ঢাকা এবং দেশের প্রায় প্রতিটি অলিতে-গলিতে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। শহর থেকে গ্রাম, যাতায়াতের গতি বাড়াতে এবং কম খরচে গন্তব্যে পৌঁছাতে এর জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু যে বাহনটিকে আমরা আমাদের যাতায়াতের সহজ সমাধান ভাবছি, তা আসলে আমাদের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক চলন্ত টাইমবোমায় পরিণত হয়েছে? তথ্য ও গবেষণার আলোকে খতিয়ে দেখা যাক এই অটোরিকশার লাভ-ক্ষতির খতিয়ান। আজ থেকে ঠিক ১৬ বছর আগে, ২০১০ সালের দিকে, দেশের উত্তরাঞ্চলের গ্রিনসিটি খ্যাত রাজশাহী শহর থেকে তৎকালীন মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের হাত ধরে এই পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী বাহনটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্যাডেলচালিত রিকশার শারীরিক পরিশ্রম লাঘব করতে সাধারণ রিকশায় ব্যাটারি ও মোটর যুক্ত করে এই অটোরিকশার উদ্ভাবন করা হয়। সময়ের পরিক্রমায় ২০২৬ সালে এসে এটি আর কেবল রাজশাহীতে সীমাবদ্ধ নেই। এক সমিকরনে দেখা গেছে, বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৫০ থেকে ৮০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে। প্রথমে দেখা যাক এর ইতিবাচক বা লাভের দিকটি। পরিবহন উপখাতে যে মোট মূল্য সংযোজন হয়, তার প্রায় ৫০ শতাংশই আসে এই খাত থেকে। গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, বাংলাদেশে শুধু থ্রি-হুইলার এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা শিল্পকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ২৪,০০০ কোটি টাকার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। সবচেয়ে বড় কথা, এটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের প্রায় ৪ থেকে ৪.৫ কোটি মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করছে। কিন্তু এই বিশাল অর্থনৈতিক অবদানের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার অধ্যায়। সাধারণ রিকশার মূল নকশা তৈরি হয়েছিল ঘণ্টায় মাত্র ৮-১০ কিলোমিটার গতিতে চলার জন্য। কিন্তু কোনো প্রকার কাঠামোগত পরিবর্তন বা ব্রেক উন্নত না করেই স্থানীয় গ্যারেজগুলোতে শক্তিশালী মোটর বসিয়ে এগুলোকে ঘণ্টায় ২৫-৩০ কিলোমিটার গতিসম্পন্ন করা হয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ ও যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে, দেশের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রায় ২০ থেকে ২১ শতাংশই ঘটছে এই অনিয়ন্ত্রিত বাহনগুলোর কারণে। এখানেই শেষ নয়, প্রতিদিন এই লাখ লাখ রিকশা চার্জ করার জন্য জাতীয় গ্রিডের প্রায় ৩,৫০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়, যা দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ। অভিযোগ রয়েছে, এই বিদ্যুতের একটি বিশাল অংশ গ্যারেজ মালিকরা অবৈধ লাইনের মাধ্যমে যোগান দেয়। এর ফলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষকে লোডশেডিং পোহাতে হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার প্রতি বছর প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে আমাদের শিশুরা । এই রিকশাগুলোতে ব্যবহৃত সস্তা ও মানহীন লেড-এসিড ব্যাটারিগুলো হাজারেরও বেশি অপরিকল্পিত ও উন্মুক্ত স্থানে গলানো হয়। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এর ফলে বিষাক্ত সিসা মাটি, পানি ও বাতাসে মিশে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় উঠে এসেছে ভয়ংকর তথ্য , বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ শিশুর রক্তে উচ্চমাত্রার সিসার উপস্থিতি রয়েছে। এই বিষক্রিয়ার ফলে দেশের শিশুদের সামগ্রিকভাবে প্রায় ২ কোটি আইকিউ (IQ) পয়েন্ট নষ্ট হচ্ছে। শিশুরা অল্পতেই খিটখিটে হয়ে পড়ছে, তাদের বুদ্ধিমত্তা কমে যাচ্ছে এবং মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি হচ্ছে। সিসা দূষণের এই বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষতির কারণে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ২৮.৬৩ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের জিডিপি হারাচ্ছে। অর্থাৎ, রিকশা যে পরিমাণ অর্থ অর্থনীতিতে যোগ করছে, সিসা দূষণ ও মেধা ধ্বংসের কারণে দেশ তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি স্থায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। সব মিলিয়ে লাভ ও ক্ষতির খতিয়ান হিসাব করলে দেখা যায়, বর্তমান অবস্থায় লাভের চেয়ে ক্ষতির পাল্লাই অনেক বেশি ভারী। জীবনের মূল্য, বিদ্যুৎ চুরি এবং ৩.৫ কোটি শিশুর মেধা নষ্টের মতো ক্ষতিকে একসাথে যোগ করলে সাধারণ এই রিক্সা দেশের জন্য এক চরম বিপর্যয় ডেকে আনছে। কিন্তু লাখ লাখ মানুষের রুটি-রুজি জড়িয়ে থাকায় একে সরাসরি নিষিদ্ধ করাও সম্ভব নয়। তাই সমাধান লুকিয়ে আছে নিয়ন্ত্রণে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতিমালা তৈরি করে এদের আইনি কাঠামোর অধীনে আনা, সস্তা লেড-এসিডের বদলে পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং বুয়েটের ডিজাইন করা নিরাপদ রিকশা মডেল ও নির্দিষ্ট জোনভিত্তিক কিউআর কোড নিবন্ধন চালু করা এখন সময়ের দাবি। তবেই জীবিকাও বাঁচবে, বাঁচবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।