সংবাদ

নিখোঁজের আড়ালে ছিল জোড়া খুন


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ১২:৪৩ পিএম

নিখোঁজের আড়ালে ছিল জোড়া খুন

  • সম্পত্তির লোভে সৎ মা ও ভাইকে হত্যার ২ বছর পর কঙ্কাল উদ্ধার

​নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে দুই বছর আগে নিখোঁজ হওয়া সৎ মা কমলা খাতুন ও তার শিশু সন্তান নোমান নিখোঁজের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। নিখোঁজের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক নির্মম জোড়া হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা।

প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের জমি ও সম্পত্তির লোভে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে কালাম আজাদের প্রথম পক্ষের সন্তানরা।

গত ২১ ও ২২ মে ময়মনসিংহের কোতোয়ালী ও সোনাইমুড়ী থেকে এই ঘটনায় জড়িত তিন আসামিকে গ্রেফতারের পর তাদের দেওয়া তথ্যে ২৪ মে সকালে পুকুর খনন করে মা ও ছেলের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়।

​ঘটনার শুরু ২০১২ সালে, যখন বিপত্নীক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে কমলা খাতুনের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে নোমান নামে এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। প্রায় সাত-আট বছর আগে কালাম আজাদের মৃত্যুর পর কমলা খাতুন তার একমাত্র সন্তান এবং সৎ সন্তানদের সঙ্গে একই বাড়িতে বসবাস করছিলেন। মৃত্যুর আগে কালাম আজাদ তার দ্বিতীয় স্ত্রী কমলা ও শিশু নোমানের নামে বসতবাড়িসহ সংলগ্ন প্রায় ৩০ শতাংশ জমি লিখে দেন, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। এই সম্পত্তি নিয়ে প্রথম পক্ষের সন্তানদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাতে খাবারের পানির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে অচেতন করে গলায় গামছা পেঁচিয়ে ও বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে মা ও ছেলেকে হত্যা করা হয়।

পরে বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে আগে থেকে খুঁড়ে রাখা গর্তে লাশ দুটি উলঙ্গ করে মাটিচাপা দেওয়া হয় এবং আলামত নষ্ট করতে কাপড় পুড়িয়ে ফেলা হয়।

​হত্যাকাণ্ডকে আড়াল করতে ২০২৪ সালের ১০ মার্চ সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান সাগর সোনাইমুড়ি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, "৯ মার্চ থেকে আমাদের সৎ মা নিখোঁজ রয়েছেন এবং মোবাইল ফোনেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।"

বোন নিখোঁজের খবর পেয়ে রহিমা বেগম ছুটে এসে সাগর ও সাইফুল ইসলাম রাজন রাজুকে জিজ্ঞাসা করলে তারা জানান, "আমরাও তো কমলা খাতুনকে খুঁজে পাচ্ছি না। আপনারা বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খোঁজ নিয়ে দেখুন, এ বিষয়ে আমরা থানায় জিডিও করেছি।"

​সৎ ভাইদের কথায় আশ্বস্ত হতে না পেরে রহিমা বেগম ২০২৪ সালের ১৪ মার্চ নোয়াখালীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। আদালত প্রথমে জেলা ডিবি এবং পরে সিআইডি নোয়াখালীকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। তদন্তের একপর্যায়ে কমলা খাতুনের মোবাইল ফোন ঢাকার সবুজবাগ এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় এবং জানা যায় আসামি রাজন রাজু একসময় ওই বাসায় ভাড়া থাকতেন। এর সূত্র ধরে গত ২১ মে রাতে ময়মনসিংহের কোতোয়ালী থানার ভাটিকাশর থেকে রাজন রাজুকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন ২২ মে সন্ধ্যায় সোনাইমুড়ী জিরো পয়েন্ট থেকে জিয়াউর রহমান সাগর এবং তাদের সহযোগী আশিকুর রহমান টিপুকে গ্রেফতার করে সিআইডি।

​তিন দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা আদালতের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজেদের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। ২৪ মে সকালে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে পুকুর সেচে ও ভেকু দিয়ে খনন করে ভিকটিমদের দেহাবশেষ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নোয়াখালী সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, দেহাবশেষ থেকে সংগৃহীত নমুনা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে এবং এ ঘটনায় জড়িত অন্য আসামিদের গ্রেফতারে সিআইডির অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ২৫ মে ২০২৬


নিখোঁজের আড়ালে ছিল জোড়া খুন

প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬

featured Image

  • সম্পত্তির লোভে সৎ মা ও ভাইকে হত্যার ২ বছর পর কঙ্কাল উদ্ধার

​নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে দুই বছর আগে নিখোঁজ হওয়া সৎ মা কমলা খাতুন ও তার শিশু সন্তান নোমান নিখোঁজের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। নিখোঁজের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক নির্মম জোড়া হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা।

প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের জমি ও সম্পত্তির লোভে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে কালাম আজাদের প্রথম পক্ষের সন্তানরা।

গত ২১ ও ২২ মে ময়মনসিংহের কোতোয়ালী ও সোনাইমুড়ী থেকে এই ঘটনায় জড়িত তিন আসামিকে গ্রেফতারের পর তাদের দেওয়া তথ্যে ২৪ মে সকালে পুকুর খনন করে মা ও ছেলের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়।

​ঘটনার শুরু ২০১২ সালে, যখন বিপত্নীক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে কমলা খাতুনের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে নোমান নামে এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। প্রায় সাত-আট বছর আগে কালাম আজাদের মৃত্যুর পর কমলা খাতুন তার একমাত্র সন্তান এবং সৎ সন্তানদের সঙ্গে একই বাড়িতে বসবাস করছিলেন। মৃত্যুর আগে কালাম আজাদ তার দ্বিতীয় স্ত্রী কমলা ও শিশু নোমানের নামে বসতবাড়িসহ সংলগ্ন প্রায় ৩০ শতাংশ জমি লিখে দেন, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। এই সম্পত্তি নিয়ে প্রথম পক্ষের সন্তানদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাতে খাবারের পানির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে অচেতন করে গলায় গামছা পেঁচিয়ে ও বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে মা ও ছেলেকে হত্যা করা হয়।

পরে বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে আগে থেকে খুঁড়ে রাখা গর্তে লাশ দুটি উলঙ্গ করে মাটিচাপা দেওয়া হয় এবং আলামত নষ্ট করতে কাপড় পুড়িয়ে ফেলা হয়।

​হত্যাকাণ্ডকে আড়াল করতে ২০২৪ সালের ১০ মার্চ সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান সাগর সোনাইমুড়ি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, "৯ মার্চ থেকে আমাদের সৎ মা নিখোঁজ রয়েছেন এবং মোবাইল ফোনেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।"

বোন নিখোঁজের খবর পেয়ে রহিমা বেগম ছুটে এসে সাগর ও সাইফুল ইসলাম রাজন রাজুকে জিজ্ঞাসা করলে তারা জানান, "আমরাও তো কমলা খাতুনকে খুঁজে পাচ্ছি না। আপনারা বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খোঁজ নিয়ে দেখুন, এ বিষয়ে আমরা থানায় জিডিও করেছি।"

​সৎ ভাইদের কথায় আশ্বস্ত হতে না পেরে রহিমা বেগম ২০২৪ সালের ১৪ মার্চ নোয়াখালীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। আদালত প্রথমে জেলা ডিবি এবং পরে সিআইডি নোয়াখালীকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। তদন্তের একপর্যায়ে কমলা খাতুনের মোবাইল ফোন ঢাকার সবুজবাগ এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় এবং জানা যায় আসামি রাজন রাজু একসময় ওই বাসায় ভাড়া থাকতেন। এর সূত্র ধরে গত ২১ মে রাতে ময়মনসিংহের কোতোয়ালী থানার ভাটিকাশর থেকে রাজন রাজুকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন ২২ মে সন্ধ্যায় সোনাইমুড়ী জিরো পয়েন্ট থেকে জিয়াউর রহমান সাগর এবং তাদের সহযোগী আশিকুর রহমান টিপুকে গ্রেফতার করে সিআইডি।

​তিন দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা আদালতের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজেদের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। ২৪ মে সকালে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে পুকুর সেচে ও ভেকু দিয়ে খনন করে ভিকটিমদের দেহাবশেষ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নোয়াখালী সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, দেহাবশেষ থেকে সংগৃহীত নমুনা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে এবং এ ঘটনায় জড়িত অন্য আসামিদের গ্রেফতারে সিআইডির অভিযান অব্যাহত রয়েছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত