সংবাদ

শব্দদূষণ: কঠোর আইনেও ঘাটতি প্রয়োগে, ভরসা জনসচেতনতা


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ৬ আগস্ট ২০২৬, ০৭:১৫ পিএম

শব্দদূষণ: কঠোর আইনেও ঘাটতি প্রয়োগে, ভরসা জনসচেতনতা
ছবি : সংগৃহীত

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়ার কথা বলছে সরকার। পরিবেশ অধিদপ্তর শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে নতুন এই বিধিমালায় পুরনো আইনের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে শব্দের সহনীয় মাত্রা ১০ ডেসিবেল বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে এলাকাভেদে শব্দের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০০৬ সালের নিয়মে আবাসিক এলাকায় দিনে সর্বোচ্চ ৫৫ ডেসিবেল ও রাতে ৪৫ ডেসিবেল এবং নীরব এলাকায় ৫০ ডেসিবেল ছিল। 

কিন্তু নতুন বিধিমালায় আবাসিক এলাকায় দিনে ৬০ ডেসিবেল, রাতে ৫০ ডেসিবেল; নীরব এলাকায় দিনে ৫০ ডেসিবেল, রাতে ৪০ ডেসিবেল নির্ধারণ করা হয়েছে। বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ ডেসিবেল ও রাতে ৬০ ডেসিবেল অপরিবর্তিত রয়েছে।

বিধিমালার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে- কোনো উচ্চ শব্দ উৎপন্নকারী যন্ত্র বা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নির্ধারিত শব্দমাত্রা অতিক্রম করা যাবে না। কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া পারিবারিক অনুষ্ঠান, সামাজিক আয়োজন বা জনসমাবেশে উচ্চ শব্দের সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করা যাবে না। অনুমতি পেলেও শব্দমাত্রা ৯০ ডেসিবেলের বেশি এবং ব্যবহারের সময় ৫ ঘণ্টার বেশি হতে পারবে না।

গেল বছরের ২৫ নভেম্বর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় নতুন শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫ জারি করে। এতে এলাকাভেদে শব্দের নির্দিষ্ট মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নীরব এলাকায় (হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালতের ১০০ মিটারের মধ্যে) দিনে ৫০, রাতে ৪০ ডেসিবেল, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫, রাতে ৪৫ ডেসিবেল (পুরনো নিয়ম), নতুন বিধিমালায় দিনে ৬০, রাতে ৫০, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০, রাতে ৬০ ডেসিবেল, মিশ্র এলাকায় দিনে ৬০, রাতে ৫০ ডেসিবেল ও শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫, রাতে ৭০ ডেসিবেল নির্ধারণ করা হয়েছে।

পাশাপাশি নিষিদ্ধ করা হয়েছে নির্ধারিত মান অতিক্রমকারী হর্ন, হাইড্রোলিক হর্ন ও মাল্টি টিউন হর্ন আমদানি, উৎপাদন, মজুদ ও বিক্রি। নীরব এলাকায় হর্ন বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, আবাসিক এলাকায় রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত হর্ন বাজানো যাবে না। আবাসিক এলাকার শেষ সীমানা থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত নির্মাণকাজে শব্দসৃষ্টিকারী যন্ত্রপাতি চালানো যাবে না।

বিধি লঙ্ঘনের শাস্তিও কঠোর- সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয়দণ্ড।

আইনের কঠোরতা থাকলেও বাস্তবতা অন্য চিত্র তুলে ধরে। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০ সালের এক জরিপে রাজধানীর পল্টন বাসস্ট্যান্ডে শব্দের মাত্রা পাওয়া যায় ১৯২ দশমিক ২ ডেসিবেল, সচিবালয়ের গেটে ১২৮ দশমিক ২, জাতীয় প্রেস ক্লাবের পাশে ১২৪ দশমিক ২ ডেসিবেল। ২০২২ সালে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় শব্দের মাত্রা ১১৯ ডেসিবেল, যা বিশ্বের শীর্ষে।

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেসের (বিইউএইচএস) ২০২২ সালের গবেষণা বলছে, প্রতি চারজনে একজন (২৫ শতাংশ) কানে কম শোনেন। রিকশাচালকদের মধ্যে এই হার প্রায় ৪২ শতাংশ।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, ‘শব্দদূষণের নানা আইনি কাঠামো থাকলেও বাস্তবায়নে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যেমন আইনে হাইড্রোলিক হর্ন নিষিদ্ধ, কিন্তু বাজারে তা পাওয়া যায়। তাহলে আমদানি হচ্ছে কীভাবে?’

পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ট্রাফিক সার্জেন্ট বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সামনে শব্দদূষণের ঘটনা ঘটলে তারা ঘটনাস্থলেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবেন। একই সঙ্গে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে।

তবে বাস্তবতা হলো- কঠোর আইন প্রয়োগে মানুষ নিজেই নিয়ম মেনে চলার বিষয় এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ, আইনের কঠোর প্রয়োগ ও জনসচেতনতা ছাড়া এই নীরব ঘাতকের থাবা থেকে নগরবাসীকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। এমনটাই বলছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬


শব্দদূষণ: কঠোর আইনেও ঘাটতি প্রয়োগে, ভরসা জনসচেতনতা

প্রকাশের তারিখ : ০৬ আগস্ট ২০২৬

featured Image

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়ার কথা বলছে সরকার। পরিবেশ অধিদপ্তর শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে নতুন এই বিধিমালায় পুরনো আইনের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে শব্দের সহনীয় মাত্রা ১০ ডেসিবেল বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে এলাকাভেদে শব্দের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০০৬ সালের নিয়মে আবাসিক এলাকায় দিনে সর্বোচ্চ ৫৫ ডেসিবেল ও রাতে ৪৫ ডেসিবেল এবং নীরব এলাকায় ৫০ ডেসিবেল ছিল। 

কিন্তু নতুন বিধিমালায় আবাসিক এলাকায় দিনে ৬০ ডেসিবেল, রাতে ৫০ ডেসিবেল; নীরব এলাকায় দিনে ৫০ ডেসিবেল, রাতে ৪০ ডেসিবেল নির্ধারণ করা হয়েছে। বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ ডেসিবেল ও রাতে ৬০ ডেসিবেল অপরিবর্তিত রয়েছে।

বিধিমালার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে- কোনো উচ্চ শব্দ উৎপন্নকারী যন্ত্র বা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নির্ধারিত শব্দমাত্রা অতিক্রম করা যাবে না। কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া পারিবারিক অনুষ্ঠান, সামাজিক আয়োজন বা জনসমাবেশে উচ্চ শব্দের সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করা যাবে না। অনুমতি পেলেও শব্দমাত্রা ৯০ ডেসিবেলের বেশি এবং ব্যবহারের সময় ৫ ঘণ্টার বেশি হতে পারবে না।

গেল বছরের ২৫ নভেম্বর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় নতুন শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫ জারি করে। এতে এলাকাভেদে শব্দের নির্দিষ্ট মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নীরব এলাকায় (হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালতের ১০০ মিটারের মধ্যে) দিনে ৫০, রাতে ৪০ ডেসিবেল, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫, রাতে ৪৫ ডেসিবেল (পুরনো নিয়ম), নতুন বিধিমালায় দিনে ৬০, রাতে ৫০, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০, রাতে ৬০ ডেসিবেল, মিশ্র এলাকায় দিনে ৬০, রাতে ৫০ ডেসিবেল ও শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫, রাতে ৭০ ডেসিবেল নির্ধারণ করা হয়েছে।

পাশাপাশি নিষিদ্ধ করা হয়েছে নির্ধারিত মান অতিক্রমকারী হর্ন, হাইড্রোলিক হর্ন ও মাল্টি টিউন হর্ন আমদানি, উৎপাদন, মজুদ ও বিক্রি। নীরব এলাকায় হর্ন বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, আবাসিক এলাকায় রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত হর্ন বাজানো যাবে না। আবাসিক এলাকার শেষ সীমানা থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত নির্মাণকাজে শব্দসৃষ্টিকারী যন্ত্রপাতি চালানো যাবে না।

বিধি লঙ্ঘনের শাস্তিও কঠোর- সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয়দণ্ড।

আইনের কঠোরতা থাকলেও বাস্তবতা অন্য চিত্র তুলে ধরে। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০ সালের এক জরিপে রাজধানীর পল্টন বাসস্ট্যান্ডে শব্দের মাত্রা পাওয়া যায় ১৯২ দশমিক ২ ডেসিবেল, সচিবালয়ের গেটে ১২৮ দশমিক ২, জাতীয় প্রেস ক্লাবের পাশে ১২৪ দশমিক ২ ডেসিবেল। ২০২২ সালে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় শব্দের মাত্রা ১১৯ ডেসিবেল, যা বিশ্বের শীর্ষে।

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেসের (বিইউএইচএস) ২০২২ সালের গবেষণা বলছে, প্রতি চারজনে একজন (২৫ শতাংশ) কানে কম শোনেন। রিকশাচালকদের মধ্যে এই হার প্রায় ৪২ শতাংশ।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, ‘শব্দদূষণের নানা আইনি কাঠামো থাকলেও বাস্তবায়নে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যেমন আইনে হাইড্রোলিক হর্ন নিষিদ্ধ, কিন্তু বাজারে তা পাওয়া যায়। তাহলে আমদানি হচ্ছে কীভাবে?’

পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ট্রাফিক সার্জেন্ট বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সামনে শব্দদূষণের ঘটনা ঘটলে তারা ঘটনাস্থলেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবেন। একই সঙ্গে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে।

তবে বাস্তবতা হলো- কঠোর আইন প্রয়োগে মানুষ নিজেই নিয়ম মেনে চলার বিষয় এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ, আইনের কঠোর প্রয়োগ ও জনসচেতনতা ছাড়া এই নীরব ঘাতকের থাবা থেকে নগরবাসীকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। এমনটাই বলছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত