সংবাদ

বান্দরবানে বনখেকোদের থাবায় ২০০ একর প্রাকৃতিক বনভূমি বিলীন


সোহেল কান্তি নাথ, বান্দরবান
সোহেল কান্তি নাথ, বান্দরবান
প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৪ পিএম

বান্দরবানে বনখেকোদের থাবায় ২০০ একর প্রাকৃতিক বনভূমি বিলীন
বান্দরবানের আলীকদমে পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে রাস্তা, যেখান দিয়ে পাচার হচ্ছে বনের শতবর্ষী গাছ। ছবি : সংবাদ

একসময়ের গহীন অরণ্য আর বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য এখন ধূ ধূ ধ্বংসস্তূপ। বান্দরবানের আলীকদমে তৈন রেঞ্জের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নির্বিচারে বন উজাড় ও পাহাড় কাটার ফলে বিপন্ন হয়ে পড়েছে পরিবেশ। বিশেষ করে মাংগু মৌজার ‘ব্যাঙ ঝিড়ি’ এলাকায় প্রায় ২০০ একর বনভূমি এখন বৃক্ষশূন্য। বনখেকো চক্রের এই তান্ডবে পানির উৎস শুকিয়ে যাওয়ায় হাহাকার শুরু হয়েছে সাত-আটটি ম্রো পাড়ায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, আলীকদম-থানচি সড়কের ২৩ কিলোমিটার এলাকা থেকে প্রায় এক ঘণ্টা পথ হাঁটলে চোখে পড়ে এই ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মাংগু মৌজার পামিয়া ম্রো পাড়া, তন্তুই পাড়া, নামচাক পাড়া ও আদুই পাড়াসহ আশপাশের বিশাল এলাকার শতবর্ষী মাতৃগাছগুলো কেটে সাবাড় করা হয়েছে। পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে ট্রাক চলাচলের রাস্তা। ঝিড়ির পানিপ্রবাহ বন্ধ করে সেই রাস্তা দিয়ে দিনরাত পাচার হচ্ছে বিশালাকৃতির গাছের গুঁড়ি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আলীকদম পান বাজারের বাসিন্দা মো. ইসমাইল ওরফে ‘লাল ইসমাইল’ এই বন নিধন সিন্ডিকেটের মূল হোতা। তার সঙ্গে রয়েছেন লংলেইন ম্রো নামের একজন সহযোগী। অভিযোগ রয়েছে, বনের কিছু গাছ ‘জোত পারমিট’-এর দোহাই দিয়ে বৈধতার আড়ালে পাচার করা হচ্ছে, আর বাকি গাছ স্থানীয় অবৈধ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে সরবরাহ করা হচ্ছে।

আদুই পাড়ার কার্বারি (পাড়া প্রধান) কামপ্লাত ম্রো বলেন, ‘এই ঝিড়ির পানির ওপর আমাদের সাত-আটটি পাড়া নির্ভরশীল। বন উজাড় হওয়ায় ঝিড়ি শুকিয়ে গেছে। এখন আমরা পানির জন্য হাহাকার করছি। প্রশাসনে জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি।’

নামচাক পাড়ার বাসিন্দা মেন রাও ম্রো আক্ষেপ করে বলেন, ‘আগে এই বনে হরিণ, ভালুক আর বন্য শূকর দেখা যেত। এখন বন নেই, প্রাণীও নেই। গত দুই বছর ধরে ইসমাইল নামের ওই ব্যক্তি সব গাছ কেটে মরুভূমি বানিয়ে ফেলেছেন।’

পামিয়া পাড়ার রেংপু ম্রো জানান, শতবর্ষী গাছগুলোর গায়ে করাতের ক্ষতচিহ্ন এখন বনের আর্তনাদ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গাছ পরিবহনের জন্য যেভাবে পাহাড় কাটা হয়েছে, তাতে বর্ষায় ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে গাছ কাটার তদারকিতে থাকা মাঝি (শ্রমিক সরদার) ইসমাইল বলেন, ‘সওদাগর ইসমাইলের নির্দেশে আমরা করই, চাপালিশ ও গামারি গাছ কাটছি। দুটি ট্রাক দিয়ে এসব গাছ আলীকদমে নেওয়া হয়।’

তবে লামা তৈন রেঞ্জ কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলাম দাবি করেছেন, ওই এলাকায় বন বিভাগের কোনো কার্যক্রম নেই। তবে অবৈধ কাঠ পাচারের প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। দ্রুত সময়ের মধ্যে পুলিশ নিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমানও বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, এখনই এই ধ্বংসযজ্ঞ না থামালে আলীকদমের এই দুর্গম অঞ্চল অচিরেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এবং প্রান্তিক ম্রো জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬


বান্দরবানে বনখেকোদের থাবায় ২০০ একর প্রাকৃতিক বনভূমি বিলীন

প্রকাশের তারিখ : ২১ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

একসময়ের গহীন অরণ্য আর বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য এখন ধূ ধূ ধ্বংসস্তূপ। বান্দরবানের আলীকদমে তৈন রেঞ্জের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নির্বিচারে বন উজাড় ও পাহাড় কাটার ফলে বিপন্ন হয়ে পড়েছে পরিবেশ। বিশেষ করে মাংগু মৌজার ‘ব্যাঙ ঝিড়ি’ এলাকায় প্রায় ২০০ একর বনভূমি এখন বৃক্ষশূন্য। বনখেকো চক্রের এই তান্ডবে পানির উৎস শুকিয়ে যাওয়ায় হাহাকার শুরু হয়েছে সাত-আটটি ম্রো পাড়ায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, আলীকদম-থানচি সড়কের ২৩ কিলোমিটার এলাকা থেকে প্রায় এক ঘণ্টা পথ হাঁটলে চোখে পড়ে এই ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মাংগু মৌজার পামিয়া ম্রো পাড়া, তন্তুই পাড়া, নামচাক পাড়া ও আদুই পাড়াসহ আশপাশের বিশাল এলাকার শতবর্ষী মাতৃগাছগুলো কেটে সাবাড় করা হয়েছে। পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে ট্রাক চলাচলের রাস্তা। ঝিড়ির পানিপ্রবাহ বন্ধ করে সেই রাস্তা দিয়ে দিনরাত পাচার হচ্ছে বিশালাকৃতির গাছের গুঁড়ি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আলীকদম পান বাজারের বাসিন্দা মো. ইসমাইল ওরফে ‘লাল ইসমাইল’ এই বন নিধন সিন্ডিকেটের মূল হোতা। তার সঙ্গে রয়েছেন লংলেইন ম্রো নামের একজন সহযোগী। অভিযোগ রয়েছে, বনের কিছু গাছ ‘জোত পারমিট’-এর দোহাই দিয়ে বৈধতার আড়ালে পাচার করা হচ্ছে, আর বাকি গাছ স্থানীয় অবৈধ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে সরবরাহ করা হচ্ছে।

আদুই পাড়ার কার্বারি (পাড়া প্রধান) কামপ্লাত ম্রো বলেন, ‘এই ঝিড়ির পানির ওপর আমাদের সাত-আটটি পাড়া নির্ভরশীল। বন উজাড় হওয়ায় ঝিড়ি শুকিয়ে গেছে। এখন আমরা পানির জন্য হাহাকার করছি। প্রশাসনে জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি।’

নামচাক পাড়ার বাসিন্দা মেন রাও ম্রো আক্ষেপ করে বলেন, ‘আগে এই বনে হরিণ, ভালুক আর বন্য শূকর দেখা যেত। এখন বন নেই, প্রাণীও নেই। গত দুই বছর ধরে ইসমাইল নামের ওই ব্যক্তি সব গাছ কেটে মরুভূমি বানিয়ে ফেলেছেন।’

পামিয়া পাড়ার রেংপু ম্রো জানান, শতবর্ষী গাছগুলোর গায়ে করাতের ক্ষতচিহ্ন এখন বনের আর্তনাদ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গাছ পরিবহনের জন্য যেভাবে পাহাড় কাটা হয়েছে, তাতে বর্ষায় ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে গাছ কাটার তদারকিতে থাকা মাঝি (শ্রমিক সরদার) ইসমাইল বলেন, ‘সওদাগর ইসমাইলের নির্দেশে আমরা করই, চাপালিশ ও গামারি গাছ কাটছি। দুটি ট্রাক দিয়ে এসব গাছ আলীকদমে নেওয়া হয়।’

তবে লামা তৈন রেঞ্জ কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলাম দাবি করেছেন, ওই এলাকায় বন বিভাগের কোনো কার্যক্রম নেই। তবে অবৈধ কাঠ পাচারের প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। দ্রুত সময়ের মধ্যে পুলিশ নিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমানও বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, এখনই এই ধ্বংসযজ্ঞ না থামালে আলীকদমের এই দুর্গম অঞ্চল অচিরেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এবং প্রান্তিক ম্রো জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত