সংবাদ

হামের পর নিউমোনিয়ার ছোবল: শিশু হাসপাতালে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল


আজিজ চৌধুরী
আজিজ চৌধুরী নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৮ মে ২০২৬, ০১:৩২ পিএম

হামের পর নিউমোনিয়ার ছোবল: শিশু হাসপাতালে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল

সারাদেশে হামের প্রকোপ কিছুটা কমলেও পরবর্তী জটিলতা হিসেবে দেখা দেওয়া নিউমোনিয়া এখন বড় আতঙ্কের কারণ। এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ড ঘুরে জানা যায় গত তিন মাসে হাম ও এর পরবর্তী জটিলতায় ২৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা গত দুই বছরের তুলনায় বহুগুণ বেশি। 

এদিকে, হাসপাতালটিতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। যাদের অর্ধেকেরও বেশি ভুগছে তীব্র শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায়। এতে বিপাকে পড়তে হচ্ছে চিকিৎসকদের। আবার সিট না পেয়ে দফায় দফায় হাসপাতাল পরিবর্তন করায় সমস্যায় রোগী ও তার পরিবার।

‎হাম ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশুদের অভিভাবকদের কণ্ঠে ঝরে পড়ছে উদ্বেগ। এক শিশুর মা জানান, শুরুতে জ্বর ও নিউমোনিয়া নিয়ে পিআইসিইউতে ভর্তি থাকলেও পরে হাম ধরা পড়ায় তাকে বিশেষায়িত ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে।

‎অন্য এক ভুক্তভোগী মা তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‎“হামের পর বাচ্চার প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। প্রথমে ডিএনসিসি হাসপাতালে রেফার করা হয়েছিল, সেখানে তিন দিন থাকার পর আবারও এখানে (শিশু হাসপাতাল) পাঠানো হয়েছে। আজ ১৫ দিন ধরে চিকিৎসা চলছে। তবে এখানকার ডাক্তারদের নিয়মিত রাউন্ড এবং সেবায় আমরা সন্তুষ্ট।”

‎টিকা নিয়ে সংশয় ও বাস্তবতা

‎সাধারণত শিশুদের নয় মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে অনেক শিশু তার আগেই এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। সাড়ে পাঁচ মাস বয়সে আক্রান্ত এক শিশুর মা বলেন, "আমি জানতাম টিকা নয় মাসে দেয়, কিন্তু আমার বাচ্চা সাড়ে পাঁচ মাসেই আক্রান্ত হয়েছে। এক মাস ধরে হাসপাতালে আছি।

‎‎মৃত্যুহার ও বর্তমান পরিস্থিতি

‎হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় এই হাসপাতালে ৪ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা একে 'অ্যালার্মিং' বা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নবজাতক ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. মো. আতিকুল ইসলাম জানান, গত দুই বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে যেখানে ৩-৪ জন মারা গিয়েছিল, সেখানে মাত্র ৩ মাসে হাম ও নিউমোনিয়ায় ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

‎তিনি বলেন, "আগে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বেশি থাকলেও জটিল রোগীর হার কম ছিল। কিন্তু এখন হাসপাতালে আসা রোগীদের প্রায় ৫০ শতাংশই রেসপিরেটরি প্রবলেম বা নিউমোনিয়া নিয়ে আসছে। এছাড়া সেপসিস, মেনিনজাইটিস ও এনকেফালাইটিসের মতো মারাত্মক জটিলতাও দেখা দিচ্ছে।"

‎ধারণক্ষমতার বাইরে রোগী

‎হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শুরুতে হামের জন্য ৩০ শয্যার একটি বিশেষায়িত ওয়ার্ড চালু করলেও রোগীর চাপে তা বাড়িয়ে ৮০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। তবে বর্তমানে ৯৫ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকায় বাকিদের কেবিন ও অন্যান্য ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ঢাকার বাইরের জেলাগুলো থেকেও প্রচুর রোগী এখানে রেফার করা হচ্ছে।

‎ভ্যাকসিনের নতুন নির্দেশনা ও চিকিৎসা

‎হামের টিকা সাধারণত ৯ মাস বয়সে দেওয়া হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ 'সাপ্লিমেন্টারি ডোজ' নিশ্চিত করছে।

এ বিষয়ে ডা. আতিকুল ইসলাম জানান, উন্নত বিশ্বে ৬ মাস থেকেই এই টিকা দেওয়া হয়। বাংলাদেশের শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এখন ৬ মাস থেকেই টিকার আওতায় আনা হচ্ছে।

‎অভিভাবকদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে হাসপাতালের এক শিশুর মা জানান, সাড়ে পাঁচ মাস বয়সেই তার শিশু হামে আক্রান্ত হয়। পর্যাপ্ত সচেতনতা ও সময়মতো টিকা না পাওয়ায় অনেক শিশুই ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

‎আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা

‎চিকিৎসকরা বলছেন, যেকোনো ভাইরাসজনিত রোগ সাধারণত ২-৩ মাস পর তার সংক্রমণ ক্ষমতা হারায়। বর্তমানে নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার হার কমেছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো যারা অলরেডি আক্রান্ত হয়েছে, তাদের নিউমোনিয়া বা অন্যান্য কমপ্লিকেশন থেকে বাঁচিয়ে তোলা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬


হামের পর নিউমোনিয়ার ছোবল: শিশু হাসপাতালে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল

প্রকাশের তারিখ : ০৮ মে ২০২৬

featured Image

সারাদেশে হামের প্রকোপ কিছুটা কমলেও পরবর্তী জটিলতা হিসেবে দেখা দেওয়া নিউমোনিয়া এখন বড় আতঙ্কের কারণ। এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ড ঘুরে জানা যায় গত তিন মাসে হাম ও এর পরবর্তী জটিলতায় ২৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা গত দুই বছরের তুলনায় বহুগুণ বেশি। 

এদিকে, হাসপাতালটিতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। যাদের অর্ধেকেরও বেশি ভুগছে তীব্র শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায়। এতে বিপাকে পড়তে হচ্ছে চিকিৎসকদের। আবার সিট না পেয়ে দফায় দফায় হাসপাতাল পরিবর্তন করায় সমস্যায় রোগী ও তার পরিবার।

‎হাম ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশুদের অভিভাবকদের কণ্ঠে ঝরে পড়ছে উদ্বেগ। এক শিশুর মা জানান, শুরুতে জ্বর ও নিউমোনিয়া নিয়ে পিআইসিইউতে ভর্তি থাকলেও পরে হাম ধরা পড়ায় তাকে বিশেষায়িত ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে।

‎অন্য এক ভুক্তভোগী মা তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‎“হামের পর বাচ্চার প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। প্রথমে ডিএনসিসি হাসপাতালে রেফার করা হয়েছিল, সেখানে তিন দিন থাকার পর আবারও এখানে (শিশু হাসপাতাল) পাঠানো হয়েছে। আজ ১৫ দিন ধরে চিকিৎসা চলছে। তবে এখানকার ডাক্তারদের নিয়মিত রাউন্ড এবং সেবায় আমরা সন্তুষ্ট।”

‎টিকা নিয়ে সংশয় ও বাস্তবতা

‎সাধারণত শিশুদের নয় মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে অনেক শিশু তার আগেই এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। সাড়ে পাঁচ মাস বয়সে আক্রান্ত এক শিশুর মা বলেন, "আমি জানতাম টিকা নয় মাসে দেয়, কিন্তু আমার বাচ্চা সাড়ে পাঁচ মাসেই আক্রান্ত হয়েছে। এক মাস ধরে হাসপাতালে আছি।

‎‎মৃত্যুহার ও বর্তমান পরিস্থিতি

‎হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় এই হাসপাতালে ৪ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা একে 'অ্যালার্মিং' বা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নবজাতক ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. মো. আতিকুল ইসলাম জানান, গত দুই বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে যেখানে ৩-৪ জন মারা গিয়েছিল, সেখানে মাত্র ৩ মাসে হাম ও নিউমোনিয়ায় ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

‎তিনি বলেন, "আগে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বেশি থাকলেও জটিল রোগীর হার কম ছিল। কিন্তু এখন হাসপাতালে আসা রোগীদের প্রায় ৫০ শতাংশই রেসপিরেটরি প্রবলেম বা নিউমোনিয়া নিয়ে আসছে। এছাড়া সেপসিস, মেনিনজাইটিস ও এনকেফালাইটিসের মতো মারাত্মক জটিলতাও দেখা দিচ্ছে।"

‎ধারণক্ষমতার বাইরে রোগী

‎হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শুরুতে হামের জন্য ৩০ শয্যার একটি বিশেষায়িত ওয়ার্ড চালু করলেও রোগীর চাপে তা বাড়িয়ে ৮০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। তবে বর্তমানে ৯৫ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকায় বাকিদের কেবিন ও অন্যান্য ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ঢাকার বাইরের জেলাগুলো থেকেও প্রচুর রোগী এখানে রেফার করা হচ্ছে।

‎ভ্যাকসিনের নতুন নির্দেশনা ও চিকিৎসা

‎হামের টিকা সাধারণত ৯ মাস বয়সে দেওয়া হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ 'সাপ্লিমেন্টারি ডোজ' নিশ্চিত করছে।

এ বিষয়ে ডা. আতিকুল ইসলাম জানান, উন্নত বিশ্বে ৬ মাস থেকেই এই টিকা দেওয়া হয়। বাংলাদেশের শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এখন ৬ মাস থেকেই টিকার আওতায় আনা হচ্ছে।

‎অভিভাবকদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে হাসপাতালের এক শিশুর মা জানান, সাড়ে পাঁচ মাস বয়সেই তার শিশু হামে আক্রান্ত হয়। পর্যাপ্ত সচেতনতা ও সময়মতো টিকা না পাওয়ায় অনেক শিশুই ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

‎আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা

‎চিকিৎসকরা বলছেন, যেকোনো ভাইরাসজনিত রোগ সাধারণত ২-৩ মাস পর তার সংক্রমণ ক্ষমতা হারায়। বর্তমানে নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার হার কমেছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো যারা অলরেডি আক্রান্ত হয়েছে, তাদের নিউমোনিয়া বা অন্যান্য কমপ্লিকেশন থেকে বাঁচিয়ে তোলা।



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত