সংবাদ

গ্যাসের মজুদে চলবে আর ৫ বছর, এরপর কী হবে?


ফয়েজ আহমেদ তুষার
ফয়েজ আহমেদ তুষার
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪৮ পিএম

গ্যাসের মজুদে চলবে আর ৫ বছর, এরপর কী হবে?
ছবি : সংগৃহীত

দেশে চলমান জ্বালানি সংকটে শিল্পোৎপাদন হ্রাস, লোডশেডিংয়ে জনভোগান্তির মধ্যে দেশি গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ ফুরিয়ে আসার তথ্য দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির এক উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে; উৎপাদনও কমছে। 

বড় আকারের নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের উল্লেখযোগ্য কোন খবরও নেই। এর মধ্যে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আবাসিক খাতে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে যে হারে গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে অবশিষ্ট গ্যাসের মজুত ২০৩১ সালের মধ্যে প্রায় নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। 

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) ঢাকায় রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইন মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট: তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

সিপিডির উপস্থাপনায় গত ১১ আগস্টের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, পাঁচটি গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচালন সক্ষমতার মাত্র ৫৭ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছিল। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট গ্যাস চাহিদার মাত্র ২৯ শতাংশ সরবরাহ করা হয়েছে। সার কারখানাগুলোও তাদের প্রয়োজনীয় গ্যাসের মাত্র ৩৮ শতাংশ পেয়েছে। এই ঘাটতির কারণে গার্মেন্টস ও সার কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কমানো বা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। 

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হয়ে দেশের শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে চলমান গ্যাস-সংকট নিরসনে সরকারের সীমিত সামর্থ্য ও বর্তমান কাঠামোগত পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) মেরামত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই।

তিনি জানান, গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ সংকট বিবেচনায় ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি ‘ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট’ (এফএসআরইউ) বা ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের সম্ভাব্য স্থান নিয়ে কাজ চলছে।

চলমান গ্যাস সংকট নিরসনে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে উল্লেখ করে জ্বালানিনিমন্ত্রী বলেন, ‘এইটুকুই বলতে চাই, উই আর ওয়ার্কিং...এই ক্রাইসিসের সময় আসলে এখন আমার কিছু করার নাই। কারণ, এখন আমি গ্যাসও উত্তোলন করতে পারব না বা উইদাউট এফএসআরইউ, আমার যে গ্যাস আছে, সেটাও নামাতে পারব না।’

গ্যাসক্ষেত্র

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ হয় প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসে প্রায় ১৬০ থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস।

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির জন্য বর্তমানে বাংলাদেশের মহেশখালীর উপকূলে দুটি এফএসআরইউ রয়েছে- একটি সামিটের অন্যটি এক্সিলারেটের। আগুন লাগার কারণে এক্সিলারেটের টার্মিনালটি বন্ধ থাকায় সেই সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। মেরমতের মাধ্যমে একটি ইউনিট চালু করা গেলেও অপরটি এখনো বন্ধ রয়েছে।

বিদেশি প্রকৌশলীরা এফএসআরইউ মেরামতে কাজ করছেন উল্লেখ করে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘এখন শুধু আমাকে দিন গোনা ছাড়া আর ওই যে ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছে এফএসআরইউতে, এটা করা ছাড়া আমার কিছু নাই। আর কিছু ম্যানেজমেন্ট করা, যাতে কম লোডশেডিং হয়। যাতে আমি ইন্ডাস্ট্রিকে গ্যাসটা দিতে পারি, এই ম্যানেজমেন্টটা করা। এ ছাড়া আপনিই বলেন আমার হাতে আর কী থাকতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘এফএসআরইউটি মেরামতের পর এর দুটি বয়লারকে সমন্বিতভাবে চালু করতে আরও ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হবে। ফলে ওই সময়ে গ্যাস সরবরাহে আবারও বড় ধরনের সাময়িক ঘাটতি তৈরি হতে পারে।’

জ্বালানিমন্ত্রী জানান, নতুন টার্মিনালগুলো নির্মাণে বিনিয়োগকারী খোঁজা হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করা একটি মার্কিন প্রতিনিধি দলও এফএসআরইউতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের আগ্রহ প্রকাশ করে দ্রুত চিঠি দিতে বলেছি, যাতে প্রকল্পগুলো নিয়ে এগিয়ে যেতে পারি।’

চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে বক্তব্যে মন্ত্রী বর্তমান পরিস্থিতির জন্য শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। দেশে বিদ্যুতের চাহিদার ‘ধরন’ বদলে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকত। এখন মধ্যরাতেও চাহিদা বেশি থাকে। আগের দিন রাত ১২টার দিকে দেশে প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা ছিল জানিয়ে এর কারণ হিসেবে রাতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দেওয়ার প্রবণতার কথা বলেন মন্ত্রী।

এলএনজি টার্মিনাল

এসব বাহনকে ‘গরিবের টেসলা’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা রাতে চার্জে বসে। এসব চার্জিংয়ের বড় অংশ অবৈধ সংযোগে চলে।’ অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীদের বাধা ও হামলার মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন মন্ত্রী।

এলএনজি ক্রয় চলমান

ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউর কারণে সরকার এলএনজি আমদানি বন্ধ করেনি উল্লেখ করে মন্ত্রী ইকবাল হাসান বলেন, ‘আমরা গতকাল (বুধবার) চারটি এলএনজি কার্গো কিনেছি, যাতে এফএসআরইউ প্রস্তুত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব কার্গো দেশে পৌঁছাতে পারে।’ এসব ক্রয়কৃত এলএনজি দ্রুত খালাস করা সম্ভব হলে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি চালু হওয়ার পর গ্যাস সংকট অনেকটাই কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। 

অনুষ্ঠানে জ্বালানিমন্ত্রী দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা এবং বেসরকারি খাতে তেল আমদানির সুযোগ দিতে নীতিমালা তৈরীর উদ্যোগের কথাও জানান। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) দ্রুত খননকাজ চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধান সক্ষমতা বাড়াতে আরও দুটি রিগ আনার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।’ 

জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সব অংশীজনের সঙ্গে বসব, তাদের মতামত নেব এবং কীভাবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে জ্বালানি তেলের বাজার কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করব।’

গ্যাসের মজুত ‘সংকটজনক পর্যায়ে’

সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফখরুল আল কবির অনুষ্ঠানে গ্যাসের বর্তমান চাহিদা ও সরবরাহ এবং মজুদ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন। উপস্থাপনায় ছয় দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা হয়, ২০৩১ সালের মধ্যে দেশে গ্যাসের মোট ব্যবহার প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে অবশিষ্ট গ্যাসের মজুত প্রায় নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমান হারে গ্যাস ব্যবহার অব্যাহত থাকলে ২০৩০-এর দশকের শুরুতেই মজুত সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এ পরিস্থিতিতে গ্যাস সংরক্ষণ ও দেশে নতুন গ্যাসের অনুসন্ধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

উপস্থাপনায় বলা হয়, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার ৪২ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক। এ ছাড়া কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের ওপরও উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা রয়েছে। ফলে দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের কথা বলেছে সিপিডি। স্বল্প মেয়াদে এলএনজি ক্রয়ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা, মূল্য নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থায় সংস্কার এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। মধ্য মেয়াদে এলএনজি টার্মিনাল ও সংরক্ষণ অবকাঠামো সম্প্রসারণ, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থায় বিনিয়োগ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের কথা বলা হয়েছে।

ফখরুল আল কবির বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে জাতীয় জরুরি অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে হবে। 

কারখানায় ‘৩৫-৪০%’ উৎপাদন হ্রাস

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ অনুষ্ঠানে বলেন, দেশে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটের কারণে কারখানাগুলোতে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। তিনি বলেন, এই সংকটের ফলে শিল্প খাত গভীর বিপর্যয়ে পড়েছে। সংকট বড় করে প্রচার হওয়ায় তৈরি পোশাক খাতের বিদেশি অর্ডার হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

উচ্চ হারে বিল দিয়েও সময়মতো জ্বালানি না পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা ব্যাংকঋণ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কায় আছেন উল্লেখ করে বিসিআই সভাপতি ব্যবসা ও কর্মসংস্থান বাঁচাতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি জরুরি সুরক্ষা বা ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ দেওয়ার দাবি জানান।

ল্যান্ডবেজড টার্মিনাল

বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, গ্যাসের তীব্র ঘাটতির কারণে দেশের একটি বড় অংশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র টানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশীয় কূপে উৎপাদন দ্রুত কমতে থাকায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ সময়সাপেক্ষ। তাই দ্রুত সংকট মোকাবিলা ও ভবিষ্যৎ জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিতে ‘ল্যান্ডবেজড টার্মিনাল’ বা স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের ওপর তাগিদ দেন তিনি।

রিনিউয়েবল এনার্জি

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দেওয়ার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট কাটাতে কাস্টমস ও প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত দূর করতে পোর্টের খালাসপ্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। স্টোরেজ প্রযুক্তিতে শুল্কছাড় দেওয়া এবং ১৩ লাখ ডিজেলচালিত সেচপাম্প সোলারে রূপান্তর করলে দ্রুত সাশ্রয় সম্ভব।

সিস্টেম লস

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বক্তব্যে দেশের তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটের জন্য সরকারের অতিরিক্ত সামাজিক প্রতিশ্রুতি, সঠিক মূল্যনীতির অভাব ও সিস্টেম লসকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, সংকট সমাধানের চেষ্টা না করে বছরের পর বছর তা জমিয়ে রেখে আজ এ পর্যায়ে আনা হয়েছে। কেবল সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা না করে চাহিদা নিয়ন্ত্রণেও জোর দিতে হবে। 

তিনি বলেন, সাশ্রয়ী মূল্যে শতভাগ বিদ্যুতায়ন ও আবাসিকে ভর্তুকি মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করার কারণে সরকার এখন বড় অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে। কোনো সরকারের পক্ষেই হঠাৎ এ ঘাটতি মেটানো সম্ভব নয়। তাই বাস্তবভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ও চুরি বন্ধের কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি শিল্প খাতকেও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান

লোডশেডিংয়ের সূচি

সিপিডির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘জ্বালানি সংকটে দেশের শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় আমাদের মানসম্মত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ জরুরি।’ তিনি লোডশেডিংয়ের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ ও সিস্টেম লস কমানোর তাগিদ দেন। এ ছাড়া সোলার স্টোরেজে করছাড় এবং শিল্প খাতকে জ্বালানি বণ্টনে অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ দেন।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের টেকসই সমাধানে সাময়িক পদক্ষেপের বদলে ১০ বছর মেয়াদি সমন্বিত নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলেন সিপিডি নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। 

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, জ্বালানি খাতে সঠিক বাজারভিত্তিক মূল্যনীতি এবং নির্ধারিত লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি না থাকায় সংকট আরও গভীর হয়েছে।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, শিল্প, কৃষি ও সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে অতীতের সুশাসনের অভাব ও সংস্কারহীনতা দূর করে সরকারকে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সাকিব বিন আমিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা প্রমুখ।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬


গ্যাসের মজুদে চলবে আর ৫ বছর, এরপর কী হবে?

প্রকাশের তারিখ : ১৩ আগস্ট ২০২৬

featured Image

দেশে চলমান জ্বালানি সংকটে শিল্পোৎপাদন হ্রাস, লোডশেডিংয়ে জনভোগান্তির মধ্যে দেশি গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ ফুরিয়ে আসার তথ্য দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির এক উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে; উৎপাদনও কমছে। 

বড় আকারের নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের উল্লেখযোগ্য কোন খবরও নেই। এর মধ্যে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আবাসিক খাতে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে যে হারে গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে অবশিষ্ট গ্যাসের মজুত ২০৩১ সালের মধ্যে প্রায় নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। 

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) ঢাকায় রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইন মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট: তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

সিপিডির উপস্থাপনায় গত ১১ আগস্টের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, পাঁচটি গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচালন সক্ষমতার মাত্র ৫৭ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছিল। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট গ্যাস চাহিদার মাত্র ২৯ শতাংশ সরবরাহ করা হয়েছে। সার কারখানাগুলোও তাদের প্রয়োজনীয় গ্যাসের মাত্র ৩৮ শতাংশ পেয়েছে। এই ঘাটতির কারণে গার্মেন্টস ও সার কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কমানো বা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। 

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হয়ে দেশের শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে চলমান গ্যাস-সংকট নিরসনে সরকারের সীমিত সামর্থ্য ও বর্তমান কাঠামোগত পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) মেরামত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই।

তিনি জানান, গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ সংকট বিবেচনায় ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি ‘ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট’ (এফএসআরইউ) বা ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের সম্ভাব্য স্থান নিয়ে কাজ চলছে।

চলমান গ্যাস সংকট নিরসনে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে উল্লেখ করে জ্বালানিনিমন্ত্রী বলেন, ‘এইটুকুই বলতে চাই, উই আর ওয়ার্কিং...এই ক্রাইসিসের সময় আসলে এখন আমার কিছু করার নাই। কারণ, এখন আমি গ্যাসও উত্তোলন করতে পারব না বা উইদাউট এফএসআরইউ, আমার যে গ্যাস আছে, সেটাও নামাতে পারব না।’

গ্যাসক্ষেত্র

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ হয় প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসে প্রায় ১৬০ থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস।

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির জন্য বর্তমানে বাংলাদেশের মহেশখালীর উপকূলে দুটি এফএসআরইউ রয়েছে- একটি সামিটের অন্যটি এক্সিলারেটের। আগুন লাগার কারণে এক্সিলারেটের টার্মিনালটি বন্ধ থাকায় সেই সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। মেরমতের মাধ্যমে একটি ইউনিট চালু করা গেলেও অপরটি এখনো বন্ধ রয়েছে।

বিদেশি প্রকৌশলীরা এফএসআরইউ মেরামতে কাজ করছেন উল্লেখ করে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘এখন শুধু আমাকে দিন গোনা ছাড়া আর ওই যে ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছে এফএসআরইউতে, এটা করা ছাড়া আমার কিছু নাই। আর কিছু ম্যানেজমেন্ট করা, যাতে কম লোডশেডিং হয়। যাতে আমি ইন্ডাস্ট্রিকে গ্যাসটা দিতে পারি, এই ম্যানেজমেন্টটা করা। এ ছাড়া আপনিই বলেন আমার হাতে আর কী থাকতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘এফএসআরইউটি মেরামতের পর এর দুটি বয়লারকে সমন্বিতভাবে চালু করতে আরও ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হবে। ফলে ওই সময়ে গ্যাস সরবরাহে আবারও বড় ধরনের সাময়িক ঘাটতি তৈরি হতে পারে।’

জ্বালানিমন্ত্রী জানান, নতুন টার্মিনালগুলো নির্মাণে বিনিয়োগকারী খোঁজা হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করা একটি মার্কিন প্রতিনিধি দলও এফএসআরইউতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের আগ্রহ প্রকাশ করে দ্রুত চিঠি দিতে বলেছি, যাতে প্রকল্পগুলো নিয়ে এগিয়ে যেতে পারি।’

চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে বক্তব্যে মন্ত্রী বর্তমান পরিস্থিতির জন্য শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। দেশে বিদ্যুতের চাহিদার ‘ধরন’ বদলে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকত। এখন মধ্যরাতেও চাহিদা বেশি থাকে। আগের দিন রাত ১২টার দিকে দেশে প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা ছিল জানিয়ে এর কারণ হিসেবে রাতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দেওয়ার প্রবণতার কথা বলেন মন্ত্রী।

এলএনজি টার্মিনাল

এসব বাহনকে ‘গরিবের টেসলা’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা রাতে চার্জে বসে। এসব চার্জিংয়ের বড় অংশ অবৈধ সংযোগে চলে।’ অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীদের বাধা ও হামলার মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন মন্ত্রী।

এলএনজি ক্রয় চলমান

ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউর কারণে সরকার এলএনজি আমদানি বন্ধ করেনি উল্লেখ করে মন্ত্রী ইকবাল হাসান বলেন, ‘আমরা গতকাল (বুধবার) চারটি এলএনজি কার্গো কিনেছি, যাতে এফএসআরইউ প্রস্তুত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব কার্গো দেশে পৌঁছাতে পারে।’ এসব ক্রয়কৃত এলএনজি দ্রুত খালাস করা সম্ভব হলে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি চালু হওয়ার পর গ্যাস সংকট অনেকটাই কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। 

অনুষ্ঠানে জ্বালানিমন্ত্রী দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা এবং বেসরকারি খাতে তেল আমদানির সুযোগ দিতে নীতিমালা তৈরীর উদ্যোগের কথাও জানান। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) দ্রুত খননকাজ চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধান সক্ষমতা বাড়াতে আরও দুটি রিগ আনার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।’ 

জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সব অংশীজনের সঙ্গে বসব, তাদের মতামত নেব এবং কীভাবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে জ্বালানি তেলের বাজার কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করব।’

গ্যাসের মজুত ‘সংকটজনক পর্যায়ে’

সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফখরুল আল কবির অনুষ্ঠানে গ্যাসের বর্তমান চাহিদা ও সরবরাহ এবং মজুদ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন। উপস্থাপনায় ছয় দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা হয়, ২০৩১ সালের মধ্যে দেশে গ্যাসের মোট ব্যবহার প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে অবশিষ্ট গ্যাসের মজুত প্রায় নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমান হারে গ্যাস ব্যবহার অব্যাহত থাকলে ২০৩০-এর দশকের শুরুতেই মজুত সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এ পরিস্থিতিতে গ্যাস সংরক্ষণ ও দেশে নতুন গ্যাসের অনুসন্ধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

উপস্থাপনায় বলা হয়, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার ৪২ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক। এ ছাড়া কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের ওপরও উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা রয়েছে। ফলে দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের কথা বলেছে সিপিডি। স্বল্প মেয়াদে এলএনজি ক্রয়ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা, মূল্য নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থায় সংস্কার এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। মধ্য মেয়াদে এলএনজি টার্মিনাল ও সংরক্ষণ অবকাঠামো সম্প্রসারণ, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থায় বিনিয়োগ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের কথা বলা হয়েছে।

ফখরুল আল কবির বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে জাতীয় জরুরি অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে হবে। 

কারখানায় ‘৩৫-৪০%’ উৎপাদন হ্রাস

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ অনুষ্ঠানে বলেন, দেশে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটের কারণে কারখানাগুলোতে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। তিনি বলেন, এই সংকটের ফলে শিল্প খাত গভীর বিপর্যয়ে পড়েছে। সংকট বড় করে প্রচার হওয়ায় তৈরি পোশাক খাতের বিদেশি অর্ডার হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

উচ্চ হারে বিল দিয়েও সময়মতো জ্বালানি না পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা ব্যাংকঋণ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কায় আছেন উল্লেখ করে বিসিআই সভাপতি ব্যবসা ও কর্মসংস্থান বাঁচাতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি জরুরি সুরক্ষা বা ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ দেওয়ার দাবি জানান।

ল্যান্ডবেজড টার্মিনাল

বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, গ্যাসের তীব্র ঘাটতির কারণে দেশের একটি বড় অংশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র টানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশীয় কূপে উৎপাদন দ্রুত কমতে থাকায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ সময়সাপেক্ষ। তাই দ্রুত সংকট মোকাবিলা ও ভবিষ্যৎ জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিতে ‘ল্যান্ডবেজড টার্মিনাল’ বা স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের ওপর তাগিদ দেন তিনি।

রিনিউয়েবল এনার্জি

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দেওয়ার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট কাটাতে কাস্টমস ও প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত দূর করতে পোর্টের খালাসপ্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। স্টোরেজ প্রযুক্তিতে শুল্কছাড় দেওয়া এবং ১৩ লাখ ডিজেলচালিত সেচপাম্প সোলারে রূপান্তর করলে দ্রুত সাশ্রয় সম্ভব।

সিস্টেম লস

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বক্তব্যে দেশের তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটের জন্য সরকারের অতিরিক্ত সামাজিক প্রতিশ্রুতি, সঠিক মূল্যনীতির অভাব ও সিস্টেম লসকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, সংকট সমাধানের চেষ্টা না করে বছরের পর বছর তা জমিয়ে রেখে আজ এ পর্যায়ে আনা হয়েছে। কেবল সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা না করে চাহিদা নিয়ন্ত্রণেও জোর দিতে হবে। 

তিনি বলেন, সাশ্রয়ী মূল্যে শতভাগ বিদ্যুতায়ন ও আবাসিকে ভর্তুকি মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করার কারণে সরকার এখন বড় অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে। কোনো সরকারের পক্ষেই হঠাৎ এ ঘাটতি মেটানো সম্ভব নয়। তাই বাস্তবভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ও চুরি বন্ধের কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি শিল্প খাতকেও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান

লোডশেডিংয়ের সূচি

সিপিডির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘জ্বালানি সংকটে দেশের শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় আমাদের মানসম্মত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ জরুরি।’ তিনি লোডশেডিংয়ের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ ও সিস্টেম লস কমানোর তাগিদ দেন। এ ছাড়া সোলার স্টোরেজে করছাড় এবং শিল্প খাতকে জ্বালানি বণ্টনে অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ দেন।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের টেকসই সমাধানে সাময়িক পদক্ষেপের বদলে ১০ বছর মেয়াদি সমন্বিত নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলেন সিপিডি নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। 

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, জ্বালানি খাতে সঠিক বাজারভিত্তিক মূল্যনীতি এবং নির্ধারিত লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি না থাকায় সংকট আরও গভীর হয়েছে।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, শিল্প, কৃষি ও সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে অতীতের সুশাসনের অভাব ও সংস্কারহীনতা দূর করে সরকারকে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সাকিব বিন আমিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা প্রমুখ।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত