সংবাদ

সচিবালয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ কেন?


প্রকাশ: ৫ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৩১ এএম

সচিবালয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ কেন?

দেশের কৃষিশিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও নিরাপদ খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যাপীঠ হলো রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের কৃষির উন্নয়ন ও দক্ষ কৃষিবিদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কৃষি গবেষণার মূল ভিত্তি বা হাতিয়ার হলো কৃষি মাঠ। সেখানে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করা হয়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা হাজারো শিক্ষার্থীর মনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। এ উদ্বেগ বাস্তবে রূপ নিলে শিক্ষা, গবেষণা এবং আগারগাঁওয়ে অবস্থিত হাসপাতালগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ মানে শুধু উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ নয়

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের খালি মাঠগুলো দেখলে আমরা অনেকেই মনে করি, এগুলো শুধু উন্মুক্ত প্রান্তর। আসলে কি তাই? না, বাস্তবতা ভিন্ন। এসব মাঠে গবেষণার মধ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছেন গবেষক, শিক্ষক ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। আজ যে মাঠকে খালি মাঠ বলে মনে করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটিই গবেষণা ও কৃষিশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষা ও গবেষণার জন্য এসব মাঠ এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠতে পারে।

সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক স্থাপনা নির্মাণের ফলে পুরো এলাকায় তীব্র যানজট তৈরি হবে। এতে আশপাশের হাসপাতালগুলোতে রোগী পরিবহন, জরুরি অ্যাম্বুলেন্স চলাচল এবং চিকিৎসাসেবা গ্রহণ ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। তা ছাড়া সচিবালয় স্থাপনের প্রভাব শুধু নির্মাণস্থানে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর ফলে বায়ুদূষণ এবং বাতাসে সিসার মতো ক্ষতিকর উপাদান বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে গবেষণার মাঠের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হবে এবং গবেষণার ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।

আগারগাঁও হাসপাতাল অঞ্চল: হুমকির মুখে হাসপাতালের পরিবেশ

আগারগাঁওকে সরকারি হাসপাতালের নগরী বলা হয়। প্রতিদিন দেশের দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার জটিল রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন জাতীয় হৃদ্‌রোগ ইনস্টিটিউট, কিডনি হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মানসিক হাসপাতাল, চক্ষু হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এবং নিউরোসায়েন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে।

এখানে সচিবালয় স্থাপন করার অর্থ হলো প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ঘিরে মানুষের ভিড়, হাজার হাজার গাড়ির চলাচল, ভিআইপিদের যাতায়াত, সাইরেন এবং তীব্র যানজট সৃষ্টি হওয়া। এসব কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশ, শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণা ও অন্যান্য কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এমনিতেই ঢাকার যানজটের কারণে এসব হাসপাতালে রোগীদের পৌঁছাতে অনেক বেগ পেতে হয়। সচিবালয় স্থাপনের ফলে হাসপাতালগুলোতে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে। এ ছাড়া শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণ রোগীদের শারীরিক জটিলতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।

শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে উন্নয়ন হোক

দেশের উন্নয়নে প্রশাসনিক অবকাঠামোর উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে এই উন্নয়ন করতে গিয়ে যদি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী এবং হাজারো রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে তাকে উন্নয়ন বলা যায় না। তাই আগারগাঁও অঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ উপেক্ষা করে সচিবালয় স্থাপন করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। এর নেতিবাচক প্রভাব শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ এবং হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবার ওপর সরাসরি পড়বে। তাই সরকারের উচিত এসব প্রতিষ্ঠানের কথা বিবেচনা করে সচিবালয় স্থাপনের জন্য বিকল্প স্থান খুঁজে বের করা।

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষির আধুনিকায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং টেকসই কৃষি উন্নয়নে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা অপরিসীম। তাই সাময়িক প্রশাসনিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যা ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও সম্প্রসারণের সুযোগ সংকুচিত করে দেয়। ঢাকার বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে এবং কৃষিশিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সুরক্ষার স্বার্থে কোনোভাবেই শেরেবাংলা নগরের উন্মুক্ত জমিতে সচিবালয় নির্মাণ যুক্তিযুক্ত নয়।

নাজমুল হাসান

সাবেক শিক্ষার্থী, পশুপালন অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬


সচিবালয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ কেন?

প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

দেশের কৃষিশিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও নিরাপদ খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যাপীঠ হলো রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের কৃষির উন্নয়ন ও দক্ষ কৃষিবিদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কৃষি গবেষণার মূল ভিত্তি বা হাতিয়ার হলো কৃষি মাঠ। সেখানে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করা হয়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা হাজারো শিক্ষার্থীর মনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। এ উদ্বেগ বাস্তবে রূপ নিলে শিক্ষা, গবেষণা এবং আগারগাঁওয়ে অবস্থিত হাসপাতালগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ মানে শুধু উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ নয়

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের খালি মাঠগুলো দেখলে আমরা অনেকেই মনে করি, এগুলো শুধু উন্মুক্ত প্রান্তর। আসলে কি তাই? না, বাস্তবতা ভিন্ন। এসব মাঠে গবেষণার মধ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছেন গবেষক, শিক্ষক ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। আজ যে মাঠকে খালি মাঠ বলে মনে করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটিই গবেষণা ও কৃষিশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষা ও গবেষণার জন্য এসব মাঠ এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠতে পারে।

সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক স্থাপনা নির্মাণের ফলে পুরো এলাকায় তীব্র যানজট তৈরি হবে। এতে আশপাশের হাসপাতালগুলোতে রোগী পরিবহন, জরুরি অ্যাম্বুলেন্স চলাচল এবং চিকিৎসাসেবা গ্রহণ ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। তা ছাড়া সচিবালয় স্থাপনের প্রভাব শুধু নির্মাণস্থানে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর ফলে বায়ুদূষণ এবং বাতাসে সিসার মতো ক্ষতিকর উপাদান বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে গবেষণার মাঠের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হবে এবং গবেষণার ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।

আগারগাঁও হাসপাতাল অঞ্চল: হুমকির মুখে হাসপাতালের পরিবেশ

আগারগাঁওকে সরকারি হাসপাতালের নগরী বলা হয়। প্রতিদিন দেশের দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার জটিল রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন জাতীয় হৃদ্‌রোগ ইনস্টিটিউট, কিডনি হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মানসিক হাসপাতাল, চক্ষু হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এবং নিউরোসায়েন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে।

এখানে সচিবালয় স্থাপন করার অর্থ হলো প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ঘিরে মানুষের ভিড়, হাজার হাজার গাড়ির চলাচল, ভিআইপিদের যাতায়াত, সাইরেন এবং তীব্র যানজট সৃষ্টি হওয়া। এসব কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশ, শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণা ও অন্যান্য কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এমনিতেই ঢাকার যানজটের কারণে এসব হাসপাতালে রোগীদের পৌঁছাতে অনেক বেগ পেতে হয়। সচিবালয় স্থাপনের ফলে হাসপাতালগুলোতে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে। এ ছাড়া শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণ রোগীদের শারীরিক জটিলতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।

শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে উন্নয়ন হোক

দেশের উন্নয়নে প্রশাসনিক অবকাঠামোর উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে এই উন্নয়ন করতে গিয়ে যদি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী এবং হাজারো রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে তাকে উন্নয়ন বলা যায় না। তাই আগারগাঁও অঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ উপেক্ষা করে সচিবালয় স্থাপন করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। এর নেতিবাচক প্রভাব শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ এবং হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবার ওপর সরাসরি পড়বে। তাই সরকারের উচিত এসব প্রতিষ্ঠানের কথা বিবেচনা করে সচিবালয় স্থাপনের জন্য বিকল্প স্থান খুঁজে বের করা।

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষির আধুনিকায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং টেকসই কৃষি উন্নয়নে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা অপরিসীম। তাই সাময়িক প্রশাসনিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যা ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও সম্প্রসারণের সুযোগ সংকুচিত করে দেয়। ঢাকার বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে এবং কৃষিশিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সুরক্ষার স্বার্থে কোনোভাবেই শেরেবাংলা নগরের উন্মুক্ত জমিতে সচিবালয় নির্মাণ যুক্তিযুক্ত নয়।

নাজমুল হাসান

সাবেক শিক্ষার্থী, পশুপালন অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত