সংবাদ

বুলেট বৈরাগী হত্যাকাণ্ড

স্ত্রীর আহাজারি ‘কলিজাকে তো আর দেখতে পাবো না’


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, কুমিল্লা
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, কুমিল্লা
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৯ পিএম

স্ত্রীর আহাজারি ‘কলিজাকে তো আর দেখতে পাবো না’
বুলেট বৈরাগীর ছবি এখন স্ত্রীর উর্মির কাছে শুধুই স্মৃতি। ছবি: প্রতিনিধি

চট্টগ্রাম থেকে প্রশিক্ষণ শেষে গভীর রাতে বাসায় ফিরছিলেন। কিন্তু বাড়ির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর আগেই দুর্বৃত্তদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী। মৃত্যুর দুই দিন পর যখন তার লাশ বাড়ির সামনে আনা হলো, বুক ফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী উর্মি হিরা।

অ্যাম্বুলেন্সের কাচ ধরে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন হিরা। এর মধ্যেই বলে চলছিলেন, ‘ও বুলেট, আমাকে কই রেখে গেলে? আমি কীভাবে বাঁচবো? আমার কলিজাকে তো আর দেখতে পাবো না। ওরে তো পুড়িয়ে দিবে।’

সোমবার (২৭ এপ্রিল) তাদের একমাত্র সন্তান অভয় বৈরাগীর প্রথম জন্মদিন। কিন্তু জন্মদিনের দুদিন আগেই বাবাকে হারিয়ে ফেলল মেয়ে। আর তিন দিন আগেই ছিল বুলেট ও উর্মির বিবাহবার্ষিকী। সংসারের সব হিসাব মেলাতে গিয়েই যেন নেমে এলো অন্ধকার।

বুলেট বৈরাগী

বুলেট বৈরাগী (৩২) ৪১তম বিসিএসের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে কুমিল্লা কাস্টমসের বিবির বাজার স্থলবন্দরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা পদে কর্মরত ছিলেন। চট্টগ্রামে বিভাগীয় প্রশিক্ষণ শেষে গত শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) গভীর রাতে তিনি কুমিল্লায় ফিরছিলেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকাগামী বাস থেকে তিনি হাইওয়েতে নেমে নগরীর টমছম ব্রিজ এলাকায় এসে রাত ২টা ২৫ মিনিটে স্ত্রীর সঙ্গে শেষবার কথা বলেন। এরপর থেকে দুর্বৃত্তরা তার মোবাইল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।

ভোর সাড়ে ৫টায় তার মোবাইলের লোকেশন ছিল চৌয়ারা এলাকায়। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানেই তাকে হত্যা করে টাকা, মোবাইল ও ক্যামেরা লুট করে নেওয়া হয়। পরে লাশ ফেলে রাখা হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি রোড এলাকার একটি হোটেলের সামনের ফুটপাতে। শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকালে হাইওয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে।

নিহত বুলেট বৈরাগীর বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। বাবা-মা ও ছোট বোনকে রেখে সংসারের হাল ধরতে তিনি দেড় বছর আগে চাকরিতে যোগ দেন। রোববার (২৬ এপ্রিল) তার লাশ বাড়ির পথে কাস্টমস কার্যালয়ের সামনে আনা হলে বাবা-মা আর স্ত্রীর আহাজারিতে করুণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

পারিবারিক সূত্র জানায়, ২০২২ সালের ২৩ এপ্রিল বাগেরহাটের মেয়ে উর্মির সঙ্গে বুলেটের বিয়ে হয়। তাদের অভয় নামে এক বছর বয়সী এক কন্যা সন্তান আছে। তিন দিন আগেই তারা বিবাহবার্ষিকী পালন করেছেন। আর সোমবার (২৭ এপ্রিল) ছিল অভয়ের প্রথম জন্মদিন। সেদিনই শেষমেষ বাবাকে চিরদিনের জন্য বিদায় জানাতে হলো মেয়েকে।

এ ঘটনায় নিহতের মা নীলিমা বৈরাগী বাদী হয়ে শনিবার রাতে সদর দক্ষিণ মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ দাবি করলেও অগ্রগতি না পাওয়ায় ছায়া তদন্ত শুরু করে র‌্যাব, ডিবি, সিআইডি ও পিবিআই।

গভীর রাতে র‌্যাব জানায়, বুলেট বৈরাগী হত্যার রহস্য উদঘাটন হয়েছে। জড়িত কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। আগামীকাল সোমবার সকাল ১১টায় কুমিল্লার শাকতলা এলাকায় র্যাব-১১, সিপিসি-০২ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে বিস্তারিত জানানো হবে বলে র‌্যাব সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বুলেট বৈরাগী ও স্ত্রী ‍উর্মি হিরা

সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি মো. সিরাজুল মোস্তফা বলেন, ‘আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব ইউনিট নিয়ে কাজ করেছি। র্যাব এ বিষয়ে কয়েকজনকে আটক করেছে বলে জানতে পেরেছি।’

রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে ধর্মসাগরপাড়ে কাস্টমস কার্যালয়ের সামনে আনা হয় বুলেটের মরদেহ। সেখানে কাস্টমস কমিশনার আবদুল মান্নান সরদারসহ কর্মকর্তারা মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

কমিশনার আবদুল মান্নান বলেন, ‘আমাদের সহকর্মীর এ অকাল মৃত্যুতে আমরা মর্মাহত। কাস্টমস বিভাগ সব সময় বুলেটের পরিবারের পাশে থাকবে।’

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬


স্ত্রীর আহাজারি ‘কলিজাকে তো আর দেখতে পাবো না’

প্রকাশের তারিখ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

চট্টগ্রাম থেকে প্রশিক্ষণ শেষে গভীর রাতে বাসায় ফিরছিলেন। কিন্তু বাড়ির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর আগেই দুর্বৃত্তদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী। মৃত্যুর দুই দিন পর যখন তার লাশ বাড়ির সামনে আনা হলো, বুক ফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী উর্মি হিরা।

অ্যাম্বুলেন্সের কাচ ধরে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন হিরা। এর মধ্যেই বলে চলছিলেন, ‘ও বুলেট, আমাকে কই রেখে গেলে? আমি কীভাবে বাঁচবো? আমার কলিজাকে তো আর দেখতে পাবো না। ওরে তো পুড়িয়ে দিবে।’

সোমবার (২৭ এপ্রিল) তাদের একমাত্র সন্তান অভয় বৈরাগীর প্রথম জন্মদিন। কিন্তু জন্মদিনের দুদিন আগেই বাবাকে হারিয়ে ফেলল মেয়ে। আর তিন দিন আগেই ছিল বুলেট ও উর্মির বিবাহবার্ষিকী। সংসারের সব হিসাব মেলাতে গিয়েই যেন নেমে এলো অন্ধকার।

বুলেট বৈরাগী

বুলেট বৈরাগী (৩২) ৪১তম বিসিএসের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে কুমিল্লা কাস্টমসের বিবির বাজার স্থলবন্দরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা পদে কর্মরত ছিলেন। চট্টগ্রামে বিভাগীয় প্রশিক্ষণ শেষে গত শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) গভীর রাতে তিনি কুমিল্লায় ফিরছিলেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকাগামী বাস থেকে তিনি হাইওয়েতে নেমে নগরীর টমছম ব্রিজ এলাকায় এসে রাত ২টা ২৫ মিনিটে স্ত্রীর সঙ্গে শেষবার কথা বলেন। এরপর থেকে দুর্বৃত্তরা তার মোবাইল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।

ভোর সাড়ে ৫টায় তার মোবাইলের লোকেশন ছিল চৌয়ারা এলাকায়। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানেই তাকে হত্যা করে টাকা, মোবাইল ও ক্যামেরা লুট করে নেওয়া হয়। পরে লাশ ফেলে রাখা হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি রোড এলাকার একটি হোটেলের সামনের ফুটপাতে। শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকালে হাইওয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে।

নিহত বুলেট বৈরাগীর বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। বাবা-মা ও ছোট বোনকে রেখে সংসারের হাল ধরতে তিনি দেড় বছর আগে চাকরিতে যোগ দেন। রোববার (২৬ এপ্রিল) তার লাশ বাড়ির পথে কাস্টমস কার্যালয়ের সামনে আনা হলে বাবা-মা আর স্ত্রীর আহাজারিতে করুণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

পারিবারিক সূত্র জানায়, ২০২২ সালের ২৩ এপ্রিল বাগেরহাটের মেয়ে উর্মির সঙ্গে বুলেটের বিয়ে হয়। তাদের অভয় নামে এক বছর বয়সী এক কন্যা সন্তান আছে। তিন দিন আগেই তারা বিবাহবার্ষিকী পালন করেছেন। আর সোমবার (২৭ এপ্রিল) ছিল অভয়ের প্রথম জন্মদিন। সেদিনই শেষমেষ বাবাকে চিরদিনের জন্য বিদায় জানাতে হলো মেয়েকে।

এ ঘটনায় নিহতের মা নীলিমা বৈরাগী বাদী হয়ে শনিবার রাতে সদর দক্ষিণ মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ দাবি করলেও অগ্রগতি না পাওয়ায় ছায়া তদন্ত শুরু করে র‌্যাব, ডিবি, সিআইডি ও পিবিআই।

গভীর রাতে র‌্যাব জানায়, বুলেট বৈরাগী হত্যার রহস্য উদঘাটন হয়েছে। জড়িত কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। আগামীকাল সোমবার সকাল ১১টায় কুমিল্লার শাকতলা এলাকায় র্যাব-১১, সিপিসি-০২ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে বিস্তারিত জানানো হবে বলে র‌্যাব সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বুলেট বৈরাগী ও স্ত্রী ‍উর্মি হিরা

সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি মো. সিরাজুল মোস্তফা বলেন, ‘আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব ইউনিট নিয়ে কাজ করেছি। র্যাব এ বিষয়ে কয়েকজনকে আটক করেছে বলে জানতে পেরেছি।’

রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে ধর্মসাগরপাড়ে কাস্টমস কার্যালয়ের সামনে আনা হয় বুলেটের মরদেহ। সেখানে কাস্টমস কমিশনার আবদুল মান্নান সরদারসহ কর্মকর্তারা মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

কমিশনার আবদুল মান্নান বলেন, ‘আমাদের সহকর্মীর এ অকাল মৃত্যুতে আমরা মর্মাহত। কাস্টমস বিভাগ সব সময় বুলেটের পরিবারের পাশে থাকবে।’


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত