(পূর্ব প্রকাশের পর)
বারো
আনিস পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিউদ্দিন আহমেদের কাছ থেকে এতটা আন্তরিক ব্যবহার আশা করেনি। সে রুমে ঢুকতেই তিনি যেভাবে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বসতে বললেন...!
মহিউদ্দিন আহমেদ এখন মোবাইলে কারও সঙ্গে কুমিল্লায় পুলিশ কমিশনার অফিসে কথা বলছেন। আলাপটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কথাবার্তার ধরন দেখে এটুকু বোঝা যাচ্ছে, তিনি উপজেলার কোনো এক রাজনৈতিক নেতার বিষয়ে আলাপ করছেন। যদিও তিনি এপাশে হু-হা শব্দ করছেন বেশি।
আনিস চুপচাপ বসে কখনও মহিউদ্দিন আহমেদকে দেখছে, কখনও পুবের জানালা গলে বাইরে তাকাচ্ছে। মহিউদ্দিন আহমেদের রুমের জানালার একেবারে পাশ ঘেঁষে একটা বেলিফুলের গাছ। বেশ ঝোপ করে বেড়ে উঠেছে। গাছে বেশ বেলিফুল ফুটেছে। রুমে বসেই বেলিফুলের সুগন্ধ নাকে লাগছে। রুমে এসি আছে। কিন্তু এসিটা বন্ধ। মাথার ওপর একটা ফ্যান চলছে। ফ্যানটা মনে হয় নতুন লাগানো হয়েছে। একেবারে শব্দহীন। শুধু বাতাসের শব্দ আসছে- শোঁ শোঁ, শোঁ শোঁ।
মহিউদ্দিন আহমেদ কথা শেষ করে লাইন কেটে দিয়েই বললেন, ‘সরি, জরুরি ফোন ছিল।’
আনিস মৃদু হেসে সায় দিয়ে বলল, ‘জি, বুঝতে পেরেছি।’
‘তা, বলুন, আপনার জন্য কী করতে পারি?’
‘না, তেমন কিছু না। মনসুর আলী আমার পড়শি। তাকে দেখতে এলাম।’
‘আপনার সেই পড়শি গত দুইদিন ধরে খুব বিরক্ত করেছে। হাজতে ওর সাথে আরও দুইজন হাজতি ছিল। সেই দুইজনকে একটার পরে একটা ঘুষি মেরে এমন অবস্থা করেছে, একজনকে তো হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছে। অন্যজনকে গতকালেই কুমিল্লা জেলে পাঠিয়ে দিয়েছি।’
‘মনসুর আসলে পাগল টাইপের। মাথায় ছিট আছে।’
‘সে পাগল না, অসুর। শরীরে কী শক্তি! আমার তিনজন পুলিশ তাকে ধরে রাখতে পারেনি।’
আনিস বিনয়ের সঙ্গে বলল, ‘আমি খুব সরি।’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘না না, আপনি কেন সরি বলবেন? তবে আমরা মনসুর আলীকে এখানে রাখা সেইফ মনে করছি না। আমরা আগামীকালই কুমিল্লা পাঠিয়ে দিবো।’
আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘কোর্টে কবে তুলবেন?’
‘আগামীকালই হয়তো কোর্ট তুলব। লাশের ময়নাতদন্ত রিপোর্টের অপেক্ষায় আছি। আজ বিকেলের মধ্যে মনে হয় পেয়ে যাব।’
‘ওসি সাহেব, একটা কথা ছিল।’
‘কী কথা, বলুন?’
‘আমি মনসুর আলীকে ছোটবেলা থেকে জানি। একসঙ্গে বড় হয়েছি। আমার মনে হচ্ছে, কোথাও একটা ভুল হচ্ছে।’
‘কী ধরনের ভুল?’
‘মনসুর আলী কাউকে খুন করবে, এটা আমার বিশ্বাস হয় না। সে পাগলা টাইপের মানুষ, এটা সত্য। বছরের বেশিরভাগ সময় একটা দরগায় পড়ে থাকে। কিন্তু খুন! তাও আবার তার বউকে?
‘কিন্তু সে খুন করেছে, এটা সত্য।’
‘কীভাবে বুঝলেন?’
‘আপনাদের ছালেক মেম্বর বলেছে। মনসুর আলী তার বউকে আপনাদের গ্রামের কোড়ের পাড়ে চুবিয়ে মেরেছে।’
‘ওটা হয়তো ছালেক মেম্বরের মনগড়া কথা।
‘আচ্ছা, যে কথাই হোক, সেটা কোর্টে প্রমাণ হবে।
‘ওসি সাহেব, আমি জোর দিয়েই বলতে পারি, ঘটনাটা স্রেফ নৌকাডুবি ছিল।’
‘নৌকাডুবি শব্দটা সুন্দর বলেছেন। তবে আমি শুধু ছালেক মেম্বরের কথার ওপর নির্ভর করেই বলছি না। অটোপসি রিপোর্ট আসেনি, এটা ঠিক। কিন্তু ফোনে কুমিল্লা ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টে কথা হয়েছে। ওরা বলেছে, লাশের কাঁধে নখের ক্ষত আছে।’
‘ও, তাই!’ —বলেই আনিস চুপ হয়ে গেল। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিউদ্দিন আহমেদের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সে এক ঝলক বাইরে তাকাল। বাইরে রোদটা পড়ে এসেছে। মনে হচ্ছে সূর্যের মুখে ভারি পেঁজা মেঘ জমেছে। এমনিতে পুবের আকাশে কিছু সাদা ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ বাদে প্রশান্ত নীল বর্তমান।
আনিস ভাবল, লাশের কাঁধে নখের ক্ষত চিহ্ন থাকলেই কি খুনের আলামত প্রকাশ পায়? এমনিতেই মনসুর পাগলা অনেকটা সংসার বিরাগী। সাতদিনের একদিন বউয়ের খবর নিত না। পুনোয়ারা বটতলায় দরগায় গিয়ে পড়ে থাকত। সে কেন সেতারা বেগমকে খুন করতে যাবে। এছাড়া খুন করার আগে মানুষ তো কিছু আলামত দেখায়। মনসুর পাগলার মধ্যে এমন কোনো আলামত ছিল না।
আনিস বলল, ‘ওসি সাহেব, লাশের কাঁধে নখের ক্ষত থাকলেই কি চুবিয়ে মারা প্রমাণ হয়? দু’দিন ধরে লাশ নদীতে ছিল। অন্য কারণেও তো ক্ষত চিহ্ন হতে পারে। গোমতীতে বোয়াল মাছ, আইর মাছ, পাঙাশ মাছ প্রচুর।’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, আপনার কথায় যুক্তি আছে। তবে আমরা যা তথ্য পেয়েছে, তাতে সন্দেহ করার অবকাশ আছে। লাশ তো আর নদীতে উজিয়ে আসতে পারে না। মনসুর আলী বলেছে, নৌকা ডুবেছে একস্থানে। পুনোয়ারার বটতলার কাছে বা কাছাকাছি কোথাও। আর লাশ পাওয়া গেছে আপনাদের গ্রামে কোড়ের পাড়ে।
‘রাত্রের বেলায় তো। হয়তো ঠাহর করতে পারেনি। আর মনসুর আলী হলো পাগল মানুষ। সে কোন কথা থেকে কোন কথা বলে...।’
‘মনসুর যে কথাই বলুক, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা তো করবেই। আচ্ছা, বাদ দিন ওসব কথা। আমি-আপনি কত যুক্তি দিতেই পারি। কিন্তু আমার-আপনার যুক্তিতে তো হবে না। মনসুর আলীকে কোর্টে তোলা হবে। সেখানেই প্রমাণ হোক, কী বলেন?’
আনিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘জি, আপনি ঠিকই বলেছেন।’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘তবে একটা কথা। আপনি নৌকাডুবি শব্দটা সুন্দর বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নৌকাডুবি উপন্যাসটার কথা মনে পড়ে গেল।’
আনিস হাসল। যদিও ম্লান হাসি। সে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নৌকাডুবি পড়েছেন?’
মহিউদ্দিন আহমেদ হেসে পাল্টা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাকে কি নৌকাডুবি উপন্যাস পড়তে নেই?’
‘না না, আমি সেটা বলিনি। আসলে...?’
‘আসলে কী, আমি পুলিশের চাকরি করি এজন্য? শোনেন, আমি পুলিশের চাকরি করলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের ছাত্র ছিলাম। পরপর তিনবার বিসিএস দিয়ে হয়নি। পরে পুলিশ ডিপার্টমেন্টে অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইনস্পেক্টর হিসেবে জয়েন করি। আমার বাবাও পুলিশ ডিপার্টমেন্টে ছিলেন তো, এজন্য।’
আনিস এমনিই কথা বাড়ানোর জন্য জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, আপনি বাংলা সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। গল্প-কবিতা লিখতেন নাকি?’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘কেন, বাংলা সাহিত্যে পড়ে সবাই কি লেখালেখি করে?’
আনিস বলল, ‘তা করে না। অনেকে আবার বাংলা সাহিত্য পড়তেই আসে লেখালেখি করবে বলে। আমার যেমন ঢাকা গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে না হোক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে, তাও যদি না হয় কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে হলেও বাংলা সাহিত্যে এমএ করব।’
‘তাই! এখন করছেন না কেন?’
‘আমার মা খুব অসুস্থ। গ্রাজুয়েশন করার পর আর ঢাকা যেতে পারিনি।’
‘আপনার মা’র কী হয়েছে?’
‘আমার মা প্যারালাইজড। একেবারে বিছানায় পড়া। এখন অবস্থা আরও খারাপ।’
‘আপনাদের সংসারে তাকে দেখার মতো আর কেউ নেই?’
‘না। আমার বাবা মারা গেছে চার বছর আগে। আমিই একমাত্র সন্তান।’
‘ও, সরি। আশাকরি আপনি একদিন ঢাকায় গিয়ে বাংলা সাহিত্যে এমএ করতে পারবেন। সত্যি বলতে, আমি আসলে বাংলা সাহিত্যে লেখাপড়া করেছি লেখালেখি করব বলেই। কিন্তু বিধি বাম।
‘কেন, বিধি বাম কেন? লেখালখি করেননি?’
‘করেছি। ছাত্রাবস্থায়। একসময় বেশ লিখতাম। কিন্তু পুলিশ ডিপার্টমেন্টে জয়েন করার পর সব শেষ। সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতে হয় ক্রিমিনাল আর কালপ্রিটদের নিয়ে।’
‘পুলিশ ডিপার্টমেন্টে জয়েন করে অনেকেই তো লেখালেখি করে।’
‘জি, কেউ কেউ লেখালেখি করে। তবে আমাদের মতো সাব-ইন্সপেক্টরে জয়েন করে নয়। বিসিএস দিয়ে এসিস্ট্যান্ট পুলিশ সুপার বা পুলিশ সুপার হয়ে। আমাদের জীবন যায় এসিস্ট্যান্ট পুলিশ সুপার বা ডিসট্রিক্ট কমিশনার অফিসের হুকুম মানতে মানতে। সারাক্ষণ তটস্থ থাকতে হয়। একটা ভুল হলে চাকরি শেষ। সাব-ইন্সপেক্টর থেকে প্রোমোশন পেয়ে ওসি হতে পনেরো-বিশ বছর লেগে যায়।
আনিস মাথা ঝাঁকাল। একটু চুপ হয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী লিখতেন, গল্প নাকি কবিতা?’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ, সবই।’
‘এখন কি একেবারেই লিখেন না?’
‘না, বেশ কয়েকবছর ধরে একেবারেই লেখালেখি করছি না। সারাক্ষণ চাপে থাকতে হয়। এত চাপ নিয়ে লেখালেখি হয় না। এছাড়া সংসার বেড়েছে। সংসারের চাপও বেড়েছে। তবে পড়ি। আমাকে পড়ুয়া বলতে পারেন। প্রিন্টেড পত্রিকা কিনে বা অনলাইনে সাহিত্যের পাতাগুলো সবসময় পড়ার চেষ্টা করি। এখানে-ওখানে মফঃস্বল শহরগুলোতে থাকি। নতুন নতুন লিটল ম্যাগগুলো হাতে পাই না। ঢাকা গেলে শাহবাগ-কাঁটাবন আজিজ সুপার মার্কেট থেকে পুরোনোগুলো কিনে নিয়ে আসি।’
‘সেটাই বা কয়জন করে? আজকাল পাঠক নেই বললেন চলে। পড়ুয়ার সংখ্যা একেবারে কমে গেছে। সবাই আছে ফেসবুক, ইউটিউব আর রিল বানানো নিয়ে। এমনকি যারা লেখালেখির জগতে আছে, গল্পকবিতা লিখে, তাদের অর্ধেকই অন্যের লেখা পড়ে না। তারা না পড়েই ফাঁপা বুলি ছাড়ে। আর নিজেকে নোবেল লরিয়েট ভেবে বসে থাকে।’
মহিউদ্দিন আহমেদ হাসলেন। বললেন, ‘একদম আমার মনের কথাটা বলেছেন। এজন্য আমাদের অনেক লেখক-কবিদের লেখার মান দিনদিন নিচে নেমে যাচ্ছে। অনেকে আছে স্ট্যান্ডবাজি করে চলছে। আচ্ছা বাদ দিন, আপনার সাংবাদিকতা কেমন চলছে? আপনি কোনো পত্রিকার সঙ্গে আছেন?’
আনিস বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি, পত্রিকার সঙ্গে?
‘কেন, আপনি কি পত্রিকাতে কাজ করেন না?’
‘নাহ, নাতো।’
মহিউদ্দিন আহমেদ একটু দমে গিয়ে বললেন, ‘ও, তাই। কিন্তু আপনাদের গ্রামের ছালেক মেম্বর যে বলল?’
আনিস বুঝতে পারল, মহিউদ্দিন আহমেদ প্রথম থেকেই কেন এত আন্তরিক ও সমীহ করে কথা বলছেন। সাধারণত থানার উপ-পরিদর্শক ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা স্থানীয় সাংবাদিকদের বেশ ভয় পায়। বিশেষ করে এলাকার অপরাধ নিয়ে পত্রিকায় যারা রিপোর্ট করে। স্থানীয় সাংবাদিকদের ক্ষ্যাপাতে গিয়ে অনেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পরিদর্শক ও উপ-পরিদর্শকদের চাকরি পর্যন্ত চলে গেছে। থানার অনেকের বদলি তো হরহামেশাই হচ্ছে।
আনিস আস্তে করে বলল, ‘ছালেক মেম্বর মনে হয় ভুল বলেছে।’
মহিউদ্দিন অনেকটা নিঃস্পৃহ গলায় বললেন, ‘আসলে আমি এই থানায় নতুন এসেছি তো। অত জানি না। শুধু ছালেক মেম্বর না, আমাদের সাব-ইনস্পেক্টর জুনায়েদ সাহেবও বলেছেন। আপনার কী নাম?
আনিস বলল, ‘আনিসুল হক ভুঁইয়া।’
মহিউদ্দিন আহমেদ দৃষ্টি সরিয়ে মোবাইল স্ক্রিনে কী একটা দেখতে দেখতে অনীহার গলায় বলল, ‘ছালেক মেম্বর এই নামই তো বলেছে। আপনি কী করেন?’
‘স্কুলে শিক্ষকতা করি। অনুতপুর হাইস্কুলে।’
‘হুম, ওরা সেটাও তো বলেছিল। আচ্ছা, বাদ দিন। আপনি কি আর কিছু বলবেন?’
‘না, তেমন কিছু বলার নেই।’ বলেই আনিস একটু চুপ হয়ে গেল। তারপর কী ভেবে বলল, ‘ওসি সাহেব, ছালেক মেম্বর মনে হয় একটা ব্যাপারে গুলিয়ে ফেলেছে।’
মহিউদ্দিন আহমেদ মোবাইল থেকে চোখ না তুলেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী গুলিয়ে ফেলেছে?’
‘আমার লেখালেখির সঙ্গে সে পত্রিকার রিপোর্টিং গুলিয়ে ফেলেছে।’
‘এ কথার মানে কী?’
‘মানে, আমি কবিতা লিখি তো। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে ছাপা হয়।’
‘আপনি কবিতা লেখেন? কী ধরনের কবিতা লেখেন?’
আনিস বুঝতে পারল, মহিউদ্দিন আহমেদের মধ্যে অনীহা ভাবটা এখনও রয়ে গেছে। থাকারই কথা। এতক্ষণ সাংবাদিক ভেবে এত সম্মান দিলেন!
আনিস বলল, ‘লিখি তো কত ধরনেরই কবিতা। যখন যেটা মন চায়। আপনি নিজেও তো একসময় কবিতা লিখতেন। ধরন দেখে তো কেউ কবিতা লিখে না।’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘হুম, সেটাই। আসলেই ধরন দেখে কবিতা লেখা যায় না।
আনিস মাথা ঝাঁকাল। এমনিই।
মহিউদ্দিন আহমেদ মোবাইলটা একপাশে রাখতে গিয়ে স্ক্রিনে কিছু একটা দেখলেন। মনে হচ্ছে কোনো একটা ইমেইল এসেছে বা কোনো জরুরি মেসেজ। তিনি সেটা পড়ায় মনোযোগ দিলেন।
আনিস আবার জানালা গলে বাইরে তাকাল। আকাশে মেঘ করে এসেছে। বাইরের পরিবেশটা বেশ স্তব্ধ গুমোট। কাছে কোথাও একটা পাখি ডাকছে— টুইট-টুইট, টুইট-টুইট। মাথার ওপর ফ্যানটা আগের মতোই চলছে— শোঁ শোঁ, শোঁ শোঁ। রুমের ভেতর একধরনের আবছা ছায়া। বাইরের মেঘের ছায়াটাই এসে পড়েছে।
মহিউদ্দিন আহমেদ পড়া শেষ করে মোবাইলটা টেবিলের একপাশে সরিয়ে রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার কোনো কবিতার বইটই বের হয়েছে?’
আনিস বলল, ‘জি, দুটো।’
‘বলেন কী? দুটো বই। তাহলে আপনি তো বেশ নামকরা।’
‘নামকরা হলে তো আপনি আমাকে প্রথম থেকেই চিনতেন।’
মহিউদ্দিন আহমেদ একটা লাজুক হাসি দিয়ে বললেন, ‘না, না, তা নয়। আমি ওটা মিন করে বলিনি। আপনার কবিতার বই দুটোর নাম কি?’
আনিস বলল, ‘প্রথমটার নাম— লাশ ও জ্যোৎস্নার আকর। দ্বিতীয়টার নাম— গোমতীর একাদশী চাঁদ।’
মহিউদ্দিন আহমেদ মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেলেন। চুপ হয়ে কী যেন ভাবলেন। তারপর ভ্রু কুঁচকে ও কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন, ‘গোমতীর একাদশী চাঁদ নামটা বেশ পরিচিত মনে হচ্ছে। আচ্ছা, আপনার এই বইয়ে একটা কবিতা আছে না, যেটার নাম— বৈষ্ণবী দেহ?’
আনিস বলল, ‘জি।’
মহিউদ্দিন একটু হাসি হাসি চেহারা করে বললেন, ‘যুবতীর সঙ্গে পুরুষের যেন জলসত্রের সম্পর্ক। পুঁইপাতার বৈষ্ণবী দেহের মতন শুধু পিছলায় আর পিছলায়...।’
আনিস হাসল বেশ প্রাণবন্ত, একটু শব্দ করে। বলল, ‘আপনি এভাবে মনে রেখেছেন?’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘মনে রাখব না মানে? দারুণ কবিতা! কিন্তু একটা কথা।’
‘কী কথা?’
‘আপনি তো মনে হয় আনিসুল হক ভুঁইয়া নামে লেখেন না। আপনার একটি লেখক নাম আছে।’
‘জি, আমি রাহেল আনিস নামে লিখি।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, রাহেল আনিস। মনে পড়ছে।’
‘ওই তো, আমার মা’র নাম রাহেলা খানম তো। আমি মা’র নামটাকে একটু ছেঁটে নিজের নামের সঙ্গে যুক্ত করে নিয়েছি। রাহেলা থেকে রাহেল। রাহেল আনিস।’
মহিউদ্দিন আহমেদ বেশ আন্তরিকভাবে হাসলেন। বললেন, ‘আপনার প্রথম কবিতার বইটি আমার সংগ্রহে আছে। ঢাকার বাসায়। আপনার কবিতা এখানে এসেও পড়েছি। একটা জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীতে। আপনি গ্রাম্যমিথকে যেভাবে আপনার কবিতায় ব্যবহার করেন, এক অর্থে চমৎকার।’
আনিস বলল, ‘অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। আরও ধন্যবাদ, আপনি আমার প্রথম কবিতার বইটা আপনার সংগ্রহে রেখেছেন।’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘আসলে, এটা শুধু আপনার কবিতার বইয়ের ক্ষেত্রেই না। আমি বইমেলায় গেলে তরুণদের কবিতার বই কিনি বেশি। সিনিয়র নামকরা কবিদের কবিতার বই যে কিনি না, তা নয়। তবে আমি গুরুত্ব দিই তরুণ কবিদের। আমার বরাবর মনে হয়, নামকরা কবিরা যা লেখার লিখে ফেলেছে। ওদের কবিতায় আর নতুন ভাঙচুর হবে না। তরুণ কবিদের কবিতায় বেশ ভাঙচুর থাকে।’
আনিস মুগ্ধ হওয়ার গলায় বলল, ‘আপনি খুব সুন্দর বলেছেন তো! তবে অনেক সিনিয়র ও নামকরা কবিদের লেখায়ও প্রচুর ভাঙচুর আছে।’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘হয়তো।’
‘হয়তো না। মানুষই প্রতিনিয়ত ভাঙে, কবিরা তো আরও বেশি ভাঙে। ভাঙে দেখেই ওরা কবিতা লিখতে পারে।’
‘কবিদের মধ্যে কি স্থবিরতা আসে না?’
‘আসে, অবশ্যই আসে। এজন্য একজন কবির সব কবিতা মান-উত্তীর্ণ হয় না। কিছু কিছু কবিতা হয়।’
‘খুব যৌক্তিক কথা বলেছেন। আমিও...।’ মহিউদ্দিন আহমেদ কথাটি শেষ করতে পারলেন না। তার মোবাইলটি বেজে উঠল। মোবাইলের রিংটোনটা সুন্দর দেশাত্ববোধক গানের টোন— ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার ‘পরে দেখাই মাথা / তোমাতে বিশ্বময়ীর, তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা...।’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, আপনার ভাবির ফোন। ঢাকা থেকে।
আনিস স্মিত হেসে বলল, ‘আমি তাহলে উঠি এখন।’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘না না, আপনার ভাবির সঙ্গে পরে কথা বলবো। ওই তো নিত্যদিনের পরিবারের আলাপ। কবিতা নিয়ে আলাপ করছি, বেশ ভালো লাগছে।’
আনিস আবার স্মিত হাসল। কিছু বলল না।
মহিউদ্দিন আহমেদ ফোন ধরবেন না বললেও ঠিকই ধরলেন।
আনিস আবার একঝলকের জন্য বাইরে তাকাল। বাইরে আকাশটা আরও ভারি হয়ে এসেছে। মেঘ ডাকছে না, কিন্তু বাতাসের স্তব্ধতা বেশ। জানালার পাশের বেলিফুল গাছটার একটা পাতাও নড়ছে না। ফুলগুলো আরও ধূসর সাদা হয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছে। সে ভাবল, তুফান আসবে নাতো? এখন উঠতে পারলে ভালো হয়। ওদিকে বাড়িতে মা’র যা অবস্থা!
মহিউদ্দিন আহমেদ অবশ্য মোবাইলে কথা সংক্ষিপ্ত করলেন। লাইন কেটে দিয়ে বললেন, ‘ফোন ধরব না বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু বোঝেনই তো, হোম মিনিস্টার। আপনি বিয়েসাধি করেছেন?
আনিস বলল, ‘না।’
‘কেন, কবিতার জন্য?’
‘আপনি বুঝলেন কীভাবে?’
মহিউদ্দিন আহমেদ বেশ জোরে হাসলেন— হা হা, হা হা। বললেন, ‘আমি যখন লেখালেখি করতাম, তখন পণ করেছিলাম। কিন্তু লেখালেখি যখন ছেড়ে দেই, একদিনও দেরি করিনি। বিয়ে করে ফেলি।’
আনিস বলল, ‘সেটাই ভালো করেছেন। ভাবি ঢাকাতে যে? তিনি কি এই থানা কোয়ার্টারে আসতে চাচ্ছেন না?’
‘না না, তার থানা কোয়ার্টারে কোনো অসুবিধা হয় না। সে এডজাস্ট করতে পারে। সে বিয়ের পর থেকে বিভিন্ন থানা কোয়ার্টারগুলোতেই তো থাকছে। আমার ছেলেমেয়েগুলোরও অভ্যাস হয়ে গেছে। আসলে এই থানায় আমার বেশিদিন হয়নি তো। বাসা এখনও গুছিয়ে তুলতে পারিনি।’
‘আপনি আমাদের এই থানায় কবে এসেছেন?’
‘এই তো একমাস হলো।’
‘কেমন লাগছে?’
‘থানা তো থানাই। সব থানা একই। তবে ভাটি অঞ্চল ও চরের জীবন দেখে ভালো লাগছে।’
‘একবার আমাদের গ্রামে আপনাকে নিয়ে যাব।’
‘অবশ্যই।’
‘বিলের জলের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত। মাঝখানে সিঁথি করা নৌকা চলাচলের পথ। আপনার ভালো লাগবে।’
‘আমি জানি। আপনার কবিতা মধ্যে তো তেমনটাই আছে।’
আনিস একটা সুখের নিঃশ্বাস ফেলল। বলল, ‘দেখুন, কীভাবে আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল। এসেছিলাম মনসুর আলীকে দেখতে। আপনার রুমে এসেছিলাম তাকে নিয়ে একটা অনুরোধ জানাতে। আর আমরা কোথায় থেকে কীভাবে কবিতার জগতে ঢুকে গেলাম!’
মহিউদ্দিন আহমেদ মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘সেটাই। আপনাকে একদিন বাসায় ডাকব। আপনার ভাবী ও বাচ্চারা আসুক। বাসাটা গুছিয়ে নিই। একদিন আপনার সঙ্গে কবিতার আড্ডায় বসব।’
আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি একেবারেই কবিতা লেখেন না?’
মহিউদ্দিন আহমেদ মাথা নেড়ে বললেন, ‘না।’
‘কবিরা কি কবিতা ছাড়তে পারে?’
‘না, পারেন না।’
‘আপনাকে যে আবার কবিতা লেখার জগতে ফিরতে হবে।’
মহিউদ্দিন আহমেদ ম্লান হেসে বললেন, ‘ফেরা কি এত সহজ?’
আনিস বলল, ‘সহজ ভাবলেই, সহজ। আমি একটা কথা বুঝি, কবিদের লেখা থামাতে নেই।’ ক্রমশ...

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬
(পূর্ব প্রকাশের পর)
বারো
আনিস পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিউদ্দিন আহমেদের কাছ থেকে এতটা আন্তরিক ব্যবহার আশা করেনি। সে রুমে ঢুকতেই তিনি যেভাবে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বসতে বললেন...!
মহিউদ্দিন আহমেদ এখন মোবাইলে কারও সঙ্গে কুমিল্লায় পুলিশ কমিশনার অফিসে কথা বলছেন। আলাপটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কথাবার্তার ধরন দেখে এটুকু বোঝা যাচ্ছে, তিনি উপজেলার কোনো এক রাজনৈতিক নেতার বিষয়ে আলাপ করছেন। যদিও তিনি এপাশে হু-হা শব্দ করছেন বেশি।
আনিস চুপচাপ বসে কখনও মহিউদ্দিন আহমেদকে দেখছে, কখনও পুবের জানালা গলে বাইরে তাকাচ্ছে। মহিউদ্দিন আহমেদের রুমের জানালার একেবারে পাশ ঘেঁষে একটা বেলিফুলের গাছ। বেশ ঝোপ করে বেড়ে উঠেছে। গাছে বেশ বেলিফুল ফুটেছে। রুমে বসেই বেলিফুলের সুগন্ধ নাকে লাগছে। রুমে এসি আছে। কিন্তু এসিটা বন্ধ। মাথার ওপর একটা ফ্যান চলছে। ফ্যানটা মনে হয় নতুন লাগানো হয়েছে। একেবারে শব্দহীন। শুধু বাতাসের শব্দ আসছে- শোঁ শোঁ, শোঁ শোঁ।
মহিউদ্দিন আহমেদ কথা শেষ করে লাইন কেটে দিয়েই বললেন, ‘সরি, জরুরি ফোন ছিল।’
আনিস মৃদু হেসে সায় দিয়ে বলল, ‘জি, বুঝতে পেরেছি।’
‘তা, বলুন, আপনার জন্য কী করতে পারি?’
‘না, তেমন কিছু না। মনসুর আলী আমার পড়শি। তাকে দেখতে এলাম।’
‘আপনার সেই পড়শি গত দুইদিন ধরে খুব বিরক্ত করেছে। হাজতে ওর সাথে আরও দুইজন হাজতি ছিল। সেই দুইজনকে একটার পরে একটা ঘুষি মেরে এমন অবস্থা করেছে, একজনকে তো হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছে। অন্যজনকে গতকালেই কুমিল্লা জেলে পাঠিয়ে দিয়েছি।’
‘মনসুর আসলে পাগল টাইপের। মাথায় ছিট আছে।’
‘সে পাগল না, অসুর। শরীরে কী শক্তি! আমার তিনজন পুলিশ তাকে ধরে রাখতে পারেনি।’
আনিস বিনয়ের সঙ্গে বলল, ‘আমি খুব সরি।’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘না না, আপনি কেন সরি বলবেন? তবে আমরা মনসুর আলীকে এখানে রাখা সেইফ মনে করছি না। আমরা আগামীকালই কুমিল্লা পাঠিয়ে দিবো।’
আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘কোর্টে কবে তুলবেন?’
‘আগামীকালই হয়তো কোর্ট তুলব। লাশের ময়নাতদন্ত রিপোর্টের অপেক্ষায় আছি। আজ বিকেলের মধ্যে মনে হয় পেয়ে যাব।’
‘ওসি সাহেব, একটা কথা ছিল।’
‘কী কথা, বলুন?’
‘আমি মনসুর আলীকে ছোটবেলা থেকে জানি। একসঙ্গে বড় হয়েছি। আমার মনে হচ্ছে, কোথাও একটা ভুল হচ্ছে।’
‘কী ধরনের ভুল?’
‘মনসুর আলী কাউকে খুন করবে, এটা আমার বিশ্বাস হয় না। সে পাগলা টাইপের মানুষ, এটা সত্য। বছরের বেশিরভাগ সময় একটা দরগায় পড়ে থাকে। কিন্তু খুন! তাও আবার তার বউকে?
‘কিন্তু সে খুন করেছে, এটা সত্য।’
‘কীভাবে বুঝলেন?’
‘আপনাদের ছালেক মেম্বর বলেছে। মনসুর আলী তার বউকে আপনাদের গ্রামের কোড়ের পাড়ে চুবিয়ে মেরেছে।’
‘ওটা হয়তো ছালেক মেম্বরের মনগড়া কথা।
‘আচ্ছা, যে কথাই হোক, সেটা কোর্টে প্রমাণ হবে।
‘ওসি সাহেব, আমি জোর দিয়েই বলতে পারি, ঘটনাটা স্রেফ নৌকাডুবি ছিল।’
‘নৌকাডুবি শব্দটা সুন্দর বলেছেন। তবে আমি শুধু ছালেক মেম্বরের কথার ওপর নির্ভর করেই বলছি না। অটোপসি রিপোর্ট আসেনি, এটা ঠিক। কিন্তু ফোনে কুমিল্লা ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টে কথা হয়েছে। ওরা বলেছে, লাশের কাঁধে নখের ক্ষত আছে।’
‘ও, তাই!’ —বলেই আনিস চুপ হয়ে গেল। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিউদ্দিন আহমেদের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সে এক ঝলক বাইরে তাকাল। বাইরে রোদটা পড়ে এসেছে। মনে হচ্ছে সূর্যের মুখে ভারি পেঁজা মেঘ জমেছে। এমনিতে পুবের আকাশে কিছু সাদা ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ বাদে প্রশান্ত নীল বর্তমান।
আনিস ভাবল, লাশের কাঁধে নখের ক্ষত চিহ্ন থাকলেই কি খুনের আলামত প্রকাশ পায়? এমনিতেই মনসুর পাগলা অনেকটা সংসার বিরাগী। সাতদিনের একদিন বউয়ের খবর নিত না। পুনোয়ারা বটতলায় দরগায় গিয়ে পড়ে থাকত। সে কেন সেতারা বেগমকে খুন করতে যাবে। এছাড়া খুন করার আগে মানুষ তো কিছু আলামত দেখায়। মনসুর পাগলার মধ্যে এমন কোনো আলামত ছিল না।
আনিস বলল, ‘ওসি সাহেব, লাশের কাঁধে নখের ক্ষত থাকলেই কি চুবিয়ে মারা প্রমাণ হয়? দু’দিন ধরে লাশ নদীতে ছিল। অন্য কারণেও তো ক্ষত চিহ্ন হতে পারে। গোমতীতে বোয়াল মাছ, আইর মাছ, পাঙাশ মাছ প্রচুর।’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, আপনার কথায় যুক্তি আছে। তবে আমরা যা তথ্য পেয়েছে, তাতে সন্দেহ করার অবকাশ আছে। লাশ তো আর নদীতে উজিয়ে আসতে পারে না। মনসুর আলী বলেছে, নৌকা ডুবেছে একস্থানে। পুনোয়ারার বটতলার কাছে বা কাছাকাছি কোথাও। আর লাশ পাওয়া গেছে আপনাদের গ্রামে কোড়ের পাড়ে।
‘রাত্রের বেলায় তো। হয়তো ঠাহর করতে পারেনি। আর মনসুর আলী হলো পাগল মানুষ। সে কোন কথা থেকে কোন কথা বলে...।’
‘মনসুর যে কথাই বলুক, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা তো করবেই। আচ্ছা, বাদ দিন ওসব কথা। আমি-আপনি কত যুক্তি দিতেই পারি। কিন্তু আমার-আপনার যুক্তিতে তো হবে না। মনসুর আলীকে কোর্টে তোলা হবে। সেখানেই প্রমাণ হোক, কী বলেন?’
আনিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘জি, আপনি ঠিকই বলেছেন।’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘তবে একটা কথা। আপনি নৌকাডুবি শব্দটা সুন্দর বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নৌকাডুবি উপন্যাসটার কথা মনে পড়ে গেল।’
আনিস হাসল। যদিও ম্লান হাসি। সে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নৌকাডুবি পড়েছেন?’
মহিউদ্দিন আহমেদ হেসে পাল্টা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাকে কি নৌকাডুবি উপন্যাস পড়তে নেই?’
‘না না, আমি সেটা বলিনি। আসলে...?’
‘আসলে কী, আমি পুলিশের চাকরি করি এজন্য? শোনেন, আমি পুলিশের চাকরি করলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের ছাত্র ছিলাম। পরপর তিনবার বিসিএস দিয়ে হয়নি। পরে পুলিশ ডিপার্টমেন্টে অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইনস্পেক্টর হিসেবে জয়েন করি। আমার বাবাও পুলিশ ডিপার্টমেন্টে ছিলেন তো, এজন্য।’
আনিস এমনিই কথা বাড়ানোর জন্য জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, আপনি বাংলা সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। গল্প-কবিতা লিখতেন নাকি?’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘কেন, বাংলা সাহিত্যে পড়ে সবাই কি লেখালেখি করে?’
আনিস বলল, ‘তা করে না। অনেকে আবার বাংলা সাহিত্য পড়তেই আসে লেখালেখি করবে বলে। আমার যেমন ঢাকা গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে না হোক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে, তাও যদি না হয় কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে হলেও বাংলা সাহিত্যে এমএ করব।’
‘তাই! এখন করছেন না কেন?’
‘আমার মা খুব অসুস্থ। গ্রাজুয়েশন করার পর আর ঢাকা যেতে পারিনি।’
‘আপনার মা’র কী হয়েছে?’
‘আমার মা প্যারালাইজড। একেবারে বিছানায় পড়া। এখন অবস্থা আরও খারাপ।’
‘আপনাদের সংসারে তাকে দেখার মতো আর কেউ নেই?’
‘না। আমার বাবা মারা গেছে চার বছর আগে। আমিই একমাত্র সন্তান।’
‘ও, সরি। আশাকরি আপনি একদিন ঢাকায় গিয়ে বাংলা সাহিত্যে এমএ করতে পারবেন। সত্যি বলতে, আমি আসলে বাংলা সাহিত্যে লেখাপড়া করেছি লেখালেখি করব বলেই। কিন্তু বিধি বাম।
‘কেন, বিধি বাম কেন? লেখালখি করেননি?’
‘করেছি। ছাত্রাবস্থায়। একসময় বেশ লিখতাম। কিন্তু পুলিশ ডিপার্টমেন্টে জয়েন করার পর সব শেষ। সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতে হয় ক্রিমিনাল আর কালপ্রিটদের নিয়ে।’
‘পুলিশ ডিপার্টমেন্টে জয়েন করে অনেকেই তো লেখালেখি করে।’
‘জি, কেউ কেউ লেখালেখি করে। তবে আমাদের মতো সাব-ইন্সপেক্টরে জয়েন করে নয়। বিসিএস দিয়ে এসিস্ট্যান্ট পুলিশ সুপার বা পুলিশ সুপার হয়ে। আমাদের জীবন যায় এসিস্ট্যান্ট পুলিশ সুপার বা ডিসট্রিক্ট কমিশনার অফিসের হুকুম মানতে মানতে। সারাক্ষণ তটস্থ থাকতে হয়। একটা ভুল হলে চাকরি শেষ। সাব-ইন্সপেক্টর থেকে প্রোমোশন পেয়ে ওসি হতে পনেরো-বিশ বছর লেগে যায়।
আনিস মাথা ঝাঁকাল। একটু চুপ হয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী লিখতেন, গল্প নাকি কবিতা?’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ, সবই।’
‘এখন কি একেবারেই লিখেন না?’
‘না, বেশ কয়েকবছর ধরে একেবারেই লেখালেখি করছি না। সারাক্ষণ চাপে থাকতে হয়। এত চাপ নিয়ে লেখালেখি হয় না। এছাড়া সংসার বেড়েছে। সংসারের চাপও বেড়েছে। তবে পড়ি। আমাকে পড়ুয়া বলতে পারেন। প্রিন্টেড পত্রিকা কিনে বা অনলাইনে সাহিত্যের পাতাগুলো সবসময় পড়ার চেষ্টা করি। এখানে-ওখানে মফঃস্বল শহরগুলোতে থাকি। নতুন নতুন লিটল ম্যাগগুলো হাতে পাই না। ঢাকা গেলে শাহবাগ-কাঁটাবন আজিজ সুপার মার্কেট থেকে পুরোনোগুলো কিনে নিয়ে আসি।’
‘সেটাই বা কয়জন করে? আজকাল পাঠক নেই বললেন চলে। পড়ুয়ার সংখ্যা একেবারে কমে গেছে। সবাই আছে ফেসবুক, ইউটিউব আর রিল বানানো নিয়ে। এমনকি যারা লেখালেখির জগতে আছে, গল্পকবিতা লিখে, তাদের অর্ধেকই অন্যের লেখা পড়ে না। তারা না পড়েই ফাঁপা বুলি ছাড়ে। আর নিজেকে নোবেল লরিয়েট ভেবে বসে থাকে।’
মহিউদ্দিন আহমেদ হাসলেন। বললেন, ‘একদম আমার মনের কথাটা বলেছেন। এজন্য আমাদের অনেক লেখক-কবিদের লেখার মান দিনদিন নিচে নেমে যাচ্ছে। অনেকে আছে স্ট্যান্ডবাজি করে চলছে। আচ্ছা বাদ দিন, আপনার সাংবাদিকতা কেমন চলছে? আপনি কোনো পত্রিকার সঙ্গে আছেন?’
আনিস বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি, পত্রিকার সঙ্গে?
‘কেন, আপনি কি পত্রিকাতে কাজ করেন না?’
‘নাহ, নাতো।’
মহিউদ্দিন আহমেদ একটু দমে গিয়ে বললেন, ‘ও, তাই। কিন্তু আপনাদের গ্রামের ছালেক মেম্বর যে বলল?’
আনিস বুঝতে পারল, মহিউদ্দিন আহমেদ প্রথম থেকেই কেন এত আন্তরিক ও সমীহ করে কথা বলছেন। সাধারণত থানার উপ-পরিদর্শক ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা স্থানীয় সাংবাদিকদের বেশ ভয় পায়। বিশেষ করে এলাকার অপরাধ নিয়ে পত্রিকায় যারা রিপোর্ট করে। স্থানীয় সাংবাদিকদের ক্ষ্যাপাতে গিয়ে অনেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পরিদর্শক ও উপ-পরিদর্শকদের চাকরি পর্যন্ত চলে গেছে। থানার অনেকের বদলি তো হরহামেশাই হচ্ছে।
আনিস আস্তে করে বলল, ‘ছালেক মেম্বর মনে হয় ভুল বলেছে।’
মহিউদ্দিন অনেকটা নিঃস্পৃহ গলায় বললেন, ‘আসলে আমি এই থানায় নতুন এসেছি তো। অত জানি না। শুধু ছালেক মেম্বর না, আমাদের সাব-ইনস্পেক্টর জুনায়েদ সাহেবও বলেছেন। আপনার কী নাম?
আনিস বলল, ‘আনিসুল হক ভুঁইয়া।’
মহিউদ্দিন আহমেদ দৃষ্টি সরিয়ে মোবাইল স্ক্রিনে কী একটা দেখতে দেখতে অনীহার গলায় বলল, ‘ছালেক মেম্বর এই নামই তো বলেছে। আপনি কী করেন?’
‘স্কুলে শিক্ষকতা করি। অনুতপুর হাইস্কুলে।’
‘হুম, ওরা সেটাও তো বলেছিল। আচ্ছা, বাদ দিন। আপনি কি আর কিছু বলবেন?’
‘না, তেমন কিছু বলার নেই।’ বলেই আনিস একটু চুপ হয়ে গেল। তারপর কী ভেবে বলল, ‘ওসি সাহেব, ছালেক মেম্বর মনে হয় একটা ব্যাপারে গুলিয়ে ফেলেছে।’
মহিউদ্দিন আহমেদ মোবাইল থেকে চোখ না তুলেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী গুলিয়ে ফেলেছে?’
‘আমার লেখালেখির সঙ্গে সে পত্রিকার রিপোর্টিং গুলিয়ে ফেলেছে।’
‘এ কথার মানে কী?’
‘মানে, আমি কবিতা লিখি তো। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে ছাপা হয়।’
‘আপনি কবিতা লেখেন? কী ধরনের কবিতা লেখেন?’
আনিস বুঝতে পারল, মহিউদ্দিন আহমেদের মধ্যে অনীহা ভাবটা এখনও রয়ে গেছে। থাকারই কথা। এতক্ষণ সাংবাদিক ভেবে এত সম্মান দিলেন!
আনিস বলল, ‘লিখি তো কত ধরনেরই কবিতা। যখন যেটা মন চায়। আপনি নিজেও তো একসময় কবিতা লিখতেন। ধরন দেখে তো কেউ কবিতা লিখে না।’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘হুম, সেটাই। আসলেই ধরন দেখে কবিতা লেখা যায় না।
আনিস মাথা ঝাঁকাল। এমনিই।
মহিউদ্দিন আহমেদ মোবাইলটা একপাশে রাখতে গিয়ে স্ক্রিনে কিছু একটা দেখলেন। মনে হচ্ছে কোনো একটা ইমেইল এসেছে বা কোনো জরুরি মেসেজ। তিনি সেটা পড়ায় মনোযোগ দিলেন।
আনিস আবার জানালা গলে বাইরে তাকাল। আকাশে মেঘ করে এসেছে। বাইরের পরিবেশটা বেশ স্তব্ধ গুমোট। কাছে কোথাও একটা পাখি ডাকছে— টুইট-টুইট, টুইট-টুইট। মাথার ওপর ফ্যানটা আগের মতোই চলছে— শোঁ শোঁ, শোঁ শোঁ। রুমের ভেতর একধরনের আবছা ছায়া। বাইরের মেঘের ছায়াটাই এসে পড়েছে।
মহিউদ্দিন আহমেদ পড়া শেষ করে মোবাইলটা টেবিলের একপাশে সরিয়ে রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার কোনো কবিতার বইটই বের হয়েছে?’
আনিস বলল, ‘জি, দুটো।’
‘বলেন কী? দুটো বই। তাহলে আপনি তো বেশ নামকরা।’
‘নামকরা হলে তো আপনি আমাকে প্রথম থেকেই চিনতেন।’
মহিউদ্দিন আহমেদ একটা লাজুক হাসি দিয়ে বললেন, ‘না, না, তা নয়। আমি ওটা মিন করে বলিনি। আপনার কবিতার বই দুটোর নাম কি?’
আনিস বলল, ‘প্রথমটার নাম— লাশ ও জ্যোৎস্নার আকর। দ্বিতীয়টার নাম— গোমতীর একাদশী চাঁদ।’
মহিউদ্দিন আহমেদ মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেলেন। চুপ হয়ে কী যেন ভাবলেন। তারপর ভ্রু কুঁচকে ও কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন, ‘গোমতীর একাদশী চাঁদ নামটা বেশ পরিচিত মনে হচ্ছে। আচ্ছা, আপনার এই বইয়ে একটা কবিতা আছে না, যেটার নাম— বৈষ্ণবী দেহ?’
আনিস বলল, ‘জি।’
মহিউদ্দিন একটু হাসি হাসি চেহারা করে বললেন, ‘যুবতীর সঙ্গে পুরুষের যেন জলসত্রের সম্পর্ক। পুঁইপাতার বৈষ্ণবী দেহের মতন শুধু পিছলায় আর পিছলায়...।’
আনিস হাসল বেশ প্রাণবন্ত, একটু শব্দ করে। বলল, ‘আপনি এভাবে মনে রেখেছেন?’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘মনে রাখব না মানে? দারুণ কবিতা! কিন্তু একটা কথা।’
‘কী কথা?’
‘আপনি তো মনে হয় আনিসুল হক ভুঁইয়া নামে লেখেন না। আপনার একটি লেখক নাম আছে।’
‘জি, আমি রাহেল আনিস নামে লিখি।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, রাহেল আনিস। মনে পড়ছে।’
‘ওই তো, আমার মা’র নাম রাহেলা খানম তো। আমি মা’র নামটাকে একটু ছেঁটে নিজের নামের সঙ্গে যুক্ত করে নিয়েছি। রাহেলা থেকে রাহেল। রাহেল আনিস।’
মহিউদ্দিন আহমেদ বেশ আন্তরিকভাবে হাসলেন। বললেন, ‘আপনার প্রথম কবিতার বইটি আমার সংগ্রহে আছে। ঢাকার বাসায়। আপনার কবিতা এখানে এসেও পড়েছি। একটা জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীতে। আপনি গ্রাম্যমিথকে যেভাবে আপনার কবিতায় ব্যবহার করেন, এক অর্থে চমৎকার।’
আনিস বলল, ‘অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। আরও ধন্যবাদ, আপনি আমার প্রথম কবিতার বইটা আপনার সংগ্রহে রেখেছেন।’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘আসলে, এটা শুধু আপনার কবিতার বইয়ের ক্ষেত্রেই না। আমি বইমেলায় গেলে তরুণদের কবিতার বই কিনি বেশি। সিনিয়র নামকরা কবিদের কবিতার বই যে কিনি না, তা নয়। তবে আমি গুরুত্ব দিই তরুণ কবিদের। আমার বরাবর মনে হয়, নামকরা কবিরা যা লেখার লিখে ফেলেছে। ওদের কবিতায় আর নতুন ভাঙচুর হবে না। তরুণ কবিদের কবিতায় বেশ ভাঙচুর থাকে।’
আনিস মুগ্ধ হওয়ার গলায় বলল, ‘আপনি খুব সুন্দর বলেছেন তো! তবে অনেক সিনিয়র ও নামকরা কবিদের লেখায়ও প্রচুর ভাঙচুর আছে।’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘হয়তো।’
‘হয়তো না। মানুষই প্রতিনিয়ত ভাঙে, কবিরা তো আরও বেশি ভাঙে। ভাঙে দেখেই ওরা কবিতা লিখতে পারে।’
‘কবিদের মধ্যে কি স্থবিরতা আসে না?’
‘আসে, অবশ্যই আসে। এজন্য একজন কবির সব কবিতা মান-উত্তীর্ণ হয় না। কিছু কিছু কবিতা হয়।’
‘খুব যৌক্তিক কথা বলেছেন। আমিও...।’ মহিউদ্দিন আহমেদ কথাটি শেষ করতে পারলেন না। তার মোবাইলটি বেজে উঠল। মোবাইলের রিংটোনটা সুন্দর দেশাত্ববোধক গানের টোন— ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার ‘পরে দেখাই মাথা / তোমাতে বিশ্বময়ীর, তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা...।’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, আপনার ভাবির ফোন। ঢাকা থেকে।
আনিস স্মিত হেসে বলল, ‘আমি তাহলে উঠি এখন।’
মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘না না, আপনার ভাবির সঙ্গে পরে কথা বলবো। ওই তো নিত্যদিনের পরিবারের আলাপ। কবিতা নিয়ে আলাপ করছি, বেশ ভালো লাগছে।’
আনিস আবার স্মিত হাসল। কিছু বলল না।
মহিউদ্দিন আহমেদ ফোন ধরবেন না বললেও ঠিকই ধরলেন।
আনিস আবার একঝলকের জন্য বাইরে তাকাল। বাইরে আকাশটা আরও ভারি হয়ে এসেছে। মেঘ ডাকছে না, কিন্তু বাতাসের স্তব্ধতা বেশ। জানালার পাশের বেলিফুল গাছটার একটা পাতাও নড়ছে না। ফুলগুলো আরও ধূসর সাদা হয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছে। সে ভাবল, তুফান আসবে নাতো? এখন উঠতে পারলে ভালো হয়। ওদিকে বাড়িতে মা’র যা অবস্থা!
মহিউদ্দিন আহমেদ অবশ্য মোবাইলে কথা সংক্ষিপ্ত করলেন। লাইন কেটে দিয়ে বললেন, ‘ফোন ধরব না বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু বোঝেনই তো, হোম মিনিস্টার। আপনি বিয়েসাধি করেছেন?
আনিস বলল, ‘না।’
‘কেন, কবিতার জন্য?’
‘আপনি বুঝলেন কীভাবে?’
মহিউদ্দিন আহমেদ বেশ জোরে হাসলেন— হা হা, হা হা। বললেন, ‘আমি যখন লেখালেখি করতাম, তখন পণ করেছিলাম। কিন্তু লেখালেখি যখন ছেড়ে দেই, একদিনও দেরি করিনি। বিয়ে করে ফেলি।’
আনিস বলল, ‘সেটাই ভালো করেছেন। ভাবি ঢাকাতে যে? তিনি কি এই থানা কোয়ার্টারে আসতে চাচ্ছেন না?’
‘না না, তার থানা কোয়ার্টারে কোনো অসুবিধা হয় না। সে এডজাস্ট করতে পারে। সে বিয়ের পর থেকে বিভিন্ন থানা কোয়ার্টারগুলোতেই তো থাকছে। আমার ছেলেমেয়েগুলোরও অভ্যাস হয়ে গেছে। আসলে এই থানায় আমার বেশিদিন হয়নি তো। বাসা এখনও গুছিয়ে তুলতে পারিনি।’
‘আপনি আমাদের এই থানায় কবে এসেছেন?’
‘এই তো একমাস হলো।’
‘কেমন লাগছে?’
‘থানা তো থানাই। সব থানা একই। তবে ভাটি অঞ্চল ও চরের জীবন দেখে ভালো লাগছে।’
‘একবার আমাদের গ্রামে আপনাকে নিয়ে যাব।’
‘অবশ্যই।’
‘বিলের জলের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত। মাঝখানে সিঁথি করা নৌকা চলাচলের পথ। আপনার ভালো লাগবে।’
‘আমি জানি। আপনার কবিতা মধ্যে তো তেমনটাই আছে।’
আনিস একটা সুখের নিঃশ্বাস ফেলল। বলল, ‘দেখুন, কীভাবে আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল। এসেছিলাম মনসুর আলীকে দেখতে। আপনার রুমে এসেছিলাম তাকে নিয়ে একটা অনুরোধ জানাতে। আর আমরা কোথায় থেকে কীভাবে কবিতার জগতে ঢুকে গেলাম!’
মহিউদ্দিন আহমেদ মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘সেটাই। আপনাকে একদিন বাসায় ডাকব। আপনার ভাবী ও বাচ্চারা আসুক। বাসাটা গুছিয়ে নিই। একদিন আপনার সঙ্গে কবিতার আড্ডায় বসব।’
আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি একেবারেই কবিতা লেখেন না?’
মহিউদ্দিন আহমেদ মাথা নেড়ে বললেন, ‘না।’
‘কবিরা কি কবিতা ছাড়তে পারে?’
‘না, পারেন না।’
‘আপনাকে যে আবার কবিতা লেখার জগতে ফিরতে হবে।’
মহিউদ্দিন আহমেদ ম্লান হেসে বললেন, ‘ফেরা কি এত সহজ?’
আনিস বলল, ‘সহজ ভাবলেই, সহজ। আমি একটা কথা বুঝি, কবিদের লেখা থামাতে নেই।’ ক্রমশ...

আপনার মতামত লিখুন