সংবাদ

শিশুরা হারাচ্ছে, নাকি পরিবার থেকে পালাচ্ছে!


মো. জোহান
মো. জোহান
প্রকাশ: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৮ পিএম

শিশুরা হারাচ্ছে, নাকি পরিবার থেকে পালাচ্ছে!
প্রতীকী ছবি।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই—মাত্র সাত মাসে সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুকে নিখোঁজ দেখিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এখনো সন্ধান মেলেনি ২ হাজার ৩৮ জনের।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশ জানায়, সম্প্রতি গণমাধ্যমে শুধু নিখোঁজের সংখ্যা তুলে ধরা হলেও উদ্ধারের হার সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রকাশ না করায় জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বিষয়টি স্পষ্ট করতে স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য যাচাই করা হয়েছে।

শিশু নিখোঁজের ১৫ হাজার ৭১৭ সংখ্যাটি প্রথম দেখায় আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। কিন্তু পুলিশের তথ্যের আরেকটি দিকও আছে—নিখোঁজের জিডি করা শিশুদের প্রায় ৮৭ শতাংশকেই পরে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে গেছে। ফলে নিখোঁজের জিডির সংখ্যা আর স্থায়ীভাবে নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা এক নয়।

তবে এখানেই আলোচনা শেষ নয়। বরং শুরু। কারণ, যে প্রশ্নটি সামনে আসে তা হলো- কেন প্রতি মাসে গড়ে দুই হাজারের বেশি শিশু-কিশোরকে নিয়ে পরিবারকে পুলিশের কাছে ছুটতে হচ্ছে। যদিও শিশু নয়, বরং কিশোররাই সংখ্যায় বেশি।ফলে প্রদত্ত পরিসংখ্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি বয়সভিত্তিক বিভাজন।

হাসিখুশি শিশুরা

শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত নিখোঁজের জিডি হয়েছে ৪৭৪টি। তাদের মধ্যে ৪০৬ জন উদ্ধার হয়েছে, এখনো নিখোঁজ ৬৮ জন। অন্যদিকে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। উদ্ধার হয়েছে ১৩ হাজার ২৭৩ জন। এখনো নিখোঁজ ১ হাজার ৯৭০ জন।অর্থাৎ মোট জিডির প্রায় ৯৭ শতাংশই ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে।

এই একটি তথ্যই সমস্যাটির চরিত্র অনেকটাই বদলে দেয়। এটি শুধু শিশু হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা নয়; এর বড় অংশ কৈশোরের সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত। ছোট শিশু হারিয়ে যেতে পারে পথ ভুলে, পরিচিতজনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কিংবা নিজের ঠিকানা বলতে না পারার কারণে। কিন্তু একজন কিশোর সাধারণত জেনে-বুঝেই বাড়ি থেকে বের হয়। তার পেছনে থাকে কোনো অভিমান, দ্বন্দ্ব, ভয়, চাপ, সম্পর্ক কিংবা স্বাধীনভাবে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা।

তাই কিশোর নিখোঁজের ঘটনা অনেক ক্ষেত্রে সমাজের কাছে একটি সতর্কবার্তা—পরিবারের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? পুলিশের বিশ্লেষণে কিশোর-কিশোরীদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে উঠে এসেছে অভিমান, পারিবারিক কলহ, পড়ালেখার চাপ, স্বাধীন জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার পর লজ্জা বা ভয়, পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা সুবিধা আদায়ের কৌশল এবং বন্ধুদের প্রভাব। কারণগুলোর তালিকা দেখলেই বোঝা যায়, ঘটনাগুলোর বড় অংশের শিকড় পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কের ভেতরে।

কৈশোর এমন একটি সময়, যখন একজন মানুষ একই সঙ্গে স্বাধীন হতে চায় এবং নিরাপত্তাও চায়। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাড়ে, অথচ অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার সীমাবদ্ধতা থাকে। এই সময়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ দুর্বল হলে সামান্য বিরোধও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।

পরীক্ষার ফল খারাপ হয়েছে। বাবা-মা বকেছেন। কোনো বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক পরিবার মেনে নেয়নি। ঘরে প্রতিদিন ঝগড়া। পড়াশোনার চাপ অসহনীয় মনে হচ্ছে। কিংবা কোনো ভুল করার পর বাড়িতে ফিরতে ভয় হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে একজন কিশোরের কাছে বাড়ি থেকে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের জন্য দূরে চলে যাওয়া সহজ সমাধান মনে হতে পারে।

কৌতুহলী শিশু

তাই নিখোঁজের অনেক ঘটনাকে শুধু ‘শিশু কোথায় গেল’ প্রশ্নে আটকে রাখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। প্রশ্ন করতে হবে—‘কেন সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল?’

বাংলাদেশে শিক্ষাজীবন ক্রমেই প্রতিযোগিতামূলক হচ্ছে। ভালো ফল, নামি স্কুল-কলেজ, কোচিং, ভর্তি পরীক্ষা—সবকিছু ঘিরেই তৈরি হচ্ছে প্রবল প্রত্যাশা। অনেক পরিবার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে গিয়ে অজান্তেই সেই প্রত্যাশাকে চাপের পর্যায়ে নিয়ে যায়। সমস্যা শুধু বেশি পড়তে বলা নয়। বরং ব্যর্থতা নিয়ে ভয়, অন্যের সঙ্গে তুলনা, প্রত্যাশা পূরণ না হলে অপমান বা শাস্তির আশঙ্কা—এসবও কিশোরের মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।

একজন কিশোর যখন মনে করে তার সমস্যার কথা বললে তাকে বোঝার বদলে বকা হবে, তখন সে সমস্যাটি পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায় না। আর যোগাযোগের জায়গাটি যত দুর্বল হয়, পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তত সহজ হতে পারে।

কৈশোরে বন্ধুত্বের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে বন্ধু বা সহপাঠীর মতামত বাবা-মায়ের মতামতের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। আগে একজন কিশোর বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে কোথায় যাবে, কার কাছে যাবে—এসব ছিল বড় প্রশ্ন। এখন সেই বাস্তবতা বদলেছে।

স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একজন কিশোরকে এমন মানুষের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, যাদের পরিবার কখনো দেখেনি বা চেনে না। ফলে বাড়ির বাইরে বিকল্প যোগাযোগ, থাকার ব্যবস্থা কিংবা সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। 

এখানে প্রযুক্তিকে এককভাবে দায়ী করা ঠিক হবে না। প্রযুক্তি মূল সমস্যা নয়; বরং পারিবারিক বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ওপর প্রযুক্তি একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আরেকটি বিষয়ও বিবেচনায় রাখা জরুরি। পুলিশ জানিয়েছে, অনলাইন জিডি চালু হওয়ার পর নিখোঁজের অভিযোগ করার প্রবণতা বেড়েছে।

২০২৩ সালে নিখোঁজ-সংক্রান্ত জিডি হয়েছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি। ২০২৪ সালে তা কিছুটা কমে ১৬ হাজার ৪১৪টিতে নামে। ২০২৫ সালে আবার বেড়ে দাঁড়ায় ২২ হাজার ৫৫০টিতে। অর্থাৎ জিডির সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে বাস্তবে নিখোঁজ শিশুর সংখ্যাও একই হারে বেড়েছে। অনলাইন জিডির ফলে অভিযোগ করা সহজ হয়েছে। ফলে আগে যে পরিবার থানায় যেতে সংকোচ করত বা দেরি করত, তারাও এখন দ্রুত অভিযোগ করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও বলেছেন, নিখোঁজের ঘটনায় করা সব জিডির শিশু দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকে না; বড় একটি অংশ পরে পরিবারের কাছে ফিরে আসে। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, কতজন শিশু শেষ পর্যন্ত ফিরে আসেনি, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সরকারের কাছে নেই।

এই তথ্যের ঘাটতিই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে—বাংলাদেশে ‘নিখোঁজ শিশু’ নিয়ে কি একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ডেটাবেস আছে? যদি না থাকে, তাহলে জিডি, উদ্ধার, স্বেচ্ছায় ফিরে আসা, অপহরণ, পাচার, পারিবারিক বিরোধ, প্রেম বা বন্ধুত্বজনিত পালিয়ে যাওয়া—সব ঘটনাকে আলাদা শ্রেণিতে ভাগ করে তথ্য সংরক্ষণ করা জরুরি।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হচ্ছে ২,০৩৮ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারটি।১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুর উদ্ধার অবশ্যই পুলিশের সক্ষমতার একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু ২ হাজার ৩৮ জনের এখনো সন্ধান না পাওয়ার বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আরও উদ্বেগের বিষয়, তাদের মধ্যে ১ হাজার ৯৭০ জনই ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী।

অর্থাৎ এখনো নিখোঁজ শিশুদের প্রায় পুরোটাই কিশোর-কিশোরী। ফলে সমস্যা সমাধানে শুধু রাস্তাঘাট, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন বা সীমান্তে নজরদারি বাড়ালেই হবে না। পরিবারের ভেতরের সংকটকেও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

কারণ একজন কিশোর নিখোঁজ হওয়ার আগেই অনেক সময় তার আচরণে সংকেত দেখা দিতে পারে—হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যাওয়া, পরিবারের সঙ্গে কথা কমিয়ে দেওয়া, পড়াশোনায় অনীহা, ঘন ঘন বাইরে থাকা, নতুন ও অচেনা বন্ধুত্ব, অনলাইনে অস্বাভাবিক যোগাযোগ কিংবা ঘরে নিয়মিত সংঘাত।

সমাধান শুধু পুলিশের হাতে নেই

নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশকে সক্রিয় হতে হয়—এটি জরুরি। কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার আগের পর্যায়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের বুঝতে হবে, কিশোরকে শুধু নিয়ন্ত্রণ করলেই নিরাপদ রাখা যায় না। তার সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করতে হয়।

স্কুল-কলেজেও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ বাড়ানো দরকার। একজন শিক্ষার্থী পারিবারিক সমস্যায় আছে, পড়াশোনার চাপে ভেঙে পড়ছে বা কোনো সম্পর্কজনিত সমস্যায় আছে—এসব বিষয়কে শুধু শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের ঝুঁকি এবং ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা দরকার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিখোঁজের তথ্যকে আরও নির্ভুলভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা। কতজন পথ হারিয়েছে, কতজন স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়েছে, কতজন অপহৃত হয়েছে, কতজন পাচারের শিকার হয়েছে এবং কতজন শেষ পর্যন্ত নিখোঁজ থেকেছে—এসব আলাদা তথ্য ছাড়া সমস্যার প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন।

বিষণ্ণ শিশু

বলা যায়, সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুকে নিয়ে নিখোঁজের জিডি—সংখ্যাটি নিঃসন্দেহে বড়। কিন্তু এই সংখ্যাকে শুধু আতঙ্কের পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ তথ্য বলছে, বড় অংশের শিশুই পরে উদ্ধার হয়েছে। একই সঙ্গে তথ্য এটাও বলছে, নিখোঁজের সমস্যার কেন্দ্র ছোট শিশু নয়—১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা।

তাই এই সংকটের প্রধান কারণ খুঁজতে হলে পুলিশের উদ্ধার অভিযানের বাইরে তাকাতে হবে। দেখতে হবে পরিবার, শিক্ষা, কৈশোর, বন্ধুত্ব, মানসিক চাপ এবং ডিজিটাল জীবনের পরিবর্তনকে। 

সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—আমাদের শিশুরা হারিয়ে যাওয়ার আগে কি আমরা তাদের হারিয়ে ফেলছি? কারণ কোনো কিশোর যখন বাড়ি ছেড়ে চলে যায়, সেটি শুধু একটি নিখোঁজের ঘটনা নয়; অনেক সময় সেটি তার পরিবার ও সমাজের সঙ্গে তৈরি হওয়া দূরত্বের শেষ দৃশ্য।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬


শিশুরা হারাচ্ছে, নাকি পরিবার থেকে পালাচ্ছে!

প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই—মাত্র সাত মাসে সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুকে নিখোঁজ দেখিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এখনো সন্ধান মেলেনি ২ হাজার ৩৮ জনের।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশ জানায়, সম্প্রতি গণমাধ্যমে শুধু নিখোঁজের সংখ্যা তুলে ধরা হলেও উদ্ধারের হার সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রকাশ না করায় জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বিষয়টি স্পষ্ট করতে স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য যাচাই করা হয়েছে।

শিশু নিখোঁজের ১৫ হাজার ৭১৭ সংখ্যাটি প্রথম দেখায় আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। কিন্তু পুলিশের তথ্যের আরেকটি দিকও আছে—নিখোঁজের জিডি করা শিশুদের প্রায় ৮৭ শতাংশকেই পরে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে গেছে। ফলে নিখোঁজের জিডির সংখ্যা আর স্থায়ীভাবে নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা এক নয়।

তবে এখানেই আলোচনা শেষ নয়। বরং শুরু। কারণ, যে প্রশ্নটি সামনে আসে তা হলো- কেন প্রতি মাসে গড়ে দুই হাজারের বেশি শিশু-কিশোরকে নিয়ে পরিবারকে পুলিশের কাছে ছুটতে হচ্ছে। যদিও শিশু নয়, বরং কিশোররাই সংখ্যায় বেশি।ফলে প্রদত্ত পরিসংখ্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি বয়সভিত্তিক বিভাজন।

হাসিখুশি শিশুরা

শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত নিখোঁজের জিডি হয়েছে ৪৭৪টি। তাদের মধ্যে ৪০৬ জন উদ্ধার হয়েছে, এখনো নিখোঁজ ৬৮ জন। অন্যদিকে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। উদ্ধার হয়েছে ১৩ হাজার ২৭৩ জন। এখনো নিখোঁজ ১ হাজার ৯৭০ জন।অর্থাৎ মোট জিডির প্রায় ৯৭ শতাংশই ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে।

এই একটি তথ্যই সমস্যাটির চরিত্র অনেকটাই বদলে দেয়। এটি শুধু শিশু হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা নয়; এর বড় অংশ কৈশোরের সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত। ছোট শিশু হারিয়ে যেতে পারে পথ ভুলে, পরিচিতজনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কিংবা নিজের ঠিকানা বলতে না পারার কারণে। কিন্তু একজন কিশোর সাধারণত জেনে-বুঝেই বাড়ি থেকে বের হয়। তার পেছনে থাকে কোনো অভিমান, দ্বন্দ্ব, ভয়, চাপ, সম্পর্ক কিংবা স্বাধীনভাবে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা।

তাই কিশোর নিখোঁজের ঘটনা অনেক ক্ষেত্রে সমাজের কাছে একটি সতর্কবার্তা—পরিবারের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? পুলিশের বিশ্লেষণে কিশোর-কিশোরীদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে উঠে এসেছে অভিমান, পারিবারিক কলহ, পড়ালেখার চাপ, স্বাধীন জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার পর লজ্জা বা ভয়, পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা সুবিধা আদায়ের কৌশল এবং বন্ধুদের প্রভাব। কারণগুলোর তালিকা দেখলেই বোঝা যায়, ঘটনাগুলোর বড় অংশের শিকড় পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কের ভেতরে।

কৈশোর এমন একটি সময়, যখন একজন মানুষ একই সঙ্গে স্বাধীন হতে চায় এবং নিরাপত্তাও চায়। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাড়ে, অথচ অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার সীমাবদ্ধতা থাকে। এই সময়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ দুর্বল হলে সামান্য বিরোধও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।

পরীক্ষার ফল খারাপ হয়েছে। বাবা-মা বকেছেন। কোনো বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক পরিবার মেনে নেয়নি। ঘরে প্রতিদিন ঝগড়া। পড়াশোনার চাপ অসহনীয় মনে হচ্ছে। কিংবা কোনো ভুল করার পর বাড়িতে ফিরতে ভয় হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে একজন কিশোরের কাছে বাড়ি থেকে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের জন্য দূরে চলে যাওয়া সহজ সমাধান মনে হতে পারে।

কৌতুহলী শিশু

তাই নিখোঁজের অনেক ঘটনাকে শুধু ‘শিশু কোথায় গেল’ প্রশ্নে আটকে রাখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। প্রশ্ন করতে হবে—‘কেন সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল?’

বাংলাদেশে শিক্ষাজীবন ক্রমেই প্রতিযোগিতামূলক হচ্ছে। ভালো ফল, নামি স্কুল-কলেজ, কোচিং, ভর্তি পরীক্ষা—সবকিছু ঘিরেই তৈরি হচ্ছে প্রবল প্রত্যাশা। অনেক পরিবার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে গিয়ে অজান্তেই সেই প্রত্যাশাকে চাপের পর্যায়ে নিয়ে যায়। সমস্যা শুধু বেশি পড়তে বলা নয়। বরং ব্যর্থতা নিয়ে ভয়, অন্যের সঙ্গে তুলনা, প্রত্যাশা পূরণ না হলে অপমান বা শাস্তির আশঙ্কা—এসবও কিশোরের মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।

একজন কিশোর যখন মনে করে তার সমস্যার কথা বললে তাকে বোঝার বদলে বকা হবে, তখন সে সমস্যাটি পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায় না। আর যোগাযোগের জায়গাটি যত দুর্বল হয়, পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তত সহজ হতে পারে।

কৈশোরে বন্ধুত্বের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে বন্ধু বা সহপাঠীর মতামত বাবা-মায়ের মতামতের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। আগে একজন কিশোর বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে কোথায় যাবে, কার কাছে যাবে—এসব ছিল বড় প্রশ্ন। এখন সেই বাস্তবতা বদলেছে।

স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একজন কিশোরকে এমন মানুষের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, যাদের পরিবার কখনো দেখেনি বা চেনে না। ফলে বাড়ির বাইরে বিকল্প যোগাযোগ, থাকার ব্যবস্থা কিংবা সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। 

এখানে প্রযুক্তিকে এককভাবে দায়ী করা ঠিক হবে না। প্রযুক্তি মূল সমস্যা নয়; বরং পারিবারিক বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ওপর প্রযুক্তি একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আরেকটি বিষয়ও বিবেচনায় রাখা জরুরি। পুলিশ জানিয়েছে, অনলাইন জিডি চালু হওয়ার পর নিখোঁজের অভিযোগ করার প্রবণতা বেড়েছে।

২০২৩ সালে নিখোঁজ-সংক্রান্ত জিডি হয়েছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি। ২০২৪ সালে তা কিছুটা কমে ১৬ হাজার ৪১৪টিতে নামে। ২০২৫ সালে আবার বেড়ে দাঁড়ায় ২২ হাজার ৫৫০টিতে। অর্থাৎ জিডির সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে বাস্তবে নিখোঁজ শিশুর সংখ্যাও একই হারে বেড়েছে। অনলাইন জিডির ফলে অভিযোগ করা সহজ হয়েছে। ফলে আগে যে পরিবার থানায় যেতে সংকোচ করত বা দেরি করত, তারাও এখন দ্রুত অভিযোগ করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও বলেছেন, নিখোঁজের ঘটনায় করা সব জিডির শিশু দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকে না; বড় একটি অংশ পরে পরিবারের কাছে ফিরে আসে। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, কতজন শিশু শেষ পর্যন্ত ফিরে আসেনি, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সরকারের কাছে নেই।

এই তথ্যের ঘাটতিই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে—বাংলাদেশে ‘নিখোঁজ শিশু’ নিয়ে কি একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ডেটাবেস আছে? যদি না থাকে, তাহলে জিডি, উদ্ধার, স্বেচ্ছায় ফিরে আসা, অপহরণ, পাচার, পারিবারিক বিরোধ, প্রেম বা বন্ধুত্বজনিত পালিয়ে যাওয়া—সব ঘটনাকে আলাদা শ্রেণিতে ভাগ করে তথ্য সংরক্ষণ করা জরুরি।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হচ্ছে ২,০৩৮ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারটি।১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুর উদ্ধার অবশ্যই পুলিশের সক্ষমতার একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু ২ হাজার ৩৮ জনের এখনো সন্ধান না পাওয়ার বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আরও উদ্বেগের বিষয়, তাদের মধ্যে ১ হাজার ৯৭০ জনই ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী।

অর্থাৎ এখনো নিখোঁজ শিশুদের প্রায় পুরোটাই কিশোর-কিশোরী। ফলে সমস্যা সমাধানে শুধু রাস্তাঘাট, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন বা সীমান্তে নজরদারি বাড়ালেই হবে না। পরিবারের ভেতরের সংকটকেও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

কারণ একজন কিশোর নিখোঁজ হওয়ার আগেই অনেক সময় তার আচরণে সংকেত দেখা দিতে পারে—হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যাওয়া, পরিবারের সঙ্গে কথা কমিয়ে দেওয়া, পড়াশোনায় অনীহা, ঘন ঘন বাইরে থাকা, নতুন ও অচেনা বন্ধুত্ব, অনলাইনে অস্বাভাবিক যোগাযোগ কিংবা ঘরে নিয়মিত সংঘাত।

সমাধান শুধু পুলিশের হাতে নেই

নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশকে সক্রিয় হতে হয়—এটি জরুরি। কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার আগের পর্যায়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের বুঝতে হবে, কিশোরকে শুধু নিয়ন্ত্রণ করলেই নিরাপদ রাখা যায় না। তার সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করতে হয়।

স্কুল-কলেজেও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ বাড়ানো দরকার। একজন শিক্ষার্থী পারিবারিক সমস্যায় আছে, পড়াশোনার চাপে ভেঙে পড়ছে বা কোনো সম্পর্কজনিত সমস্যায় আছে—এসব বিষয়কে শুধু শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের ঝুঁকি এবং ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা দরকার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিখোঁজের তথ্যকে আরও নির্ভুলভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা। কতজন পথ হারিয়েছে, কতজন স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়েছে, কতজন অপহৃত হয়েছে, কতজন পাচারের শিকার হয়েছে এবং কতজন শেষ পর্যন্ত নিখোঁজ থেকেছে—এসব আলাদা তথ্য ছাড়া সমস্যার প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন।

বিষণ্ণ শিশু

বলা যায়, সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুকে নিয়ে নিখোঁজের জিডি—সংখ্যাটি নিঃসন্দেহে বড়। কিন্তু এই সংখ্যাকে শুধু আতঙ্কের পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ তথ্য বলছে, বড় অংশের শিশুই পরে উদ্ধার হয়েছে। একই সঙ্গে তথ্য এটাও বলছে, নিখোঁজের সমস্যার কেন্দ্র ছোট শিশু নয়—১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা।

তাই এই সংকটের প্রধান কারণ খুঁজতে হলে পুলিশের উদ্ধার অভিযানের বাইরে তাকাতে হবে। দেখতে হবে পরিবার, শিক্ষা, কৈশোর, বন্ধুত্ব, মানসিক চাপ এবং ডিজিটাল জীবনের পরিবর্তনকে। 

সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—আমাদের শিশুরা হারিয়ে যাওয়ার আগে কি আমরা তাদের হারিয়ে ফেলছি? কারণ কোনো কিশোর যখন বাড়ি ছেড়ে চলে যায়, সেটি শুধু একটি নিখোঁজের ঘটনা নয়; অনেক সময় সেটি তার পরিবার ও সমাজের সঙ্গে তৈরি হওয়া দূরত্বের শেষ দৃশ্য।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত