সংবাদ

সাহারার উল্কাপিণ্ডে প্রাচীন মঙ্গলে পানির প্রমাণ


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ১ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম

সাহারার উল্কাপিণ্ডে প্রাচীন মঙ্গলে পানির প্রমাণ
ছবিঃ সংগৃহীত

মঙ্গল গ্রহের অতীত সম্পর্কে নতুন তথ্য দিয়েছে সাহারা মরুভূমিতে পাওয়া একটি প্রাচীন উল্কাপিণ্ড। এর রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, ৪১০ কোটিরও বেশি বছর আগে মঙ্গলের ভূত্বকে পানির উপস্থিতি ছিল। তেঘাজা ০০১ নামের নমুনাটি পৃথিবীতে শনাক্ত হওয়া মঙ্গলের সবচেয়ে প্রাচীন উল্কাপিণ্ড হতে পারে বলেও ধারণা করছেন গবেষকেরা।

২০২২ সালে মালির বির চালি গ্রামের কাছের সাহারা মরুভূমি থেকে আটটি খণ্ডে উল্কাপিণ্ডটি উদ্ধার করা হয়। এর সবচেয়ে বড় অংশটি প্রায় মানুষের মুষ্টির সমান। গবেষকদের হিসাবে, নমুনাটির বয়স অন্তত ৪১০ কোটি বছর।

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির গ্রহবিজ্ঞানী ইয়াং লিউয়ের মতে, উল্কাপিণ্ডটি মঙ্গলের এমন এক সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে, যখন গ্রহটি এখনকার তুলনায় উষ্ণ ও আর্দ্র ছিল।

শিলার ভেতরে পানির রাসায়নিক চিহ্ন

তেঘাজা ০০১ গ্যাব্রো শ্রেণির আগ্নেয় শিলা। এর প্রধান উপাদান ফেল্ডস্পার ও পাইরোক্সিন। নমুনাটিতে ইউরেনিয়ামযুক্ত জিরকন স্ফটিকও শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। ইউরেনিয়াম ধীরে ধীরে সিসায় পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে তাঁরা শিলাটির বয়স নির্ধারণ করেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, মঙ্গলের ভূগর্ভে ম্যাগমা ঠান্ডা হয়ে জমাট বাঁধার সময় পানির সঙ্গে শিলাটির রাসায়নিক বিক্রিয়া হয়েছিল। অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের বিভিন্ন আইসোটোপের পরীক্ষাতেও পানির উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

গবেষকদের ব্যাখ্যা, মঙ্গলের উপরিভাগ থেকে পানি নিচের ভূত্বকে প্রবেশ করে গলিত শিলার সংস্পর্শে এসেছিল। পৃথিবীতেও একই ধরনের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া ঘটে।

প্রাণের উপযোগী পরিবেশের সম্ভাবনা

বর্তমানে মঙ্গল শীতল ও শুষ্ক গ্রহ। কিন্তু অতীতে সেখানে নদী, হ্রদ এবং উত্তর গোলার্ধে বিশাল সমুদ্র থাকার প্রমাণ বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

নাসার অ্যামস রিসার্চ সেন্টারের গ্রহবিজ্ঞানী ও গবেষণাটির সহলেখক লি স্যাপার বলেন, তেঘাজা ০০১-এর রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য প্রাচীন মঙ্গলে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ থাকার সম্ভাবনার পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। তবে এই গবেষণা মঙ্গলে কখনো প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না, তার প্রমাণ দেয় না।

গবেষকদের ধারণা, একসময় মঙ্গলের ঘন বায়ুমণ্ডল ও উষ্ণ পরিবেশ সেখানে প্রাণের বসবাসের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করে থাকতে পারে। তবে গ্রহটির প্রথম ১০০ কোটি বছরের মধ্যেই পরিবেশে দ্রুত পরিবর্তন শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে মঙ্গল রূপ নেয় বর্তমানের শুষ্ক ও প্রতিকূল গ্রহে।

বিরল নমুনায় মঙ্গলের প্রাচীন ইতিহাস

পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত মঙ্গল থেকে আসা ৪৩৫টি উল্কাপিণ্ড শনাক্ত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে মাত্র তিনটির বয়স গ্রহটির প্রাচীন ইতিহাসের সময়কালের বলে জানা গেছে।

১৯৮৪ সালে অ্যান্টার্কটিকায় পাওয়া একটি উল্কাপিণ্ডের বয়স প্রথমে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর বলে নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এর বয়স তেঘাজা ০০১-এর কাছাকাছি পাওয়া গেছে। নতুন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দুটি নমুনার মধ্যে তেঘাজা ০০১ বেশি প্রাচীন হতে পারে।

গবেষকদের ধারণা, উল্কাপিণ্ডটি মঙ্গলের দক্ষিণাঞ্চলীয় উচ্চভূমি থেকে এসেছে। এর সম্ভাব্য উৎসস্থল হেলাস বেসিনের আশপাশ। এটি মঙ্গলের অন্যতম বৃহৎ আঘাতজনিত খাদ।

ইয়াং লিউ বলেন, পৃথিবীতে থাকা মঙ্গলের উল্কাপিণ্ডগুলোই গ্রহটির সরাসরি নমুনা। এগুলো বিশ্লেষণ করে মঙ্গলের প্রাথমিক গঠন, অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন এবং অতীতের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে উপগ্রহ, ল্যান্ডার ও রোভারের মাধ্যমে সংগ্রহ করা তথ্যও যাচাই করা সম্ভব হয়।

মঙ্গল থেকে মহাকাশ, তারপর সাহারা

তেঘাজা ০০১-এর পৃথিবীতে পৌঁছানোর সম্ভাব্য ঘটনাপ্রবাহও তুলে ধরেছেন গবেষকেরা। তাঁদের ধারণা, মঙ্গলের পৃষ্ঠে কোনো গ্রহাণুর আঘাতে শিলাটি মহাকাশে ছিটকে বেরিয়ে আসে। এরপর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর কক্ষপথে প্রবেশ করে। একপর্যায়ে বায়ুমণ্ডলে ঢুকে উল্কাপিণ্ড হিসেবে সাহারা মরুভূমিতে পড়ে।

তবে ঠিক কত দিন আগে উল্কাপিণ্ডটি পৃথিবীতে পতিত হয়েছিল, তা এখনো নির্ধারণ করা যায়নি।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬


সাহারার উল্কাপিণ্ডে প্রাচীন মঙ্গলে পানির প্রমাণ

প্রকাশের তারিখ : ০১ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

মঙ্গল গ্রহের অতীত সম্পর্কে নতুন তথ্য দিয়েছে সাহারা মরুভূমিতে পাওয়া একটি প্রাচীন উল্কাপিণ্ড। এর রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, ৪১০ কোটিরও বেশি বছর আগে মঙ্গলের ভূত্বকে পানির উপস্থিতি ছিল। তেঘাজা ০০১ নামের নমুনাটি পৃথিবীতে শনাক্ত হওয়া মঙ্গলের সবচেয়ে প্রাচীন উল্কাপিণ্ড হতে পারে বলেও ধারণা করছেন গবেষকেরা।

২০২২ সালে মালির বির চালি গ্রামের কাছের সাহারা মরুভূমি থেকে আটটি খণ্ডে উল্কাপিণ্ডটি উদ্ধার করা হয়। এর সবচেয়ে বড় অংশটি প্রায় মানুষের মুষ্টির সমান। গবেষকদের হিসাবে, নমুনাটির বয়স অন্তত ৪১০ কোটি বছর।

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির গ্রহবিজ্ঞানী ইয়াং লিউয়ের মতে, উল্কাপিণ্ডটি মঙ্গলের এমন এক সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে, যখন গ্রহটি এখনকার তুলনায় উষ্ণ ও আর্দ্র ছিল।

শিলার ভেতরে পানির রাসায়নিক চিহ্ন

তেঘাজা ০০১ গ্যাব্রো শ্রেণির আগ্নেয় শিলা। এর প্রধান উপাদান ফেল্ডস্পার ও পাইরোক্সিন। নমুনাটিতে ইউরেনিয়ামযুক্ত জিরকন স্ফটিকও শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। ইউরেনিয়াম ধীরে ধীরে সিসায় পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে তাঁরা শিলাটির বয়স নির্ধারণ করেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, মঙ্গলের ভূগর্ভে ম্যাগমা ঠান্ডা হয়ে জমাট বাঁধার সময় পানির সঙ্গে শিলাটির রাসায়নিক বিক্রিয়া হয়েছিল। অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের বিভিন্ন আইসোটোপের পরীক্ষাতেও পানির উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

গবেষকদের ব্যাখ্যা, মঙ্গলের উপরিভাগ থেকে পানি নিচের ভূত্বকে প্রবেশ করে গলিত শিলার সংস্পর্শে এসেছিল। পৃথিবীতেও একই ধরনের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া ঘটে।

প্রাণের উপযোগী পরিবেশের সম্ভাবনা

বর্তমানে মঙ্গল শীতল ও শুষ্ক গ্রহ। কিন্তু অতীতে সেখানে নদী, হ্রদ এবং উত্তর গোলার্ধে বিশাল সমুদ্র থাকার প্রমাণ বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

নাসার অ্যামস রিসার্চ সেন্টারের গ্রহবিজ্ঞানী ও গবেষণাটির সহলেখক লি স্যাপার বলেন, তেঘাজা ০০১-এর রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য প্রাচীন মঙ্গলে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ থাকার সম্ভাবনার পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। তবে এই গবেষণা মঙ্গলে কখনো প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না, তার প্রমাণ দেয় না।

গবেষকদের ধারণা, একসময় মঙ্গলের ঘন বায়ুমণ্ডল ও উষ্ণ পরিবেশ সেখানে প্রাণের বসবাসের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করে থাকতে পারে। তবে গ্রহটির প্রথম ১০০ কোটি বছরের মধ্যেই পরিবেশে দ্রুত পরিবর্তন শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে মঙ্গল রূপ নেয় বর্তমানের শুষ্ক ও প্রতিকূল গ্রহে।

বিরল নমুনায় মঙ্গলের প্রাচীন ইতিহাস

পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত মঙ্গল থেকে আসা ৪৩৫টি উল্কাপিণ্ড শনাক্ত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে মাত্র তিনটির বয়স গ্রহটির প্রাচীন ইতিহাসের সময়কালের বলে জানা গেছে।

১৯৮৪ সালে অ্যান্টার্কটিকায় পাওয়া একটি উল্কাপিণ্ডের বয়স প্রথমে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর বলে নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এর বয়স তেঘাজা ০০১-এর কাছাকাছি পাওয়া গেছে। নতুন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দুটি নমুনার মধ্যে তেঘাজা ০০১ বেশি প্রাচীন হতে পারে।

গবেষকদের ধারণা, উল্কাপিণ্ডটি মঙ্গলের দক্ষিণাঞ্চলীয় উচ্চভূমি থেকে এসেছে। এর সম্ভাব্য উৎসস্থল হেলাস বেসিনের আশপাশ। এটি মঙ্গলের অন্যতম বৃহৎ আঘাতজনিত খাদ।

ইয়াং লিউ বলেন, পৃথিবীতে থাকা মঙ্গলের উল্কাপিণ্ডগুলোই গ্রহটির সরাসরি নমুনা। এগুলো বিশ্লেষণ করে মঙ্গলের প্রাথমিক গঠন, অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন এবং অতীতের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে উপগ্রহ, ল্যান্ডার ও রোভারের মাধ্যমে সংগ্রহ করা তথ্যও যাচাই করা সম্ভব হয়।

মঙ্গল থেকে মহাকাশ, তারপর সাহারা

তেঘাজা ০০১-এর পৃথিবীতে পৌঁছানোর সম্ভাব্য ঘটনাপ্রবাহও তুলে ধরেছেন গবেষকেরা। তাঁদের ধারণা, মঙ্গলের পৃষ্ঠে কোনো গ্রহাণুর আঘাতে শিলাটি মহাকাশে ছিটকে বেরিয়ে আসে। এরপর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর কক্ষপথে প্রবেশ করে। একপর্যায়ে বায়ুমণ্ডলে ঢুকে উল্কাপিণ্ড হিসেবে সাহারা মরুভূমিতে পড়ে।

তবে ঠিক কত দিন আগে উল্কাপিণ্ডটি পৃথিবীতে পতিত হয়েছিল, তা এখনো নির্ধারণ করা যায়নি।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত