সংবাদ

ওয়াসার পানির ঘাটতি ‘বিপজ্জনক’


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৬:৪৮ পিএম

ওয়াসার পানির ঘাটতি ‘বিপজ্জনক’
চাহিদার তুলনায় প্রতিদিন ২৫ কোটি লিটার কম উৎপাদন

চাহিদার তুলনায় প্রতিদিন ২৫ কোটি লিটার কম উৎপাদন

রাজধানীবাসীর জন্য উদ্বেগজনক খবর। চাহিদার তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ২৫ কোটি লিটার কম পানি উৎপাদন করছে ঢাকা ওয়াসা। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদে এ তথ্য জানিয়েছেন।

মঙ্গলবার (১৬ জুন) সংসদে সংরক্ষিত আসনের সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনিরের তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী এ তথ্য জানান।অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

মন্ত্রী জানান, বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা প্রতিদিন ২৯৫ থেকে ৩০০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করছে। অথচ, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় দৈনিক চাহিদা ৩২০ থেকে ৩২৫ কোটি লিটার। অর্থাৎ প্রতিদিনই কম পড়ছে প্রায় ২৫ কোটি লিটার পানি।

নগরীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, বাড়তি আবাসন প্রকল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কারণে প্রতিদিনই বাড়ছে পানির চাহিদা। তবে সেই অনুপাতে উৎপাদন বাড়াতে পারছে না ওয়াসা। ওয়াসার পানির এই ঘাটতিকে ‘বিপজ্জনক’ বলছেন অনেকে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিম্নগামী হওয়া এবং পৃষ্ঠের পানি উৎপাদনে সীমাবদ্ধতাই এই সংকটের মূল কারণ। তবে শুধু ঘাটতিই নয়, পানির মান নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। 

মন্ত্রী জানিয়েছেন, সরবরাহকৃত পানির মান নিশ্চিতে পলি অ্যালুমিনিয়াম ক্লোরাইড (পিএসি), অ্যালাম সালফেট ও ক্লোরিনেশন পদ্ধতি ব্যবহার করে ওয়াসা। শোধিত পানি সরবরাহের আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশিকা অনুযায়ী ওয়াসার ল্যাবে গুণগত মান পরীক্ষা করা হয়।

তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০টি নমুনা সংগ্রহ করা হলেও তা কি যথেষ্ট? প্রশ্ন রয়েছে অভিজাত এলাকা ও নিম্নআয়ের বসতিগুলোতে পানির মানের তারতম্য নিয়েও।

রাজধানী ঢাকা এখন জলসংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। প্রতিদিন ২৫ কোটি লিটার ঘাটতি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি নগরীর ভবিষ্যতের জন্য এক মারাত্মক হুমকি।

মূলত, ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় এখনও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে বছরে প্রায় ২-৩ মিটার করে নিচে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। তাছাড়া পদ্মা ও বুড়িগঙ্গার পানি ব্যবহারে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ৪-৫ লাখ মানুষ বাড়ছে ঢাকায়, সেই সঙ্গে বাড়ছে পানির চাহিদাও। এর ওপর বাড়তি আবাসন ও শিল্প কারখানায় পানির ব্যবহারও বাড়ছে বহুগুণে।

পানির ঘাটতির বড় প্রভাব পড়বে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর। তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বস্তি ও ঘিঞ্জি এলাকায় সংকট আরও তীব্র হবে। পাশাপাশি, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। আর দীর্ঘমেয়াদে নগরীর জলাবদ্ধতা ও নিষ্কাশন ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়বে। শুধু তাই নয়, পানি সংকটে বাড়বে স্বাস্থ্যঝুঁকি।অপরিশোধিত পানি ব্যবহার করে ডায়রিয়া, টাইফয়েডের মতো রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা বাড়বে।

এসব সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পদ্মা থেকে পানি এনে শোধনাগার স্থাপন ও সম্প্রসারণ জরুরি। নতুন ভবনে রেইনওয়াটার হারভেস্টিং বাধ্যতামূলক করতে হবে। ডিপ টিউবওয়েল বসাতে কঠোর অনুমতির প্রয়োজন। শিল্পকারখানায় ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করে পানি পুনঃব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। জনগণকে পানি অপচয় রোধে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। 

জাতীয় সংসদে মন্ত্রী যে তথ্য তুলে ধরেছেন, তা নগরীর জন্য এক রেড সিগন্যাল। অথচ, সমাধানের পরিকল্পনা কতদূর এগিয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পানির অভাবে ঢাকার প্রতিটি ঘরে ঘরে দুর্ভোগ নামার আগেই কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ নিতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬


ওয়াসার পানির ঘাটতি ‘বিপজ্জনক’

প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬

featured Image

চাহিদার তুলনায় প্রতিদিন ২৫ কোটি লিটার কম উৎপাদন

রাজধানীবাসীর জন্য উদ্বেগজনক খবর। চাহিদার তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ২৫ কোটি লিটার কম পানি উৎপাদন করছে ঢাকা ওয়াসা। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদে এ তথ্য জানিয়েছেন।

মঙ্গলবার (১৬ জুন) সংসদে সংরক্ষিত আসনের সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনিরের তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী এ তথ্য জানান।অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

মন্ত্রী জানান, বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা প্রতিদিন ২৯৫ থেকে ৩০০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করছে। অথচ, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় দৈনিক চাহিদা ৩২০ থেকে ৩২৫ কোটি লিটার। অর্থাৎ প্রতিদিনই কম পড়ছে প্রায় ২৫ কোটি লিটার পানি।

নগরীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, বাড়তি আবাসন প্রকল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কারণে প্রতিদিনই বাড়ছে পানির চাহিদা। তবে সেই অনুপাতে উৎপাদন বাড়াতে পারছে না ওয়াসা। ওয়াসার পানির এই ঘাটতিকে ‘বিপজ্জনক’ বলছেন অনেকে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিম্নগামী হওয়া এবং পৃষ্ঠের পানি উৎপাদনে সীমাবদ্ধতাই এই সংকটের মূল কারণ। তবে শুধু ঘাটতিই নয়, পানির মান নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। 

মন্ত্রী জানিয়েছেন, সরবরাহকৃত পানির মান নিশ্চিতে পলি অ্যালুমিনিয়াম ক্লোরাইড (পিএসি), অ্যালাম সালফেট ও ক্লোরিনেশন পদ্ধতি ব্যবহার করে ওয়াসা। শোধিত পানি সরবরাহের আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশিকা অনুযায়ী ওয়াসার ল্যাবে গুণগত মান পরীক্ষা করা হয়।

তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০টি নমুনা সংগ্রহ করা হলেও তা কি যথেষ্ট? প্রশ্ন রয়েছে অভিজাত এলাকা ও নিম্নআয়ের বসতিগুলোতে পানির মানের তারতম্য নিয়েও।

রাজধানী ঢাকা এখন জলসংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। প্রতিদিন ২৫ কোটি লিটার ঘাটতি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি নগরীর ভবিষ্যতের জন্য এক মারাত্মক হুমকি।

মূলত, ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় এখনও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে বছরে প্রায় ২-৩ মিটার করে নিচে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। তাছাড়া পদ্মা ও বুড়িগঙ্গার পানি ব্যবহারে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ৪-৫ লাখ মানুষ বাড়ছে ঢাকায়, সেই সঙ্গে বাড়ছে পানির চাহিদাও। এর ওপর বাড়তি আবাসন ও শিল্প কারখানায় পানির ব্যবহারও বাড়ছে বহুগুণে।

পানির ঘাটতির বড় প্রভাব পড়বে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর। তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বস্তি ও ঘিঞ্জি এলাকায় সংকট আরও তীব্র হবে। পাশাপাশি, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। আর দীর্ঘমেয়াদে নগরীর জলাবদ্ধতা ও নিষ্কাশন ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়বে। শুধু তাই নয়, পানি সংকটে বাড়বে স্বাস্থ্যঝুঁকি।অপরিশোধিত পানি ব্যবহার করে ডায়রিয়া, টাইফয়েডের মতো রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা বাড়বে।

এসব সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পদ্মা থেকে পানি এনে শোধনাগার স্থাপন ও সম্প্রসারণ জরুরি। নতুন ভবনে রেইনওয়াটার হারভেস্টিং বাধ্যতামূলক করতে হবে। ডিপ টিউবওয়েল বসাতে কঠোর অনুমতির প্রয়োজন। শিল্পকারখানায় ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করে পানি পুনঃব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। জনগণকে পানি অপচয় রোধে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। 

জাতীয় সংসদে মন্ত্রী যে তথ্য তুলে ধরেছেন, তা নগরীর জন্য এক রেড সিগন্যাল। অথচ, সমাধানের পরিকল্পনা কতদূর এগিয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পানির অভাবে ঢাকার প্রতিটি ঘরে ঘরে দুর্ভোগ নামার আগেই কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ নিতে হবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত