সংবাদ

দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল চালকদের মৃত্যু কেন বেশি


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ৬ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২৪ পিএম

দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল চালকদের মৃত্যু কেন বেশি
ছবি : সংগৃহীত

দেশের সড়কগুলোতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা মোট মৃত্যুর এক-তৃতীয়াংশ। এমন প্রবণতা বছরের পর বছর বাড়ছে। গেল বছরের তথ্য মতে, ২০২৫ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। যা মোট সড়ক মৃত্যুর ৩৬.২৯ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক, আইন শিথিলতা ও অব্যবস্থাপনাই এই মৃত্যুর মূল কারণ।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের (আরএসএফ)-এর গেল জুলাই মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারাদেশে ৪৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত ও ৬২৯ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ছিল ১৫৯টি। যা মোট দুর্ঘটনার ৩৪.৭১ শতাংশ। এসব দুর্ঘটনায় ১৩৮ জন প্রাণ হারান। যা মোট মৃত্যুর ৩৩.১৭ শতাংশ।

নিহতদের মধ্যে ৫৭ জন নারী ও ৪৮ জন শিশু। পথচারী হিসেবে নিহত হয়েছেন ১০৬ জন। যা মোট মৃত্যুর এক-চতুর্থাংশ। আরও ৫৩ জন শিক্ষার্থী ও ৫১ জন পরিবহন কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন।

আরএসএফের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। ওই বছর মোট ৭ হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ছিল ৩ হাজার ২৯টি। যা মোট দুর্ঘটনার ৩৯.৯৩ শতাংশ। এই দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ৬৭১ জন। যা মোট মৃত্যুর ৩৬.২৯ শতাংশ।

২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে ৯.৭ শতাংশ এবং মৃত্যু বেড়েছে ২.৩৭ শতাংশ। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। ৭ হাজার ৩৫৯ জনের মধ্যে ৫ হাজার ৭২৩ জন (৭৭.৭৬ শতাংশ) এই বয়সসীমার অন্তর্ভুক্ত।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ভয়াবহতা আরও প্রকট। আরএসএফের ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত সাড়ে সাত বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৬৪ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। যা মোট মৃত্যুর ১৫.১১ শতাংশ। এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫২.১৫ শতাংশ বা ৩ হাজার ৮৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়।

১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোটরসাইকেল আরোহী হিসেবে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে ৫ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা সাধারণত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও পণ্যবাহী যানবাহনের ধাক্কায় মারা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-

অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অদক্ষ চালক: মোটরসাইকেল চালকদের একটি বড় অংশ কিশোর ও তরুণ। যারা বেপরোয়া গতিতে চালান। আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাবে অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকরা সহজেই বাইক চালাচ্ছেন।

দেশের যানবাহনের ৭১ শতাংশ মোটরসাইকেল: আরএসএফ চেয়ারম্যান অধ্যাপক এআই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ জানান, বাংলাদেশের নিবন্ধিত যানবাহনের ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল। এক দশক আগে এই হার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। অপ্রস্তুত সড়ক অবকাঠামোয় বিপুলসংখ্যক মোটরসাইকেল চলাচল করছে।

আইন প্রয়োগের দুর্বলতা: রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট ২০১৮ থাকলেও ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ দুর্বল। হেলমেট ব্যবহার না করা, লেন শৃঙ্খলা লঙ্ঘন ও বেপরোয়া ড্রাইভিং সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সড়ক অবকাঠামোর ঘাটতি: জাতীয় ও আঞ্চলিক সড়কে মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেই। বেপরোয়া ওভারটেকিং ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনা বেশি ঘটে।

রাইডশেয়ারিংয়ে অনিয়ম: ক্রমবর্ধমান রাইডশেয়ারিং সেবায় অনেক অননুমোদিত ও অপ্রশিক্ষিত চালক যুক্ত রয়েছেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

আরএসএফের সুপারিশ অনুযায়ী, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে প্রয়োজন- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, অপ্রাপ্তবয়স্কদের বাইক চালানো বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ, হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করা, সড়ক অবকাঠামো উন্নত করা এবং রাইডশেয়ারিং সেবা নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার এই ভয়াবহতা কমানো সম্ভব-প্রয়োজন শুধু সমন্বিত উদ্যোগ ও আইনের কঠোর প্রয়োগ।


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬


দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল চালকদের মৃত্যু কেন বেশি

প্রকাশের তারিখ : ০৬ আগস্ট ২০২৬

featured Image

দেশের সড়কগুলোতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা মোট মৃত্যুর এক-তৃতীয়াংশ। এমন প্রবণতা বছরের পর বছর বাড়ছে। গেল বছরের তথ্য মতে, ২০২৫ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। যা মোট সড়ক মৃত্যুর ৩৬.২৯ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক, আইন শিথিলতা ও অব্যবস্থাপনাই এই মৃত্যুর মূল কারণ।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের (আরএসএফ)-এর গেল জুলাই মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারাদেশে ৪৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত ও ৬২৯ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ছিল ১৫৯টি। যা মোট দুর্ঘটনার ৩৪.৭১ শতাংশ। এসব দুর্ঘটনায় ১৩৮ জন প্রাণ হারান। যা মোট মৃত্যুর ৩৩.১৭ শতাংশ।

নিহতদের মধ্যে ৫৭ জন নারী ও ৪৮ জন শিশু। পথচারী হিসেবে নিহত হয়েছেন ১০৬ জন। যা মোট মৃত্যুর এক-চতুর্থাংশ। আরও ৫৩ জন শিক্ষার্থী ও ৫১ জন পরিবহন কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন।

আরএসএফের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। ওই বছর মোট ৭ হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ছিল ৩ হাজার ২৯টি। যা মোট দুর্ঘটনার ৩৯.৯৩ শতাংশ। এই দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ৬৭১ জন। যা মোট মৃত্যুর ৩৬.২৯ শতাংশ।

২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে ৯.৭ শতাংশ এবং মৃত্যু বেড়েছে ২.৩৭ শতাংশ। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। ৭ হাজার ৩৫৯ জনের মধ্যে ৫ হাজার ৭২৩ জন (৭৭.৭৬ শতাংশ) এই বয়সসীমার অন্তর্ভুক্ত।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ভয়াবহতা আরও প্রকট। আরএসএফের ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত সাড়ে সাত বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৬৪ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। যা মোট মৃত্যুর ১৫.১১ শতাংশ। এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫২.১৫ শতাংশ বা ৩ হাজার ৮৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়।

১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোটরসাইকেল আরোহী হিসেবে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে ৫ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা সাধারণত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও পণ্যবাহী যানবাহনের ধাক্কায় মারা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-

অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অদক্ষ চালক: মোটরসাইকেল চালকদের একটি বড় অংশ কিশোর ও তরুণ। যারা বেপরোয়া গতিতে চালান। আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাবে অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকরা সহজেই বাইক চালাচ্ছেন।

দেশের যানবাহনের ৭১ শতাংশ মোটরসাইকেল: আরএসএফ চেয়ারম্যান অধ্যাপক এআই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ জানান, বাংলাদেশের নিবন্ধিত যানবাহনের ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল। এক দশক আগে এই হার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। অপ্রস্তুত সড়ক অবকাঠামোয় বিপুলসংখ্যক মোটরসাইকেল চলাচল করছে।

আইন প্রয়োগের দুর্বলতা: রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট ২০১৮ থাকলেও ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ দুর্বল। হেলমেট ব্যবহার না করা, লেন শৃঙ্খলা লঙ্ঘন ও বেপরোয়া ড্রাইভিং সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সড়ক অবকাঠামোর ঘাটতি: জাতীয় ও আঞ্চলিক সড়কে মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেই। বেপরোয়া ওভারটেকিং ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনা বেশি ঘটে।

রাইডশেয়ারিংয়ে অনিয়ম: ক্রমবর্ধমান রাইডশেয়ারিং সেবায় অনেক অননুমোদিত ও অপ্রশিক্ষিত চালক যুক্ত রয়েছেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

আরএসএফের সুপারিশ অনুযায়ী, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে প্রয়োজন- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, অপ্রাপ্তবয়স্কদের বাইক চালানো বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ, হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করা, সড়ক অবকাঠামো উন্নত করা এবং রাইডশেয়ারিং সেবা নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার এই ভয়াবহতা কমানো সম্ভব-প্রয়োজন শুধু সমন্বিত উদ্যোগ ও আইনের কঠোর প্রয়োগ।



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত