সংবাদ

পদ্মাহীন সোনাকান্ত বিল, সৌন্দর্যের খোঁজে এসে হতাশ পর্যটকেরা


প্রতিনিধি, উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ)
প্রতিনিধি, উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ)
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫১ পিএম

পদ্মাহীন সোনাকান্ত বিল, সৌন্দর্যের খোঁজে এসে হতাশ পর্যটকেরা
অনিয়ন্ত্রিত ফুল ছেঁড়ায় সৌন্দর্য হারাচ্ছে সিরাজগঞ্জের পদ্মবিল। ছবি : সংবাদ

বর্ষার মৌসুম এলেই সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার সোনাকান্ত বিল রূপ নিত এক অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আঁধারে। বিস্তীর্ণ জলরাশির বুকজুড়ে ফুটে থাকা গোলাপি ও সাদা পদ্মফুল দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করতেন প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই নয়নাভিরাম দৃশ্য বিলটিকে এনে দিয়েছিল বিশেষ পরিচিতি। কিন্তু এবার সেই চিত্র একেবারেই ভিন্ন। বিল পদ্মপাতায় ভরে থাকলেও নেই কাঙ্ক্ষিত পদ্মফুলের সমারোহ। ফলে সৌন্দর্যের টানে আসা দর্শনার্থীদের অনেকেই ফিরছেন চরম হতাশ হয়ে।

উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের আমডাঙ্গা গ্রামের পাশে প্রায় ৪০ বিঘা জমিজুড়ে অবস্থিত এই সোনাকান্ত বিল। বর্ষা মৌসুমে ছয় মাসেরও বেশি সময় পানিতে নিমজ্জিত থাকে নিচু এই জলাভূমি। বছরের অন্য সময়ে এখানে বোরো ধানের আবাদ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া পদ্মফুলের কারণে এলাকাটি ‘পদ্মবিল’ হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিলের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে সবুজ পদ্মপাতা ছড়িয়ে রয়েছে। কোথাও কোথাও শুকিয়ে যাওয়া ডাঁটা ও জলজ আগাছা থাকলেও চোখে পড়েনি আগের বছরের মতো ফুলে ভরা মনোরম দৃশ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত পুরোনো ছবি ও বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক।

স্থানীয় বাসিন্দা আলসামাহমুদ, রুবেল ও সোহেল জানান, কয়েক বছর ধরেই বর্ষা এলেই পদ্মফুলে ভরে উঠত সোনাকান্ত বিল। সেই সৌন্দর্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসতেন। তবে অনেক দর্শনার্থী বিলে নেমে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পদ্মফুল ও কলি ছিঁড়ে নিয়ে যাওয়ায় ফুলের স্থায়িত্ব কমে যায়। এ বছরও শুরুতে কিছু ফুল ফুটলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা হারিয়ে যায়। পাশাপাশি প্রতিকূল আবহাওয়া ও অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণেও এবার ফুলের সংখ্যা আগের তুলনায় কম বলে তাদের ধারণা।

ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী সুমাইয়া মেহজাবিন জুঁই বলেন, 'ফেসবুকে সোনাকান্ত বিলের অসংখ্য ছবি ও ভিডিও দেখে এখানে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম পদ্মফুলে ভরা বিল দেখব আর ছবি তুলব। কিন্তু এসে দেখি পদ্মপাতা আছে, তবে ফুল নেই। সত্যি অনেকটা হতাশ হয়েছি।'

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক দর্শনার্থী ছবি তোলার জন্য অযাচিতভাবে ফুল ও কলি ছিঁড়ে ফেলেন। কেউ কেউ আবার পদ্মগাছ ও পাতার ওপর উঠে ছবি তোলেন, যা জলজ উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে ধীরে ধীরে বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের মতে, সোনাকান্ত বিলের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে দর্শনার্থীদের সচেতন করতে না পারলে ভবিষ্যতে এই বিল তার স্বকীয় সৌন্দর্য হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।

উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্ণা ইয়াসমিন সুমি বলেন, পদ্ম একটি প্রাকৃতিক জলজ উদ্ভিদ। বিভিন্ন পাখির মাধ্যমে এর বীজ এক জলাশয় থেকে অন্য জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবেশ অনুকূলে থাকলে পদ্মের বিস্তার দ্রুত ঘটে। সোনাকান্ত বিলেও পদ্মের বিস্তার সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবেই হয়েছে। উপযুক্ত পরিবেশ সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতে আবারও বিলটি পদ্মফুলে ভরে উঠবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম বলেন, 'বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতি রোধ করা যায়।'

একসময় যে সোনাকান্ত বিল পদ্মের রঙে রঙিন হয়ে উঠত, আজ সেখানে শুধুই সবুজ পাতার বিস্তার। স্থানীয়দের আশা, সচেতনতা বৃদ্ধি ও পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলে আগামী বর্ষায় আবারও পদ্মফুলে ভরে উঠবে বিলটি, ফিরে আসবে তার হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্য।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


পদ্মাহীন সোনাকান্ত বিল, সৌন্দর্যের খোঁজে এসে হতাশ পর্যটকেরা

প্রকাশের তারিখ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

বর্ষার মৌসুম এলেই সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার সোনাকান্ত বিল রূপ নিত এক অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আঁধারে। বিস্তীর্ণ জলরাশির বুকজুড়ে ফুটে থাকা গোলাপি ও সাদা পদ্মফুল দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করতেন প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই নয়নাভিরাম দৃশ্য বিলটিকে এনে দিয়েছিল বিশেষ পরিচিতি। কিন্তু এবার সেই চিত্র একেবারেই ভিন্ন। বিল পদ্মপাতায় ভরে থাকলেও নেই কাঙ্ক্ষিত পদ্মফুলের সমারোহ। ফলে সৌন্দর্যের টানে আসা দর্শনার্থীদের অনেকেই ফিরছেন চরম হতাশ হয়ে।

উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের আমডাঙ্গা গ্রামের পাশে প্রায় ৪০ বিঘা জমিজুড়ে অবস্থিত এই সোনাকান্ত বিল। বর্ষা মৌসুমে ছয় মাসেরও বেশি সময় পানিতে নিমজ্জিত থাকে নিচু এই জলাভূমি। বছরের অন্য সময়ে এখানে বোরো ধানের আবাদ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া পদ্মফুলের কারণে এলাকাটি ‘পদ্মবিল’ হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিলের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে সবুজ পদ্মপাতা ছড়িয়ে রয়েছে। কোথাও কোথাও শুকিয়ে যাওয়া ডাঁটা ও জলজ আগাছা থাকলেও চোখে পড়েনি আগের বছরের মতো ফুলে ভরা মনোরম দৃশ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত পুরোনো ছবি ও বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক।

স্থানীয় বাসিন্দা আলসামাহমুদ, রুবেল ও সোহেল জানান, কয়েক বছর ধরেই বর্ষা এলেই পদ্মফুলে ভরে উঠত সোনাকান্ত বিল। সেই সৌন্দর্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসতেন। তবে অনেক দর্শনার্থী বিলে নেমে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পদ্মফুল ও কলি ছিঁড়ে নিয়ে যাওয়ায় ফুলের স্থায়িত্ব কমে যায়। এ বছরও শুরুতে কিছু ফুল ফুটলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা হারিয়ে যায়। পাশাপাশি প্রতিকূল আবহাওয়া ও অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণেও এবার ফুলের সংখ্যা আগের তুলনায় কম বলে তাদের ধারণা।

ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী সুমাইয়া মেহজাবিন জুঁই বলেন, 'ফেসবুকে সোনাকান্ত বিলের অসংখ্য ছবি ও ভিডিও দেখে এখানে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম পদ্মফুলে ভরা বিল দেখব আর ছবি তুলব। কিন্তু এসে দেখি পদ্মপাতা আছে, তবে ফুল নেই। সত্যি অনেকটা হতাশ হয়েছি।'

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক দর্শনার্থী ছবি তোলার জন্য অযাচিতভাবে ফুল ও কলি ছিঁড়ে ফেলেন। কেউ কেউ আবার পদ্মগাছ ও পাতার ওপর উঠে ছবি তোলেন, যা জলজ উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে ধীরে ধীরে বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের মতে, সোনাকান্ত বিলের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে দর্শনার্থীদের সচেতন করতে না পারলে ভবিষ্যতে এই বিল তার স্বকীয় সৌন্দর্য হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।

উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্ণা ইয়াসমিন সুমি বলেন, পদ্ম একটি প্রাকৃতিক জলজ উদ্ভিদ। বিভিন্ন পাখির মাধ্যমে এর বীজ এক জলাশয় থেকে অন্য জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবেশ অনুকূলে থাকলে পদ্মের বিস্তার দ্রুত ঘটে। সোনাকান্ত বিলেও পদ্মের বিস্তার সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবেই হয়েছে। উপযুক্ত পরিবেশ সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতে আবারও বিলটি পদ্মফুলে ভরে উঠবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম বলেন, 'বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতি রোধ করা যায়।'

একসময় যে সোনাকান্ত বিল পদ্মের রঙে রঙিন হয়ে উঠত, আজ সেখানে শুধুই সবুজ পাতার বিস্তার। স্থানীয়দের আশা, সচেতনতা বৃদ্ধি ও পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলে আগামী বর্ষায় আবারও পদ্মফুলে ভরে উঠবে বিলটি, ফিরে আসবে তার হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্য।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত