আজকের শিশুরা হয়তো জানে না, এক সময় হাম নামক রোগটি ছিল মৃত্যুর প্রতিশব্দ। ১৯৬৩ সালে টিকা আবিষ্কারের আগে পর্যন্ত এ ভাইরাসটি বিশ্বজুড়ে প্রতি দুই থেকে তিন বছর পর পর ভয়াবহ মহামারি আকার ধারণ করত। প্রতি বছর গড়ে ২৬ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিত এই একক রোগ।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, হাম শুধু অসুস্থতা নয়- এটি জাতি ধ্বংস পর্যন্ত ঘটিয়েছে। উপনিবেশবাদীরা আমেরিকায় যে রোগ ছড়িয়েছিল, তাতে আদিবাসীদের ৯০ শতাংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এক রাজার অস্ট্রেলিয়া সফর ফিজি দ্বীপপুঞ্জের এক-তৃতীয়াংশ মানুষকে কবরে পাঠিয়েছিল। টিকা এলেও, ১৯৮০ সালেও মৃত্যু হয়েছিল ২৬ লাখ মানুষের।
পারস্য থেকে শুরু: গবেষকদের মতে, প্রায় হাজার বছর আগে মানুষের মধ্যে ছড়াতে শুরু করে হাম ভাইরাসটি। তবে ১০ম শতাব্দীতে পারস্যের বিখ্যাত চিকিৎসক মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল-রাজি প্রথম এই রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত প্রকাশ করেন। তিনিই প্রথম হামকে গুটিবসন্ত থেকে আলাদা রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তখন থেকেই শুরু হয় এই ভাইরাসের সঙ্গে মানুষের লড়াই।
৯০% জনসংখ্যা নিশ্চিহ্ন: ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীরা যখন ১৫২০ সালের দিকে আমেরিকা মহাদেশে প্রবেশ করে, তখন তারা সঙ্গে নিয়ে আসে হাম ও গুটিবসন্তের জীবাণু। আদিবাসীদের শরীরে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না। পরিণতি ছিল ভয়াবহ। মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে আমেরিকার আদি জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষ মারা যায়। মানব ইতিহাসের এটিই অন্যতম বড় গণহত্যা—যেখানে অস্ত্র নয়, রোগই হয়েছিল সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
ফিজির প্রলয়ঙ্কারী মহামারি: ইতিহাসের সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট ও প্রলয়ঙ্কারী একক হামের মহামারিটি ঘটেছিল ১৮৭৫ সালে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের ফিজি দ্বীপপুঞ্জে। রাজা কাকোবাউ অস্ট্রেলিয়া সফর শেষে বাড়ি ফেরেন। অজান্তেই তিনি সঙ্গে এনেছিলেন হামের জীবাণু।
কয়েক মাসের মধ্যে মহামারি ফিজির মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। মৃতের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। পুরো দ্বীপপুঞ্জ শোকে নিমজ্জিত হয়েছিল। এই ঘটনা আজও সংক্রামক রোগের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হয়ে আছে।
টিকার আগের চিত্র: ১৯৬৩ সালে টিকা আবিষ্কারের আগে হামের প্রকোপ এতটাই নিয়মিত ছিল যে, একে জীবনের একটি সাধারণ অংশ মনে করা হতো। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতি বছর গড়ে ৫ লাখ মানুষ আক্রান্ত হতো এবং ৫০০ জনের বেশি মারা যেত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ২৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হতো শুধু এই একটি রোগে। এর মানে—প্রতি মিনিটে পাঁচজনের বেশি মানুষ হামে মারা যাচ্ছিল।
টিকার পরেও: টিকা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরও অসচেতনতা ও টিকার অভাবে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল চোখ ধাঁধানো। ১৯৮০ সালে টিকাদান কর্মসূচি পুরোদমে শুরুর আগে এ বছর হামে মারা যায় ২৬ লাখ মানুষ। এরপর ১৯৯০ সালে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ ৪৫ হাজার। ২০১৯ সালে টিকাবিরোধী প্রচারণা ও অসচেতনতার কারণে বিশ্বজুড়ে বড় প্রাদুর্ভাব ঘটে। এতে ২ লাখ ৭ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। অর্থাৎ, টিকার যুগেও হাম থামেনি। মৃত্যু কমেছে, কিন্তু পুরোপুরি নির্মূল হয়নি।
বাঁচলো ৬ কোটি প্রাণ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং গাভির যৌথ উদ্যোগে গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী এই টিকাদানের ফলে প্রায় ৫ কোটি ৯০ লাখ মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০০ সালে বার্ষিক হামে মৃত্যু ছিল ৭ লাখ ৮০ হাজার। ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে ৯৫ হাজারে। অর্থাৎ, মৃত্যু কমেছে প্রায় ৮৮ শতাংশ। এটি টিকারই জয়। কিন্তু এখনও প্রতি বছর এক লাখের কাছাকাছি মানুষ হামে মারা যায়। যা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়।
১৭৮৯ সালে ক্যাপ্টেন ব্লাই ও তার দল প্রথম ফিজির প্রধান দুটি দ্বীপে পৌঁছান
বাংলাদেশে সম্প্রতি হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর খবর উদ্বেগজনক। ইতিহাসের ভয়াল স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়- হামের টিকা সবচেয়ে জরুরি প্রতিরোধ। একজন অসচেতন অভিভাবকের অবহেলা হয়তো ফিরিয়ে আনতে পারে সে অন্ধকার যুগ।
ফিজির রাজার গল্প যেমন সতর্ক করে, আমেরিকার আদিবাসীদের ইতিহাস যেমন কাঁদায়, তেমনি টিকার সাফল্যের গল্প আশা জাগায়। হাম নির্মূল করা সম্ভব। তার জন্য দরকার সচেতনতা, দরকার টিকার আওতা বাড়ানো, দরকার ছড়িয়ে দেওয়ার আগেই থামানো। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটুক- সেটা মৃত্যুর নয়, বরং সাফল্যের।

বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬
আজকের শিশুরা হয়তো জানে না, এক সময় হাম নামক রোগটি ছিল মৃত্যুর প্রতিশব্দ। ১৯৬৩ সালে টিকা আবিষ্কারের আগে পর্যন্ত এ ভাইরাসটি বিশ্বজুড়ে প্রতি দুই থেকে তিন বছর পর পর ভয়াবহ মহামারি আকার ধারণ করত। প্রতি বছর গড়ে ২৬ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিত এই একক রোগ।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, হাম শুধু অসুস্থতা নয়- এটি জাতি ধ্বংস পর্যন্ত ঘটিয়েছে। উপনিবেশবাদীরা আমেরিকায় যে রোগ ছড়িয়েছিল, তাতে আদিবাসীদের ৯০ শতাংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এক রাজার অস্ট্রেলিয়া সফর ফিজি দ্বীপপুঞ্জের এক-তৃতীয়াংশ মানুষকে কবরে পাঠিয়েছিল। টিকা এলেও, ১৯৮০ সালেও মৃত্যু হয়েছিল ২৬ লাখ মানুষের।
পারস্য থেকে শুরু: গবেষকদের মতে, প্রায় হাজার বছর আগে মানুষের মধ্যে ছড়াতে শুরু করে হাম ভাইরাসটি। তবে ১০ম শতাব্দীতে পারস্যের বিখ্যাত চিকিৎসক মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল-রাজি প্রথম এই রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত প্রকাশ করেন। তিনিই প্রথম হামকে গুটিবসন্ত থেকে আলাদা রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তখন থেকেই শুরু হয় এই ভাইরাসের সঙ্গে মানুষের লড়াই।
৯০% জনসংখ্যা নিশ্চিহ্ন: ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীরা যখন ১৫২০ সালের দিকে আমেরিকা মহাদেশে প্রবেশ করে, তখন তারা সঙ্গে নিয়ে আসে হাম ও গুটিবসন্তের জীবাণু। আদিবাসীদের শরীরে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না। পরিণতি ছিল ভয়াবহ। মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে আমেরিকার আদি জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষ মারা যায়। মানব ইতিহাসের এটিই অন্যতম বড় গণহত্যা—যেখানে অস্ত্র নয়, রোগই হয়েছিল সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
ফিজির প্রলয়ঙ্কারী মহামারি: ইতিহাসের সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট ও প্রলয়ঙ্কারী একক হামের মহামারিটি ঘটেছিল ১৮৭৫ সালে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের ফিজি দ্বীপপুঞ্জে। রাজা কাকোবাউ অস্ট্রেলিয়া সফর শেষে বাড়ি ফেরেন। অজান্তেই তিনি সঙ্গে এনেছিলেন হামের জীবাণু।
কয়েক মাসের মধ্যে মহামারি ফিজির মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। মৃতের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। পুরো দ্বীপপুঞ্জ শোকে নিমজ্জিত হয়েছিল। এই ঘটনা আজও সংক্রামক রোগের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হয়ে আছে।
টিকার আগের চিত্র: ১৯৬৩ সালে টিকা আবিষ্কারের আগে হামের প্রকোপ এতটাই নিয়মিত ছিল যে, একে জীবনের একটি সাধারণ অংশ মনে করা হতো। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতি বছর গড়ে ৫ লাখ মানুষ আক্রান্ত হতো এবং ৫০০ জনের বেশি মারা যেত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ২৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হতো শুধু এই একটি রোগে। এর মানে—প্রতি মিনিটে পাঁচজনের বেশি মানুষ হামে মারা যাচ্ছিল।
টিকার পরেও: টিকা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরও অসচেতনতা ও টিকার অভাবে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল চোখ ধাঁধানো। ১৯৮০ সালে টিকাদান কর্মসূচি পুরোদমে শুরুর আগে এ বছর হামে মারা যায় ২৬ লাখ মানুষ। এরপর ১৯৯০ সালে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ ৪৫ হাজার। ২০১৯ সালে টিকাবিরোধী প্রচারণা ও অসচেতনতার কারণে বিশ্বজুড়ে বড় প্রাদুর্ভাব ঘটে। এতে ২ লাখ ৭ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। অর্থাৎ, টিকার যুগেও হাম থামেনি। মৃত্যু কমেছে, কিন্তু পুরোপুরি নির্মূল হয়নি।
বাঁচলো ৬ কোটি প্রাণ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং গাভির যৌথ উদ্যোগে গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী এই টিকাদানের ফলে প্রায় ৫ কোটি ৯০ লাখ মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০০ সালে বার্ষিক হামে মৃত্যু ছিল ৭ লাখ ৮০ হাজার। ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে ৯৫ হাজারে। অর্থাৎ, মৃত্যু কমেছে প্রায় ৮৮ শতাংশ। এটি টিকারই জয়। কিন্তু এখনও প্রতি বছর এক লাখের কাছাকাছি মানুষ হামে মারা যায়। যা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়।
১৭৮৯ সালে ক্যাপ্টেন ব্লাই ও তার দল প্রথম ফিজির প্রধান দুটি দ্বীপে পৌঁছান
বাংলাদেশে সম্প্রতি হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর খবর উদ্বেগজনক। ইতিহাসের ভয়াল স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়- হামের টিকা সবচেয়ে জরুরি প্রতিরোধ। একজন অসচেতন অভিভাবকের অবহেলা হয়তো ফিরিয়ে আনতে পারে সে অন্ধকার যুগ।
ফিজির রাজার গল্প যেমন সতর্ক করে, আমেরিকার আদিবাসীদের ইতিহাস যেমন কাঁদায়, তেমনি টিকার সাফল্যের গল্প আশা জাগায়। হাম নির্মূল করা সম্ভব। তার জন্য দরকার সচেতনতা, দরকার টিকার আওতা বাড়ানো, দরকার ছড়িয়ে দেওয়ার আগেই থামানো। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটুক- সেটা মৃত্যুর নয়, বরং সাফল্যের।

আপনার মতামত লিখুন