সংবাদ

ধারাবাহিক উপন্যাস ২০

গোমতীকন্যা


মহিবুল আলম
মহিবুল আলম
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১০ এএম

গোমতীকন্যা
শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

দ্বিতীয় পর্ব: মমিনার জীবন 

(পূর্ব প্রকাশের পর) 

দশ.

শুক্রবারের সকালটা আনিসের জন্য বরাবরই সুখের। আয়াস করে সে দশটা-এগারোটার দিকে ঘুম থেকে ওঠে। তারপর গায়ে শার্ট চাপিয়ে নিচে গলির মুখে ‘চাচার হোটেল’-এ নাস্তা করতে যায়। গলির মুখের সেই রেস্তোরাঁর নাম ‘চাচার হোটেল’ কেন রাখা হয়েছে, সে জানে না। রেস্তোরাঁর মালিক কফিল মিয়া শুক্রবার এলেই তার জন্য দুই-তিনটা পরোটা, একটু সবজি ও গরুর মাংসের ঝোল থাকলে আলাদা করে তা রেখে দেয়। সকাল দশটার পর রেস্তোঁরাটায় নাস্তার কোনো ব্যবস্থা থাকে না। দুপুরের খাবারের সরঞ্জাম তৈরি করা হয়।

বৃহস্পতিবার রাতে পত্রিকায় তার সাহিত্যের পাতার গেটআপ-মেকআপ থাকে বলে রাতে বাসায় ফিরতে আনিসের অনেক রাত হয়ে যায়। তাই শুক্রবার সকালে দেরিতে ওঠে। কিন্তু অন্যদিন অবশ্য সে সকাল-সকালই ঘুম থেকে উঠে যায়। দুপুরে সে যেখানেই খায়, কিন্তু সকালের নাস্তাটা সে কফিল মিয়ার ওখানেই করে। রাতেও সে এখানে-ওখানে খেয়ে নেয়। তার পত্রিকা অফিসের নিচেই বেশ কয়েকটা রেস্তোরাঁ আছে। ছাপরার রেস্তোরাঁ, কিন্তু খাবার ভালো। পত্রিকার অফিসের কেউ কেউ অবশ্য ভালো কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে খায়। সে যে ভালো রেস্তোরাঁয় যায় না, তা নয়। কিন্তু সে ভালো রেস্তোরাঁয় যাওয়ার চেয়ে ভালো খাবার কোথায় পাওয়া যায়, সেটা খোঁজে।

আনিস মাঝখানে অবশ্য বাসায় রান্নার সব ব্যবস্থা করেছিল। হাঁড়িপাতিল থেকে থালাবাটি কোনোটাই কেনা বাদ দেয়নি। একটা মাঝারি আকারের রেফ্রিজারেটরও কিনেছিল। এজন্য সে একটি ছুটা কাজের বুয়াও রেখেছিল। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে কাঁচাবাজারে গিয়ে বাজার করার সমস্যা দেখে শেষে কাজের বুয়া ছেড়ে দেয়। তার পত্রিকা অফিসের সহকর্মীরা প্রায়ই তাকে একটা বিয়ে করতে বলে। পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক কামরুজ্জামান কামাল তো পিছেই লেগে গেছেন তার শ্যালিকাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য। তার শ্যালিকা তিনবার পত্রিকা অফিসে এসে তাকে দেখে গেছে। ফোন নম্বর নিয়ে কয়েকবার ফোনও দিয়েছে। দেখতে খারাপ নয় মেয়েটা। নামটার বেশ সুন্দর— অহনা। একটা এনজিওতে কাজ করছে। ঢাকাতেই অফিস। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস নিয়ে এমএ পাস করা। অহনা বরঞ্চ তার চেয়ে শিক্ষিত বেশি। সে নিজে তো বিএ পাস। যদিও সে ঢাকায় এসে এমএ-টা পড়বে বলে অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু এখন ইচ্ছেটা মিইয়ে গেছে। পত্রিকায় চাকরি বা কবিতা লিখতে গিয়ে তো তার এমএ পাস করাটা খুব একটা জরুরি নয়। ওদিকে বয়সটাও মানানসই। অহনার বয়স তিরিশের ঘরে। তার নিজের পঁয়ত্রিশ বছর বয়স।

তারপরও আনিস বিয়ের ব্যাপারে মোটেও এগোচ্ছে না। আসলে তার বিয়ের প্রতি কোনো আগ্রহই নেই। এমন না যে তার মেয়েমানুষের প্রতি আগ্রহ নেই। মেয়েমানুষের প্রতি তার প্রচণ্ড আগ্রহ আছে। কিন্তু সে বিয়ে করবে না। তার বিয়ের প্রতিটা আগ্রহটা মরে গেছে বুঝ হওয়ার পর থেকেই। তার মা’র প্রতি তার বাবা যে অত্যাচার করেছে! সেই অত্যাচার দেখে দেখে সে বড় হয়েছে। তার ভেতর প্রতিনিয়ত একটা আতঙ্ক কাজ করে, সে না আবার তার বাবার মতো হয়...! তার শরীরে যে তার বাবারই রক্ত। এছাড়া সে আরেকটা ব্যাপারে সমঝোতা করতে চায় না। তার কবিতা লেখায় কোনো কারণে ব্যাঘাত ঘটবে এমন কোনো কাজ সে করবে না। পত্রিকায় চাকরি নিয়ে প্রথমদিকে কবিতা লেখায় ব্যাঘাত ঘটছে দেখে চাকরিটাই ছেড়ে দিতে চেয়েছিল। পরে সে দেখে, পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের সহকারী হয়ে বরং ভালোই হয়েছে। বাধ্যতামূলক বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকদের লেখা পড়তে গিয়ে সে নিজেকে জানতে শিখছে। কিন্তু কবিতার জন্য সে বিয়েটা করতে চাচ্ছে না। সে দেখেছে, অনেক কবি-সাহিত্যিক বিয়েসাধি করে পরে জীবন থেকে কবিতাকে চিরতরে বিদায় দিয়েছে। সেটাও বড় কথা নয়, আসলে সে চিরস্থায়ী কবিতার শরীর নিয়ে থাকতে চায়, বিয়ে নামক মেয়েমানুষের শরীর নিয়ে নয়। এমনিতে শরীরের চাহিদা এ-নারী ও-নারীর সংস্পর্শে মেটাবে, সেটা অন্যকথা।

আজও শুক্রবার। সাধারণত সাহিত্য সাময়িকীর গেটআপ ও মেকআপ দিয়ে প্রেসে পাঠিয়ে আনিসের বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত দেড়টা-দুইটা বেজে গেলেও গতরাতে তার প্রায় সাড়ে তিনটা বাজে যায়। পত্রিকা অফিসের কাছ থেকে তার সিএনজি পেতে সমস্যা হয়েছিল। তার মোটর সাইকেলটা নষ্ট। ভটভট শব্দ তুলে বন্ধ হয়ে যায়। তাই গতকাল ফার্মগেটের কাছে একটা গ্যারেজে ঠিক করতে দিয়েছে। গ্যারেজের মেকানিক্স বলছে, গিয়ারবক্সের নাকি সমস্যা। একদিন লাগবে ঠিক করতে। আজ হয়তো মোটর সাইকেলটা পেয়ে যাবে।

গতরাতে সাড়ে তিনটার দিকে বাসায় ফিরলেও আনিস আজ দশটার আগেই ঘুম থেকে উঠে গেল। তার চিলেকোঠার ভেতরই বাথরুম ও টয়লেট। অনেকটা আধুনিক, টাইলস বসানো। সাদা ধবধবে টাইলস। তার বাসাটা নামে চিলেকোঠা হলেও আসলে এটা একটা স্টুডিও ইউনিট। একপাশে বেড, পাশেই ছোট্ট একটা লাউঞ্জ। একটা কিচেনও আছে। এ বাসার মালিক সোবহান সাহেব নাকি খুব সুন্দর বেহালা বাজাতেন। তাই তিনি জ্যোৎস্নার রাতে চাঁদ দেখতে দেখতে বেহালা বাজাবেন বলে এই স্টুডিও ইউনিটটা বানিয়েছিলেন। কিন্তু বিধিবাম, এই ছয়তলা দালান ও চিলেকোঠাটা পুরোপুরি বানানো শেষ করার আগে আমেরিকায় ছেলেদের কাছে বেড়াতে গিয়ে সেখানেই মারা যান। পরে তার ছয় ছেলে ছয়তলা ভাগ করে নেয়। ছয় ছেলের মধ্যে পাঁচ ছেলে আমেরিকাতে থাকে আর এক ছেলে দেশে থাকে। যে ছেলে দেশে থাকে তার নাম অনাবিল মজুমদার। উত্তরায় উত্তরখানে তার আলাদা একটা বাড়ি আছে। নিজের ভাড়াটিয়ার টাকাসহ অন্য ভাইদের ফ্ল্যাটগুলোর টাকা তুলে বলে ও তুলনামূলক আর্থিকভাবে দুর্বল হওয়াতে আমেরিকা প্রবাসী পাঁচ ভাই মিলে তাদের ছোট ভাই অনাবিল মজুমদারের নামে চিলেকোঠাটা লিখে দেয়।

আনিস এই চিলেকোঠার খোঁজ পায় তাদের পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক সেই কামরুজ্জামান কামালের মাধ্যমেই। ভাড়া একটু বেশি, চৌদ্দ হাজার টাকা। কিন্তু তাতে তার কিছু যায়-আসে না। সে তো আর পত্রিকার বেতনের ওপর নির্ভরশীল নয়। গ্রামে তার অঢেল সম্পত্তি। প্রথম দেখায়ই চিলেকোঠাটা তার ভালো লেগে যায়। তার ভালো লাগা চিলেকোঠায় এই আধুনিকতার ছোঁয়া থাকার জন্য নয়, চিলেকোঠার সামনে উঠোনসদৃশ বিশাল ছাদটার জন্য। ছয়তলার ওপর ছাদ থেকে ঢাকা শহরটা সেদিন সত্যি অন্য রকম লেগেছিল।

শুধু সেদিন নয়, আনিসের প্রতিনিয়তই উঠোন সদৃশ ছাদটা ভালো লাগে। বাসায় ওঠার পর প্রথম প্রথম ভোরে ঘুম থেকে উঠে কয়েকবার ছাদ থেকে সূর্য ওঠা দেখেছে। সেটা তার কাছে অন্য রকম এক অনুভূতি ছিল। তার মনে হয়েছিল, কুয়াশার মতো অনেকটা দেখতে, ধুলোর আস্তরের ভেতর ভোরের সূর্যটা যেন আস্ত একটা ডিমের কুসুম। পুবের আকাশ বেয়ে নয়, তার শরীর বেয়েই যেন উঠছে!

আজকাল অবশ্য পত্রিকায় অনেক রাত অব্ধি কাজ করে বলে আনিসের সকালের সুর্য ওঠা আর দেখা হয় না। তবে মাঝেমধ্যে ছাদে বসে সে সূর্যাস্ত দেখে। সূর্যটা পশ্চিমের আকাশ বেয়ে আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে, চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা আভা ও একই রকম কুয়াশার মতো ধুলোর আস্তর, ঢাকা শহরের কোনো বহুতল ভবন থেকে এমন সূর্যাস্ত দেখে নিঃসন্দেহে যে কেউ মনের দিক দিয়ে মহিমান্বিত হবে। সে নিজেও অনেকবার মহিমান্বিত হয়েছে। সে এই ছাদে বসে অনেকগুলো কবিতা লিখেছে। বিকেলের কবিতা। গোধূলির আভা যেন পশ্চিমের শরীর বেয়ে নয়, বারবার তার কবিতার শরীর বেয়ে নেমেছে। তার আরও কিছু কবিতা লেখা হলে একটি বই করবে। বইটির নামও স্থির করে রেখেছে— ‘জলকুসুমের কাব্য।’

আনিস আজ বাথরুম থেকে বের গায়ে একটা শার্ট চাপাল। সচরাচর সে যে লুঙ্গি পরে কফিল মিয়ার রেস্তোরাঁয় নাস্তা করতে যায়, আজ সে তা করল না। একটা প্যান্ট পরে নিল। সে কফিল মিয়ার রেস্তোরাঁ থেকে নাস্তাটা সেরে ফার্মগেট মোটর মেকানিকসের দোকানে যাবে। তার মোটর সাইকেলটা ঠিক হয়েছে কি না দেখবে।

চিলেকোঠা থেকে বের হয়ে আনিসকে সিঁড়ি দিয়ে ছয়তলায় নামতে হয়। ছয়তলা থেকে লিফট। পাশেই সিঁড়ি। এ বাসায় কোনো জেনারেটর নেই। তাই মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলে লিফট বন্ধ হয়ে যায়। তখন সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে হয়। আজ অবশ্য বিদ্যুৎ আছে। লিফট চলছে। সে ছয়তলায় নেমে লিফটের কাছে দাঁড়াল। লিফটটা এখন তিনতলায়। সে সেখানে দাঁড়িয়ে লিফটের নম্বরগুলো দেখতে থাকল। ঠিক তখনই পেছন থেকে একজন ডেকে উঠল, ‘আনিস ভাই।’

বেশ মধুর মেয়েলি কণ্ঠের ডাক। তারপরও আনিস কিছুটা চমকে উঠল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, ছয়তলার নতুন আসা ভাড়াটিয়া সেই যুবতী নারী। অবশ্য এই ভাড়াটিয়াকে ঠিক নতুন বলা যায় না। এরই মধ্যে তিন মাস হয়ে গেছে।

আনিস কিছুটা সামলে নিয়ে বলল, ‘ও, আপনি!’

যুবতী নারী খিলখিল করে হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যাঁ আমি। কিন্তু আমার ডাকে ভয় পেয়ে গেলেন মনে হয়?’

আনিস কিছুটা লজ্জা পেয়ে বলল, ‘না, ঠিক তা নয়। পেছন থেকে আঁতকা ডাক দিলেন তো, তাই!’

যুবতী নারী কৃত্রিম বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, ‘কী বলেন, আঁতকা কোথায়? আমি তো মোলায়েম গলায় ডাক দিয়েছি।’ বলেই আরও জোরে খলবল করে হাসতে শুরু করল।

আনিস কিছুটা শঙ্কিত হয়ে এদিকওদিক তাকাল। যদিও এখানে শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এখানে কে কাকে চিনে? আর চিনলেই বা কী? এখানে কেউ কাউকে নিয়ে ভাবার সময় নেই।

লিফট চলে এল। যুবতী নারীকে আর কথা বাড়ানোর সুযোগ দিবে না বলে আনিস মুহূর্ত দেরি না করে লিফটে উঠে গেল। কিন্তু লিফটের দরজা বন্ধ হওয়ার পূর্বমুহূর্তে যুবতী মহিলা গলা বাড়িয়ে বলল, ‘আজ তো আপনার বন্ধের দিন। বিকেলের দিকে আমি ছাদে যাব। সূর্যাস্ত দেখব। আপনি বিকেলে থাকবেন তো?’

আনিস কোনো জবাব দিল না।

লিফটা নামছে একটা শিনশিন শব্দ করে। সঙ্গে হাল্কা ঘড়ঘড় শব্দও আছে। লিফটে আনিস একাই। সে যুবতী নারীকে নিয়ে ভাবতে বসল। প্রথম প্রথম সম্পর্কটা প্রতিবেশী হিসেবে থাকলেও গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুবতী নারী যেন তার পিছু ছাড়ছে না। গায়ে পড়ে কথা বলে। শাড়ি ঠিক করার নামে আঁচলটা বুক থেকে সরিয়ে দেয়। আকারে-ইঙ্গিতে এটাসেটা বোঝায়। বই নেওয়ার নাম করে তার চিলেকোঠায় আসার সুযোগ খোঁজে। তার কবিতার বই নিয়ে আবৃত্তি করে শোনায়। তার ‘গোমতীকন্যা’ সিরিজ কবিতা পড়ে নিজেকে গোমতীকন্যা হিসেবে আখ্যা দিতে আনন্দ পায়।

যুবতী নারী অবশ্য গোমতী পাড়েরই মেয়ে। কুমিল্লার উত্তরে শহরতলির কাছাকাছি তাদের বাড়ি। গোমতী পাড়ের মেয়ে বলে প্রথম পরিচয়ের পর থেকেই আনিসের সঙ্গে সে আন্তরিক হওয়ার চেষ্টা করে। সেই আন্তরিকতা থেকে আজকাল অন্তরঙ্গতা চাচ্ছে।

আনিস ভাবল, যুবতী নারী তার কাছে এই অন্তরঙ্গতা চাওয়ার পেছনে কোনো অযৌক্তিক কারণ নেই। স্বামী বিদেশ থাকে। নিজের চাহিদা বলতে একটা কথা আছে তো!

আনিস প্রথমদিনেই যুবতী মহিলার নাম জেনেছে। শবনম শিউলি। নামটা তার খুব পছন্দ হয়েছিল। শরতের শিশিরে ভেজা শিউলি ফুল। সে তা প্রকাশও করেছিল।

আনিসের মনে পড়ল, শবনম শিউলি যখন বাসা ভাড়া নেয়, এর প্রথমদিনই সে ছাদে এসে তার চিলেকোঠার দরজায় কড়া নাড়ে। সেদিনও শুক্রবার ছিল। সে শুয়ে শুয়ে একটা কবিতা লেখার চেষ্টা করছিল। কড়া নাড়ার শব্দ শুনে সে অবাক হয়। সাধারণ সে ছাদের চিলেকোঠাটায় থাকে বলে কেউ সহজে ছাদে আসে না। একমাত্র অনাবিল মজুমদার এসে মাসের পাঁচ তারিখ বাসা ভাড়া নেওয়ার জন্য কড়ানাড়ে, আর কেউ নয়। মাঝেমধ্যে বাসার কেয়ারটেকার আসে। তাও খুব কম, বছরে একবার-দু’বার। কোনোকিছু বলার থাকলে কেয়ারটেকার গেইটের কাছেই বলে।

আনিস উঠে গিয়ে দরজা খোলে। আর দরজা খুলেই সে অপ্রস্তুত হয়ে যায়। সে আশা করেনি, একজন অপরিচিত সুন্দরী যুবতী নারী তার দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকবে।

যুবতী নারী নিজ থেকে পরিচিত হয়। এক সন্তানের জননী। ছেলের বয়স পাঁচবছর। স্বামী চার বছর ধরে ইতালিতে থাকে। এখনও কাগজপত্র হয়নি বলে তাদেরকে নিয়ে যেতে পারছে না। বাসায় শবনম শিউলির সঙ্গে তার ছোটভাই থাকে। তবে সবসময় থাকে না। তার ছোটভাই একটা ওষুধ কোম্পানিতে কাজ করে বলে প্রায়ই জেলাশহরগুলোতে যেতে হয়। বেশিরভাগ সময় শবনম শিউলি ছেলেকে নিয়ে একা থাকে।

প্রথম পরিচয়ের পর থেকে শবনম শিউলি কারণে-অকারণে ছাদে আসা শুরু করে। এই দালানের আর কেউ ছাদে কাপড় শুকাতে না এলেও সে ঠিকই কাপড় শুকাতে আসে। সময়সময় চিলেকোঠায় এসে এটাওটা জিজ্ঞেস করে। কোনো অনুমতির তোয়াক্কা না করে বই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করে।

আনিস এতে প্রথম প্রথম বিরক্ত হলেও কিছু বলতে পারত না। তবে আস্তে আস্তে তার বিরক্তিভাবটা চলে যায়। বিশেষ করে শবনম শিউলি যখন তার কবিতার প্রশংসা করে ও আবৃত্তি করে শোনায়, সে ভেতর ভেতরে গলে যায়। সে জানে, কবিদের এ একটা দুর্বলতা। কেউ তার কবিতার প্রশংসা করলে নিজেকে আর আয়ত্তে রাখতে পারে না। নিজেকে উজাড় করে দিতে চায়।

এভাবে তিনটা মাস। তবে আনিস মনেপ্রাণে চাচ্ছে, শবনম শিউলির সঙ্গে তার কোনো শারীরিক সম্পর্ক না হোক। এর মানে এই নয় যে তার আজকাল নারীর শরীর প্রতি টানে না। কিন্তু সেতারা বেগমের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে সেই যে দ্বগ্ধ হয়েছে, এখন অন্যের স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার পক্ষপাতী সে আর হতে চায় না। শবনম শিউলি তো অন্য একজনের স্ত্রী। তার ওপর পাঁচ বছরের এক ছেলে সন্তানের জননী। ক্রমশ... 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬


গোমতীকন্যা

প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

দ্বিতীয় পর্ব: মমিনার জীবন 

(পূর্ব প্রকাশের পর) 

দশ.

শুক্রবারের সকালটা আনিসের জন্য বরাবরই সুখের। আয়াস করে সে দশটা-এগারোটার দিকে ঘুম থেকে ওঠে। তারপর গায়ে শার্ট চাপিয়ে নিচে গলির মুখে ‘চাচার হোটেল’-এ নাস্তা করতে যায়। গলির মুখের সেই রেস্তোরাঁর নাম ‘চাচার হোটেল’ কেন রাখা হয়েছে, সে জানে না। রেস্তোরাঁর মালিক কফিল মিয়া শুক্রবার এলেই তার জন্য দুই-তিনটা পরোটা, একটু সবজি ও গরুর মাংসের ঝোল থাকলে আলাদা করে তা রেখে দেয়। সকাল দশটার পর রেস্তোঁরাটায় নাস্তার কোনো ব্যবস্থা থাকে না। দুপুরের খাবারের সরঞ্জাম তৈরি করা হয়।

বৃহস্পতিবার রাতে পত্রিকায় তার সাহিত্যের পাতার গেটআপ-মেকআপ থাকে বলে রাতে বাসায় ফিরতে আনিসের অনেক রাত হয়ে যায়। তাই শুক্রবার সকালে দেরিতে ওঠে। কিন্তু অন্যদিন অবশ্য সে সকাল-সকালই ঘুম থেকে উঠে যায়। দুপুরে সে যেখানেই খায়, কিন্তু সকালের নাস্তাটা সে কফিল মিয়ার ওখানেই করে। রাতেও সে এখানে-ওখানে খেয়ে নেয়। তার পত্রিকা অফিসের নিচেই বেশ কয়েকটা রেস্তোরাঁ আছে। ছাপরার রেস্তোরাঁ, কিন্তু খাবার ভালো। পত্রিকার অফিসের কেউ কেউ অবশ্য ভালো কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে খায়। সে যে ভালো রেস্তোরাঁয় যায় না, তা নয়। কিন্তু সে ভালো রেস্তোরাঁয় যাওয়ার চেয়ে ভালো খাবার কোথায় পাওয়া যায়, সেটা খোঁজে।

আনিস মাঝখানে অবশ্য বাসায় রান্নার সব ব্যবস্থা করেছিল। হাঁড়িপাতিল থেকে থালাবাটি কোনোটাই কেনা বাদ দেয়নি। একটা মাঝারি আকারের রেফ্রিজারেটরও কিনেছিল। এজন্য সে একটি ছুটা কাজের বুয়াও রেখেছিল। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে কাঁচাবাজারে গিয়ে বাজার করার সমস্যা দেখে শেষে কাজের বুয়া ছেড়ে দেয়। তার পত্রিকা অফিসের সহকর্মীরা প্রায়ই তাকে একটা বিয়ে করতে বলে। পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক কামরুজ্জামান কামাল তো পিছেই লেগে গেছেন তার শ্যালিকাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য। তার শ্যালিকা তিনবার পত্রিকা অফিসে এসে তাকে দেখে গেছে। ফোন নম্বর নিয়ে কয়েকবার ফোনও দিয়েছে। দেখতে খারাপ নয় মেয়েটা। নামটার বেশ সুন্দর— অহনা। একটা এনজিওতে কাজ করছে। ঢাকাতেই অফিস। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস নিয়ে এমএ পাস করা। অহনা বরঞ্চ তার চেয়ে শিক্ষিত বেশি। সে নিজে তো বিএ পাস। যদিও সে ঢাকায় এসে এমএ-টা পড়বে বলে অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু এখন ইচ্ছেটা মিইয়ে গেছে। পত্রিকায় চাকরি বা কবিতা লিখতে গিয়ে তো তার এমএ পাস করাটা খুব একটা জরুরি নয়। ওদিকে বয়সটাও মানানসই। অহনার বয়স তিরিশের ঘরে। তার নিজের পঁয়ত্রিশ বছর বয়স।

তারপরও আনিস বিয়ের ব্যাপারে মোটেও এগোচ্ছে না। আসলে তার বিয়ের প্রতি কোনো আগ্রহই নেই। এমন না যে তার মেয়েমানুষের প্রতি আগ্রহ নেই। মেয়েমানুষের প্রতি তার প্রচণ্ড আগ্রহ আছে। কিন্তু সে বিয়ে করবে না। তার বিয়ের প্রতিটা আগ্রহটা মরে গেছে বুঝ হওয়ার পর থেকেই। তার মা’র প্রতি তার বাবা যে অত্যাচার করেছে! সেই অত্যাচার দেখে দেখে সে বড় হয়েছে। তার ভেতর প্রতিনিয়ত একটা আতঙ্ক কাজ করে, সে না আবার তার বাবার মতো হয়...! তার শরীরে যে তার বাবারই রক্ত। এছাড়া সে আরেকটা ব্যাপারে সমঝোতা করতে চায় না। তার কবিতা লেখায় কোনো কারণে ব্যাঘাত ঘটবে এমন কোনো কাজ সে করবে না। পত্রিকায় চাকরি নিয়ে প্রথমদিকে কবিতা লেখায় ব্যাঘাত ঘটছে দেখে চাকরিটাই ছেড়ে দিতে চেয়েছিল। পরে সে দেখে, পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের সহকারী হয়ে বরং ভালোই হয়েছে। বাধ্যতামূলক বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকদের লেখা পড়তে গিয়ে সে নিজেকে জানতে শিখছে। কিন্তু কবিতার জন্য সে বিয়েটা করতে চাচ্ছে না। সে দেখেছে, অনেক কবি-সাহিত্যিক বিয়েসাধি করে পরে জীবন থেকে কবিতাকে চিরতরে বিদায় দিয়েছে। সেটাও বড় কথা নয়, আসলে সে চিরস্থায়ী কবিতার শরীর নিয়ে থাকতে চায়, বিয়ে নামক মেয়েমানুষের শরীর নিয়ে নয়। এমনিতে শরীরের চাহিদা এ-নারী ও-নারীর সংস্পর্শে মেটাবে, সেটা অন্যকথা।

আজও শুক্রবার। সাধারণত সাহিত্য সাময়িকীর গেটআপ ও মেকআপ দিয়ে প্রেসে পাঠিয়ে আনিসের বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত দেড়টা-দুইটা বেজে গেলেও গতরাতে তার প্রায় সাড়ে তিনটা বাজে যায়। পত্রিকা অফিসের কাছ থেকে তার সিএনজি পেতে সমস্যা হয়েছিল। তার মোটর সাইকেলটা নষ্ট। ভটভট শব্দ তুলে বন্ধ হয়ে যায়। তাই গতকাল ফার্মগেটের কাছে একটা গ্যারেজে ঠিক করতে দিয়েছে। গ্যারেজের মেকানিক্স বলছে, গিয়ারবক্সের নাকি সমস্যা। একদিন লাগবে ঠিক করতে। আজ হয়তো মোটর সাইকেলটা পেয়ে যাবে।

গতরাতে সাড়ে তিনটার দিকে বাসায় ফিরলেও আনিস আজ দশটার আগেই ঘুম থেকে উঠে গেল। তার চিলেকোঠার ভেতরই বাথরুম ও টয়লেট। অনেকটা আধুনিক, টাইলস বসানো। সাদা ধবধবে টাইলস। তার বাসাটা নামে চিলেকোঠা হলেও আসলে এটা একটা স্টুডিও ইউনিট। একপাশে বেড, পাশেই ছোট্ট একটা লাউঞ্জ। একটা কিচেনও আছে। এ বাসার মালিক সোবহান সাহেব নাকি খুব সুন্দর বেহালা বাজাতেন। তাই তিনি জ্যোৎস্নার রাতে চাঁদ দেখতে দেখতে বেহালা বাজাবেন বলে এই স্টুডিও ইউনিটটা বানিয়েছিলেন। কিন্তু বিধিবাম, এই ছয়তলা দালান ও চিলেকোঠাটা পুরোপুরি বানানো শেষ করার আগে আমেরিকায় ছেলেদের কাছে বেড়াতে গিয়ে সেখানেই মারা যান। পরে তার ছয় ছেলে ছয়তলা ভাগ করে নেয়। ছয় ছেলের মধ্যে পাঁচ ছেলে আমেরিকাতে থাকে আর এক ছেলে দেশে থাকে। যে ছেলে দেশে থাকে তার নাম অনাবিল মজুমদার। উত্তরায় উত্তরখানে তার আলাদা একটা বাড়ি আছে। নিজের ভাড়াটিয়ার টাকাসহ অন্য ভাইদের ফ্ল্যাটগুলোর টাকা তুলে বলে ও তুলনামূলক আর্থিকভাবে দুর্বল হওয়াতে আমেরিকা প্রবাসী পাঁচ ভাই মিলে তাদের ছোট ভাই অনাবিল মজুমদারের নামে চিলেকোঠাটা লিখে দেয়।

আনিস এই চিলেকোঠার খোঁজ পায় তাদের পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক সেই কামরুজ্জামান কামালের মাধ্যমেই। ভাড়া একটু বেশি, চৌদ্দ হাজার টাকা। কিন্তু তাতে তার কিছু যায়-আসে না। সে তো আর পত্রিকার বেতনের ওপর নির্ভরশীল নয়। গ্রামে তার অঢেল সম্পত্তি। প্রথম দেখায়ই চিলেকোঠাটা তার ভালো লেগে যায়। তার ভালো লাগা চিলেকোঠায় এই আধুনিকতার ছোঁয়া থাকার জন্য নয়, চিলেকোঠার সামনে উঠোনসদৃশ বিশাল ছাদটার জন্য। ছয়তলার ওপর ছাদ থেকে ঢাকা শহরটা সেদিন সত্যি অন্য রকম লেগেছিল।

শুধু সেদিন নয়, আনিসের প্রতিনিয়তই উঠোন সদৃশ ছাদটা ভালো লাগে। বাসায় ওঠার পর প্রথম প্রথম ভোরে ঘুম থেকে উঠে কয়েকবার ছাদ থেকে সূর্য ওঠা দেখেছে। সেটা তার কাছে অন্য রকম এক অনুভূতি ছিল। তার মনে হয়েছিল, কুয়াশার মতো অনেকটা দেখতে, ধুলোর আস্তরের ভেতর ভোরের সূর্যটা যেন আস্ত একটা ডিমের কুসুম। পুবের আকাশ বেয়ে নয়, তার শরীর বেয়েই যেন উঠছে!

আজকাল অবশ্য পত্রিকায় অনেক রাত অব্ধি কাজ করে বলে আনিসের সকালের সুর্য ওঠা আর দেখা হয় না। তবে মাঝেমধ্যে ছাদে বসে সে সূর্যাস্ত দেখে। সূর্যটা পশ্চিমের আকাশ বেয়ে আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে, চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা আভা ও একই রকম কুয়াশার মতো ধুলোর আস্তর, ঢাকা শহরের কোনো বহুতল ভবন থেকে এমন সূর্যাস্ত দেখে নিঃসন্দেহে যে কেউ মনের দিক দিয়ে মহিমান্বিত হবে। সে নিজেও অনেকবার মহিমান্বিত হয়েছে। সে এই ছাদে বসে অনেকগুলো কবিতা লিখেছে। বিকেলের কবিতা। গোধূলির আভা যেন পশ্চিমের শরীর বেয়ে নয়, বারবার তার কবিতার শরীর বেয়ে নেমেছে। তার আরও কিছু কবিতা লেখা হলে একটি বই করবে। বইটির নামও স্থির করে রেখেছে— ‘জলকুসুমের কাব্য।’

আনিস আজ বাথরুম থেকে বের গায়ে একটা শার্ট চাপাল। সচরাচর সে যে লুঙ্গি পরে কফিল মিয়ার রেস্তোরাঁয় নাস্তা করতে যায়, আজ সে তা করল না। একটা প্যান্ট পরে নিল। সে কফিল মিয়ার রেস্তোরাঁ থেকে নাস্তাটা সেরে ফার্মগেট মোটর মেকানিকসের দোকানে যাবে। তার মোটর সাইকেলটা ঠিক হয়েছে কি না দেখবে।

চিলেকোঠা থেকে বের হয়ে আনিসকে সিঁড়ি দিয়ে ছয়তলায় নামতে হয়। ছয়তলা থেকে লিফট। পাশেই সিঁড়ি। এ বাসায় কোনো জেনারেটর নেই। তাই মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলে লিফট বন্ধ হয়ে যায়। তখন সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে হয়। আজ অবশ্য বিদ্যুৎ আছে। লিফট চলছে। সে ছয়তলায় নেমে লিফটের কাছে দাঁড়াল। লিফটটা এখন তিনতলায়। সে সেখানে দাঁড়িয়ে লিফটের নম্বরগুলো দেখতে থাকল। ঠিক তখনই পেছন থেকে একজন ডেকে উঠল, ‘আনিস ভাই।’

বেশ মধুর মেয়েলি কণ্ঠের ডাক। তারপরও আনিস কিছুটা চমকে উঠল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, ছয়তলার নতুন আসা ভাড়াটিয়া সেই যুবতী নারী। অবশ্য এই ভাড়াটিয়াকে ঠিক নতুন বলা যায় না। এরই মধ্যে তিন মাস হয়ে গেছে।

আনিস কিছুটা সামলে নিয়ে বলল, ‘ও, আপনি!’

যুবতী নারী খিলখিল করে হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যাঁ আমি। কিন্তু আমার ডাকে ভয় পেয়ে গেলেন মনে হয়?’

আনিস কিছুটা লজ্জা পেয়ে বলল, ‘না, ঠিক তা নয়। পেছন থেকে আঁতকা ডাক দিলেন তো, তাই!’

যুবতী নারী কৃত্রিম বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, ‘কী বলেন, আঁতকা কোথায়? আমি তো মোলায়েম গলায় ডাক দিয়েছি।’ বলেই আরও জোরে খলবল করে হাসতে শুরু করল।

আনিস কিছুটা শঙ্কিত হয়ে এদিকওদিক তাকাল। যদিও এখানে শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এখানে কে কাকে চিনে? আর চিনলেই বা কী? এখানে কেউ কাউকে নিয়ে ভাবার সময় নেই।

লিফট চলে এল। যুবতী নারীকে আর কথা বাড়ানোর সুযোগ দিবে না বলে আনিস মুহূর্ত দেরি না করে লিফটে উঠে গেল। কিন্তু লিফটের দরজা বন্ধ হওয়ার পূর্বমুহূর্তে যুবতী মহিলা গলা বাড়িয়ে বলল, ‘আজ তো আপনার বন্ধের দিন। বিকেলের দিকে আমি ছাদে যাব। সূর্যাস্ত দেখব। আপনি বিকেলে থাকবেন তো?’

আনিস কোনো জবাব দিল না।

লিফটা নামছে একটা শিনশিন শব্দ করে। সঙ্গে হাল্কা ঘড়ঘড় শব্দও আছে। লিফটে আনিস একাই। সে যুবতী নারীকে নিয়ে ভাবতে বসল। প্রথম প্রথম সম্পর্কটা প্রতিবেশী হিসেবে থাকলেও গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুবতী নারী যেন তার পিছু ছাড়ছে না। গায়ে পড়ে কথা বলে। শাড়ি ঠিক করার নামে আঁচলটা বুক থেকে সরিয়ে দেয়। আকারে-ইঙ্গিতে এটাসেটা বোঝায়। বই নেওয়ার নাম করে তার চিলেকোঠায় আসার সুযোগ খোঁজে। তার কবিতার বই নিয়ে আবৃত্তি করে শোনায়। তার ‘গোমতীকন্যা’ সিরিজ কবিতা পড়ে নিজেকে গোমতীকন্যা হিসেবে আখ্যা দিতে আনন্দ পায়।

যুবতী নারী অবশ্য গোমতী পাড়েরই মেয়ে। কুমিল্লার উত্তরে শহরতলির কাছাকাছি তাদের বাড়ি। গোমতী পাড়ের মেয়ে বলে প্রথম পরিচয়ের পর থেকেই আনিসের সঙ্গে সে আন্তরিক হওয়ার চেষ্টা করে। সেই আন্তরিকতা থেকে আজকাল অন্তরঙ্গতা চাচ্ছে।

আনিস ভাবল, যুবতী নারী তার কাছে এই অন্তরঙ্গতা চাওয়ার পেছনে কোনো অযৌক্তিক কারণ নেই। স্বামী বিদেশ থাকে। নিজের চাহিদা বলতে একটা কথা আছে তো!

আনিস প্রথমদিনেই যুবতী মহিলার নাম জেনেছে। শবনম শিউলি। নামটা তার খুব পছন্দ হয়েছিল। শরতের শিশিরে ভেজা শিউলি ফুল। সে তা প্রকাশও করেছিল।

আনিসের মনে পড়ল, শবনম শিউলি যখন বাসা ভাড়া নেয়, এর প্রথমদিনই সে ছাদে এসে তার চিলেকোঠার দরজায় কড়া নাড়ে। সেদিনও শুক্রবার ছিল। সে শুয়ে শুয়ে একটা কবিতা লেখার চেষ্টা করছিল। কড়া নাড়ার শব্দ শুনে সে অবাক হয়। সাধারণ সে ছাদের চিলেকোঠাটায় থাকে বলে কেউ সহজে ছাদে আসে না। একমাত্র অনাবিল মজুমদার এসে মাসের পাঁচ তারিখ বাসা ভাড়া নেওয়ার জন্য কড়ানাড়ে, আর কেউ নয়। মাঝেমধ্যে বাসার কেয়ারটেকার আসে। তাও খুব কম, বছরে একবার-দু’বার। কোনোকিছু বলার থাকলে কেয়ারটেকার গেইটের কাছেই বলে।

আনিস উঠে গিয়ে দরজা খোলে। আর দরজা খুলেই সে অপ্রস্তুত হয়ে যায়। সে আশা করেনি, একজন অপরিচিত সুন্দরী যুবতী নারী তার দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকবে।

যুবতী নারী নিজ থেকে পরিচিত হয়। এক সন্তানের জননী। ছেলের বয়স পাঁচবছর। স্বামী চার বছর ধরে ইতালিতে থাকে। এখনও কাগজপত্র হয়নি বলে তাদেরকে নিয়ে যেতে পারছে না। বাসায় শবনম শিউলির সঙ্গে তার ছোটভাই থাকে। তবে সবসময় থাকে না। তার ছোটভাই একটা ওষুধ কোম্পানিতে কাজ করে বলে প্রায়ই জেলাশহরগুলোতে যেতে হয়। বেশিরভাগ সময় শবনম শিউলি ছেলেকে নিয়ে একা থাকে।

প্রথম পরিচয়ের পর থেকে শবনম শিউলি কারণে-অকারণে ছাদে আসা শুরু করে। এই দালানের আর কেউ ছাদে কাপড় শুকাতে না এলেও সে ঠিকই কাপড় শুকাতে আসে। সময়সময় চিলেকোঠায় এসে এটাওটা জিজ্ঞেস করে। কোনো অনুমতির তোয়াক্কা না করে বই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করে।

আনিস এতে প্রথম প্রথম বিরক্ত হলেও কিছু বলতে পারত না। তবে আস্তে আস্তে তার বিরক্তিভাবটা চলে যায়। বিশেষ করে শবনম শিউলি যখন তার কবিতার প্রশংসা করে ও আবৃত্তি করে শোনায়, সে ভেতর ভেতরে গলে যায়। সে জানে, কবিদের এ একটা দুর্বলতা। কেউ তার কবিতার প্রশংসা করলে নিজেকে আর আয়ত্তে রাখতে পারে না। নিজেকে উজাড় করে দিতে চায়।

এভাবে তিনটা মাস। তবে আনিস মনেপ্রাণে চাচ্ছে, শবনম শিউলির সঙ্গে তার কোনো শারীরিক সম্পর্ক না হোক। এর মানে এই নয় যে তার আজকাল নারীর শরীর প্রতি টানে না। কিন্তু সেতারা বেগমের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে সেই যে দ্বগ্ধ হয়েছে, এখন অন্যের স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার পক্ষপাতী সে আর হতে চায় না। শবনম শিউলি তো অন্য একজনের স্ত্রী। তার ওপর পাঁচ বছরের এক ছেলে সন্তানের জননী। ক্রমশ... 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত