মাঠ থেকে ঘাম ঝরানো ফসল ঘরে তুলেছিলেন প্রান্তিক চাষিরা। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। বাজারের বিক্রি করতে না পেরে হাজার হাজার মণ পেঁয়াজ এখন জলাশয়ে ফেলে দিচ্ছেন ঝিনাইদহের কৃষকেরা। নিম্নমানের ভারতীয় বীজে উৎপাদিত এসব পেঁয়াজে দ্রুত পচন ধরছে। সংরক্ষণের অযোগ্য হওয়ায় ঘরবাড়িতে পচা পেঁয়াজের দুর্গন্ধে টেকা দায় হয়ে পড়েছে। দেশের পঞ্চম ও খুলনা বিভাগের বৃহত্তম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী এলাকা ঝিনাইদহে এখন শত শত কৃষক পরিবারে হাহাকার চলছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, আপেলের মতো বড় ও উজ্জ্বল লালচে রঙের হাজার হাজার মণ পেঁয়াজ কৃষকদের বাড়ির পাশের ডোবা-নালায় পড়ে আছে। ঘর থেকে পচা পেঁয়াজ বস্তায় ভরে এনে পানিতে ফেলছেন গৃহবধূরা।
চাষিদের অভিযোগ, মেহেরপুর ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা একদল অসাধু ব্যবসায়ী নিম্নমানের ভেজাল বীজ বিক্রি করে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। চলতি মৌসুমে ‘সুখসাগর’ বা ‘লালতীর’ জাতের কথা বলে তাদের দেওয়া হয়েছিল ভারতীয় নিম্নমানের ‘নাসিক’ জাতের বীজ। এই জাতের পেঁয়াজ ফলনে বিঘা প্রতি দেড় শ মণের বেশি হলেও তা একেবারেই সংরক্ষণযোগ্য নয়। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ পেঁয়াজ ১০০ থেকে ২০০ টাকাতেও কেউ কিনছে না।
শৈলকুপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের কৃষক রাজন বলেন, তিনি স্থানীয় ‘লাকী বীজ ভান্ডার’ থেকে ৯ হাজার টাকা কেজি দরে সুখসাগর মনে করে বীজ কিনেছিলেন। কিন্তু চাষের পর দেখা যায় সেগুলো নাসিক জাতের পেঁয়াজ। বড় বড় আকারের এসব পেঁয়াজ তোলার ৩-৪ দিনের মধ্যেই পচন ধরছে। তার উৎপাদিত প্রায় ২০০ মণ পেঁয়াজের বেশির ভাগই খালে ফেলে দিতে হয়েছে। একই গ্রামের আরও কয়েকজন কৃষকের প্রায় ৬০০ মণ পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে গেছে।
ধলহরাচন্দ্র গ্রামের এক কৃষক জানান, বাজারজাত করতে না পেরে তিনি প্রায় ১৫০ মণ পেঁয়াজ পাশের ডোবায় ফেলে দিয়েছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী আলমগীর অরণ্য বলেন, পাইকাররা এসব পেঁয়াজ কিনতে চাইছেন না। অনেক কৃষক ক্ষোভে বাজারে পেঁয়াজ ঢেলে দিয়ে খালি বস্তা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন।
চলতি মৌসুমে সার ও কীটনাশক সংকটের কারণে চাষিদের উৎপাদন খরচ এমনিতেই দ্বিগুণ হয়েছে। এর ওপর বীজের এই প্রতারণা কৃষকদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর শৈলকুপায় ১২ হাজার ৮৩৬ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৮০৫ হেক্টর বেশি। মোট উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার টনের বেশি। অথচ এই বিপুল উৎপাদনের বড় একটি অংশ এখন পচে নষ্ট হচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে নিম্নমানের বীজ বিক্রি হলেও কৃষি বিভাগ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। তবে শৈলকুপা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান খান বলেন, ‘কিছু ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে বীজের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। অন্য ক্ষতিগ্রস্তরা আবেদন করলে তাদেরও টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করা হবে।’
আপনার মতামত লিখুন