গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নারী বিষয়ক একটি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। যার নেতৃত্বে ছিলেন মানবাধিকারকর্মী নারী নেত্রী শিরিন পারভিন হক। সেই কমিশন একটি রিপোর্টও দিয়েছিল কিন্তু ধর্মীয় একটি শক্তির চরম বিরোধিতার মুখে সেই রিপোর্টটি আলোর মুখ দেখেনি। সেই কমিশন নিয়ে এবং তার বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে শিরিন পারভিন হকের সাথে কথা বলেছেন সংবাদের ডিজিটাল বিভাগের বার্তা প্রধান রাশেদ আহমেদ। হুবহু তা তুলে ধরা হলো।
রাশেদ আহমেদ: ৫ই আগস্টে একটা রেজিম পরিবর্তন হলো। সেই পরিবর্তনের পর আপনাদের আশাটা কী ছিল?
শিরিন পারভিন হক: তখন তো আশা একেবারে আকাশ ছুঁয়েছিল। কারণ এমন একটা ঘটনা ঘটল এই দেশে যেটা আমরা তো পারিনি। আমার প্রজন্মে পারিনি। কিন্তু আমাদের পরের পরের প্রজন্ম দেখিয়ে দিল যে এত বড় একটা পরিবর্তন আনা যায়।
রাশেদ আহমেদ: তারপর যে মানে ক্ষমতাটা যাদের কাছে গেল মানে সেখানে কি মানে তখন কী ধরনের একটি রাষ্ট্র তৈরি হবে সেগুলো নিয়ে যে প্রত্যাশা ছিল সেটা কি পূরণ হয়েছিল?
শিরিন পারভিন হক: সেটা পূরণ হয়নি। কারণ তখন তো আমার মনে হয় শুধু নারী সমাজ না সকলেরই একটা আশা ছিল যে এবার রাষ্ট্র মেরামত হবে। আমাদের কাছে মনে হয়েছে কিছু মৌলিক পরিবর্তন আসবে। কিন্তু তারপরে দেখা গেল সরকার বদলেছে। মৌলিক পরিবর্তনটা সেভাবে আসলো না।
রাশেদ আহমেদ: প্রভাবটা কার ছিল এই সরকারের তখন আপনারা কী দেখেছেন?
শিরিন পারভিন হক: উপদেষ্টা পরিষদেও অনেকে ছিল যাদের আমরা প্রগতিবাদী হিসেবেই জেনেছি। আমাদের সাথে মাঠে ময়দানে আন্দোলনও করেছে অনেকে। তো সেই জায়গায় আমাদের আশাটা অনেক বেশি হয়তো ছিল। অনেক বেশি মানে আকাঙ্ক্ষা, অনেক বেশি আশা করে বসে গিয়েছিলাম। কিন্তু তাদের কী সীমাবদ্ধতা ছিল, তাদের পক্ষে কোন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা সম্ভব হয়নি, সেটা হয়তো বাইরের থেকে বোঝাটা অতটা সহজ নয়।
রাশেদ আহমেদ: ৫ই আগস্টের পরে একটি তো গণঅভ্যুত্থান। গণঅভ্যুত্থানের পর দেখা গেল আক্রমণের শিকার হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য এবং নারীবাদী যেমন বেগম রোকেয়ার ভাস্কর্য এবং তার ম্যুরাল সেটিও মানে ভেঙে ফেলা হলো। তখন আপনারা কী সিগনাল পেলেন?
শিরিন পারভিন হক: তখন একটা আতঙ্ক তৈরি হলো। তার আগে পর্যন্ত তো উচ্ছ্বাস ছিল। ৫ই আগস্টে যখন আমি শাহবাগে তখন তো সবার চোখেমুখে উচ্ছ্বাস। ওই সময়টা বেশিক্ষণ লাস্ট করল না। অল্প দিনের মধ্যেই মনে হলো যে বেশি আশা করে বসে গিয়েছি। আমার কাছে যেটা দুঃখজনক সেটা হলো যে যেই শক্তিটা প্রগতির পক্ষে না প্রগতির পক্ষে তো নাই প্রগতির বিপক্ষে এবং বিশেষ করে নারীদের ব্যাপারে সেই শক্তিটা মনে হলো অনেক বেশি উত্থান হলো।
রাশেদ আহমেদ: এটি কি রাতারাতি উত্থান হয়েছে?
শিরিন পারভিন হক: না রাতারাতি হয়নি। আমার নিজস্ব একটা ধারণা এবং ব্যাখ্যা সেটা কতটা সঠিক আমি জানি না কিন্তু আমার নিজের যেটা আমি নিজে যেটা পর্যবেক্ষণ করেছি সেটা হলো স্বৈরশাসনের আমলে কিন্তু এই শক্তি নিরবে কাজ করে গেছে। তারা তাদের ঘাঁটি তৈরি করেছে তৃণমূলে এবং সেইটাকে আস্তে আস্তে তারা খোলাসা করেছে।
রাশেদ আহমেদ: মানে আপনি কি বলতে চাচ্ছেন জুলাই আন্দোলনে কারো কারো আকাঙ্ক্ষা কারো কারো উদ্দেশ্য দুইটা ভিন্নভাবে কাজ করেছে?
শিরিন পারভিন হক: ওখানে অনেকে নেমেছে তাদের তো একটা অনেক দিনের মতাদর্শ নিয়ে তারা কাজ করেছে সংগঠন করেছে। তারা হয়তো প্রথমে সেটা নিয়ে অত খোলাসা ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা খোলাসা হয়েছে। অনেকে কিন্তু আগস্টের এটাকে বিপ্লব বলে, আমি কোনোদিন এটাকে বিপ্লব বলি না। তবে নিশ্চয়ই গণঅভ্যুত্থান ছিল। কিন্তু বিপ্লব বলতে যে মৌলিক পরিবর্তনগুলো দরকার সেগুলো উপাদান কিন্তু ছিল না। আমরা তো দেখলাম যে যাদের ওপর আমরা এত আশা করলাম যেই যুব সমাজের ওপর তারা আমরা যেটা করতে পারি নাই তারা সেটা করে দেখাল। সেই জন্য তাদের ওপর আমাদের আশা অনেক বেশি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারা যখন তাদের নিজস্ব দল গঠন করল সেই দলের মধ্যেই তো আমরা দেখতে পেলাম নানা রকমের কি বলব যেগুলো আমরা আশা করিনি। সেই দলের মধ্যেই আস্তে আস্তে দেখলাম দুর্নীতি। আস্তে আস্তে দেখলাম স্বজনপ্রীতি। মানে এই জিনিসগুলো তো আমরা আশা করিনি। আমি ব্যক্তিগত ভাবে খুব দুঃখিত হয়েছি।
রাশেদ আহমেদ: একটা গণঅভ্যুত্থান হয়েছে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলবে নাকি এটার বিপরীতে একটি ধারা রক্ষা করে চলবে এরকম একটি প্রশ্ন দাঁড়ালো?
শিরিন পারভিন হক: কিন্তু আমি অত সাদাকালো ভাবে দেখি না কখনো। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা গেল গেল বলে যে হায় হায় করে উঠেছে বা হাহুতাশ করেছে আমি সেটার সাথেও একমত না। আমি মনে করি না এত সহজ মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা কথাটাতে এত মিসইউজড হয়ে গেছে আমি ওটা ইউজ করতে চাই না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের যে স্পৃহা মুক্তিযুদ্ধের যে স্বপ্নটা সেটা কখনোই কেউ বাতিল করতে পারবেনা।
রাশেদ আহমেদ: চেষ্টা তো হয়েছিল।
শিরিন পারভিন হক: চেষ্টা তো হয়েছে তখনো হয়েছে ৭১ এও হয়েছে। ৭১ এও তো কিছু লোক অল্প সংখ্যক হলেও কিছু লোক তো বিরোধিতা করেছে। তো সেই বিরোধিতা যারা করেছে তারা আস্তে আস্তে তাদের একটা উত্থান হয়েছে। তারা আরও শক্তিশালী হয়েছে। তারা এই দুঃসাহসটা করেছে যে আপনি যেটা বললেন রোকেয়ার ভাস্কর্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্যের উপর হাত দিতে। এই দুঃসাহসটা তারা করতে পেরেছে। অনেক জায়গার নাম পরিবর্তন হয়ে গেল। শুধুমাত্র ভিন্ন ধর্মের নাম বলে সেই নামগুলো পরিবর্তন করে ইসলামী নাম দেওয়ার চেষ্টা করা হলো। জয়দেবপুরকে গাজীপুর কিন্তু আগে হয়েছে এখন না। এবং কার আমলে হয়েছে সেটা আপনারাও জানেন। তো সেই জিনিসগুলো কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে হুট করে ডানদিকে চলে গেলাম তা তো না। এই ডানপন্থী চিন্তা কিন্তু অনেকদিন ধরেই চলছে এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার তাদেরকে প্রশ্রয়ও দিয়েছে। লালন পালনও করেছে। আপনি যেটা বললেন এই যে মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শনগুলোর ওপর আক্রমণ শুধু মুক্তিযুদ্ধ না রোকেয়ার কথা বললেন। যেই রোকেয়া লড়াই করেছে নারীর মুক্তির জন্য নারীর শিক্ষার জন্য নারীর অগ্রগতির জন্য এটা ভাবা যায় না যে এটার উপরে কেউ আক্রমণ করতে যায়? এটা আমাদের কাছে রীতিমতো একটা ধাক্কা লেগেছে যে তাহলে আমরা কী করলাম এতদিন? তাহলে আমরা যে এতদিন নারী আন্দোলন যে কাজ করল যে সচেতনতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করল তাহলে সবই কি বৃথা?
রাশেদ আহমেদ: আপনি কী দেখেছেন ১৮ মাসে? রাষ্ট্র কি এগুলোকে প্রশ্রয় দিয়েছে?
শিরিন পারভিন হক: এই যে আমরা একটা প্রতিবেদন এত পরিশ্রম করে করলাম এবং যখন জমা দিলাম প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে যে কয়জন উপদেষ্টা উপস্থিত ছিল সবাই এটাকে স্বাগত জানিয়েছে এবং উচ্ছ্বসিত হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা রীতিমতো উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছে এটা তোমরা তাড়াতাড়ি ছাপাবার ব্যবস্থা করো। এবং যেন এটা মানুষের হাতে হাতে চলে যায়। কারণ এখানে যে ৪২০ টা প্রস্তাব আছে কিছু আছে সুদূরপ্রসারী কিছু আছে এখনই বাস্তবায়ন যোগ্য কিছু আছে মধ্যম মেয়াদে বাস্তবায়ন যোগ্য। এসবগুলোই কিন্তু আর কিছু না হোক মানুষের কাছে একটা বার্তা দিবে যে নারীরা কী চায়। নারীরা আসলে কী চায়? নারীরা তো মূলত একটা জিনিসই চায় সেটা হলো আমাকে সমান নাগরিক হিসেবে চিন্তা করবেন। আমাকে মানুষের মর্যাদা দেবেন এটাই তো চায়। এই জিনিসটা আমরা আশা করেছি যখন প্রতিবেদন জমা দিয়েছি প্রধান উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টা পরিষদে যারা ছিল তারা সবাই এটাকে স্বাগত জানিয়েছে। এবং প্রধান উপদেষ্টা এটাও বলেছেন যে তোমরা এটাকে তাড়াতাড়ি ইংরেজি অনুবাদের ব্যবস্থা করো, উনি বললন যে আমার কাছে বাইরের দেশ থেকে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করা হচ্ছে এই প্রতিবেদনে। নারী সংস্কার কমিশন কী বলছে কী চাইছে। কিন্তু তারপর যেটা ঘটল দুঃখজনক আমরা জমা দেওয়ার বোধহয় ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে ঠিক তারিখটা মনে নাই হেফাজত ই ইসলাম বিশাল জনসভা করল রমনাতে এবং সেখানে তারা একদম পরিষ্কার বলল এই প্রতিবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। হেফাজত নেতা বললো এই কমিশন যদি বাতিল না করা হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবে হেফাজতে ইসলাম। তসলিমা নাসরিন টিকতে পারে নাই। আজকের এই কমিশনও টিকতে পারবে না। একটা একটা করে মাটির নিচ থেকে ধরে এনে তাদের চামড়া তুলে ফেলা হবে। তাদের চামড়া তুলে ফেলা হবে।
তারা প্রতিবেদনটি পড়েও নাই ঠিকমতো। ওরা তিনটা ইস্যুতে আপত্তি জানাল। একটা বলেছিল যে আমাদের এখানে আমরা বলেছি যে ধর্মভিত্তিক যে পারিবারিক আইন আছে আমাদের, আপনি জানেন আমাদের মুসলিম পারিবারিক আইন আছে হিন্দু পারিবারিক আইন আছে ইত্যাদি ইত্যাদি। তো সেখানে কোনো পারিবারিক আইনেই কিন্তু নারীকে সমান হিস্যা দেওয়া হয় না। বোন হিসেবেও না কন্যা হিসেবেও না স্ত্রী হিসেবেও না। তো আমরা বলেছিলাম যে আমরা মনে করি আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ ধর্মপরায়ণ এবং তারা হয়তো এই ধর্মভিত্তিক আইনের প্রতিই তাদের আনুগত্য। সুতরাং আমরা সেটাকে বাতিল করার কথা বলছি না। কিন্তু কিছু মানুষ আছে যারা চায় একটা সমতাভিত্তিক পারিবারিক আইন তৈরি হোক যেখানে আপনার উত্তরাধিকার হবে সমান ভিত্তিতে অভিভাবকত্ব হবে সমান ভিত্তিতে বিয়ে এবং বিবাহ বিচ্ছেদ সেখানেও সমান অধিকার থাকবে ইত্যাদি ইত্যাদি। তো সেটাকে আমরা বলেছি একটা সিভিল অপশন তৈরি করার জন্য। অর্থাৎ এটা অপশনাল হবে যারা চাইবে তারা তাদের জন্য যেন এই অপশনটা থাকে। সবাই যেন বাধ্য না হয় ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইনের অধীনে জীবন যাপন করতে বা বিয়ে করতে বা ইত্যাদি। এইটা নিয়ে তারা একটা হুলুস্থুল করে দিল যে আমরা ধর্মের ওপর হাত দিচ্ছি। বারবার যে ওখানে পরিষ্কার করে লেখা আছে এটা একটা অপশন। এটা একটা বাড়তি অপশন অন্যগুলোকে বাদ দিতে বলছি না কিন্তু তারা এমনভাবে জিনিসটাকে উপস্থাপন করল যেন আমরা ধর্মের বিরুদ্ধে একটা অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়েছি। এইটা গেল একটা আর দ্বিতীয় যেটা ছিল সেটা হলো আমরা বলেছি যে যৌনকর্মীদের মৌলিক অধিকার যদি নিশ্চিত করতে হয় তাহলে সেটাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। এবং এটার বলার পেছনে আমাদের একটা কারণ ছিল এই প্রতিবেদন কিন্তু আমরা ১০ জন মিলে করেছি, একা একা করি নাই। আমরা ৩৯ টা পরামর্শ সভা করেছি ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন পেশার নারীদের সাথে বিভিন্ন শ্রেণির নারীদের সাথে বিভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার নারীদের সাথে বিভিন্ন রকমের মানুষের সাথে আমরা বসেছি এবং পুরুষদের সাথেও বসেছি। এবং আমরা খুব ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি শ্রম কমিশনের সাথে।
রাশেদ আহমেদ: আমি যেই প্রশ্নটায় আসছি সেটি হচ্ছে গিয়ে আপনি বলছেন যে প্রধান উপদেষ্টা ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এই রিপোর্টটা নিয়ে এবং বলেছেন যে এটার ইংরেজি ভার্সন এবং এটা যেন প্রচার দেওয়ার জন্য উনি বলেছেন। তারপর উনি থেমে গেলেন। এই যে থেমে যাওয়াটা সেটাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
শিরিন পারভিন হক: আমরা জমা দেওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই হেফাজত এই বিশাল জনসভা করে আমার ছবি ছাপিয়ে সেটার ওপরে ক্রস দিয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি এটা বাতিল করল এবং বলল সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন বাতিল সেই সাথে সংস্কার কমিশনের প্রধানও বাতিল। তো এই যে তারা একটা মারমুখী অবস্থান নিল আমার মনে হয় সেটাতে উপদেষ্টা পরিষদ কিছুটা ঘাবড়ে গেল। এবং উপদেষ্টা পরিষদে তো সবাই একমতের না সবাই এক ধারার না। সেখানে কেউ কেউ নিশ্চয়ই অনেক বেশি রক্ষণশীল তারা হয়তো বলেছে যে এই বিতর্কে আমাদের জড়ানো উচিত না। আমার ধারণা যে এই কারণে তারা সরে গেল। মূলত সাহসটা কেউ দেখাতে পারেনি।
রাশেদ আহমেদ: সাহসটা ছিল না। এই যে একটা কমিশন হলো এটার আলোর মুখ দেখল না এটার দায় তো প্রধান উপদেষ্টাকেই নিতে হবে। বা পুরো উপদেষ্টা পরিষদকে নিতে হবে। কিন্তু তারা এটি নিল না। আর আপনি যেটি বলছেন রক্ষণশীল হওয়া। রক্ষণশীল হওয়া এক জিনিস কারো অধিকার নিশ্চিত করা ভিন্ন জিনিস। তো এটাকে কি রক্ষণশীল এইটি দিয়ে কি ঢাকা যায় কিনা?
শিরিন পারভিন হক: হয়তো পুরোপুরি না। কিন্তু আমি রক্ষণশীল শব্দটা সচেতনভাবে ব্যবহার করছি এইজন্য যে যখনই নারীর প্রশ্নটা আসে আপনি দেখেন মজুরির প্রশ্নে কারো সমস্যা নাই সবাই সমান মজুরি সমর্থন করতে প্রস্তুত। সবাই না হলে বেশিরভাগ ট্রেড ইউনিয়নরা প্রস্তুত। কিন্তু যখন নারী নিজস্ব কোনো দাবি থাকে যে নারী একটা স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে সে তার স্বীকৃতি চায় শুধু কারো বোন বা কারো মেয়ে বা কারো স্ত্রী হিসেবে পরিচিতি না সে একটা সমান নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি চায় তখনই সবার একদম সমস্যা হয়ে যায়। এবং সেখানে তারা ভাবে নারীরা কী চায়? নারীরা কি তাদের শরীরের উপর স্বতন্ত্র অধিকার চাচ্ছে? এই যে শরীর, দেহ, এই জিনিসগুলো নিয়ে মানুষ কিন্তু স্বচ্ছন্দ বোধ করে না।
রাশেদ আহমেদ: আপনি এটাকে তাহলে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন আমি যেটি বলছি, এটা কি আমাদের মনোজগতের পরিবর্তন ঘটেনি?
শিরিন পারভিন হক: সেইটাই। গত ৫০ বছরে আমাদের মনোজগতে পরিবর্তন ঘটেনি। ঘটলে আমরা রোকেয়ার ভাস্কর্যে হাত দিতে পারতাম না। শুধু ভাস্কর্যেই হাত দেওয়া হয়নি, বলা হচ্ছে রোকেয়া যেসব কথা বলে গেছে সেগুলো অগ্রহণযোগ্য। অথচ আমরা রোকেয়াকে চিনেছি নারী শিক্ষার অগ্রদূত হিসেবে এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে একটা বলিষ্ঠ কণ্ঠ হিসেবে।
রাশেদ আহমেদ: আপনারা রিপোর্টটি করেছেন, কোন দেশের স্ট্যান্ডার্ড ধরে এটি করেছেন?
শিরিন পারভিন হক: কোনো দেশের স্ট্যান্ডার্ড না। আমাদের দেশের অভিজ্ঞতা, আমাদের দেশের বিভিন্ন স্তরের নারীদের জীবন অভিজ্ঞতা থেকে এটি করা হয়েছে। দুটি দলিল আমাদের খুব কাজে লেগেছে। একটি দলিল হলো মহিলা পরিষদ একটি ‘চার্টার অফ ডিমান্ডস’ তৈরি করেছিল এবং উনারাও বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন জায়গায় পরামর্শ সভা করে ওটা তৈরি করেছিলেন। ওই একই সময়ে ‘নারীপক্ষ’ও একটা দলিল তৈরি করেছিল। তো এই দুটি দলিল আমরা আমাদের ভিত্তি হিসেবে নিয়েছিলাম যে, এগুলো মোটামুটি নারী সমাজের দাবিদাওয়াক রিপ্রেজেন্ট করে।
রাশেদ আহমেদ: একটা বিষয় আপা, এখানে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার নারীদের সাথে আপনারা বসেছেন, তাদের মতামত নিয়েছেন, পুরুষদের সাথেও বসেছেন। যেই শক্তিটি আপনাদের বিরোধিতা করল, সেই শক্তির ঘরেও তো নারীরা আছে। তাদের সাথে কি আপনারা বসেছিলেন? মানে তাদের মতামতটা কী সেটি নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন? কেন বসা হয়নি?
শিরিন পারভিন হক: আমার মনে হয় সেটা বসা হয়নি। দুটি কারণে। আমাদের লক্ষ্য তো পরিষ্কার ছিল; আমরা সমতার পক্ষে সুপারিশ তৈরি করছি ১৫টি খাতে। সেটা নিয়ে তর্ক হোক, বিতর্ক হোক। তর্ক-বিতর্ক হলে অন্তত জনপরিসরে আলোচনা হবে, মানুষ জানবে। কিন্তু যেটা আমরা ঠিক আশা করিনি সেটা হলো গালিগালাজটা। আমরা তর্ক-বিতর্ক দুইটাই স্বাগত জানিয়েছি, সমালোচনাও স্বাগত জানিয়েছি।
রাশেদ আহমেদ: আপনারা আরেকটি চেয়েছিলেন যে রাষ্ট্রে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর জন্য আপনারা সংসদে আসন বৃদ্ধি করতে বলেছিলেন। সেটি তো নেক্সট যারা ক্ষমতায় আসবে, যারা নির্বাচন করবে তাদের কাছে আপনাদের এই দাবিটা ছিল। সেটি তো আর হলো না। আরেকটি বিষয় যে আপনাদের গালিগালাজের মুখে পড়তে হলো, আপনাদের বিরুদ্ধে নানা রকম প্রসেসন তৈরি হলো এবং এটি আলোর মুখ দেখল না। এরপরে কি আপনারা এটি নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ অথবা প্রধান উপদেষ্টার সাথে এর বাস্তবায়নের জন্য পারসু করেছিলেন?
শিরিন পারভিন হক: হ্যাঁ, আমরা করেছিলাম। আমরা যেটা প্রথমত মনে করেছিলাম যে এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা যার সেটা হচ্ছে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়। তো আমরা মহিলা বিষয়ক যিনি উপদেষ্টা ছিলেন তার সাথে আমার কমিশনের দুইজন বসেছি এবং ৪২০টি সুপারিশ তো আর রাতারাতি করা সম্ভব না, তাই ৭০ বা ৮০টি সুপারিশকে আলাদা করে একটা তালিকা করা হয়েছিল। এবং আমরা প্রস্তুত ছিলাম মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করতে যে এই প্রস্তাবগুলো কোন কোন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে, সেখানে কী ধরনের প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হবে; এসব ক্ষেত্রে আমরা আমাদের সম্পূর্ণ সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু সেটা দুঃখজনক যে তা খুব বেশি আগায়নি।
রাশেদ আহমেদ: আপনি দায় দিচ্ছেন মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে... কিন্তু তারা একটি কাজ করবেন তো প্রধান উপদেষ্টার কনসেন্ট ছাড়া? তারা কি ওনার সম্মতি ছাড়া কিছু করতে পারেন?
শিরিন পারভিন হক: তা হয়তো না। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা যে তার বিরোধিতা করেছেন সেটা তো আমাদের কানে আসেনি।
রাশেদ আহমেদ: কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা যে করতে চেয়েছেন সেটা কি কানে এসেছে?
শিরিন পারভিন হক: সেটা তো আমাদের সামনেই উনি বলেছেন। উনি আমাদের সামনেই যেদিন প্রতিবেদন জমা দিলাম সেদিনই বলেছেন; উনি বলেছিলেন যে তোমরা সবগুলো একসাথে পারবে না, তোমরা চারটি মন্ত্রণালয়কে বেছে নাও যে চারটির মধ্য দিয়ে তোমাদের সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হবে।
রাশেদ আহমেদ: আপনি বলছেন যে ধর্মীয় চরমপন্থার একটি বিশাল উত্থান হয়েছে বাংলাদেশে। সেই উত্থানের কারণে অনেক কিছুই করতে পারছেন না কারণ তাদের প্রভাব অনেক বেশি। তাহলে আপনারা তাদেরকে কীভাবে মোকাবিলা করবেন সামনে?
শিরিন পারভিন হক: তাদের প্রভাব অনেক বেশি আমি কিন্তু এটাতে পুরোপুরি একমত নই। আমার কাছে ব্যাপারটা এত সাদাকালো না যে শুধু ধর্মীয় শক্তির উত্থানটাই সবকিছুতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি তো বলছি যে আমার আপনার মতো মানুষেরও তো অনেকের সেই মুক্ত চিন্তার জায়গাটি নেই। সমাজের একটা বড় অংশেরই নেই। এবং তারা যে সবাই ধর্মীয় শক্তি দ্বারা প্রভাবিত তা না। তারা হয়তো খুবই প্রগতিবাদী, খুবই শিক্ষিত, খুবই মুক্ত চিন্তার ধারক-বাহক; কিন্তু যখন ভাই-বোনের মধ্যে সম্পত্তির ভাগ হবে, বন্টন হবে তখন তারা ধর্মীয় আইনের আশ্রয়ী হয়ে যায়।
রাশেদ আহমেদ: আমাদের এই দেশের মনোজগতের চিন্তা-চেতনায় সীমাবদ্ধতা বাসা বেঁধেছে। সেই জায়গাটা তাহলে কীভাবে আপনারা উপড়াবেন? কীভাবে এর পরিবর্তন হবে?
শিরিন পারভিন হক: বাসা বাঁধেনি, একদম শিকড় গেড়েছে। এটার কোনো সহজ সমাধান নেই। এটা আমাদের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এটার জন্য যে মানসিক এবং মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনটা লাগবে সেটা তো শুধু বক্তৃতা দিয়ে বা এরকম দলিল লিখে হবে না। সেটার জন্য যে সাংস্কৃতিক লড়াইটা দরকার, যে সাংস্কৃতিক তৎপরতা দরকার সেটাকে জারি রাখতে হবে।
রাশেদ আহমেদ: আপনারা একটা কমিশনের মাধ্যমে একটি রিপোর্ট দিয়েছিলেন। এই যে নতুন বিএনপি সরকার, সেই সরকারের কাছে কি আপনারা এই রিপোর্ট বাস্তবায়নের জন্য গেছেন? বা ওনাদের কিছু বলেছেন?
শিরিন পারভিন হক: আমরা একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট খুঁজছি। আমরা জানি যে নতুন একটা সরকার আসছে তারা নানা কিছু নিয়ে ব্যস্ত এবং তাদের অনেক রকমের বিষয় মোকাবিলা করতে হচ্ছে। কিন্তু গত তিন সপ্তাহ ধরে আমরা যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি যেন আমাদেরকে একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া হয়। প্রধান উপদেষ্টা হতে হবে এমন না, ওনার অনেক কাজ আছে। তবে মহিলা বিষয়ক যিনি মন্ত্রী আছেন এবং আরও যারা সংশ্লিষ্ট আছেন, সংসদীয় কমিটিতে যারা আছেন তাদের সাথে আমরা বসতে চাই। বসে আমরা আমাদের এই প্রতিবেদন তাদের কাছে উপস্থাপন করতে চাই। এটাও বলতে চাই যে সবগুলো তারা করতে পারবেন সেটা আমরাও মনে করি না কিন্তু আমাদের যে অগ্রাধিকার তালিকা আছে সেটা নিয়ে বসতে চাই যে আপনারা দেখেন এই জিনিসগুলো করতে পারেন কিনা। আমরা চাই আপনারা করবেন এবং সেখানে আমাদের যতটুকু সহযোগিতা প্রয়োজন আমরা দেব।
রাশেদ আহমেদ: সবগুলো করতে পারবেন না কেন বলছেন?
শিরিন পারভিন হক: কারণ কতগুলো সুপারিশ আছে যেগুলো আমাদের স্বপ্ন। ওগুলো বাস্তবায়নের জন্য যে পরিমাণ সামাজিক পরিবর্তন লাগবে সেটা তো এত অল্প সময়ে হবে না। সেটা কোনো এক সরকারের মেয়াদে সম্ভব নয়। সেটা দীর্ঘদিনের ব্যাপার। কিন্তু আমরা চাই সেই প্রক্রিয়ায়ার প্রথম ছোট পদক্ষেপটা অন্তত নেওয়া হোক।
রাশেদ আহমেদ: যোগাযোগ শুরু করেছেন?
শিরিন পারভিন হক: হ্যাঁ অলরেডি শুরু করেছি। আমি গতকালই ডক্টর জাহিদের সাথে কথা বলেছি ফোনে। উনি বগুড়ায় ছিলেন গতকাল। তো উনি বললেন যে আমি ফিরে আসি, তারপর আমার একান্ত সচিবের সাথে কথা বলে আমি আপনাদেরকে একটা সময় দেব। তো আমি খুব আশাবাদী যে সেই সময়টা আমরা শীঘ্রই পাব এবং আমরা ওনাকেই দিয়েই শুরু করতে চাই।
রাশেদ আহমেদ: আপনারা প্রধানমন্ত্রীর অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইছেন না কেন? ওনাকে বুঝাতে পারলে তো আপনাদের অনেক কাজ সহজ হয়ে যায়।
শিরিন পারভিন হক: হ্যাঁ খুব ভালো হতো। তো সেটাও আমরা আশা করছি; ডক্টর জাহিদ যদি কনভিন্সড হন তাহলে উনি সেই অ্যাপয়েন্টমেন্টটা আমাদেরকে করে দিবেন।
রাশেদ আহমেদ: আপনাকে যদি বলি একজন নারী নেত্রী এবং মানবাধিকার কর্মী হিসেবে বাংলাদেশে আসলে অবস্থাটা কী এখন এই মুহূর্তে? আপনারা কি এগিয়েছেন না পিছিয়ে গেছেন?
শিরিন পারভিন হক: অবস্থা তো ভালো না। অনেক ব্যাপারে পিছিয়েছি। ওই যে বললাম চার পা এগিয়েছি তো তিন পা পিছিয়েছি। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় এগিয়েছি। এই যে আইএলও সনদগুলো ইয়ে করা হলো, এগুলো যদি এখন বাস্তবায়ন হয় তাহলে তো আমরা অনেক আগাব। কারণ শ্রমিক শ্রেণির একটা বড় অংশই তো নারী শ্রমিক। তো তাদের অধিকারগুলো, তাদের কর্মপরিবেশ সম্পর্কে যে দাবিগুলো এবং যৌন হয়রানি থেকে মুক্তি পাওয়ার যে আকাঙ্ক্ষাগুলো সেগুলো যদি বাস্তবায়িত হয় তাহলে তো একটি বিরাট অংশ উপকৃত হবে।
রাশেদ আহমেদ: আপনাদের বিরোধিতা যে একটি ইসলামি গোষ্ঠী শুধু করেছে তা নয়, একটি নারী গোষ্ঠীও কিন্তু আপনাদের বিরোধিতা করেছে। তাদের তাহলে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
শিরিন পারভিন হক: না আমি কিন্তু মোটেও সেটাকে অশ্রদ্ধা করব না। ভিন্ন মত তো থাকবেই।
রাশেদ আহমেদ: আপনি যেটি বলছেন যে নারী অধিকার নিশ্চিত করতে হলে এই বিষয়গুলো নিশ্চিত হওয়া দরকার সমাজে ও রাষ্ট্রে। কিন্তু তারা তো এটি চাইছে না। কেন চাইছে না? তারা কি অন্য কোনো জগতে বাস করছে?
শিরিন পারভিন হক: না অন্য কোনো জগতে না। তারা চাইছে না এবং তাদের না চাওয়ার পক্ষে অনেক মানুষ আছে, অনেক সংগঠন আছে, অনেক রাজনৈতিক দল আছে। তাদের মতাদর্শটা একটি গভীর বিশ্বাস থেকে আসে অনেকের ক্ষেত্রে, যেটা হচ্ছে ধর্মীয় পুস্তকে যেটা বলা হয়েছে সেটার বাইরে আমি যেতে পারি না। সেই বিশ্বাসটা অনেকের আছে এবং আমি তো সেই বিশ্বাসটাকে উড়িয়ে দিতে পারি না বা সেটাকে ছোট করে দেখতে চাইও না। সেই বিশ্বাসের জায়গায় সে থাকবে। আমি আমার বিশ্বাসের জায়গায় এগুতে পারি কিনা আমাকে সেই চেষ্টাটা করে যেতে হবে।
রাশেদ আহমেদ: মুক্তি কোনটায় মিলবে?
শিরিন পারভিন হক: এখন যদি কেউ বিশ্বাস করে যে পরকালে মুক্তি আর আমি বলছি যে আমি ইহকালে মুক্তি চাই; সেটা নিয়ে আর কী বলবেন? সেটার উত্তর কী হবে আপনার এই প্রশ্নের?
রাশেদ আহমেদ: আমি মুক্তি বলতে বুঝাতে চাইছি যে তারা অধিকার বঞ্চিত থাকতে চাইছে।
শিরিন পারভিন হক: না তারা তো সেভাবে দেখে না জিনিসটা। তারা তো এটাকে বঞ্চনা মনে করছে না। তারা মনে করছে যে নারীর জীবনে, সংসারে, সমাজে, রাষ্ট্রে বাইরে-ভেতরে এটাই নারীর ভূমিকা। এতটুকুই নারীর বিচরণ গণ্ডি। এর মধ্যেই নারী থাকবে আর পুরুষের গণ্ডি ভিন্ন। তো এটা তো তারা বিশ্বাস করে যে এটাই নায্য। তারা তো মনে করছে না এটা অন্যায্য। আমি মনে করছি যে না, নারীকে কেন কোনো গণ্ডিতে বাধা হবে?
রাশেদ আহমেদ: এবার একটু রাষ্ট্রীয় বিষয়ে আসি। গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নারী সংস্কার কমিশনের পাশাপাশি রাষ্ট্র সংস্কারেও কিছু কমিশন হয়েছিল। একটি গণভোট হয়েছিল। গণভোটের মাধ্যমে কিছু সংবিধান পরিবর্তন অথবা সংশোধনের কথা বলা হয়েছিল। সে ব্যাপারে আপনাদের মতটা কী?
শিরিন পারভিন হক: আপনি ৮৪টি বিষয়কে চারটি প্রস্তাবের মধ্যে নিয়ে আসলেন। এনে বললেন এখন হ্যাঁ-না ভোট দেন। আমি এখন চারটির মধ্যে যদি তিনটিতে সহমত পোষণ করি আর একটিতে না করি আমার তো সেই সুযোগ নেই। হয় সবগুলোতে হ্যাঁ বলতে হবে না হয় সবগুলোতে না বলতে হবে। তো এটা একটা ফালতু গণভোট হলো না? সুতরাং গণভোট আমি প্রত্যাখ্যান করেছি আগেও এবং এখনো করি। কিন্তু অনেকগুলো ভালো সুপারিশ আছে যেগুলো আমি চাই বাস্তবায়িত হোক। তবে তার জন্য গণভোটের ওপর ভর করতে হবে তা না। এখন যে নতুন সরকার হয়েছে, নতুন সংসদ হয়েছে সেখানে বিষয়গুলো আসুক, আলোচিত হোক, বিতর্ক হোক। তারপর সেখানে যেগুলো টিকবে সেগুলো হবে, যেগুলো টিকবে না সেগুলো হবে না—এটাই তো গণতন্ত্রের নিয়ম।
রাশেদ আহমেদ: আপা আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আপনার সময় দেওয়ার জন্য।
শিরিন পারভিন হক: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ আপনারা কষ্ট করে এসেছেন।

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ মে ২০২৬
গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নারী বিষয়ক একটি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। যার নেতৃত্বে ছিলেন মানবাধিকারকর্মী নারী নেত্রী শিরিন পারভিন হক। সেই কমিশন একটি রিপোর্টও দিয়েছিল কিন্তু ধর্মীয় একটি শক্তির চরম বিরোধিতার মুখে সেই রিপোর্টটি আলোর মুখ দেখেনি। সেই কমিশন নিয়ে এবং তার বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে শিরিন পারভিন হকের সাথে কথা বলেছেন সংবাদের ডিজিটাল বিভাগের বার্তা প্রধান রাশেদ আহমেদ। হুবহু তা তুলে ধরা হলো।
রাশেদ আহমেদ: ৫ই আগস্টে একটা রেজিম পরিবর্তন হলো। সেই পরিবর্তনের পর আপনাদের আশাটা কী ছিল?
শিরিন পারভিন হক: তখন তো আশা একেবারে আকাশ ছুঁয়েছিল। কারণ এমন একটা ঘটনা ঘটল এই দেশে যেটা আমরা তো পারিনি। আমার প্রজন্মে পারিনি। কিন্তু আমাদের পরের পরের প্রজন্ম দেখিয়ে দিল যে এত বড় একটা পরিবর্তন আনা যায়।
রাশেদ আহমেদ: তারপর যে মানে ক্ষমতাটা যাদের কাছে গেল মানে সেখানে কি মানে তখন কী ধরনের একটি রাষ্ট্র তৈরি হবে সেগুলো নিয়ে যে প্রত্যাশা ছিল সেটা কি পূরণ হয়েছিল?
শিরিন পারভিন হক: সেটা পূরণ হয়নি। কারণ তখন তো আমার মনে হয় শুধু নারী সমাজ না সকলেরই একটা আশা ছিল যে এবার রাষ্ট্র মেরামত হবে। আমাদের কাছে মনে হয়েছে কিছু মৌলিক পরিবর্তন আসবে। কিন্তু তারপরে দেখা গেল সরকার বদলেছে। মৌলিক পরিবর্তনটা সেভাবে আসলো না।
রাশেদ আহমেদ: প্রভাবটা কার ছিল এই সরকারের তখন আপনারা কী দেখেছেন?
শিরিন পারভিন হক: উপদেষ্টা পরিষদেও অনেকে ছিল যাদের আমরা প্রগতিবাদী হিসেবেই জেনেছি। আমাদের সাথে মাঠে ময়দানে আন্দোলনও করেছে অনেকে। তো সেই জায়গায় আমাদের আশাটা অনেক বেশি হয়তো ছিল। অনেক বেশি মানে আকাঙ্ক্ষা, অনেক বেশি আশা করে বসে গিয়েছিলাম। কিন্তু তাদের কী সীমাবদ্ধতা ছিল, তাদের পক্ষে কোন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা সম্ভব হয়নি, সেটা হয়তো বাইরের থেকে বোঝাটা অতটা সহজ নয়।
রাশেদ আহমেদ: ৫ই আগস্টের পরে একটি তো গণঅভ্যুত্থান। গণঅভ্যুত্থানের পর দেখা গেল আক্রমণের শিকার হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য এবং নারীবাদী যেমন বেগম রোকেয়ার ভাস্কর্য এবং তার ম্যুরাল সেটিও মানে ভেঙে ফেলা হলো। তখন আপনারা কী সিগনাল পেলেন?
শিরিন পারভিন হক: তখন একটা আতঙ্ক তৈরি হলো। তার আগে পর্যন্ত তো উচ্ছ্বাস ছিল। ৫ই আগস্টে যখন আমি শাহবাগে তখন তো সবার চোখেমুখে উচ্ছ্বাস। ওই সময়টা বেশিক্ষণ লাস্ট করল না। অল্প দিনের মধ্যেই মনে হলো যে বেশি আশা করে বসে গিয়েছি। আমার কাছে যেটা দুঃখজনক সেটা হলো যে যেই শক্তিটা প্রগতির পক্ষে না প্রগতির পক্ষে তো নাই প্রগতির বিপক্ষে এবং বিশেষ করে নারীদের ব্যাপারে সেই শক্তিটা মনে হলো অনেক বেশি উত্থান হলো।
রাশেদ আহমেদ: এটি কি রাতারাতি উত্থান হয়েছে?
শিরিন পারভিন হক: না রাতারাতি হয়নি। আমার নিজস্ব একটা ধারণা এবং ব্যাখ্যা সেটা কতটা সঠিক আমি জানি না কিন্তু আমার নিজের যেটা আমি নিজে যেটা পর্যবেক্ষণ করেছি সেটা হলো স্বৈরশাসনের আমলে কিন্তু এই শক্তি নিরবে কাজ করে গেছে। তারা তাদের ঘাঁটি তৈরি করেছে তৃণমূলে এবং সেইটাকে আস্তে আস্তে তারা খোলাসা করেছে।
রাশেদ আহমেদ: মানে আপনি কি বলতে চাচ্ছেন জুলাই আন্দোলনে কারো কারো আকাঙ্ক্ষা কারো কারো উদ্দেশ্য দুইটা ভিন্নভাবে কাজ করেছে?
শিরিন পারভিন হক: ওখানে অনেকে নেমেছে তাদের তো একটা অনেক দিনের মতাদর্শ নিয়ে তারা কাজ করেছে সংগঠন করেছে। তারা হয়তো প্রথমে সেটা নিয়ে অত খোলাসা ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা খোলাসা হয়েছে। অনেকে কিন্তু আগস্টের এটাকে বিপ্লব বলে, আমি কোনোদিন এটাকে বিপ্লব বলি না। তবে নিশ্চয়ই গণঅভ্যুত্থান ছিল। কিন্তু বিপ্লব বলতে যে মৌলিক পরিবর্তনগুলো দরকার সেগুলো উপাদান কিন্তু ছিল না। আমরা তো দেখলাম যে যাদের ওপর আমরা এত আশা করলাম যেই যুব সমাজের ওপর তারা আমরা যেটা করতে পারি নাই তারা সেটা করে দেখাল। সেই জন্য তাদের ওপর আমাদের আশা অনেক বেশি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারা যখন তাদের নিজস্ব দল গঠন করল সেই দলের মধ্যেই তো আমরা দেখতে পেলাম নানা রকমের কি বলব যেগুলো আমরা আশা করিনি। সেই দলের মধ্যেই আস্তে আস্তে দেখলাম দুর্নীতি। আস্তে আস্তে দেখলাম স্বজনপ্রীতি। মানে এই জিনিসগুলো তো আমরা আশা করিনি। আমি ব্যক্তিগত ভাবে খুব দুঃখিত হয়েছি।
রাশেদ আহমেদ: একটা গণঅভ্যুত্থান হয়েছে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলবে নাকি এটার বিপরীতে একটি ধারা রক্ষা করে চলবে এরকম একটি প্রশ্ন দাঁড়ালো?
শিরিন পারভিন হক: কিন্তু আমি অত সাদাকালো ভাবে দেখি না কখনো। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা গেল গেল বলে যে হায় হায় করে উঠেছে বা হাহুতাশ করেছে আমি সেটার সাথেও একমত না। আমি মনে করি না এত সহজ মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা কথাটাতে এত মিসইউজড হয়ে গেছে আমি ওটা ইউজ করতে চাই না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের যে স্পৃহা মুক্তিযুদ্ধের যে স্বপ্নটা সেটা কখনোই কেউ বাতিল করতে পারবেনা।
রাশেদ আহমেদ: চেষ্টা তো হয়েছিল।
শিরিন পারভিন হক: চেষ্টা তো হয়েছে তখনো হয়েছে ৭১ এও হয়েছে। ৭১ এও তো কিছু লোক অল্প সংখ্যক হলেও কিছু লোক তো বিরোধিতা করেছে। তো সেই বিরোধিতা যারা করেছে তারা আস্তে আস্তে তাদের একটা উত্থান হয়েছে। তারা আরও শক্তিশালী হয়েছে। তারা এই দুঃসাহসটা করেছে যে আপনি যেটা বললেন রোকেয়ার ভাস্কর্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্যের উপর হাত দিতে। এই দুঃসাহসটা তারা করতে পেরেছে। অনেক জায়গার নাম পরিবর্তন হয়ে গেল। শুধুমাত্র ভিন্ন ধর্মের নাম বলে সেই নামগুলো পরিবর্তন করে ইসলামী নাম দেওয়ার চেষ্টা করা হলো। জয়দেবপুরকে গাজীপুর কিন্তু আগে হয়েছে এখন না। এবং কার আমলে হয়েছে সেটা আপনারাও জানেন। তো সেই জিনিসগুলো কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে হুট করে ডানদিকে চলে গেলাম তা তো না। এই ডানপন্থী চিন্তা কিন্তু অনেকদিন ধরেই চলছে এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার তাদেরকে প্রশ্রয়ও দিয়েছে। লালন পালনও করেছে। আপনি যেটা বললেন এই যে মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শনগুলোর ওপর আক্রমণ শুধু মুক্তিযুদ্ধ না রোকেয়ার কথা বললেন। যেই রোকেয়া লড়াই করেছে নারীর মুক্তির জন্য নারীর শিক্ষার জন্য নারীর অগ্রগতির জন্য এটা ভাবা যায় না যে এটার উপরে কেউ আক্রমণ করতে যায়? এটা আমাদের কাছে রীতিমতো একটা ধাক্কা লেগেছে যে তাহলে আমরা কী করলাম এতদিন? তাহলে আমরা যে এতদিন নারী আন্দোলন যে কাজ করল যে সচেতনতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করল তাহলে সবই কি বৃথা?
রাশেদ আহমেদ: আপনি কী দেখেছেন ১৮ মাসে? রাষ্ট্র কি এগুলোকে প্রশ্রয় দিয়েছে?
শিরিন পারভিন হক: এই যে আমরা একটা প্রতিবেদন এত পরিশ্রম করে করলাম এবং যখন জমা দিলাম প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে যে কয়জন উপদেষ্টা উপস্থিত ছিল সবাই এটাকে স্বাগত জানিয়েছে এবং উচ্ছ্বসিত হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা রীতিমতো উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছে এটা তোমরা তাড়াতাড়ি ছাপাবার ব্যবস্থা করো। এবং যেন এটা মানুষের হাতে হাতে চলে যায়। কারণ এখানে যে ৪২০ টা প্রস্তাব আছে কিছু আছে সুদূরপ্রসারী কিছু আছে এখনই বাস্তবায়ন যোগ্য কিছু আছে মধ্যম মেয়াদে বাস্তবায়ন যোগ্য। এসবগুলোই কিন্তু আর কিছু না হোক মানুষের কাছে একটা বার্তা দিবে যে নারীরা কী চায়। নারীরা আসলে কী চায়? নারীরা তো মূলত একটা জিনিসই চায় সেটা হলো আমাকে সমান নাগরিক হিসেবে চিন্তা করবেন। আমাকে মানুষের মর্যাদা দেবেন এটাই তো চায়। এই জিনিসটা আমরা আশা করেছি যখন প্রতিবেদন জমা দিয়েছি প্রধান উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টা পরিষদে যারা ছিল তারা সবাই এটাকে স্বাগত জানিয়েছে। এবং প্রধান উপদেষ্টা এটাও বলেছেন যে তোমরা এটাকে তাড়াতাড়ি ইংরেজি অনুবাদের ব্যবস্থা করো, উনি বললন যে আমার কাছে বাইরের দেশ থেকে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করা হচ্ছে এই প্রতিবেদনে। নারী সংস্কার কমিশন কী বলছে কী চাইছে। কিন্তু তারপর যেটা ঘটল দুঃখজনক আমরা জমা দেওয়ার বোধহয় ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে ঠিক তারিখটা মনে নাই হেফাজত ই ইসলাম বিশাল জনসভা করল রমনাতে এবং সেখানে তারা একদম পরিষ্কার বলল এই প্রতিবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। হেফাজত নেতা বললো এই কমিশন যদি বাতিল না করা হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবে হেফাজতে ইসলাম। তসলিমা নাসরিন টিকতে পারে নাই। আজকের এই কমিশনও টিকতে পারবে না। একটা একটা করে মাটির নিচ থেকে ধরে এনে তাদের চামড়া তুলে ফেলা হবে। তাদের চামড়া তুলে ফেলা হবে।
তারা প্রতিবেদনটি পড়েও নাই ঠিকমতো। ওরা তিনটা ইস্যুতে আপত্তি জানাল। একটা বলেছিল যে আমাদের এখানে আমরা বলেছি যে ধর্মভিত্তিক যে পারিবারিক আইন আছে আমাদের, আপনি জানেন আমাদের মুসলিম পারিবারিক আইন আছে হিন্দু পারিবারিক আইন আছে ইত্যাদি ইত্যাদি। তো সেখানে কোনো পারিবারিক আইনেই কিন্তু নারীকে সমান হিস্যা দেওয়া হয় না। বোন হিসেবেও না কন্যা হিসেবেও না স্ত্রী হিসেবেও না। তো আমরা বলেছিলাম যে আমরা মনে করি আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ ধর্মপরায়ণ এবং তারা হয়তো এই ধর্মভিত্তিক আইনের প্রতিই তাদের আনুগত্য। সুতরাং আমরা সেটাকে বাতিল করার কথা বলছি না। কিন্তু কিছু মানুষ আছে যারা চায় একটা সমতাভিত্তিক পারিবারিক আইন তৈরি হোক যেখানে আপনার উত্তরাধিকার হবে সমান ভিত্তিতে অভিভাবকত্ব হবে সমান ভিত্তিতে বিয়ে এবং বিবাহ বিচ্ছেদ সেখানেও সমান অধিকার থাকবে ইত্যাদি ইত্যাদি। তো সেটাকে আমরা বলেছি একটা সিভিল অপশন তৈরি করার জন্য। অর্থাৎ এটা অপশনাল হবে যারা চাইবে তারা তাদের জন্য যেন এই অপশনটা থাকে। সবাই যেন বাধ্য না হয় ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইনের অধীনে জীবন যাপন করতে বা বিয়ে করতে বা ইত্যাদি। এইটা নিয়ে তারা একটা হুলুস্থুল করে দিল যে আমরা ধর্মের ওপর হাত দিচ্ছি। বারবার যে ওখানে পরিষ্কার করে লেখা আছে এটা একটা অপশন। এটা একটা বাড়তি অপশন অন্যগুলোকে বাদ দিতে বলছি না কিন্তু তারা এমনভাবে জিনিসটাকে উপস্থাপন করল যেন আমরা ধর্মের বিরুদ্ধে একটা অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়েছি। এইটা গেল একটা আর দ্বিতীয় যেটা ছিল সেটা হলো আমরা বলেছি যে যৌনকর্মীদের মৌলিক অধিকার যদি নিশ্চিত করতে হয় তাহলে সেটাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। এবং এটার বলার পেছনে আমাদের একটা কারণ ছিল এই প্রতিবেদন কিন্তু আমরা ১০ জন মিলে করেছি, একা একা করি নাই। আমরা ৩৯ টা পরামর্শ সভা করেছি ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন পেশার নারীদের সাথে বিভিন্ন শ্রেণির নারীদের সাথে বিভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার নারীদের সাথে বিভিন্ন রকমের মানুষের সাথে আমরা বসেছি এবং পুরুষদের সাথেও বসেছি। এবং আমরা খুব ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি শ্রম কমিশনের সাথে।
রাশেদ আহমেদ: আমি যেই প্রশ্নটায় আসছি সেটি হচ্ছে গিয়ে আপনি বলছেন যে প্রধান উপদেষ্টা ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এই রিপোর্টটা নিয়ে এবং বলেছেন যে এটার ইংরেজি ভার্সন এবং এটা যেন প্রচার দেওয়ার জন্য উনি বলেছেন। তারপর উনি থেমে গেলেন। এই যে থেমে যাওয়াটা সেটাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
শিরিন পারভিন হক: আমরা জমা দেওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই হেফাজত এই বিশাল জনসভা করে আমার ছবি ছাপিয়ে সেটার ওপরে ক্রস দিয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি এটা বাতিল করল এবং বলল সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন বাতিল সেই সাথে সংস্কার কমিশনের প্রধানও বাতিল। তো এই যে তারা একটা মারমুখী অবস্থান নিল আমার মনে হয় সেটাতে উপদেষ্টা পরিষদ কিছুটা ঘাবড়ে গেল। এবং উপদেষ্টা পরিষদে তো সবাই একমতের না সবাই এক ধারার না। সেখানে কেউ কেউ নিশ্চয়ই অনেক বেশি রক্ষণশীল তারা হয়তো বলেছে যে এই বিতর্কে আমাদের জড়ানো উচিত না। আমার ধারণা যে এই কারণে তারা সরে গেল। মূলত সাহসটা কেউ দেখাতে পারেনি।
রাশেদ আহমেদ: সাহসটা ছিল না। এই যে একটা কমিশন হলো এটার আলোর মুখ দেখল না এটার দায় তো প্রধান উপদেষ্টাকেই নিতে হবে। বা পুরো উপদেষ্টা পরিষদকে নিতে হবে। কিন্তু তারা এটি নিল না। আর আপনি যেটি বলছেন রক্ষণশীল হওয়া। রক্ষণশীল হওয়া এক জিনিস কারো অধিকার নিশ্চিত করা ভিন্ন জিনিস। তো এটাকে কি রক্ষণশীল এইটি দিয়ে কি ঢাকা যায় কিনা?
শিরিন পারভিন হক: হয়তো পুরোপুরি না। কিন্তু আমি রক্ষণশীল শব্দটা সচেতনভাবে ব্যবহার করছি এইজন্য যে যখনই নারীর প্রশ্নটা আসে আপনি দেখেন মজুরির প্রশ্নে কারো সমস্যা নাই সবাই সমান মজুরি সমর্থন করতে প্রস্তুত। সবাই না হলে বেশিরভাগ ট্রেড ইউনিয়নরা প্রস্তুত। কিন্তু যখন নারী নিজস্ব কোনো দাবি থাকে যে নারী একটা স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে সে তার স্বীকৃতি চায় শুধু কারো বোন বা কারো মেয়ে বা কারো স্ত্রী হিসেবে পরিচিতি না সে একটা সমান নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি চায় তখনই সবার একদম সমস্যা হয়ে যায়। এবং সেখানে তারা ভাবে নারীরা কী চায়? নারীরা কি তাদের শরীরের উপর স্বতন্ত্র অধিকার চাচ্ছে? এই যে শরীর, দেহ, এই জিনিসগুলো নিয়ে মানুষ কিন্তু স্বচ্ছন্দ বোধ করে না।
রাশেদ আহমেদ: আপনি এটাকে তাহলে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন আমি যেটি বলছি, এটা কি আমাদের মনোজগতের পরিবর্তন ঘটেনি?
শিরিন পারভিন হক: সেইটাই। গত ৫০ বছরে আমাদের মনোজগতে পরিবর্তন ঘটেনি। ঘটলে আমরা রোকেয়ার ভাস্কর্যে হাত দিতে পারতাম না। শুধু ভাস্কর্যেই হাত দেওয়া হয়নি, বলা হচ্ছে রোকেয়া যেসব কথা বলে গেছে সেগুলো অগ্রহণযোগ্য। অথচ আমরা রোকেয়াকে চিনেছি নারী শিক্ষার অগ্রদূত হিসেবে এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে একটা বলিষ্ঠ কণ্ঠ হিসেবে।
রাশেদ আহমেদ: আপনারা রিপোর্টটি করেছেন, কোন দেশের স্ট্যান্ডার্ড ধরে এটি করেছেন?
শিরিন পারভিন হক: কোনো দেশের স্ট্যান্ডার্ড না। আমাদের দেশের অভিজ্ঞতা, আমাদের দেশের বিভিন্ন স্তরের নারীদের জীবন অভিজ্ঞতা থেকে এটি করা হয়েছে। দুটি দলিল আমাদের খুব কাজে লেগেছে। একটি দলিল হলো মহিলা পরিষদ একটি ‘চার্টার অফ ডিমান্ডস’ তৈরি করেছিল এবং উনারাও বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন জায়গায় পরামর্শ সভা করে ওটা তৈরি করেছিলেন। ওই একই সময়ে ‘নারীপক্ষ’ও একটা দলিল তৈরি করেছিল। তো এই দুটি দলিল আমরা আমাদের ভিত্তি হিসেবে নিয়েছিলাম যে, এগুলো মোটামুটি নারী সমাজের দাবিদাওয়াক রিপ্রেজেন্ট করে।
রাশেদ আহমেদ: একটা বিষয় আপা, এখানে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার নারীদের সাথে আপনারা বসেছেন, তাদের মতামত নিয়েছেন, পুরুষদের সাথেও বসেছেন। যেই শক্তিটি আপনাদের বিরোধিতা করল, সেই শক্তির ঘরেও তো নারীরা আছে। তাদের সাথে কি আপনারা বসেছিলেন? মানে তাদের মতামতটা কী সেটি নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন? কেন বসা হয়নি?
শিরিন পারভিন হক: আমার মনে হয় সেটা বসা হয়নি। দুটি কারণে। আমাদের লক্ষ্য তো পরিষ্কার ছিল; আমরা সমতার পক্ষে সুপারিশ তৈরি করছি ১৫টি খাতে। সেটা নিয়ে তর্ক হোক, বিতর্ক হোক। তর্ক-বিতর্ক হলে অন্তত জনপরিসরে আলোচনা হবে, মানুষ জানবে। কিন্তু যেটা আমরা ঠিক আশা করিনি সেটা হলো গালিগালাজটা। আমরা তর্ক-বিতর্ক দুইটাই স্বাগত জানিয়েছি, সমালোচনাও স্বাগত জানিয়েছি।
রাশেদ আহমেদ: আপনারা আরেকটি চেয়েছিলেন যে রাষ্ট্রে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর জন্য আপনারা সংসদে আসন বৃদ্ধি করতে বলেছিলেন। সেটি তো নেক্সট যারা ক্ষমতায় আসবে, যারা নির্বাচন করবে তাদের কাছে আপনাদের এই দাবিটা ছিল। সেটি তো আর হলো না। আরেকটি বিষয় যে আপনাদের গালিগালাজের মুখে পড়তে হলো, আপনাদের বিরুদ্ধে নানা রকম প্রসেসন তৈরি হলো এবং এটি আলোর মুখ দেখল না। এরপরে কি আপনারা এটি নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ অথবা প্রধান উপদেষ্টার সাথে এর বাস্তবায়নের জন্য পারসু করেছিলেন?
শিরিন পারভিন হক: হ্যাঁ, আমরা করেছিলাম। আমরা যেটা প্রথমত মনে করেছিলাম যে এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা যার সেটা হচ্ছে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়। তো আমরা মহিলা বিষয়ক যিনি উপদেষ্টা ছিলেন তার সাথে আমার কমিশনের দুইজন বসেছি এবং ৪২০টি সুপারিশ তো আর রাতারাতি করা সম্ভব না, তাই ৭০ বা ৮০টি সুপারিশকে আলাদা করে একটা তালিকা করা হয়েছিল। এবং আমরা প্রস্তুত ছিলাম মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করতে যে এই প্রস্তাবগুলো কোন কোন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে, সেখানে কী ধরনের প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হবে; এসব ক্ষেত্রে আমরা আমাদের সম্পূর্ণ সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু সেটা দুঃখজনক যে তা খুব বেশি আগায়নি।
রাশেদ আহমেদ: আপনি দায় দিচ্ছেন মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে... কিন্তু তারা একটি কাজ করবেন তো প্রধান উপদেষ্টার কনসেন্ট ছাড়া? তারা কি ওনার সম্মতি ছাড়া কিছু করতে পারেন?
শিরিন পারভিন হক: তা হয়তো না। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা যে তার বিরোধিতা করেছেন সেটা তো আমাদের কানে আসেনি।
রাশেদ আহমেদ: কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা যে করতে চেয়েছেন সেটা কি কানে এসেছে?
শিরিন পারভিন হক: সেটা তো আমাদের সামনেই উনি বলেছেন। উনি আমাদের সামনেই যেদিন প্রতিবেদন জমা দিলাম সেদিনই বলেছেন; উনি বলেছিলেন যে তোমরা সবগুলো একসাথে পারবে না, তোমরা চারটি মন্ত্রণালয়কে বেছে নাও যে চারটির মধ্য দিয়ে তোমাদের সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হবে।
রাশেদ আহমেদ: আপনি বলছেন যে ধর্মীয় চরমপন্থার একটি বিশাল উত্থান হয়েছে বাংলাদেশে। সেই উত্থানের কারণে অনেক কিছুই করতে পারছেন না কারণ তাদের প্রভাব অনেক বেশি। তাহলে আপনারা তাদেরকে কীভাবে মোকাবিলা করবেন সামনে?
শিরিন পারভিন হক: তাদের প্রভাব অনেক বেশি আমি কিন্তু এটাতে পুরোপুরি একমত নই। আমার কাছে ব্যাপারটা এত সাদাকালো না যে শুধু ধর্মীয় শক্তির উত্থানটাই সবকিছুতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি তো বলছি যে আমার আপনার মতো মানুষেরও তো অনেকের সেই মুক্ত চিন্তার জায়গাটি নেই। সমাজের একটা বড় অংশেরই নেই। এবং তারা যে সবাই ধর্মীয় শক্তি দ্বারা প্রভাবিত তা না। তারা হয়তো খুবই প্রগতিবাদী, খুবই শিক্ষিত, খুবই মুক্ত চিন্তার ধারক-বাহক; কিন্তু যখন ভাই-বোনের মধ্যে সম্পত্তির ভাগ হবে, বন্টন হবে তখন তারা ধর্মীয় আইনের আশ্রয়ী হয়ে যায়।
রাশেদ আহমেদ: আমাদের এই দেশের মনোজগতের চিন্তা-চেতনায় সীমাবদ্ধতা বাসা বেঁধেছে। সেই জায়গাটা তাহলে কীভাবে আপনারা উপড়াবেন? কীভাবে এর পরিবর্তন হবে?
শিরিন পারভিন হক: বাসা বাঁধেনি, একদম শিকড় গেড়েছে। এটার কোনো সহজ সমাধান নেই। এটা আমাদের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এটার জন্য যে মানসিক এবং মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনটা লাগবে সেটা তো শুধু বক্তৃতা দিয়ে বা এরকম দলিল লিখে হবে না। সেটার জন্য যে সাংস্কৃতিক লড়াইটা দরকার, যে সাংস্কৃতিক তৎপরতা দরকার সেটাকে জারি রাখতে হবে।
রাশেদ আহমেদ: আপনারা একটা কমিশনের মাধ্যমে একটি রিপোর্ট দিয়েছিলেন। এই যে নতুন বিএনপি সরকার, সেই সরকারের কাছে কি আপনারা এই রিপোর্ট বাস্তবায়নের জন্য গেছেন? বা ওনাদের কিছু বলেছেন?
শিরিন পারভিন হক: আমরা একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট খুঁজছি। আমরা জানি যে নতুন একটা সরকার আসছে তারা নানা কিছু নিয়ে ব্যস্ত এবং তাদের অনেক রকমের বিষয় মোকাবিলা করতে হচ্ছে। কিন্তু গত তিন সপ্তাহ ধরে আমরা যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি যেন আমাদেরকে একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া হয়। প্রধান উপদেষ্টা হতে হবে এমন না, ওনার অনেক কাজ আছে। তবে মহিলা বিষয়ক যিনি মন্ত্রী আছেন এবং আরও যারা সংশ্লিষ্ট আছেন, সংসদীয় কমিটিতে যারা আছেন তাদের সাথে আমরা বসতে চাই। বসে আমরা আমাদের এই প্রতিবেদন তাদের কাছে উপস্থাপন করতে চাই। এটাও বলতে চাই যে সবগুলো তারা করতে পারবেন সেটা আমরাও মনে করি না কিন্তু আমাদের যে অগ্রাধিকার তালিকা আছে সেটা নিয়ে বসতে চাই যে আপনারা দেখেন এই জিনিসগুলো করতে পারেন কিনা। আমরা চাই আপনারা করবেন এবং সেখানে আমাদের যতটুকু সহযোগিতা প্রয়োজন আমরা দেব।
রাশেদ আহমেদ: সবগুলো করতে পারবেন না কেন বলছেন?
শিরিন পারভিন হক: কারণ কতগুলো সুপারিশ আছে যেগুলো আমাদের স্বপ্ন। ওগুলো বাস্তবায়নের জন্য যে পরিমাণ সামাজিক পরিবর্তন লাগবে সেটা তো এত অল্প সময়ে হবে না। সেটা কোনো এক সরকারের মেয়াদে সম্ভব নয়। সেটা দীর্ঘদিনের ব্যাপার। কিন্তু আমরা চাই সেই প্রক্রিয়ায়ার প্রথম ছোট পদক্ষেপটা অন্তত নেওয়া হোক।
রাশেদ আহমেদ: যোগাযোগ শুরু করেছেন?
শিরিন পারভিন হক: হ্যাঁ অলরেডি শুরু করেছি। আমি গতকালই ডক্টর জাহিদের সাথে কথা বলেছি ফোনে। উনি বগুড়ায় ছিলেন গতকাল। তো উনি বললেন যে আমি ফিরে আসি, তারপর আমার একান্ত সচিবের সাথে কথা বলে আমি আপনাদেরকে একটা সময় দেব। তো আমি খুব আশাবাদী যে সেই সময়টা আমরা শীঘ্রই পাব এবং আমরা ওনাকেই দিয়েই শুরু করতে চাই।
রাশেদ আহমেদ: আপনারা প্রধানমন্ত্রীর অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইছেন না কেন? ওনাকে বুঝাতে পারলে তো আপনাদের অনেক কাজ সহজ হয়ে যায়।
শিরিন পারভিন হক: হ্যাঁ খুব ভালো হতো। তো সেটাও আমরা আশা করছি; ডক্টর জাহিদ যদি কনভিন্সড হন তাহলে উনি সেই অ্যাপয়েন্টমেন্টটা আমাদেরকে করে দিবেন।
রাশেদ আহমেদ: আপনাকে যদি বলি একজন নারী নেত্রী এবং মানবাধিকার কর্মী হিসেবে বাংলাদেশে আসলে অবস্থাটা কী এখন এই মুহূর্তে? আপনারা কি এগিয়েছেন না পিছিয়ে গেছেন?
শিরিন পারভিন হক: অবস্থা তো ভালো না। অনেক ব্যাপারে পিছিয়েছি। ওই যে বললাম চার পা এগিয়েছি তো তিন পা পিছিয়েছি। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় এগিয়েছি। এই যে আইএলও সনদগুলো ইয়ে করা হলো, এগুলো যদি এখন বাস্তবায়ন হয় তাহলে তো আমরা অনেক আগাব। কারণ শ্রমিক শ্রেণির একটা বড় অংশই তো নারী শ্রমিক। তো তাদের অধিকারগুলো, তাদের কর্মপরিবেশ সম্পর্কে যে দাবিগুলো এবং যৌন হয়রানি থেকে মুক্তি পাওয়ার যে আকাঙ্ক্ষাগুলো সেগুলো যদি বাস্তবায়িত হয় তাহলে তো একটি বিরাট অংশ উপকৃত হবে।
রাশেদ আহমেদ: আপনাদের বিরোধিতা যে একটি ইসলামি গোষ্ঠী শুধু করেছে তা নয়, একটি নারী গোষ্ঠীও কিন্তু আপনাদের বিরোধিতা করেছে। তাদের তাহলে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
শিরিন পারভিন হক: না আমি কিন্তু মোটেও সেটাকে অশ্রদ্ধা করব না। ভিন্ন মত তো থাকবেই।
রাশেদ আহমেদ: আপনি যেটি বলছেন যে নারী অধিকার নিশ্চিত করতে হলে এই বিষয়গুলো নিশ্চিত হওয়া দরকার সমাজে ও রাষ্ট্রে। কিন্তু তারা তো এটি চাইছে না। কেন চাইছে না? তারা কি অন্য কোনো জগতে বাস করছে?
শিরিন পারভিন হক: না অন্য কোনো জগতে না। তারা চাইছে না এবং তাদের না চাওয়ার পক্ষে অনেক মানুষ আছে, অনেক সংগঠন আছে, অনেক রাজনৈতিক দল আছে। তাদের মতাদর্শটা একটি গভীর বিশ্বাস থেকে আসে অনেকের ক্ষেত্রে, যেটা হচ্ছে ধর্মীয় পুস্তকে যেটা বলা হয়েছে সেটার বাইরে আমি যেতে পারি না। সেই বিশ্বাসটা অনেকের আছে এবং আমি তো সেই বিশ্বাসটাকে উড়িয়ে দিতে পারি না বা সেটাকে ছোট করে দেখতে চাইও না। সেই বিশ্বাসের জায়গায় সে থাকবে। আমি আমার বিশ্বাসের জায়গায় এগুতে পারি কিনা আমাকে সেই চেষ্টাটা করে যেতে হবে।
রাশেদ আহমেদ: মুক্তি কোনটায় মিলবে?
শিরিন পারভিন হক: এখন যদি কেউ বিশ্বাস করে যে পরকালে মুক্তি আর আমি বলছি যে আমি ইহকালে মুক্তি চাই; সেটা নিয়ে আর কী বলবেন? সেটার উত্তর কী হবে আপনার এই প্রশ্নের?
রাশেদ আহমেদ: আমি মুক্তি বলতে বুঝাতে চাইছি যে তারা অধিকার বঞ্চিত থাকতে চাইছে।
শিরিন পারভিন হক: না তারা তো সেভাবে দেখে না জিনিসটা। তারা তো এটাকে বঞ্চনা মনে করছে না। তারা মনে করছে যে নারীর জীবনে, সংসারে, সমাজে, রাষ্ট্রে বাইরে-ভেতরে এটাই নারীর ভূমিকা। এতটুকুই নারীর বিচরণ গণ্ডি। এর মধ্যেই নারী থাকবে আর পুরুষের গণ্ডি ভিন্ন। তো এটা তো তারা বিশ্বাস করে যে এটাই নায্য। তারা তো মনে করছে না এটা অন্যায্য। আমি মনে করছি যে না, নারীকে কেন কোনো গণ্ডিতে বাধা হবে?
রাশেদ আহমেদ: এবার একটু রাষ্ট্রীয় বিষয়ে আসি। গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নারী সংস্কার কমিশনের পাশাপাশি রাষ্ট্র সংস্কারেও কিছু কমিশন হয়েছিল। একটি গণভোট হয়েছিল। গণভোটের মাধ্যমে কিছু সংবিধান পরিবর্তন অথবা সংশোধনের কথা বলা হয়েছিল। সে ব্যাপারে আপনাদের মতটা কী?
শিরিন পারভিন হক: আপনি ৮৪টি বিষয়কে চারটি প্রস্তাবের মধ্যে নিয়ে আসলেন। এনে বললেন এখন হ্যাঁ-না ভোট দেন। আমি এখন চারটির মধ্যে যদি তিনটিতে সহমত পোষণ করি আর একটিতে না করি আমার তো সেই সুযোগ নেই। হয় সবগুলোতে হ্যাঁ বলতে হবে না হয় সবগুলোতে না বলতে হবে। তো এটা একটা ফালতু গণভোট হলো না? সুতরাং গণভোট আমি প্রত্যাখ্যান করেছি আগেও এবং এখনো করি। কিন্তু অনেকগুলো ভালো সুপারিশ আছে যেগুলো আমি চাই বাস্তবায়িত হোক। তবে তার জন্য গণভোটের ওপর ভর করতে হবে তা না। এখন যে নতুন সরকার হয়েছে, নতুন সংসদ হয়েছে সেখানে বিষয়গুলো আসুক, আলোচিত হোক, বিতর্ক হোক। তারপর সেখানে যেগুলো টিকবে সেগুলো হবে, যেগুলো টিকবে না সেগুলো হবে না—এটাই তো গণতন্ত্রের নিয়ম।
রাশেদ আহমেদ: আপা আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আপনার সময় দেওয়ার জন্য।
শিরিন পারভিন হক: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ আপনারা কষ্ট করে এসেছেন।

আপনার মতামত লিখুন