যন্তরমন্তরের ছাত্র-যুব আন্দোলন আপাতত স্তিমিত। ফলে রাজধানীর রাস্তায় সাময়িক স্বস্তি ফিরেছে কেন্দ্রীয় সরকারের। কিন্তু সেই স্বস্তি সংসদে মিলবে না বলেই স্পষ্ট রাজনৈতিক মহলের কাছে। সোমবার (২৭ জুলাই) থেকে শুরু হওয়া অধিবেশনে সরকার যেমন প্রশ্নফাঁস রুখতে কঠোর সংশোধনী বিল দ্রুত পাশ করাতে চাইছে, তেমনই বিরোধীরা মোদি সরকারকে কোণঠাসা করতে বেছে নিয়েছে ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা, পেলেট গান বিতর্ক এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের জবাবদিহির প্রশ্নকে। ফলে সংসদের ভেতর ও বাইরে নতুন রাজনৈতিক সংঘর্ষের আবহ তৈরি হয়েছে।
সরকার সোমবার লোকসভায় ‘দ্য পাবলিক এগজামিনেশনস (প্রিভেনশন অব আনফেয়ার মিনস) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’ পেশ করছে। ২০২৪ সালের আইনে সংশোধন এনে প্রশ্নফাঁস, সংগঠিত পরীক্ষা জালিয়াতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তি এবং দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করাই এই সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য। সরকার চাইছে বিলটি এদিনই লোকসভায় পাশ করাতে। তবে বিরোধীরা শুরু থেকেই এই বিলকে কেন্দ্র করে আলোচনার পাশাপাশি ছাত্র আন্দোলনে পুলিশি পদক্ষেপের প্রশ্নও তুলতে প্রস্তুত। ফলে বিল পেশের সঙ্গে সঙ্গেই অধিবেশন উত্তপ্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কা প্রবল।
সংসদ শুরুর আগেই রাজনৈতিক লড়াইয়ের মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে চিঠি লিখে ২০ জুলাই যন্তরমন্তরে ছাত্র-যুবদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন। রাহুলের অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের উপর শুধু লাঠিচার্জই নয়, পেলেট গান এবং কাঁদানে গ্যাসও ব্যবহার করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (র্যাফ) এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও আহত ছাত্র শাহিল লোচাবের চিকিৎসার নথি এবং তার শরীরে থাকা আঘাতের চিহ্ন সামনে এনে কংগ্রেস দাবি করছে, সরকার সত্য গোপন করছে।
চিঠিতে রাহুল দুটি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন। প্রথমত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ছাত্রদের বিরুদ্ধে পেলেট গান-সহ প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের অনুমতি কি অমিত শাহ নিজে দিয়েছিলেন? যদি না দিয়ে থাকেন, তবে সেই নির্দেশ কে দিয়েছিল? দ্বিতীয়ত, সাদা পোশাকে যাঁদের আন্দোলনকারীদের উপর নির্মমভাবে লাঠিচার্জ করতে দেখা গিয়েছে, তারা কারা? তারা কি পুলিশকর্মী, নাকি অন্য কোনও বাহিনীর সদস্য? তাদের মোতায়েনের অনুমোদনই বা কে দিয়েছে? রাহুলের অভিযোগ, গণতন্ত্রে আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা সরকারের দায়িত্ব। তার পরিবর্তে ছাত্র-যুবদের উপর বলপ্রয়োগ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। তার আরও অভিযোগ, ছাত্রীদের উপরও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ হয়েছে এবং শরীরের সংবেদনশীল অংশ লক্ষ্য করে আঘাত করা হয়েছে। সংসদে এই সমস্ত অভিযোগের জবাব চাওয়া হবে বলে কংগ্রেস ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে।
এদিকে সরকারি মহলেও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে নিরাপত্তা সূত্রের দাবি। জানা গিয়েছে, সিআরপিএফের একটি অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা বৈঠকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পেলেট গান ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সূত্রের দাবি, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ ধরনের পরিস্থিতিতে পেলেট গান ব্যবহার না করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে র্যাফ কেন আরও ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারল না, তা নিয়েও সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। দিল্লি পুলিশ ও র্যাফের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির বিষয়টিও ওই বৈঠকে উঠে এসেছে বলে জানা গিয়েছে। তবে এই তথ্যগুলির কোনওটিই এখনও কেন্দ্রীয় সরকার বা সিআরপিএফ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
এই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই সামনে স্বাধীনতা দিবস। তাই রাজধানীতে নিরাপত্তা আরও জোরদার করছে কেন্দ্র। ইতিমধ্যেই দিল্লিতে ৪৫ কোম্পানি নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। তার সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আরও ১৬ কোম্পানি বাহিনী আনা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ১০ কোম্পানি সিআরপিএফ এবং ৬ কোম্পানি র্যাফ। উত্তরপ্রদেশের হিন্ডন বিমানবন্দরে পৌঁছনোর পর প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের দিল্লির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মোতায়েন করা হবে। সংসদ চত্বর, কেন্দ্রীয় সরকারি দপ্তর, কূটনৈতিক এলাকা এবং সম্ভাব্য বিক্ষোভস্থলগুলিতে নজরদারি আরও কড়া করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যন্তরমন্তরের আন্দোলন আপাতত থেমে গেলেও সংঘাতের কেন্দ্র এখন সংসদ। একদিকে সরকার প্রশ্নফাঁস রোধে কঠোর আইন এনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে, অন্যদিকে বিরোধীরা ছাত্র আন্দোলনে বলপ্রয়োগ, পুলিশের ভূমিকা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহিকে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করার কৌশল নিয়েছে। ফলে সোমবারের অধিবেশন শুধু একটি সংশোধনী বিলের ভবিষ্যৎ নয়, বরং মোদি সরকারের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অবস্থানকেও কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করাতে চলেছে।
/

সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুলাই ২০২৬
যন্তরমন্তরের ছাত্র-যুব আন্দোলন আপাতত স্তিমিত। ফলে রাজধানীর রাস্তায় সাময়িক স্বস্তি ফিরেছে কেন্দ্রীয় সরকারের। কিন্তু সেই স্বস্তি সংসদে মিলবে না বলেই স্পষ্ট রাজনৈতিক মহলের কাছে। সোমবার (২৭ জুলাই) থেকে শুরু হওয়া অধিবেশনে সরকার যেমন প্রশ্নফাঁস রুখতে কঠোর সংশোধনী বিল দ্রুত পাশ করাতে চাইছে, তেমনই বিরোধীরা মোদি সরকারকে কোণঠাসা করতে বেছে নিয়েছে ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা, পেলেট গান বিতর্ক এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের জবাবদিহির প্রশ্নকে। ফলে সংসদের ভেতর ও বাইরে নতুন রাজনৈতিক সংঘর্ষের আবহ তৈরি হয়েছে।
সরকার সোমবার লোকসভায় ‘দ্য পাবলিক এগজামিনেশনস (প্রিভেনশন অব আনফেয়ার মিনস) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’ পেশ করছে। ২০২৪ সালের আইনে সংশোধন এনে প্রশ্নফাঁস, সংগঠিত পরীক্ষা জালিয়াতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তি এবং দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করাই এই সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য। সরকার চাইছে বিলটি এদিনই লোকসভায় পাশ করাতে। তবে বিরোধীরা শুরু থেকেই এই বিলকে কেন্দ্র করে আলোচনার পাশাপাশি ছাত্র আন্দোলনে পুলিশি পদক্ষেপের প্রশ্নও তুলতে প্রস্তুত। ফলে বিল পেশের সঙ্গে সঙ্গেই অধিবেশন উত্তপ্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কা প্রবল।
সংসদ শুরুর আগেই রাজনৈতিক লড়াইয়ের মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে চিঠি লিখে ২০ জুলাই যন্তরমন্তরে ছাত্র-যুবদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন। রাহুলের অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের উপর শুধু লাঠিচার্জই নয়, পেলেট গান এবং কাঁদানে গ্যাসও ব্যবহার করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (র্যাফ) এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও আহত ছাত্র শাহিল লোচাবের চিকিৎসার নথি এবং তার শরীরে থাকা আঘাতের চিহ্ন সামনে এনে কংগ্রেস দাবি করছে, সরকার সত্য গোপন করছে।
চিঠিতে রাহুল দুটি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন। প্রথমত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ছাত্রদের বিরুদ্ধে পেলেট গান-সহ প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের অনুমতি কি অমিত শাহ নিজে দিয়েছিলেন? যদি না দিয়ে থাকেন, তবে সেই নির্দেশ কে দিয়েছিল? দ্বিতীয়ত, সাদা পোশাকে যাঁদের আন্দোলনকারীদের উপর নির্মমভাবে লাঠিচার্জ করতে দেখা গিয়েছে, তারা কারা? তারা কি পুলিশকর্মী, নাকি অন্য কোনও বাহিনীর সদস্য? তাদের মোতায়েনের অনুমোদনই বা কে দিয়েছে? রাহুলের অভিযোগ, গণতন্ত্রে আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা সরকারের দায়িত্ব। তার পরিবর্তে ছাত্র-যুবদের উপর বলপ্রয়োগ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। তার আরও অভিযোগ, ছাত্রীদের উপরও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ হয়েছে এবং শরীরের সংবেদনশীল অংশ লক্ষ্য করে আঘাত করা হয়েছে। সংসদে এই সমস্ত অভিযোগের জবাব চাওয়া হবে বলে কংগ্রেস ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে।
এদিকে সরকারি মহলেও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে নিরাপত্তা সূত্রের দাবি। জানা গিয়েছে, সিআরপিএফের একটি অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা বৈঠকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পেলেট গান ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সূত্রের দাবি, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ ধরনের পরিস্থিতিতে পেলেট গান ব্যবহার না করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে র্যাফ কেন আরও ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারল না, তা নিয়েও সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। দিল্লি পুলিশ ও র্যাফের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির বিষয়টিও ওই বৈঠকে উঠে এসেছে বলে জানা গিয়েছে। তবে এই তথ্যগুলির কোনওটিই এখনও কেন্দ্রীয় সরকার বা সিআরপিএফ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
এই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই সামনে স্বাধীনতা দিবস। তাই রাজধানীতে নিরাপত্তা আরও জোরদার করছে কেন্দ্র। ইতিমধ্যেই দিল্লিতে ৪৫ কোম্পানি নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। তার সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আরও ১৬ কোম্পানি বাহিনী আনা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ১০ কোম্পানি সিআরপিএফ এবং ৬ কোম্পানি র্যাফ। উত্তরপ্রদেশের হিন্ডন বিমানবন্দরে পৌঁছনোর পর প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের দিল্লির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মোতায়েন করা হবে। সংসদ চত্বর, কেন্দ্রীয় সরকারি দপ্তর, কূটনৈতিক এলাকা এবং সম্ভাব্য বিক্ষোভস্থলগুলিতে নজরদারি আরও কড়া করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যন্তরমন্তরের আন্দোলন আপাতত থেমে গেলেও সংঘাতের কেন্দ্র এখন সংসদ। একদিকে সরকার প্রশ্নফাঁস রোধে কঠোর আইন এনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে, অন্যদিকে বিরোধীরা ছাত্র আন্দোলনে বলপ্রয়োগ, পুলিশের ভূমিকা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহিকে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করার কৌশল নিয়েছে। ফলে সোমবারের অধিবেশন শুধু একটি সংশোধনী বিলের ভবিষ্যৎ নয়, বরং মোদি সরকারের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অবস্থানকেও কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করাতে চলেছে।
/

আপনার মতামত লিখুন