সংবাদ

বাজেট ও স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন


নাজমুল হুদা খান
নাজমুল হুদা খান
প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম

বাজেট ও স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় বাজেট কোনো দেশের শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন-দর্শন, অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার প্রতিচ্ছবি| বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট-২০২৬ সে অর্থে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক| বিশেষ করে স্বাস্থ্যখাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং জিডিপির ১ দশমিক ০২ শতাংশ ব্যয় নির্ধারণ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে| বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করলেও বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম এ খাতে জিডিপির ১ শতাংশের বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে| একই সঙ্গে জাতীয় বাজেটের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দও একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি| সরকার এবারের বাজেটে জাতীয় উন্নয়নের জন্য দশটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে| গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দশটি লক্ষ্যই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে স্বাস্থ্যখাতের সঙ্গে সম্পর্কিত| কারণ একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই হতে পারে না| 

এবারের জাতীয় বাজেটের প্রথম লক্ষ্য হলো ˆবষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা| অর্থনৈতিক ˆবষম্য কমাতে হলে স্বাস্থ্যসেবার ˆবষম্য দূর করা অপরিহার্য| দরিদ্র, নারী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সম্ভব নয়| এ লক্ষ্যে ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হৃদরোগের স্টেন্ট এবং চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের ওপর কর ও ভ্যাট ছাড় দেয়ার উদ্যোগ চিকিৎসা ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে| 

দ্বিতীয় লক্ষ্য গুণগত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা| শিক্ষা ও স্বাস্থ্য একে অপরের পরিপূরক| অসুস্থ, অপুষ্ট বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শিক্ষার্থী কখনোই তার পূর্ণ সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারে না| তাই প্রতিটি ইউনিয়ন ও নগর ওয়ার্ডে আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন, ই-হেলথ কার্ড চালু এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার সম্প্রসারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক বিনিয়োগ| একই সঙ্গে আধুনিক এমবিবিএস কারিকুলাম চালুর উদ্যোগ দেশের চিকিৎসা শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সহায়ক হবে| 

তৃতীয় লক্ষ্য সার্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা| বাংলাদেশে প্রতিবছর বহু পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে| স্বাস্থ্যবিমা, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সহায়তা সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা আর্থিক দুর্ভোগ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে| একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের অন্যতম ˆবশিষ্ট্য হলো অসুস্থতার কারণে কোনো নাগরিক যেন দারিদ্র্েযর কষাঘাতে না ভোগে| 

চতুর্থ লক্ষ্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রবৃদ্ধি| স্বাস্থ্যখাত নিজেই একটি বৃহৎ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র| পাঁচ হাজার চিকিৎসক এবং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা শুধু স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে না, একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে| চিকিৎসা যন্ত্রপাতি এবং ওষুধশিল্পে কাঁচামাল আমদানির সুবিধা স্থানীয় শিল্পের বিকাশকে ত্বরান্বিত করবে এবং স্বাস্থ্যখাতকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত করবে| 

পঞ্চম লক্ষ্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি| সুস্থ শ্রমশক্তি ছাড়া উৎপাদনশীল অর্থনীতি কল্পনা করা যায় না| শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, কর্মঘণ্টা অপচয় কমে এবং শিল্পখাত আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে| উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়| 

ষষ্ঠ লক্ষ্য আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা| স্বাস্থ্যখাতে ব্যক্তিগত ব্যয় বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ| শক্তিশালী সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যবিমা চালু হলে মানুষের সঞ্চয় রক্ষা পাবে, ঋণগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কমবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে| 

সপ্তম লক্ষ্য জ্বালানি নিরাপত্তা| আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর| আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, ল্যাবরেটরি, অক্সিজেন প্ল্যান্ট, ডিজিটাল রেকর্ড এবং টেলিমেডিসিন—সবকিছুই বিদ্যুৎনির্ভর| তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা| 

অষ্টম লক্ষ্য ডিজিটাল রূপান্তর ও তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়ন| ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, টেলিমেডিসিন, ইলেকট্রনিক হেলথকার্ড এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোগ নির্ণয় ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ| তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করে তুলতে পারে| 

নবম লক্ষ্য জীবন, প্রকৃতি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা| নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত| ডেঙ্গু, তাপপ্রবাহ, বন্যা এবং পানিবাহিত রোগের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত উন্নয়ন নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| 

দশম ও শেষ লক্ষ্য স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা| স্বাস্থ্যখাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা ছাড়া জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবে না| মেধাভিত্তিক নিয়োগ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন সম্ভব| একটি জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করে এবং রাষ্ট্রীয় সেবার কার্যকারিতা নিশ্চিত করে| 

স্বাস্থ্য জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু| মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং পরিবেশ সুরক্ষা—সবকিছুর ভিত্তি একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী| তাই স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে নয়, বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদি মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত| জাতীয় বাজেট ২০২৬ সে উপলব্ধিরই প্রতিফলন| এখন প্রয়োজন ঘোষিত পরিকল্পনাগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন, সুশাসন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা| কারণ বাজেটের প্রকৃত সাফল্য কাগজে নয়, মানুষের জীবনে তার ইতিবাচক প্রভাবের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়| একটি সুস্থ, সক্ষম ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের পথে এ বাজেট আশার নতুন আলো জ্বালাবে এটাই প্রত্যাশা| 

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ২১ জুন ২০২৬


বাজেট ও স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন

প্রকাশের তারিখ : ২১ জুন ২০২৬

featured Image

জাতীয় বাজেট কোনো দেশের শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন-দর্শন, অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার প্রতিচ্ছবি| বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট-২০২৬ সে অর্থে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক| বিশেষ করে স্বাস্থ্যখাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং জিডিপির ১ দশমিক ০২ শতাংশ ব্যয় নির্ধারণ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে| বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করলেও বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম এ খাতে জিডিপির ১ শতাংশের বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে| একই সঙ্গে জাতীয় বাজেটের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দও একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি| সরকার এবারের বাজেটে জাতীয় উন্নয়নের জন্য দশটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে| গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দশটি লক্ষ্যই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে স্বাস্থ্যখাতের সঙ্গে সম্পর্কিত| কারণ একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই হতে পারে না| 

এবারের জাতীয় বাজেটের প্রথম লক্ষ্য হলো ˆবষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা| অর্থনৈতিক ˆবষম্য কমাতে হলে স্বাস্থ্যসেবার ˆবষম্য দূর করা অপরিহার্য| দরিদ্র, নারী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সম্ভব নয়| এ লক্ষ্যে ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হৃদরোগের স্টেন্ট এবং চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের ওপর কর ও ভ্যাট ছাড় দেয়ার উদ্যোগ চিকিৎসা ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে| 

দ্বিতীয় লক্ষ্য গুণগত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা| শিক্ষা ও স্বাস্থ্য একে অপরের পরিপূরক| অসুস্থ, অপুষ্ট বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শিক্ষার্থী কখনোই তার পূর্ণ সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারে না| তাই প্রতিটি ইউনিয়ন ও নগর ওয়ার্ডে আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন, ই-হেলথ কার্ড চালু এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার সম্প্রসারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক বিনিয়োগ| একই সঙ্গে আধুনিক এমবিবিএস কারিকুলাম চালুর উদ্যোগ দেশের চিকিৎসা শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সহায়ক হবে| 

তৃতীয় লক্ষ্য সার্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা| বাংলাদেশে প্রতিবছর বহু পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে| স্বাস্থ্যবিমা, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সহায়তা সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা আর্থিক দুর্ভোগ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে| একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের অন্যতম ˆবশিষ্ট্য হলো অসুস্থতার কারণে কোনো নাগরিক যেন দারিদ্র্েযর কষাঘাতে না ভোগে| 

চতুর্থ লক্ষ্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রবৃদ্ধি| স্বাস্থ্যখাত নিজেই একটি বৃহৎ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র| পাঁচ হাজার চিকিৎসক এবং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা শুধু স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে না, একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে| চিকিৎসা যন্ত্রপাতি এবং ওষুধশিল্পে কাঁচামাল আমদানির সুবিধা স্থানীয় শিল্পের বিকাশকে ত্বরান্বিত করবে এবং স্বাস্থ্যখাতকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত করবে| 

পঞ্চম লক্ষ্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি| সুস্থ শ্রমশক্তি ছাড়া উৎপাদনশীল অর্থনীতি কল্পনা করা যায় না| শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, কর্মঘণ্টা অপচয় কমে এবং শিল্পখাত আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে| উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়| 

ষষ্ঠ লক্ষ্য আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা| স্বাস্থ্যখাতে ব্যক্তিগত ব্যয় বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ| শক্তিশালী সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যবিমা চালু হলে মানুষের সঞ্চয় রক্ষা পাবে, ঋণগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কমবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে| 

সপ্তম লক্ষ্য জ্বালানি নিরাপত্তা| আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর| আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, ল্যাবরেটরি, অক্সিজেন প্ল্যান্ট, ডিজিটাল রেকর্ড এবং টেলিমেডিসিন—সবকিছুই বিদ্যুৎনির্ভর| তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা| 

অষ্টম লক্ষ্য ডিজিটাল রূপান্তর ও তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়ন| ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, টেলিমেডিসিন, ইলেকট্রনিক হেলথকার্ড এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোগ নির্ণয় ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ| তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করে তুলতে পারে| 

নবম লক্ষ্য জীবন, প্রকৃতি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা| নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত| ডেঙ্গু, তাপপ্রবাহ, বন্যা এবং পানিবাহিত রোগের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত উন্নয়ন নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| 

দশম ও শেষ লক্ষ্য স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা| স্বাস্থ্যখাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা ছাড়া জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবে না| মেধাভিত্তিক নিয়োগ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন সম্ভব| একটি জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করে এবং রাষ্ট্রীয় সেবার কার্যকারিতা নিশ্চিত করে| 

স্বাস্থ্য জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু| মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং পরিবেশ সুরক্ষা—সবকিছুর ভিত্তি একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী| তাই স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে নয়, বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদি মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত| জাতীয় বাজেট ২০২৬ সে উপলব্ধিরই প্রতিফলন| এখন প্রয়োজন ঘোষিত পরিকল্পনাগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন, সুশাসন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা| কারণ বাজেটের প্রকৃত সাফল্য কাগজে নয়, মানুষের জীবনে তার ইতিবাচক প্রভাবের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়| একটি সুস্থ, সক্ষম ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের পথে এ বাজেট আশার নতুন আলো জ্বালাবে এটাই প্রত্যাশা| 

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত