একই দিনে কয়েকটি জেলায় ছড়িয়ে থাকা পাঁচটি ঘটনা—শিশুহত্যা, স্ত্রী-সন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যা, বিষ খাইয়ে সন্তানহত্যার চেষ্টা, নিজ কন্যাকে ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণে তরুণীর মৃত্যু ঘটেছে।এসব ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন হলেও সূত্র একটাই—পারিবারিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বলয় ভেঙে পড়ছে।
মোবাইলের জন্য কিশোরহত্যা
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষকের সপ্তম শ্রেণিপড়ুয়া ছেলে ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে (১৩) হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই সানন্দা পাহাড়ের জঙ্গল থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তুহিন নামের এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। ইশিয়াত স্থানীয় বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম। এরপর থেকে তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছেলের নিখোঁজের বিষয়টি জানিয়ে পোস্ট দেন। শনিবার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাস্থলে কুবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ ভিড় করেন। দুপুর পৌনে ৩টার দিকে ঘটনাস্থলে যান সদর আসনের এমপি মনিরুল হক চৌধুরী। এ সময় তিনি হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আটক করতে পুলিশকে নির্দেশ দেন।
ওসি রকিবুল ইসলাম বলেন, “আমরা অনেকটা নিশ্চিত, মোবাইল ফোনের জন্যই এ হত্যার ঘটনা। আটক তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।”
স্ত্রী-সন্তান হত্যার পর আত্মহত্যা
মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলা সদরে ঘরের ভেতর থেকে একই পরিবারের তিনজনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক ধারণা, স্ত্রী ও দেড় বছরের সন্তানকে হত্যার পর মালয়েশিয়া প্রবাসী ইকরাম হোসেন (৩০) গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের জান্নাকান্দি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
সম্প্রতি বিদেশ থেকে দেশে ফেরেন ইকরাম। শনিবার ঘরের ভেতর স্ত্রী ও দেড় বছরের অবুঝ সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যার পর নিজে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস নেন। স্বজনেরা বিষয়টি টের পেয়ে পুলিশে খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঘরের দরজা ভেঙে তিনটি লাশ উদ্ধার করে।
মানিকগঞ্জ সদর থানার ওসি মো. মনির হোসেন বলেন, “খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। লাশগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।”
তিন সন্তানকে বিষ খাইয়ে বাবার আত্মহত্যার চেষ্টা
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর প্রতিনিধি জানান, উপজেলার রজনীলাইন গ্রামে তিন সন্তানসহ বিষপান করা সরফত আলী মাদকাসক্ত বলে জানিয়েছে পুলিশ। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ভোরের দিকে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরফত আলীর তিন সন্তানকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। সরফত আলী আশঙ্কাজনক অবস্থায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
মারা যাওয়া তিন সন্তান হলো—১০ বছর বয়সী মেয়ে মাওয়া আক্তার, সাত বছর বয়সী ছেলে শামিম মিয়া ও দুই বছর বয়সী ছেলে তামিম মিয়া। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সরফত আলীর স্ত্রী ফাতেমা বেগম কয়েক বছর সৌদি আরবে ছিলেন। চার দিন আগে তিনি আবারও সৌদি আরবে যান। স্ত্রী বিদেশ যাওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক কলহের সৃষ্টি হয়। শুক্রবার রাতে সরফত আলী তার তিন সন্তানকে নিয়ে বসতঘরে ঘুমাতে যান। রাত আনুমানিক দুইটার পর তিনি তিন সন্তানসহ কীটনাশক পান করেন।
তাহিরপুর থানার ওসি ফারুক আহমদ বলেন, “স্বামী-স্ত্রীর পারিবারিক কলহের জেরে এই ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। সরফত আলী মাদক ও অনলাইন জুয়ায় জড়িত।”
নিজ মেয়েকে ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণ
নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, সদরে নিজ নাবালিকা কন্যাকে দীর্ঘদিন ধরে ধর্ষণ ও পর্নোগ্রাফি ভিডিও ধারণের অভিযোগে বাবা মো. হালিম মিয়াকে (৩৫) গ্রেপ্তার করেছে জেলা পুলিশ। চার জেলায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ৪ সেপ্টেম্বর নরসিংদী সদর মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলাটি দায়ের করেন ভুক্তভোগীর মামা।
নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ ও সিলেটের গোয়াইনঘাটে অভিযানের পর অবশেষে গত ১৭-১৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের হাটহাজারীর মাইজভাণ্ডারী দরবার শরীফ এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে নরসিংদী জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও সদর থানা-পুলিশের যৌথ দল। পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আবদুল হান্নানের দিকনির্দেশনায় পরিচালিত এ অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা অংশ নেন।
সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার তরুণীর মৃত্যু
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা প্রতিনিধি জানান, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়ে গুরুতর অসুস্থ তমা খাতুন (১৮) নামের এক তরুণী মারা গেছেন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে তার মৃত্যু হয়। নিহত তমা খাতুন ভেড়ামারা উপজেলার ফকিরাবাদ বকশীপাড়া এলাকার তোফাজ্জল হোসেনের মেয়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে বকশীপাড়া এলাকায় একদল যুবক তমা খাতুনকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে। পরে তাকে নির্জন স্থানে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় অভিযুক্তরা। স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেন। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে রামেক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে তিনি মারা যান।
ভেড়ামারা থানার ওসি জাহেদুর রহমান জানান, “ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আইনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
কেন এমন অপরাধ বেপরোয়া
অপরাধবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, একক কোনো কারণ নয়—একাধিক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ মিলেই এমন নৃশংসতা বাড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলাম খান বলেন, “পারিবারিক নিরাপত্তা বলয় ভেঙে পড়ার বড় কারণ পারিবারিক কলহ, অর্থনৈতিক চাপ ও মাদক। পরিবারে সন্তানরা নিরাপদ নয়—এই উপলব্ধিই তাদের অপরাধপ্রবণ করে তুলছে।”
মনস্তাত্ত্বিকদের মতে, দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহ ও মাদকাসক্তি মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোবকে অকার্যকর করে দেয়। ফলে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে যায়। একজন মাদকাসক্ত বাবা সন্তানের প্রতি সহানুভূতি হারান—এটাই সরফত আলী ও ইকরাম হোসেনের ঘটনায় দেখা গেছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পারিবারিক নিরাপত্তা বলয় ভেঙে পড়ার পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব এবং সামাজিক বৈষম্য। পরিবারে অভিভাবকের অনুপস্থিতি ও সন্তানের প্রতি অবহেলা—এসব কারণে শিশুরা অপরাধের শিকার হচ্ছে। আর নারীরা নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছেন।
অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশি তৎপরতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা, মাদক প্রতিরোধ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা। পারিবারিক সুরক্ষা কমিটি গঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ—এসব সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই সামাজিক মহামারি ঠেকাতে।

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
একই দিনে কয়েকটি জেলায় ছড়িয়ে থাকা পাঁচটি ঘটনা—শিশুহত্যা, স্ত্রী-সন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যা, বিষ খাইয়ে সন্তানহত্যার চেষ্টা, নিজ কন্যাকে ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণে তরুণীর মৃত্যু ঘটেছে।এসব ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন হলেও সূত্র একটাই—পারিবারিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বলয় ভেঙে পড়ছে।
মোবাইলের জন্য কিশোরহত্যা
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষকের সপ্তম শ্রেণিপড়ুয়া ছেলে ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে (১৩) হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই সানন্দা পাহাড়ের জঙ্গল থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তুহিন নামের এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। ইশিয়াত স্থানীয় বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম। এরপর থেকে তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছেলের নিখোঁজের বিষয়টি জানিয়ে পোস্ট দেন। শনিবার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাস্থলে কুবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ ভিড় করেন। দুপুর পৌনে ৩টার দিকে ঘটনাস্থলে যান সদর আসনের এমপি মনিরুল হক চৌধুরী। এ সময় তিনি হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আটক করতে পুলিশকে নির্দেশ দেন।
ওসি রকিবুল ইসলাম বলেন, “আমরা অনেকটা নিশ্চিত, মোবাইল ফোনের জন্যই এ হত্যার ঘটনা। আটক তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।”
স্ত্রী-সন্তান হত্যার পর আত্মহত্যা
মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলা সদরে ঘরের ভেতর থেকে একই পরিবারের তিনজনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক ধারণা, স্ত্রী ও দেড় বছরের সন্তানকে হত্যার পর মালয়েশিয়া প্রবাসী ইকরাম হোসেন (৩০) গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের জান্নাকান্দি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
সম্প্রতি বিদেশ থেকে দেশে ফেরেন ইকরাম। শনিবার ঘরের ভেতর স্ত্রী ও দেড় বছরের অবুঝ সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যার পর নিজে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস নেন। স্বজনেরা বিষয়টি টের পেয়ে পুলিশে খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঘরের দরজা ভেঙে তিনটি লাশ উদ্ধার করে।
মানিকগঞ্জ সদর থানার ওসি মো. মনির হোসেন বলেন, “খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। লাশগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।”
তিন সন্তানকে বিষ খাইয়ে বাবার আত্মহত্যার চেষ্টা
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর প্রতিনিধি জানান, উপজেলার রজনীলাইন গ্রামে তিন সন্তানসহ বিষপান করা সরফত আলী মাদকাসক্ত বলে জানিয়েছে পুলিশ। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ভোরের দিকে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরফত আলীর তিন সন্তানকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। সরফত আলী আশঙ্কাজনক অবস্থায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
মারা যাওয়া তিন সন্তান হলো—১০ বছর বয়সী মেয়ে মাওয়া আক্তার, সাত বছর বয়সী ছেলে শামিম মিয়া ও দুই বছর বয়সী ছেলে তামিম মিয়া। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সরফত আলীর স্ত্রী ফাতেমা বেগম কয়েক বছর সৌদি আরবে ছিলেন। চার দিন আগে তিনি আবারও সৌদি আরবে যান। স্ত্রী বিদেশ যাওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক কলহের সৃষ্টি হয়। শুক্রবার রাতে সরফত আলী তার তিন সন্তানকে নিয়ে বসতঘরে ঘুমাতে যান। রাত আনুমানিক দুইটার পর তিনি তিন সন্তানসহ কীটনাশক পান করেন।
তাহিরপুর থানার ওসি ফারুক আহমদ বলেন, “স্বামী-স্ত্রীর পারিবারিক কলহের জেরে এই ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। সরফত আলী মাদক ও অনলাইন জুয়ায় জড়িত।”
নিজ মেয়েকে ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণ
নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, সদরে নিজ নাবালিকা কন্যাকে দীর্ঘদিন ধরে ধর্ষণ ও পর্নোগ্রাফি ভিডিও ধারণের অভিযোগে বাবা মো. হালিম মিয়াকে (৩৫) গ্রেপ্তার করেছে জেলা পুলিশ। চার জেলায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ৪ সেপ্টেম্বর নরসিংদী সদর মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলাটি দায়ের করেন ভুক্তভোগীর মামা।
নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ ও সিলেটের গোয়াইনঘাটে অভিযানের পর অবশেষে গত ১৭-১৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের হাটহাজারীর মাইজভাণ্ডারী দরবার শরীফ এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে নরসিংদী জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও সদর থানা-পুলিশের যৌথ দল। পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আবদুল হান্নানের দিকনির্দেশনায় পরিচালিত এ অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা অংশ নেন।
সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার তরুণীর মৃত্যু
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা প্রতিনিধি জানান, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়ে গুরুতর অসুস্থ তমা খাতুন (১৮) নামের এক তরুণী মারা গেছেন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে তার মৃত্যু হয়। নিহত তমা খাতুন ভেড়ামারা উপজেলার ফকিরাবাদ বকশীপাড়া এলাকার তোফাজ্জল হোসেনের মেয়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে বকশীপাড়া এলাকায় একদল যুবক তমা খাতুনকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে। পরে তাকে নির্জন স্থানে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় অভিযুক্তরা। স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেন। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে রামেক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে তিনি মারা যান।
ভেড়ামারা থানার ওসি জাহেদুর রহমান জানান, “ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আইনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
কেন এমন অপরাধ বেপরোয়া
অপরাধবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, একক কোনো কারণ নয়—একাধিক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ মিলেই এমন নৃশংসতা বাড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলাম খান বলেন, “পারিবারিক নিরাপত্তা বলয় ভেঙে পড়ার বড় কারণ পারিবারিক কলহ, অর্থনৈতিক চাপ ও মাদক। পরিবারে সন্তানরা নিরাপদ নয়—এই উপলব্ধিই তাদের অপরাধপ্রবণ করে তুলছে।”
মনস্তাত্ত্বিকদের মতে, দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহ ও মাদকাসক্তি মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোবকে অকার্যকর করে দেয়। ফলে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে যায়। একজন মাদকাসক্ত বাবা সন্তানের প্রতি সহানুভূতি হারান—এটাই সরফত আলী ও ইকরাম হোসেনের ঘটনায় দেখা গেছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পারিবারিক নিরাপত্তা বলয় ভেঙে পড়ার পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব এবং সামাজিক বৈষম্য। পরিবারে অভিভাবকের অনুপস্থিতি ও সন্তানের প্রতি অবহেলা—এসব কারণে শিশুরা অপরাধের শিকার হচ্ছে। আর নারীরা নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছেন।
অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশি তৎপরতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা, মাদক প্রতিরোধ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা। পারিবারিক সুরক্ষা কমিটি গঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ—এসব সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই সামাজিক মহামারি ঠেকাতে।

আপনার মতামত লিখুন