সংবাদ

বিলুপ্তির পথে অনন্য সামাজিক পাখি : ত্রিবর্ণ মুনিয়া


প্রতিনিধি, মেহেরপুর
প্রতিনিধি, মেহেরপুর
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪১ এএম

বিলুপ্তির পথে অনন্য সামাজিক পাখি : ত্রিবর্ণ মুনিয়া
মেহেরপুরে কমছে ত্রিবর্ণ মুনিয়া পাখির সংখ্যা; আবাসস্থল হারিয়ে চরম সংকটে সুন্দর এই প্রাকৃতিক প্রজাতি। ছবি : সংবাদ

মেহেরপুর শহর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে মেহেরপুর-কুষ্টিয়া মহাসড়কের পাশে অবস্থিত একটি বিশাল খড়ের মাঠ। তবে নগরায়ণের ধাক্কায় ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে এই ঐতিহ্যবাহী প্রান্তর। শরতের আগমনে নীল আকাশে তুলোর মতো মেঘের ভেলা আর কাশবনের অপার সৌন্দর্য প্রকৃতিকে নতুন রূপে সাজিয়ে তোলে। বিকেলের দিকে দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে প্রান্তরটি; দর্শনার্থীরা কাশবনের সৌন্দর্যের সঙ্গে নিজেদের ফ্রেমবন্দী করতে সেখানে ভিড় জমান।

তবে শুধু সৌন্দর্যপিপাসু মানুষই নয়, এই কাশবনে সমাগম ঘটে নানা প্রজাতির পাখির। মানুষ ও পাখির এই মেলবন্ধন যেন প্রকৃতির এক অনবদ্য মেলা। এবার শরতে এ কাশবনে চার প্রজাতির খড়ের পাখি এবং এক প্রজাতির বাবুই পাখির দেখা মিলেছে। এসব পাখির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ‘ত্রিবর্ণ মুনিয়া’।

ত্রিবর্ণ মুনিয়া মূলত স্থানীয় এক প্রজাতির পাখি। একসময় এটি ‘কালোমাথা মুনিয়া’ নামে পরিচিত ছিল। তবে বর্তমানে গবেষকেরা এদের দুটি পৃথক প্রজাতিতে বিভক্ত করেছেন–একটি বাদামি বা ত্রিবর্ণ মুনিয়া এবং অন্যটি তামা বা কালোমাথা মুনিয়া। ত্রিবর্ণ মুনিয়ার ইংরেজি নাম ‘Tricolored Munia’ এবং বৈজ্ঞানিক নাম Lonchura malacca। এরা এস্ট্রিলডি (Estrildidae) পরিবারের ছোট ও শান্ত স্বভাবের পাখি। সাদা, কালো ও বাদামি রঙের সংমিশ্রণের কারণেই মূলত এদের ‘ত্রিবর্ণ মুনিয়া’ বলা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এদের দেখা মিললেও শরৎকাল এলে এরা জঙ্গলে দলবেঁধে বিচরণ করতে পছন্দ করে। এরা সাধারণত কালোঠোঁট বেবুন ও অন্য প্রজাতির মুনিয়াদের সঙ্গে একসঙ্গে থাকে। সমাজবদ্ধ এই জীবনযাত্রার কারণে এদের একটি অনন্য সামাজিক পাখি বলেও গণ্য করা হয়।

ধানের শত্রু নয়, বরং কৃষকের প্রকৃত বন্ধু মুনিয়া পাখি।


মেহেরপুর বার্ড ক্লাবের সভাপতি এম এ মুহিত মেহেরপুর টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের পেছনের জঙ্গলে পাখির ছবি তোলার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, 'আমি লক্ষ্য করেছি, এ বছর ত্রিবর্ণ মুনিয়ার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। শহরের পরিধি বাড়ায় তৃণভূমিগুলো অনেক ছোট হয়ে গেছে। সাধারণত মুনিয়া পাখি ঘাসযুক্ত বনাঞ্চল ও প্রান্তর পছন্দ করে। তৃণভূমি কমে গেলে এই পাখির জীবন ও অস্তিত্ব বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। এসব পাখি সাধারণত দলবেঁধে ধানখেতে বসে।' তিনি আরও বলেন, 'গ্রামের অনেক কৃষক মনে করেন মুনিয়া পাখি ধান খেয়ে ফসলের ক্ষতি করে। কিন্তু বাস্তবে এরা মূলত ধানখেতের ক্ষতিকর আগাছার বীজ ও পোকামাকড় খেয়ে জীবনধারণ করে। সেই হিসেবে এদের প্রকৃতির ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মী’ বললে ভুল হবে না।'

মেহেরপুর বার্ড ক্লাবের উপদেষ্টা, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও পরিবেশবিদ এনামুল আজিম বলেন, মাঠের ক্ষতিকর আগাছার বীজ খেয়ে বিভিন্ন স্থানে তা ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই মূলত তৃণভূমির বিকাশ ঘটে। পাশাপাশি ফসলের ক্ষতিকারক পোকা খেয়ে মুনিয়া পাখি কৃষকের ফসল রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এই অনন্য তৃণভূমি ও পাখি প্রজাতি রক্ষায় স্থানীয় কৃষকদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

সংস্থাটির আরেক উপদেষ্টা ও পৌর কলেজের ভূগোলের শিক্ষক মাসুদ রেজা জানান, অনেকেই শখের বশে কিংবা খাঁচায় পোষার জন্য এই সুন্দর মুনিয়া পাখি ধরে বাড়িতে লালন-পালন করেন। এমনকি বিভিন্ন পাখির দোকানেও এদের বিক্রি হতে দেখা যায়, যা বন্যপ্রাণী সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় বাধা। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা ও সৌন্দর্য ধরে রাখতে সর্বস্তরের মানুষকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

পরিবেশ বিষয়ক স্থানীয় সংগঠন ‘সুবাহ’-এর নির্বাহী পরিচালক মঈনুল আলম জানান, মেহেরপুর বার্ড ক্লাব প্রকৃতি ও পাখি রক্ষায় প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে। প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষকে সচেতন করার এই উদ্যোগ সত্যি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬


বিলুপ্তির পথে অনন্য সামাজিক পাখি : ত্রিবর্ণ মুনিয়া

প্রকাশের তারিখ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

মেহেরপুর শহর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে মেহেরপুর-কুষ্টিয়া মহাসড়কের পাশে অবস্থিত একটি বিশাল খড়ের মাঠ। তবে নগরায়ণের ধাক্কায় ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে এই ঐতিহ্যবাহী প্রান্তর। শরতের আগমনে নীল আকাশে তুলোর মতো মেঘের ভেলা আর কাশবনের অপার সৌন্দর্য প্রকৃতিকে নতুন রূপে সাজিয়ে তোলে। বিকেলের দিকে দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে প্রান্তরটি; দর্শনার্থীরা কাশবনের সৌন্দর্যের সঙ্গে নিজেদের ফ্রেমবন্দী করতে সেখানে ভিড় জমান।

তবে শুধু সৌন্দর্যপিপাসু মানুষই নয়, এই কাশবনে সমাগম ঘটে নানা প্রজাতির পাখির। মানুষ ও পাখির এই মেলবন্ধন যেন প্রকৃতির এক অনবদ্য মেলা। এবার শরতে এ কাশবনে চার প্রজাতির খড়ের পাখি এবং এক প্রজাতির বাবুই পাখির দেখা মিলেছে। এসব পাখির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ‘ত্রিবর্ণ মুনিয়া’।

ত্রিবর্ণ মুনিয়া মূলত স্থানীয় এক প্রজাতির পাখি। একসময় এটি ‘কালোমাথা মুনিয়া’ নামে পরিচিত ছিল। তবে বর্তমানে গবেষকেরা এদের দুটি পৃথক প্রজাতিতে বিভক্ত করেছেন–একটি বাদামি বা ত্রিবর্ণ মুনিয়া এবং অন্যটি তামা বা কালোমাথা মুনিয়া। ত্রিবর্ণ মুনিয়ার ইংরেজি নাম ‘Tricolored Munia’ এবং বৈজ্ঞানিক নাম Lonchura malacca। এরা এস্ট্রিলডি (Estrildidae) পরিবারের ছোট ও শান্ত স্বভাবের পাখি। সাদা, কালো ও বাদামি রঙের সংমিশ্রণের কারণেই মূলত এদের ‘ত্রিবর্ণ মুনিয়া’ বলা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এদের দেখা মিললেও শরৎকাল এলে এরা জঙ্গলে দলবেঁধে বিচরণ করতে পছন্দ করে। এরা সাধারণত কালোঠোঁট বেবুন ও অন্য প্রজাতির মুনিয়াদের সঙ্গে একসঙ্গে থাকে। সমাজবদ্ধ এই জীবনযাত্রার কারণে এদের একটি অনন্য সামাজিক পাখি বলেও গণ্য করা হয়।

ধানের শত্রু নয়, বরং কৃষকের প্রকৃত বন্ধু মুনিয়া পাখি।


মেহেরপুর বার্ড ক্লাবের সভাপতি এম এ মুহিত মেহেরপুর টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের পেছনের জঙ্গলে পাখির ছবি তোলার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, 'আমি লক্ষ্য করেছি, এ বছর ত্রিবর্ণ মুনিয়ার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। শহরের পরিধি বাড়ায় তৃণভূমিগুলো অনেক ছোট হয়ে গেছে। সাধারণত মুনিয়া পাখি ঘাসযুক্ত বনাঞ্চল ও প্রান্তর পছন্দ করে। তৃণভূমি কমে গেলে এই পাখির জীবন ও অস্তিত্ব বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। এসব পাখি সাধারণত দলবেঁধে ধানখেতে বসে।' তিনি আরও বলেন, 'গ্রামের অনেক কৃষক মনে করেন মুনিয়া পাখি ধান খেয়ে ফসলের ক্ষতি করে। কিন্তু বাস্তবে এরা মূলত ধানখেতের ক্ষতিকর আগাছার বীজ ও পোকামাকড় খেয়ে জীবনধারণ করে। সেই হিসেবে এদের প্রকৃতির ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মী’ বললে ভুল হবে না।'

মেহেরপুর বার্ড ক্লাবের উপদেষ্টা, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও পরিবেশবিদ এনামুল আজিম বলেন, মাঠের ক্ষতিকর আগাছার বীজ খেয়ে বিভিন্ন স্থানে তা ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই মূলত তৃণভূমির বিকাশ ঘটে। পাশাপাশি ফসলের ক্ষতিকারক পোকা খেয়ে মুনিয়া পাখি কৃষকের ফসল রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এই অনন্য তৃণভূমি ও পাখি প্রজাতি রক্ষায় স্থানীয় কৃষকদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

সংস্থাটির আরেক উপদেষ্টা ও পৌর কলেজের ভূগোলের শিক্ষক মাসুদ রেজা জানান, অনেকেই শখের বশে কিংবা খাঁচায় পোষার জন্য এই সুন্দর মুনিয়া পাখি ধরে বাড়িতে লালন-পালন করেন। এমনকি বিভিন্ন পাখির দোকানেও এদের বিক্রি হতে দেখা যায়, যা বন্যপ্রাণী সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় বাধা। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা ও সৌন্দর্য ধরে রাখতে সর্বস্তরের মানুষকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

পরিবেশ বিষয়ক স্থানীয় সংগঠন ‘সুবাহ’-এর নির্বাহী পরিচালক মঈনুল আলম জানান, মেহেরপুর বার্ড ক্লাব প্রকৃতি ও পাখি রক্ষায় প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে। প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষকে সচেতন করার এই উদ্যোগ সত্যি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত