বাংলাদেশে বেড়ানোর প্রিয় জায়গার কথা উঠলে সুন্দরবন ও বান্দরবানের নাম বলেন ইমন চৌধুরী। তবে দুটির মধ্যে সুন্দরবনই তাঁর সবচেয়ে পছন্দের। বনের নীরবতা, রাতের আকাশ, নদী ও গাছপালার অপূর্ব মেলবন্ধন তাঁকে বারবার টানে। ২০০৫ সালে প্রথমবার সুন্দরবনে যাওয়ার পর এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ বার সেখানে গিয়েছেন তিনি। প্রিয় এই বন ঘিরে রয়েছে বাঘের মুখোমুখি হওয়ার রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতাসহ নানা স্মৃতি।
সুন্দরবন কেন এত প্রিয়?
সুন্দরবনের পরিচ্ছন্নতা আর নীরবতা আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে। রাতে আকাশের দিকে তাকালে মনে হয়, অসংখ্য তারা যেন খুব কাছে চলে এসেছে। চাঁদটাও অনেক বড় দেখায়। চারপাশের গাছপালা, নদী আর প্রকৃতির মধ্যে একধরনের অদ্ভুত সমন্বয় রয়েছে। বনের নীরবতাকে বলা যায় ‘পিনড্রপ সাইলেন্স’।
আমি সব সময় বলি, সুন্দরবনে গেলে মানুষ আসলে সুন্দরবনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। জোয়ার-ভাটা থেকে শুরু করে কখন কোথায় যাওয়া যাবে, সবকিছুই যেন বনের নিয়মের ওপর নির্ভর করে। এ কারণেই জায়গাটি আমার কাছে রহস্যময়। অল্প সময়ের ব্যবধানেই এর রূপ বদলে যেতে পারে।
বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রতিবছরই সুন্দরবনে যাওয়ার চেষ্টা করি।

প্রথমবার সুন্দরবনে গিয়েছিলেন কবে?
২০০৫ সালে প্রথম সুন্দরবনে যাই। এরপর এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ বার সেখানে যাওয়া হয়েছে। এ বছরও আশা করছি, অক্টোবর বা নভেম্বরে আবার যাব।
বাঘের মুখোমুখি হওয়ার কোনো স্মৃতি আছে?
সুন্দরবন ঘিরে অনেক গল্প আছে। বেশ কিছু রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতাও হয়েছে। কয়েকবার বাঘের মুখোমুখি হয়েছি। এর মধ্যে ডিমের চরের একটি ঘটনা বিশেষভাবে মনে আছে।
সেদিন ডিমের চরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। অন্যরা ততক্ষণে সেখান থেকে চলে গেছেন। আমাদের ব্যক্তিগত লঞ্চ থাকায় আরও কিছুক্ষণ থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। তখন চাঁদ উঠেছে। চারপাশ এত উজ্জ্বল ছিল যে দিনের মতো মনে হচ্ছিল। সময় কীভাবে কেটে যাচ্ছিল, বুঝতেই পারিনি।
লঞ্চে ফেরার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় আমাদের সঙ্গে থাকা গার্ড বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন, ‘ভাই, চলেন, চলেন।’ কিন্তু জায়গাটির সৌন্দর্য ছেড়ে ফিরতে মন চাইছিল না।
একপর্যায়ে হাঁটতে হাঁটতে নাকে অদ্ভুত একটি গন্ধ আসে। তখনই বুঝতে পারি, এটি বাঘের গন্ধ। দ্রুত কয়েকটি ছবি তুলি। আমার স্ত্রী সামনে ছিলেন, তাঁরও একটি ছবি তুলছিলাম। এরপর আশপাশের আরও কিছু ছবি তুলে দ্রুত লঞ্চে ফিরে যাই।
পরে লঞ্চে বসে ছবিগুলো বড় করে দেখার সময় দূরে একটি অবয়বের মতো কিছু চোখে পড়ে। সেটি কিছুটা সোজা ধরনের ছিল। সবাই মিলে ধারণা করি, ওটা বাঘই ছিল।
সময়ের সঙ্গে সুন্দরবনে কী পরিবর্তন দেখেছেন?
আমরা মূলত ঘুরতে যাই। তাই চারপাশের সব পরিবর্তন হয়তো গভীরভাবে খেয়াল করা হয় না। তবে সম্প্রতি বাঘ নিয়ে মানুষের মধ্যে কিছুটা বেশি ভয় কাজ করতে দেখেছি। বাঘ আশপাশে থাকার সম্ভাবনা থাকলেও একধরনের আতঙ্ক অনুভূত হয়।
জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবেও সুন্দরবনের পরিবর্তন হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় সিডরের আগে যে সুন্দরবন দেখেছি, পরের সুন্দরবনের সঙ্গে তার অনেক পার্থক্য। নিয়মিত যাঁরা সেখানে যান, তাঁরা হয়তো পরিবর্তনগুলো আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবেন।
সিডরের আগে বনটিকে অনেক সুন্দর লাগত, অনেকটা বাগানের মতো। ঝড়টির পর বনের চেহারায় বড় পরিবর্তন আসে। আমার মনে হয়, সুন্দরবন এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। অনেক জায়গায় ভাঙাচোরা অবস্থা রয়েছে। সুন্দরবনের ওপর দিয়ে নিয়মিত ঝড় বয়ে যাওয়ায় বনটি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দেশের বাইরে প্রিয় বেড়ানোর জায়গা কোনটি?
বিদেশে আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা নেপাল। স্রষ্টা আমাকে পৃথিবীর অনেক জায়গায় ঘোরার সুযোগ দিয়েছেন। তারপরও এখন পর্যন্ত নেপালই আমার সবচেয়ে পছন্দের।
আমার মনে হয়, একবার নেপাল ঘুরে দেশটিকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। আরও কয়েকবার যেতে হবে। তারপর হয়তো জায়গাটির প্রকৃত অনুভূতি উপলব্ধি করতে পারব। সুন্দরবনের পর পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত নেপালকেই আমার সবচেয়ে ভালো ‘গুড ভাইব’-এর জায়গা বলে মনে হয়েছে।

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশে বেড়ানোর প্রিয় জায়গার কথা উঠলে সুন্দরবন ও বান্দরবানের নাম বলেন ইমন চৌধুরী। তবে দুটির মধ্যে সুন্দরবনই তাঁর সবচেয়ে পছন্দের। বনের নীরবতা, রাতের আকাশ, নদী ও গাছপালার অপূর্ব মেলবন্ধন তাঁকে বারবার টানে। ২০০৫ সালে প্রথমবার সুন্দরবনে যাওয়ার পর এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ বার সেখানে গিয়েছেন তিনি। প্রিয় এই বন ঘিরে রয়েছে বাঘের মুখোমুখি হওয়ার রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতাসহ নানা স্মৃতি।
সুন্দরবন কেন এত প্রিয়?
সুন্দরবনের পরিচ্ছন্নতা আর নীরবতা আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে। রাতে আকাশের দিকে তাকালে মনে হয়, অসংখ্য তারা যেন খুব কাছে চলে এসেছে। চাঁদটাও অনেক বড় দেখায়। চারপাশের গাছপালা, নদী আর প্রকৃতির মধ্যে একধরনের অদ্ভুত সমন্বয় রয়েছে। বনের নীরবতাকে বলা যায় ‘পিনড্রপ সাইলেন্স’।
আমি সব সময় বলি, সুন্দরবনে গেলে মানুষ আসলে সুন্দরবনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। জোয়ার-ভাটা থেকে শুরু করে কখন কোথায় যাওয়া যাবে, সবকিছুই যেন বনের নিয়মের ওপর নির্ভর করে। এ কারণেই জায়গাটি আমার কাছে রহস্যময়। অল্প সময়ের ব্যবধানেই এর রূপ বদলে যেতে পারে।
বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রতিবছরই সুন্দরবনে যাওয়ার চেষ্টা করি।

প্রথমবার সুন্দরবনে গিয়েছিলেন কবে?
২০০৫ সালে প্রথম সুন্দরবনে যাই। এরপর এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ বার সেখানে যাওয়া হয়েছে। এ বছরও আশা করছি, অক্টোবর বা নভেম্বরে আবার যাব।
বাঘের মুখোমুখি হওয়ার কোনো স্মৃতি আছে?
সুন্দরবন ঘিরে অনেক গল্প আছে। বেশ কিছু রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতাও হয়েছে। কয়েকবার বাঘের মুখোমুখি হয়েছি। এর মধ্যে ডিমের চরের একটি ঘটনা বিশেষভাবে মনে আছে।
সেদিন ডিমের চরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। অন্যরা ততক্ষণে সেখান থেকে চলে গেছেন। আমাদের ব্যক্তিগত লঞ্চ থাকায় আরও কিছুক্ষণ থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। তখন চাঁদ উঠেছে। চারপাশ এত উজ্জ্বল ছিল যে দিনের মতো মনে হচ্ছিল। সময় কীভাবে কেটে যাচ্ছিল, বুঝতেই পারিনি।
লঞ্চে ফেরার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় আমাদের সঙ্গে থাকা গার্ড বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন, ‘ভাই, চলেন, চলেন।’ কিন্তু জায়গাটির সৌন্দর্য ছেড়ে ফিরতে মন চাইছিল না।
একপর্যায়ে হাঁটতে হাঁটতে নাকে অদ্ভুত একটি গন্ধ আসে। তখনই বুঝতে পারি, এটি বাঘের গন্ধ। দ্রুত কয়েকটি ছবি তুলি। আমার স্ত্রী সামনে ছিলেন, তাঁরও একটি ছবি তুলছিলাম। এরপর আশপাশের আরও কিছু ছবি তুলে দ্রুত লঞ্চে ফিরে যাই।
পরে লঞ্চে বসে ছবিগুলো বড় করে দেখার সময় দূরে একটি অবয়বের মতো কিছু চোখে পড়ে। সেটি কিছুটা সোজা ধরনের ছিল। সবাই মিলে ধারণা করি, ওটা বাঘই ছিল।
সময়ের সঙ্গে সুন্দরবনে কী পরিবর্তন দেখেছেন?
আমরা মূলত ঘুরতে যাই। তাই চারপাশের সব পরিবর্তন হয়তো গভীরভাবে খেয়াল করা হয় না। তবে সম্প্রতি বাঘ নিয়ে মানুষের মধ্যে কিছুটা বেশি ভয় কাজ করতে দেখেছি। বাঘ আশপাশে থাকার সম্ভাবনা থাকলেও একধরনের আতঙ্ক অনুভূত হয়।
জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবেও সুন্দরবনের পরিবর্তন হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় সিডরের আগে যে সুন্দরবন দেখেছি, পরের সুন্দরবনের সঙ্গে তার অনেক পার্থক্য। নিয়মিত যাঁরা সেখানে যান, তাঁরা হয়তো পরিবর্তনগুলো আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবেন।
সিডরের আগে বনটিকে অনেক সুন্দর লাগত, অনেকটা বাগানের মতো। ঝড়টির পর বনের চেহারায় বড় পরিবর্তন আসে। আমার মনে হয়, সুন্দরবন এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। অনেক জায়গায় ভাঙাচোরা অবস্থা রয়েছে। সুন্দরবনের ওপর দিয়ে নিয়মিত ঝড় বয়ে যাওয়ায় বনটি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দেশের বাইরে প্রিয় বেড়ানোর জায়গা কোনটি?
বিদেশে আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা নেপাল। স্রষ্টা আমাকে পৃথিবীর অনেক জায়গায় ঘোরার সুযোগ দিয়েছেন। তারপরও এখন পর্যন্ত নেপালই আমার সবচেয়ে পছন্দের।
আমার মনে হয়, একবার নেপাল ঘুরে দেশটিকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। আরও কয়েকবার যেতে হবে। তারপর হয়তো জায়গাটির প্রকৃত অনুভূতি উপলব্ধি করতে পারব। সুন্দরবনের পর পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত নেপালকেই আমার সবচেয়ে ভালো ‘গুড ভাইব’-এর জায়গা বলে মনে হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন