মানবজীবনের ক্যানভাসে সম্পর্কের রঙগুলো নানাভাবে বিন্যস্ত। কোনো সম্পর্ক স্নেহের, কোনোটি সখ্যের, কোনোটি আবার মায়ায় জড়ানো। তবে এই সমস্ত অনুভূতির ঊর্ধ্বে যে মানুষটি এক বিশাল আকাশ হয়ে আমাদের অস্তিত্বকে আগলে রাখেন, তিনি হলেন বাবা। ‘বাবা’ শব্দটির গভীরতা পরিমাপ করা কোনো দাঁড়িপাল্লার পক্ষে সম্ভব নয়। এটি কেবল একটি সম্পর্ক বা ডাক নয়; বরং এটি এক পরম নিশ্চিন্ততার আশ্রয়, যেন এক অলিখিত সুরক্ষাকবচ।
মা যদি হন সন্তানের জীবনের প্রথম সুর ও মমতা, তবে বাবা হলেন সেই সুরের পেছনের গুরুগম্ভীর তান, যা পুরো জীবনটাকে একটি সুশৃঙ্খল ছন্দে বেঁধে রাখে। একজন বাবার জীবন মূলত এক নিঃশব্দ ত্যাগের মহাকাব্য। সমাজের চাকা সচল রাখতে এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে তিনি প্রতিদিন যে সংগ্রাম করেন, তার সিংহভাগই অলক্ষিত থেকে যায়। বাবার ভালোবাসা প্রকাশ পায় তার রুক্ষ হাতের তালুতে, কপালে জমে থাকা ঘামের বিন্দুতে এবং সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে অক্লান্ত পথচলায়।
ˆশশবের অবুঝ দিনগুলো থেকে শুরু করে যৌবনের জটিল মোড় পর্যন্ত বাবা হলেন জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শিক্ষক। বাবার আঙুল ধরে প্রথম হাঁটতে শেখা কেবল শারীরিক ভারসাম্য রক্ষা করা নয়, বরং জীবনের পথে পা বাড়ানোর প্রথম আত্মবিশ্বাস। যখন সন্তান পড়ে যেতে নেয়, তখন যে শক্ত হাতটি তাকে টেনে তোলে, সেটিই তাকে শেখায়—পড়ে যাওয়া মানেই শেষ নয়; বরং নতুন শক্তিতে আবার উঠে দাঁড়াতে হবে।
মা যেখানে সন্তানকে পৃথিবীর সমস্ত নির্মমতা থেকে আড়াল করে রাখতে চান, বাবা সেখানে সন্তানকে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে শেখান। তিনি শেখান কীভাবে ঝড়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়। তিনি মুখে হয়তো বড় বড় তত্ত্বকথা বলেন না, কিন্তু তার জীবনযাপনই হয়ে ওঠে সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় অনুকরণীয় আদর্শ।
সংসারে অভাব-অনটন যতই থাকুক না কেন, সন্তানের ছোট ছোট আবদারগুলো পূরণ করতে বাবা নিজের ইচ্ছাগুলোকে নির্দ্বিধায় বিসর্জন দেন। নিজের জীর্ণ জুতোজোড়া তালি দিয়ে হলেও সন্তানের পায়ে নতুন জুতো পরিয়ে দেয়ার মাঝে তিনি যে স্বর্গীয় আনন্দ পান, তা কেবল একজন বাবার পক্ষেই সম্ভব। এই সুরক্ষার প্রাচীরটি যখন মাথার ওপর থাকে, তখন মানুষ যেকোনো যুদ্ধে জয়ী হওয়ার সাহস পায়।
বাবার ভালোবাসা সবসময় এক রহস্যময় চাদরে ঢাকা থাকে। তিনি হয়তো প্রতিদিন জড়িয়ে ধরে ‘ভালোবাসি’ বলেন না; বরং অবাধ্যতার জন্য মাঝেমধ্যে শাসন করেন। কিন্তু সেই শাসনের আড়ালে যে কত বড় উদ্বেগের নদী বয়ে চলে, তা কেবল একজন বাবাই জানেন। সন্তান যখন দেরিতে বাড়ি ফেরে, তখন বাইরে রাগী মুখে পায়চারি করা মানুষটির ভেতরে যে তীব্র উৎকণ্ঠা কাজ করে, সেটিই হলো বাবার ভালোবাসা।
সন্তানের সামান্য সাফল্যে যে মানুষটির বুক গর্বে ভরে ওঠে, অথচ লোকসমক্ষে যিনি কেবল এক চিলতে মৃদু হাসি দিয়ে নিজের আবেগ লুকিয়ে রাখেন, তিনিই বাবা। মায়ের অশ্রু জল হয়ে ঝরে পড়ে, কিন্তু বাবার অশ্রু বুকের ভেতরে জমাট বেঁধে পাথর হয়ে যায়, যা কেউ কোনোদিন দেখতে পায় না। এই নীরব ভালোবাসার ভাষা বুঝতে পারাটাই সন্তানের জীবনের অন্যতম বড় সার্থকতা।
সময়ের নিষ্ঠুর নিয়মে যে বাবা একদিন ছিলেন পরিবারের একমাত্র চালিকাশক্তি, যার বলিষ্ঠ পদচারণায় মুখরিত থাকত চারপাশ, তিনিও একসময় বার্ধক্যে উপনীত হন। তার টানটান চামড়া কুঁচকে যায়, চোখের দৃষ্টি ধোঁয়াটে হয়ে আসে এবং একসময়ের শক্ত হাত দুটি কাঁপতে শুরু করে। এই সময়টা একজন বাবার জন্য বড় বিষণ্নতার। ˆশশবে তিনি যেভাবে সন্তানকে আগলে রেখেছিলেন, বার্ধক্যে এসে তিনিও ঠিক তেমনই একটুখানি সময়, একটুখানি মনোযোগ ও স্নেহের কাঙাল হয়ে পড়েন।
তখন সন্তানের দায়িত্ব হয়ে ওঠে সেই ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করার, যদিও বাবার ঋত কখনো পুরোপুরি শোধ করা সম্ভব নয়। তার জীর্ণ হাতটি ধরে তাকে আশ্বস্ত করা— ‘বাবা, আমি আছি’—এটাই হতে পারে তার জীবনের শেষ বয়সের সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।
আজকের এই যান্ত্রিক ও ব্যস্ত জীবনে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রতিটি সন্তানের উচিত বাবার নিঃশব্দ অবদানকে শ্রদ্ধা জানানো। যতদিন বাবা বেঁচে আছেন, তার চরণে যেন থাকে পরম শ্রদ্ধা; আর তিনি যদি ওপারে চলে গিয়ে থাকেন, তবে তার স্মৃতি যেন হয় আমাদের সৎ পথে চলার পাথেয়।
স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ উপহারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বাবা। তার ছায়াতলে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তই জীবনের পরম প্রাপ্তি। বাবা কেবল একজন মানুষ নন; তিনি সন্তানের জীবনের প্রথম নায়ক, প্রথম শিক্ষক এবং এক বিশাল বটবৃক্ষ, যার ছায়া জীবনভর আমাদের আগলে রাখে।
[লেখক: শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

রোববার, ২১ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুন ২০২৬
মানবজীবনের ক্যানভাসে সম্পর্কের রঙগুলো নানাভাবে বিন্যস্ত। কোনো সম্পর্ক স্নেহের, কোনোটি সখ্যের, কোনোটি আবার মায়ায় জড়ানো। তবে এই সমস্ত অনুভূতির ঊর্ধ্বে যে মানুষটি এক বিশাল আকাশ হয়ে আমাদের অস্তিত্বকে আগলে রাখেন, তিনি হলেন বাবা। ‘বাবা’ শব্দটির গভীরতা পরিমাপ করা কোনো দাঁড়িপাল্লার পক্ষে সম্ভব নয়। এটি কেবল একটি সম্পর্ক বা ডাক নয়; বরং এটি এক পরম নিশ্চিন্ততার আশ্রয়, যেন এক অলিখিত সুরক্ষাকবচ।
মা যদি হন সন্তানের জীবনের প্রথম সুর ও মমতা, তবে বাবা হলেন সেই সুরের পেছনের গুরুগম্ভীর তান, যা পুরো জীবনটাকে একটি সুশৃঙ্খল ছন্দে বেঁধে রাখে। একজন বাবার জীবন মূলত এক নিঃশব্দ ত্যাগের মহাকাব্য। সমাজের চাকা সচল রাখতে এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে তিনি প্রতিদিন যে সংগ্রাম করেন, তার সিংহভাগই অলক্ষিত থেকে যায়। বাবার ভালোবাসা প্রকাশ পায় তার রুক্ষ হাতের তালুতে, কপালে জমে থাকা ঘামের বিন্দুতে এবং সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে অক্লান্ত পথচলায়।
ˆশশবের অবুঝ দিনগুলো থেকে শুরু করে যৌবনের জটিল মোড় পর্যন্ত বাবা হলেন জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শিক্ষক। বাবার আঙুল ধরে প্রথম হাঁটতে শেখা কেবল শারীরিক ভারসাম্য রক্ষা করা নয়, বরং জীবনের পথে পা বাড়ানোর প্রথম আত্মবিশ্বাস। যখন সন্তান পড়ে যেতে নেয়, তখন যে শক্ত হাতটি তাকে টেনে তোলে, সেটিই তাকে শেখায়—পড়ে যাওয়া মানেই শেষ নয়; বরং নতুন শক্তিতে আবার উঠে দাঁড়াতে হবে।
মা যেখানে সন্তানকে পৃথিবীর সমস্ত নির্মমতা থেকে আড়াল করে রাখতে চান, বাবা সেখানে সন্তানকে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে শেখান। তিনি শেখান কীভাবে ঝড়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়। তিনি মুখে হয়তো বড় বড় তত্ত্বকথা বলেন না, কিন্তু তার জীবনযাপনই হয়ে ওঠে সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় অনুকরণীয় আদর্শ।
সংসারে অভাব-অনটন যতই থাকুক না কেন, সন্তানের ছোট ছোট আবদারগুলো পূরণ করতে বাবা নিজের ইচ্ছাগুলোকে নির্দ্বিধায় বিসর্জন দেন। নিজের জীর্ণ জুতোজোড়া তালি দিয়ে হলেও সন্তানের পায়ে নতুন জুতো পরিয়ে দেয়ার মাঝে তিনি যে স্বর্গীয় আনন্দ পান, তা কেবল একজন বাবার পক্ষেই সম্ভব। এই সুরক্ষার প্রাচীরটি যখন মাথার ওপর থাকে, তখন মানুষ যেকোনো যুদ্ধে জয়ী হওয়ার সাহস পায়।
বাবার ভালোবাসা সবসময় এক রহস্যময় চাদরে ঢাকা থাকে। তিনি হয়তো প্রতিদিন জড়িয়ে ধরে ‘ভালোবাসি’ বলেন না; বরং অবাধ্যতার জন্য মাঝেমধ্যে শাসন করেন। কিন্তু সেই শাসনের আড়ালে যে কত বড় উদ্বেগের নদী বয়ে চলে, তা কেবল একজন বাবাই জানেন। সন্তান যখন দেরিতে বাড়ি ফেরে, তখন বাইরে রাগী মুখে পায়চারি করা মানুষটির ভেতরে যে তীব্র উৎকণ্ঠা কাজ করে, সেটিই হলো বাবার ভালোবাসা।
সন্তানের সামান্য সাফল্যে যে মানুষটির বুক গর্বে ভরে ওঠে, অথচ লোকসমক্ষে যিনি কেবল এক চিলতে মৃদু হাসি দিয়ে নিজের আবেগ লুকিয়ে রাখেন, তিনিই বাবা। মায়ের অশ্রু জল হয়ে ঝরে পড়ে, কিন্তু বাবার অশ্রু বুকের ভেতরে জমাট বেঁধে পাথর হয়ে যায়, যা কেউ কোনোদিন দেখতে পায় না। এই নীরব ভালোবাসার ভাষা বুঝতে পারাটাই সন্তানের জীবনের অন্যতম বড় সার্থকতা।
সময়ের নিষ্ঠুর নিয়মে যে বাবা একদিন ছিলেন পরিবারের একমাত্র চালিকাশক্তি, যার বলিষ্ঠ পদচারণায় মুখরিত থাকত চারপাশ, তিনিও একসময় বার্ধক্যে উপনীত হন। তার টানটান চামড়া কুঁচকে যায়, চোখের দৃষ্টি ধোঁয়াটে হয়ে আসে এবং একসময়ের শক্ত হাত দুটি কাঁপতে শুরু করে। এই সময়টা একজন বাবার জন্য বড় বিষণ্নতার। ˆশশবে তিনি যেভাবে সন্তানকে আগলে রেখেছিলেন, বার্ধক্যে এসে তিনিও ঠিক তেমনই একটুখানি সময়, একটুখানি মনোযোগ ও স্নেহের কাঙাল হয়ে পড়েন।
তখন সন্তানের দায়িত্ব হয়ে ওঠে সেই ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করার, যদিও বাবার ঋত কখনো পুরোপুরি শোধ করা সম্ভব নয়। তার জীর্ণ হাতটি ধরে তাকে আশ্বস্ত করা— ‘বাবা, আমি আছি’—এটাই হতে পারে তার জীবনের শেষ বয়সের সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।
আজকের এই যান্ত্রিক ও ব্যস্ত জীবনে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রতিটি সন্তানের উচিত বাবার নিঃশব্দ অবদানকে শ্রদ্ধা জানানো। যতদিন বাবা বেঁচে আছেন, তার চরণে যেন থাকে পরম শ্রদ্ধা; আর তিনি যদি ওপারে চলে গিয়ে থাকেন, তবে তার স্মৃতি যেন হয় আমাদের সৎ পথে চলার পাথেয়।
স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ উপহারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বাবা। তার ছায়াতলে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তই জীবনের পরম প্রাপ্তি। বাবা কেবল একজন মানুষ নন; তিনি সন্তানের জীবনের প্রথম নায়ক, প্রথম শিক্ষক এবং এক বিশাল বটবৃক্ষ, যার ছায়া জীবনভর আমাদের আগলে রাখে।
[লেখক: শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

আপনার মতামত লিখুন