সংবাদ

নজরুল সঙ্গীতে প্রেমময়ী নারী


সুহৃদ সাদিক
সুহৃদ সাদিক
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১৪ এএম

নজরুল সঙ্গীতে প্রেমময়ী নারী
কাজী নজরুল ইসলাম

আধুনিক বাংলা গানের পঞ্চরত্ন হিসেবে রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ ও নজরুলের নাম স্মরণীয়| বিশ শতকের প্রথম চার দশকে এই পাঁচ বিশিষ্ট শিল্পী বাংলা সংগীতকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন| বিশেষত রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ তাঁরা ছিলেন একাধারে কবি ও সংগীতজ্ঞ| তবে নজরুলই প্রথম তাঁর গানে আধুনিকতার বীজ বপন করেন| তিনি ছিলেন উচ্চাঙ্গ সংগীতের গভীর অনুরাগী এবং সেই সুরে আধুনিকতার ছোঁয়া এনে নতুন এক ধারার জন্ম দেন| সাঙ্গীতিক হিসেবে তাঁর পরিচয়টি বাদ দিলে, পূর্ণ নজরুলকে কখনোই পাওয়া যাবে না| তাঁর নিজের অভিমত: ‘সাহিত্যে দান আমার কতোটুকু তা আমার জানা নেই| তবে এইটুকু মনে আছে, সঙ্গীতে আমি কিছু দিতে পেরেছি|’

নজরুলের রোমান্টিক মানসে প্রেমের যে চেতনা ক্রিয়াশীল ছিল, তাকে বিচিত্রপথে ˆবচিত্র্যমণ্ডিত রূপ দিতে তিনি সদা-সচেষ্ট ছিলেন| তাঁর সঙ্গীতে ব্যক্তিপ্রেম ধীরে ধীরে উত্তীর্ণ হয়েছে ˆনর্ব্যক্তিক প্রেমবোধে; দেহগন্ধী প্রেম অতিক্রম করে তা পৌঁছেছে অতীন্দ্রিয় ভাবলালিত্যে| প্রেমকে তিনি যে দৃষ্টিতে উপলব্ধি করেছেন, সেই দৃষ্টির পূর্ণতা অনুধাবন করতে হলে বাঙালি কবি-গীতিকারদের দীর্ঘ ঐতিহ্যে প্রেমের বিবর্তনের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় প্রদান প্রয়োজন| জয়দেব এবং বড়ু চণ্ডীদাসের রচনায় নায়ক-নায়িকার প্রেমে শারীরিকতার উপস্থিতি থাকলেও তা আবেগে পরিপূর্ণ নয়| ˆচতন্য-উত্তর পদকারদের হাতে এসে সেই প্রেম ধীরে ধীরে আবেগসমৃদ্ধ হয়ে ওঠে| যেমন ‘রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর’— এই চরণের পরবর্তী অংশ “প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর”-এ নিষিদ্ধ প্রেমের বেদনাময় আবেগ গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে| অন্যদিকে, গ্রামীণ লোকজ প্রেমোক্তিতেও পাওয়া যায় এক স্বতঃস্ফূর্ত মর্মস্পর্শিতা: “কোথায় পাব কলসি কন্যা, কোথায় পাব দড়ি/ তুমি হও গহিন গাঙ, আমি ডুইব্যা মরি”— যা গ্রাম্যতার মধ্যেও হৃদয়ের গভীরে অনুরণন তোলে| ˆবষ্ণব পদকারদের নিষিদ্ধ প্রেমে একসময় ˆনতিকতা ও আধ্যাত্মিক মনোভাব বিদ্যমান ছিল; কিন্তু অষ্টাদশ শতকের ক্ষয়িষ্ণু ˆবষ্ণব সাহিত্যে তা ক্রমে ˆবধতার সীমা লঙ্ঘন করে| “মনে রয়ে গেল মনেরই বেদনা” প্রভৃতি গানে কৌলিন্য-নিয়ন্ত্রিত বাঙালি বধূর যন্ত্রণা ধরা পড়লেও, সেখানে আবেগের তীব্রতা বা সৃজনশীল প্রেরণার ঘনত্ব ততটা লক্ষণীয় নয়|

রবীন্দ্রনাথ ঐতিহ্যের প্রাসাদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতি ও জীবনানুভবকে যুক্ত করে প্রেমের গানে এনে দিয়েছেন এক পরিণত, সুষম ও পূর্ণাঙ্গ রূপ| প্রেমের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তাঁর মন্তব্য: ‘বাংলা ভাষায় প্রেম অর্থে দুটো শব্দের চল আছে, ভালোলাগা আর ভালোবাসা|... যেখানে ভালোলাগা, সেখানে ভালো আমাকে লাগে, যেখানে ভালোবাসা সেখানে ভালো অন্যকে বাসি| আবেগের মুখটা যখন নিজের দিকে তখন ভালোলাগা; যখন অন্যের দিকে, তখন ভালোবাসা| ভালোলাগায় ভোগের তৃপ্তি, ভালোবাসায় ত্যাগের সাধন|’ তাঁর প্রেমচিন্তায় ত্যাগের মহিমা বিশেষভাবে স্বীকৃত হলেও, তিনি এটা কখনোই অস্বীকার করেননি যে নর-নারীর পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সহাবস্থানই প্রেমের মূল ভিত্তি| তিনি স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছেন, প্রেমের পরিসরে নারীর ভূমিকা কোনোভাবেই গৌণ নয়; তা সমানভাবে সক্রিয় ও তাৎপর্যপূর্ণ| এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রেমকে কেবল আধ্যাত্মিক উচ্চতায় নয়, বরং মানবিক সম্পর্কের গভীর ও বাস্তব সত্যের মধ্যেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন| এর ধারাবাহিকতার মধ্যেই নজরুল তাঁর প্রেমভাবনাকে নতুন মাত্রা ও ˆবচিত্র্য দান করেছেন|

নজরুলের অসংখ্য গানে নারী বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছে— কখনো প্রেমময়ী, কখনো কল্যাণী, কখনো শক্তিময়ী প্রেমপ্রত্যাশী; আবার কখনো প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকা, কিংবা প্রেমবেদনায় বিদীর্ণ এক চিরন্তন মানবিক সত্তা হিসেবে| এই বহুমাত্রিক উপস্থাপনার অন্তরালে যে একক সুরটি সর্বত্র অনুরণিত, তা হলো প্রেম| তাঁর সমগ্র সঙ্গীতধারার বিস্তৃত পরিসর জুড়ে প্রেমই প্রধান সঞ্চারশক্তি হিসেবে বিরাজমান| তবে এই প্রেম কেবল প্রাপ্তির আনন্দময় পরিধিতেই সীমাবদ্ধ নয়; অপ্রাপ্তির করুণ, বেদনাময় অথচ মোহময় অনুভূতিতেও তা সমানভাবে স্পন্দিত| ‘অগ্নি-বীণা’র বিদ্রোহী নজরুল সঙ্গীতের ভুবনে রূপান্তরিত হন এক গভীর সংবেদনশীল প্রেমিক-পুরুষে| প্রেমিকার প্রত্যাখ্যান তাঁকে করে তোলে আহত, অশ্রুসিক্ত ও ব্যথাবিধুর; কখনো তা তাঁকে হতাশা ও দিশাহীনতার গভীর অন্ধকারেও নিমজ্জিত করে|

নজরুলের গানে প্রেমময়ী ঐতিহাসিক নারীদের উপস্থিতি প্রেমের অনুপম মাধুর্যকে গভীরতর করেছে| নূরজাহান, মমতাজ, আনারকলি, চাঁদ সুলতানা, শিরী ও লায়লীর মতো চরিত্রগুলো তাঁর সৃষ্টিতে বারবার ফিরে আসে প্রেমের চিরন্তন প্রতীক হয়ে| এসব নারীর আকাঙ্ক্ষা মূলত ইহজাগতিক| তারা চায় ভালোবাসার স্পর্শে নিজেকে সুন্দর ও পরিপূর্ণ করে তুলতে| প্রেমিকের সান্নিধ্যই তাদের কাছে জীবনের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি| পারলৌকিক সুখের মায়াবী কল্পনা তাদের আকর্ষণ করে না; বরং তারা বাস্তব জীবনের বিরহ, বেদনা ও বিচ্ছেদের অনুভূতিকেই সত্য বলে গ্রহণ করে| এইভাবেই নজরুল তাঁর নারী চরিত্রগুলোর মাধ্যমে প্রেমকে মাটির কাছাকাছি, জীবন্ত ও গভীর মানবিকতায় রূপ দিয়েছেন|

দেশ-কাল অতিক্রমী কবি নজরুল বিশ্বমানবতাকে প্রেমের শাশ্বত বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন| তাঁর সৃষ্ট নারীচরিত্রগুলোর মধ্যে প্রেমময়ী নূরজাহান বিশেষভাবে উজ্জ্বল| নূরজাহান, যার প্রকৃত নাম মেহের-উন-নিসা, জন্মগ্রহণ করেন ১৫৭৫ সালে পারস্যের এক অভিজাত পরিবারে| তাঁর পিতা মির্জা গিয়াস বেগ ভাগ্যের সন্ধানে ভারতবর্ষে আগমন করেন এবং সম্রাট আকবরের দরবারে কর্মসংস্থান লাভ করে দ্রুতই নিজের যোগ্যতার পরিচয় দেন| কান্দাহারে জন্ম নেওয়া এই কন্যাই পরবর্তীকালে মুঘল ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত হন|

তরুণী মেহের-উন-নিসার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন শাহজাদা সেলিম (পরবর্তী সম্রাট জাহাঙ্গীর), তবে সম্রাট আকবর এই সম্পর্ক মেনে নেননি| ফলে তাঁকে ইরানী সেনাপতি শের আফগান আলী কুলি খানের সঙ্গে বিবাহ দেওয়া হয়| বর্ধমানে বসবাসকালে তাদের ঘরে জন্ম নেয় কন্যা লাভলী বেগম| পরবর্তী সময়ে শের আফগান একটা অভিযানে নিহত হলে মেহের-উন-নিসা আগ্রায় ফিরে আসেন এবং রুকাইয়া বেগমের সেবায় নিযুক্ত হন| ১৬১১ সালে নওরোজ উৎসবে মীনা বাজারে জাহাঙ্গীর পুনরায় তাঁকে দেখে মুগ্ধ হন এবং অচিরেই তাঁকে বিবাহ করেন|

প্রথমে ‘নূর মহল’ এবং পরে ‘নূরজাহান’ উপাধিতে ভূষিত এই নারী শুধু সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বুদ্ধিমত্তা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার জন্যও প্রসিদ্ধ হন| ইরানী ঐতিহ্যের আবহ নিয়ে তিনি যেন সিন্ধুর ঢেউ পেরিয়ে এসে মিশেছেন শ্যামল, স্বপ্নময় ভারতবর্ষে| নজরুল লিখেছেন: ‘নূরজাহান! নূরজাহান, সিন্ধু নদীতে ভেসে/ এলে মেঘলামতীর দেশে, ইরানী গুলিস্তান!!’ কবি তাঁকে ˆদ্বত ঐতিহ্যের সমš^য়ে গড়ে তুলেছেন প্রেম ও সৌন্দর্যের গভীরতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে| তার প্রেমে প্রেমিক ভুলে যায় সকল জাত্যাভিমান, বংশমর্যাদা: ‘তব প্রেমে উন্মাদ ভুলিল সেলিম সে যে রাজাধিরাজ,/ চন্দন-সম মাখিল অঙ্গে কলঙ্ক লোক-লাজ|’ পূর্ণিমার চাঁদের কলঙ্ক যেমন তার সৌন্দর্যকে ম্লান করতে পারে না, তেমনি প্রেমের বিশালতায় প্রেমিকের ক্ষুদ্র ত্রুটি তুচ্ছ হয়ে যায়| এই প্রেম অনন্ত প্রবাহমান, যার মর্যাদায় চিরন্তন প্রেমিক সর্বদাই শ্রদ্ধাভরে নতশির থাকে|

নশ্বর পৃথিবীতে প্রেমই একমাত্র অবিনশ্বর— এই চেতনা কবির মনে সদা জাগ্রত| ক্ষমতা ও ঐশ্বর্য ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু প্রেম চিরকাল নিজ মহিমায় দীপ্ত| মমতাজ— নূরজাহানের ভ্রাতা আসফ খাঁর কন্যা ও সম্রাট শাহজাহানের প্রিয়তমা, সেই শাশ্বত প্রেমের উজ্জ্বল প্রতীক| কবি তাঁর প্রেমকে ¯^র্গীয় আবেগে মহিমাšি^ত করেছেন| মমতাজের স্মৃতিকে ধারণ করে গড়ে ওঠা তাজমহল শুধু একটি স্থাপত্য নয়, এটি প্রেমের অমর স্মারক:

“মমতাজ! মমতাজ! তোমার তাজমহল

বৃন্দাবনের একমুঠো প্রেম, ফেরদৌসের একমুঠো প্রেম

আজো করে ঝলমল!!”

হিন্দু-মুসলিম ঐতিহ্যের অপূর্ব সময়ে তাজমহল যেন বৃন্দাবনের সৌরভ ও ফেরদৌসের মাধুর্যে ভরা এক চিরন্তন প্রেমস্মারক|

ইতিহাস ও কল্পনার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা ট্র্যাজিক প্রেমকাহিনির অন্যতম নায়িকা আনারকলি| তাঁকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে শাহজাদা সেলিম এবং সম্রাট আকবর-এর রাজদরবারের জটিল সম্পর্ক| সেলিমের সঙ্গে আনারকলির গভীর প্রেম সম্রাট আকবর মেনে নেননি| রাজশক্তির কঠোরতায় এই প্রেম নিষ্ঠুর পরিণতির দিকে ধাবিত হয়| প্রচলিত কিংবদন্তিতে বলা হয়ে থাকে, আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল| এই বিয়োগান্ত সমাপ্তিই তাদের প্রেমকে দিয়েছে এক অনন্ত মাত্রা| কারণ পূর্ণতা নয়, বরং অসমাপ্ততাই কখনও কখনও প্রেমকে চিরস্থায়ী করে তোলে| নজরুল লিখেছেন:

“মোগলের মসনদ মিলায়েছে মাটিতে

তুমি আজো দুলিতেছ ফুলের হাসিতে

বিরহীর বাঁশীতে;

তব জীবন্ত সমাধির বিগলিত পাষাণে

আজিও প্রেম-যমুনায় ঢেউ উঠে উথলি

আনার কলি! আনার কলি!”

এভাবেই আনারকলি ও সেলিমের প্রেম ইতিহাসের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠেছে শাশ্বত ভালোবাসার এক মর্মস্পর্শী প্রতীক|

দুনিয়ার সাধারণ মানবিক প্রেমে উন্মাদিনী লাইলীকে পাওয়া যায় ‘লাইলী তোমার এসেছে ফিরিয়া/ মজনু গো আঁখি খোলো/ প্রিয়তম! এতদিন বিরহের/ নিশি বুঝি ভোর হলো!!’ গানে| গানটা নজরুলের অসাধারণ সৃষ্টি| এখানে দেখা যায়, লাইলী মূলত পার্থিব জগতের এক বিরহবিধূর প্রেমিকা, যার প্রেমে আধ্যাত্মিকতার প্রত্যক্ষ স্পর্শ নেই| কিন্তু সেই লাইলীর প্রতি গভীর ভালোবাসাকেই আশ্রয় করে মজনু ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিকতার গভীরে প্রবেশ করেছেন|

নজরুল সঙ্গীতে প্রেমিকা নারী কখনও কালিদাসীয় সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি, আবার কখনও ঐতিহাসিক নারী রেনেসাঁসের দীপ্ত আলোয় উদ্ভাসিত| ভারতীয় ও মধ্যপ্রাচ্যীয় ঐতিহ্যের নারীদের তিনি চমৎকারভাবে রূপায়িত করেছেন| সেখানে ব্যক্তি  স্বাতন্ত্র্য ও আধুনিক চেতনার এক অপূর্ব সমš^য় ঘটেছে| এই উপস্থাপনায় উদ্ভাসিত হয়েছে শাশ্বত নারীর সার্বজনীন পরিচয়| এসব নারী কেবল ইতিহাস বা পুরাণের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না; তারা হয়ে ওঠে চিরন্তন মানবিক অনুভূতির প্রতীক| তাদের ভাবনা, আবেগ, ব্যক্তিত্ব ও কর্ম বর্তমান সময়ের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে রচনা করে এক জীবন্ত, অনন্ত শাশ্বত নারীমূর্তি|

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬


নজরুল সঙ্গীতে প্রেমময়ী নারী

প্রকাশের তারিখ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

আধুনিক বাংলা গানের পঞ্চরত্ন হিসেবে রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ ও নজরুলের নাম স্মরণীয়| বিশ শতকের প্রথম চার দশকে এই পাঁচ বিশিষ্ট শিল্পী বাংলা সংগীতকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন| বিশেষত রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ তাঁরা ছিলেন একাধারে কবি ও সংগীতজ্ঞ| তবে নজরুলই প্রথম তাঁর গানে আধুনিকতার বীজ বপন করেন| তিনি ছিলেন উচ্চাঙ্গ সংগীতের গভীর অনুরাগী এবং সেই সুরে আধুনিকতার ছোঁয়া এনে নতুন এক ধারার জন্ম দেন| সাঙ্গীতিক হিসেবে তাঁর পরিচয়টি বাদ দিলে, পূর্ণ নজরুলকে কখনোই পাওয়া যাবে না| তাঁর নিজের অভিমত: ‘সাহিত্যে দান আমার কতোটুকু তা আমার জানা নেই| তবে এইটুকু মনে আছে, সঙ্গীতে আমি কিছু দিতে পেরেছি|’

নজরুলের রোমান্টিক মানসে প্রেমের যে চেতনা ক্রিয়াশীল ছিল, তাকে বিচিত্রপথে ˆবচিত্র্যমণ্ডিত রূপ দিতে তিনি সদা-সচেষ্ট ছিলেন| তাঁর সঙ্গীতে ব্যক্তিপ্রেম ধীরে ধীরে উত্তীর্ণ হয়েছে ˆনর্ব্যক্তিক প্রেমবোধে; দেহগন্ধী প্রেম অতিক্রম করে তা পৌঁছেছে অতীন্দ্রিয় ভাবলালিত্যে| প্রেমকে তিনি যে দৃষ্টিতে উপলব্ধি করেছেন, সেই দৃষ্টির পূর্ণতা অনুধাবন করতে হলে বাঙালি কবি-গীতিকারদের দীর্ঘ ঐতিহ্যে প্রেমের বিবর্তনের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় প্রদান প্রয়োজন| জয়দেব এবং বড়ু চণ্ডীদাসের রচনায় নায়ক-নায়িকার প্রেমে শারীরিকতার উপস্থিতি থাকলেও তা আবেগে পরিপূর্ণ নয়| ˆচতন্য-উত্তর পদকারদের হাতে এসে সেই প্রেম ধীরে ধীরে আবেগসমৃদ্ধ হয়ে ওঠে| যেমন ‘রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর’— এই চরণের পরবর্তী অংশ “প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর”-এ নিষিদ্ধ প্রেমের বেদনাময় আবেগ গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে| অন্যদিকে, গ্রামীণ লোকজ প্রেমোক্তিতেও পাওয়া যায় এক স্বতঃস্ফূর্ত মর্মস্পর্শিতা: “কোথায় পাব কলসি কন্যা, কোথায় পাব দড়ি/ তুমি হও গহিন গাঙ, আমি ডুইব্যা মরি”— যা গ্রাম্যতার মধ্যেও হৃদয়ের গভীরে অনুরণন তোলে| ˆবষ্ণব পদকারদের নিষিদ্ধ প্রেমে একসময় ˆনতিকতা ও আধ্যাত্মিক মনোভাব বিদ্যমান ছিল; কিন্তু অষ্টাদশ শতকের ক্ষয়িষ্ণু ˆবষ্ণব সাহিত্যে তা ক্রমে ˆবধতার সীমা লঙ্ঘন করে| “মনে রয়ে গেল মনেরই বেদনা” প্রভৃতি গানে কৌলিন্য-নিয়ন্ত্রিত বাঙালি বধূর যন্ত্রণা ধরা পড়লেও, সেখানে আবেগের তীব্রতা বা সৃজনশীল প্রেরণার ঘনত্ব ততটা লক্ষণীয় নয়|

রবীন্দ্রনাথ ঐতিহ্যের প্রাসাদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতি ও জীবনানুভবকে যুক্ত করে প্রেমের গানে এনে দিয়েছেন এক পরিণত, সুষম ও পূর্ণাঙ্গ রূপ| প্রেমের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তাঁর মন্তব্য: ‘বাংলা ভাষায় প্রেম অর্থে দুটো শব্দের চল আছে, ভালোলাগা আর ভালোবাসা|... যেখানে ভালোলাগা, সেখানে ভালো আমাকে লাগে, যেখানে ভালোবাসা সেখানে ভালো অন্যকে বাসি| আবেগের মুখটা যখন নিজের দিকে তখন ভালোলাগা; যখন অন্যের দিকে, তখন ভালোবাসা| ভালোলাগায় ভোগের তৃপ্তি, ভালোবাসায় ত্যাগের সাধন|’ তাঁর প্রেমচিন্তায় ত্যাগের মহিমা বিশেষভাবে স্বীকৃত হলেও, তিনি এটা কখনোই অস্বীকার করেননি যে নর-নারীর পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সহাবস্থানই প্রেমের মূল ভিত্তি| তিনি স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছেন, প্রেমের পরিসরে নারীর ভূমিকা কোনোভাবেই গৌণ নয়; তা সমানভাবে সক্রিয় ও তাৎপর্যপূর্ণ| এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রেমকে কেবল আধ্যাত্মিক উচ্চতায় নয়, বরং মানবিক সম্পর্কের গভীর ও বাস্তব সত্যের মধ্যেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন| এর ধারাবাহিকতার মধ্যেই নজরুল তাঁর প্রেমভাবনাকে নতুন মাত্রা ও ˆবচিত্র্য দান করেছেন|

নজরুলের অসংখ্য গানে নারী বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছে— কখনো প্রেমময়ী, কখনো কল্যাণী, কখনো শক্তিময়ী প্রেমপ্রত্যাশী; আবার কখনো প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকা, কিংবা প্রেমবেদনায় বিদীর্ণ এক চিরন্তন মানবিক সত্তা হিসেবে| এই বহুমাত্রিক উপস্থাপনার অন্তরালে যে একক সুরটি সর্বত্র অনুরণিত, তা হলো প্রেম| তাঁর সমগ্র সঙ্গীতধারার বিস্তৃত পরিসর জুড়ে প্রেমই প্রধান সঞ্চারশক্তি হিসেবে বিরাজমান| তবে এই প্রেম কেবল প্রাপ্তির আনন্দময় পরিধিতেই সীমাবদ্ধ নয়; অপ্রাপ্তির করুণ, বেদনাময় অথচ মোহময় অনুভূতিতেও তা সমানভাবে স্পন্দিত| ‘অগ্নি-বীণা’র বিদ্রোহী নজরুল সঙ্গীতের ভুবনে রূপান্তরিত হন এক গভীর সংবেদনশীল প্রেমিক-পুরুষে| প্রেমিকার প্রত্যাখ্যান তাঁকে করে তোলে আহত, অশ্রুসিক্ত ও ব্যথাবিধুর; কখনো তা তাঁকে হতাশা ও দিশাহীনতার গভীর অন্ধকারেও নিমজ্জিত করে|

নজরুলের গানে প্রেমময়ী ঐতিহাসিক নারীদের উপস্থিতি প্রেমের অনুপম মাধুর্যকে গভীরতর করেছে| নূরজাহান, মমতাজ, আনারকলি, চাঁদ সুলতানা, শিরী ও লায়লীর মতো চরিত্রগুলো তাঁর সৃষ্টিতে বারবার ফিরে আসে প্রেমের চিরন্তন প্রতীক হয়ে| এসব নারীর আকাঙ্ক্ষা মূলত ইহজাগতিক| তারা চায় ভালোবাসার স্পর্শে নিজেকে সুন্দর ও পরিপূর্ণ করে তুলতে| প্রেমিকের সান্নিধ্যই তাদের কাছে জীবনের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি| পারলৌকিক সুখের মায়াবী কল্পনা তাদের আকর্ষণ করে না; বরং তারা বাস্তব জীবনের বিরহ, বেদনা ও বিচ্ছেদের অনুভূতিকেই সত্য বলে গ্রহণ করে| এইভাবেই নজরুল তাঁর নারী চরিত্রগুলোর মাধ্যমে প্রেমকে মাটির কাছাকাছি, জীবন্ত ও গভীর মানবিকতায় রূপ দিয়েছেন|

দেশ-কাল অতিক্রমী কবি নজরুল বিশ্বমানবতাকে প্রেমের শাশ্বত বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন| তাঁর সৃষ্ট নারীচরিত্রগুলোর মধ্যে প্রেমময়ী নূরজাহান বিশেষভাবে উজ্জ্বল| নূরজাহান, যার প্রকৃত নাম মেহের-উন-নিসা, জন্মগ্রহণ করেন ১৫৭৫ সালে পারস্যের এক অভিজাত পরিবারে| তাঁর পিতা মির্জা গিয়াস বেগ ভাগ্যের সন্ধানে ভারতবর্ষে আগমন করেন এবং সম্রাট আকবরের দরবারে কর্মসংস্থান লাভ করে দ্রুতই নিজের যোগ্যতার পরিচয় দেন| কান্দাহারে জন্ম নেওয়া এই কন্যাই পরবর্তীকালে মুঘল ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত হন|

তরুণী মেহের-উন-নিসার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন শাহজাদা সেলিম (পরবর্তী সম্রাট জাহাঙ্গীর), তবে সম্রাট আকবর এই সম্পর্ক মেনে নেননি| ফলে তাঁকে ইরানী সেনাপতি শের আফগান আলী কুলি খানের সঙ্গে বিবাহ দেওয়া হয়| বর্ধমানে বসবাসকালে তাদের ঘরে জন্ম নেয় কন্যা লাভলী বেগম| পরবর্তী সময়ে শের আফগান একটা অভিযানে নিহত হলে মেহের-উন-নিসা আগ্রায় ফিরে আসেন এবং রুকাইয়া বেগমের সেবায় নিযুক্ত হন| ১৬১১ সালে নওরোজ উৎসবে মীনা বাজারে জাহাঙ্গীর পুনরায় তাঁকে দেখে মুগ্ধ হন এবং অচিরেই তাঁকে বিবাহ করেন|

প্রথমে ‘নূর মহল’ এবং পরে ‘নূরজাহান’ উপাধিতে ভূষিত এই নারী শুধু সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বুদ্ধিমত্তা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার জন্যও প্রসিদ্ধ হন| ইরানী ঐতিহ্যের আবহ নিয়ে তিনি যেন সিন্ধুর ঢেউ পেরিয়ে এসে মিশেছেন শ্যামল, স্বপ্নময় ভারতবর্ষে| নজরুল লিখেছেন: ‘নূরজাহান! নূরজাহান, সিন্ধু নদীতে ভেসে/ এলে মেঘলামতীর দেশে, ইরানী গুলিস্তান!!’ কবি তাঁকে ˆদ্বত ঐতিহ্যের সমš^য়ে গড়ে তুলেছেন প্রেম ও সৌন্দর্যের গভীরতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে| তার প্রেমে প্রেমিক ভুলে যায় সকল জাত্যাভিমান, বংশমর্যাদা: ‘তব প্রেমে উন্মাদ ভুলিল সেলিম সে যে রাজাধিরাজ,/ চন্দন-সম মাখিল অঙ্গে কলঙ্ক লোক-লাজ|’ পূর্ণিমার চাঁদের কলঙ্ক যেমন তার সৌন্দর্যকে ম্লান করতে পারে না, তেমনি প্রেমের বিশালতায় প্রেমিকের ক্ষুদ্র ত্রুটি তুচ্ছ হয়ে যায়| এই প্রেম অনন্ত প্রবাহমান, যার মর্যাদায় চিরন্তন প্রেমিক সর্বদাই শ্রদ্ধাভরে নতশির থাকে|

নশ্বর পৃথিবীতে প্রেমই একমাত্র অবিনশ্বর— এই চেতনা কবির মনে সদা জাগ্রত| ক্ষমতা ও ঐশ্বর্য ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু প্রেম চিরকাল নিজ মহিমায় দীপ্ত| মমতাজ— নূরজাহানের ভ্রাতা আসফ খাঁর কন্যা ও সম্রাট শাহজাহানের প্রিয়তমা, সেই শাশ্বত প্রেমের উজ্জ্বল প্রতীক| কবি তাঁর প্রেমকে ¯^র্গীয় আবেগে মহিমাšি^ত করেছেন| মমতাজের স্মৃতিকে ধারণ করে গড়ে ওঠা তাজমহল শুধু একটি স্থাপত্য নয়, এটি প্রেমের অমর স্মারক:

“মমতাজ! মমতাজ! তোমার তাজমহল

বৃন্দাবনের একমুঠো প্রেম, ফেরদৌসের একমুঠো প্রেম

আজো করে ঝলমল!!”

হিন্দু-মুসলিম ঐতিহ্যের অপূর্ব সময়ে তাজমহল যেন বৃন্দাবনের সৌরভ ও ফেরদৌসের মাধুর্যে ভরা এক চিরন্তন প্রেমস্মারক|

ইতিহাস ও কল্পনার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা ট্র্যাজিক প্রেমকাহিনির অন্যতম নায়িকা আনারকলি| তাঁকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে শাহজাদা সেলিম এবং সম্রাট আকবর-এর রাজদরবারের জটিল সম্পর্ক| সেলিমের সঙ্গে আনারকলির গভীর প্রেম সম্রাট আকবর মেনে নেননি| রাজশক্তির কঠোরতায় এই প্রেম নিষ্ঠুর পরিণতির দিকে ধাবিত হয়| প্রচলিত কিংবদন্তিতে বলা হয়ে থাকে, আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল| এই বিয়োগান্ত সমাপ্তিই তাদের প্রেমকে দিয়েছে এক অনন্ত মাত্রা| কারণ পূর্ণতা নয়, বরং অসমাপ্ততাই কখনও কখনও প্রেমকে চিরস্থায়ী করে তোলে| নজরুল লিখেছেন:

“মোগলের মসনদ মিলায়েছে মাটিতে

তুমি আজো দুলিতেছ ফুলের হাসিতে

বিরহীর বাঁশীতে;

তব জীবন্ত সমাধির বিগলিত পাষাণে

আজিও প্রেম-যমুনায় ঢেউ উঠে উথলি

আনার কলি! আনার কলি!”

এভাবেই আনারকলি ও সেলিমের প্রেম ইতিহাসের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠেছে শাশ্বত ভালোবাসার এক মর্মস্পর্শী প্রতীক|

দুনিয়ার সাধারণ মানবিক প্রেমে উন্মাদিনী লাইলীকে পাওয়া যায় ‘লাইলী তোমার এসেছে ফিরিয়া/ মজনু গো আঁখি খোলো/ প্রিয়তম! এতদিন বিরহের/ নিশি বুঝি ভোর হলো!!’ গানে| গানটা নজরুলের অসাধারণ সৃষ্টি| এখানে দেখা যায়, লাইলী মূলত পার্থিব জগতের এক বিরহবিধূর প্রেমিকা, যার প্রেমে আধ্যাত্মিকতার প্রত্যক্ষ স্পর্শ নেই| কিন্তু সেই লাইলীর প্রতি গভীর ভালোবাসাকেই আশ্রয় করে মজনু ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিকতার গভীরে প্রবেশ করেছেন|

নজরুল সঙ্গীতে প্রেমিকা নারী কখনও কালিদাসীয় সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি, আবার কখনও ঐতিহাসিক নারী রেনেসাঁসের দীপ্ত আলোয় উদ্ভাসিত| ভারতীয় ও মধ্যপ্রাচ্যীয় ঐতিহ্যের নারীদের তিনি চমৎকারভাবে রূপায়িত করেছেন| সেখানে ব্যক্তি  স্বাতন্ত্র্য ও আধুনিক চেতনার এক অপূর্ব সমš^য় ঘটেছে| এই উপস্থাপনায় উদ্ভাসিত হয়েছে শাশ্বত নারীর সার্বজনীন পরিচয়| এসব নারী কেবল ইতিহাস বা পুরাণের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না; তারা হয়ে ওঠে চিরন্তন মানবিক অনুভূতির প্রতীক| তাদের ভাবনা, আবেগ, ব্যক্তিত্ব ও কর্ম বর্তমান সময়ের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে রচনা করে এক জীবন্ত, অনন্ত শাশ্বত নারীমূর্তি|


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত