সংবাদ

পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে টানটান উত্তেজনা, বিতর্ক


দীপক মূখার্জী, কলকাতা
দীপক মূখার্জী, কলকাতা
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:০৭ পিএম

পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে টানটান উত্তেজনা, বিতর্ক
বিশাল পদযাত্রার মাধ্যমে শক্তি প্রদর্শন করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি

পশ্চিমবঙ্গের জন্য ২৯ এপ্রিল একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় তথা শেষ দফার ভোট। এবার ১৪২টি আসনে ভোট। তার আগে সোমবার বিকেল ৫টায় শেষ হয়ে গেছে নির্বাচনী প্রচারপর্ব। এখন শুরু হয়েছে নীরব পর্ব। কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেই উত্তেজনা, বিতর্ক এবং উদ্বেগে টানটান গোটা রাজ্য।

প্রথম দফার মতোই শান্তিপূর্ণ ভোট করাতে ‘মরিয়া’ ভারতের নির্বাচন কমিশন। তবে ভোটের আগেই হিংসা, প্রশাসনিক প্রশ্ন এবং ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক নতুন মাত্রা যোগ করেছে নির্বাচনী লড়াইয়ে।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে দ্বিতীয় দফার আগে সোমবার গভীর রাতে প্রকাশ করা হয়েছে সাপ্লিমেন্টারি বা সম্পূরক ভোটার তালিকা। ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তির ভিত্তিতে ১৪৬৮ জন নতুন ভোটারকে চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আর ৬ জনের নাম বাতিল করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী ‘নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়া’ আবেদনগুলিকেই এই তালিকায় রাখা হয়েছে।

তবে প্রায় ৯২ লাখ বাদ পড়া ভোটারের তুলনায় এই সংখ্যা অত্যন্ত কম। ফলে বহু ভোটার এখনও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত বলে অভিযোগ উঠছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, দ্বিতীয় দফার আগে আর কোনও ট্রাইব্যুনাল নিষ্পত্তি বা নতুন সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করা হবে না— যা নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়েছে বিভিন্ন মহলে।

এই প্রশাসনিক বিতর্কের মাঝেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একের পর এক উদ্বেগজনক খবর সামনে আসছে। মঙ্গলবার ভোরে মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘির মনিগ্রামে জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে ব্যাগভর্তি তাজা বোমা উদ্ধার হওয়ায় চাঞ্চল্য ছড়ায়। ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

এছাড়াও তল্লাশির নামে বাড়িতে ঢুকে মহিলাদের হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে, যেখানে নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে অভিযোগ। এই ঘটনাগুলি ভোটের আগে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।

এরই মধ্যে ভোটারদের মধ্যেও ক্ষোভ এবং প্রতিক্রিয়া সামনে আসছে। ভবানীপুরের সাধারণ মানুষের একাংশের বক্তব্য- ‘আমরাই তো সেই স্পেশাল ভোটার, যারা মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন করি’।

এই উত্তপ্ত আবহেই ভোটের আগের সন্ধ্যায় উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহরে গুলির ঘটনায় চরম উত্তেজনা ছড়ায়। তৃণমূল কর্মী প্রসেনজিৎ মৌলিক ওরফে রাজাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মিস্রি পুকুর রোডে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় বাইকে করে আসা কয়েকজন অন্তত তিন রাউন্ড গুলি চালায়। একটি গুলি তাঁর পেটে লাগে এবং বাকি দুটি তাঁর পকেটে থাকা মোবাইলে লাগে, ফলে বড় বিপদ অল্পের জন্য এড়ানো যায় বলে মনে করা হচ্ছে।

গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে কল্যাণীর জেএনএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনায় তৃণমূল বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে, যদিও বিজেপি সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে এবং এলাকায় জোর তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

শেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক প্রচারেও ছিল তুঙ্গ উত্তেজনা। ব্যারাকপুর থেকে উত্তর কলকাতা পর্যন্ত একাধিক সভা ও রোড শোর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘পরিবর্তনের হাওয়া’র বার্তা দিয়েছেন।

উত্তর ২৪ পরগণার বারাসাতে মধ্যমগ্রামের বিজেপি প্রার্থী অনিন্দ্য রাজু ব্যানার্জীর সমর্থনে সভা করেন মিঠুন চক্রবর্তী, যা শেষ মুহূর্তে কর্মী-সমর্থকদের উজ্জীবিত করেছে।

আর, প্রচারের শেষ দিনে কলকাতায় বিশাল পদযাত্রার মাধ্যমে শক্তি প্রদর্শন করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। সুলেখা মোড় থেকে ভবানীপুর পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে এই পদযাত্রায় জনস্রোত দেখা যায়। বিজেপিকে উৎখাতের ডাক দিয়ে তিনি বলেন, “এই লড়াই আত্মসম্মান রক্ষার লড়াই।”

এই পদযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন বিহারের প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী তেজশ্বী যাদব সহ তৃণমূলের একাধিক নেতা-মন্ত্রী। মিছিলের রুট জুড়ে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণ এই প্রচারকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।

ভোটের রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গে।

একইসঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া ইস্যুতেও সরব হন তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান মমতা। তিনি অভিযোগ করেন, ‘যোগ্য’ ভোটারদের বাদ দেওয়ার মাধ্যমে ‘পরিকল্পিতভাবে’ ভোটাধিকার ‘খর্ব করার’ চেষ্টা হচ্ছে। ভোটারদের উদ্দেশে তিনি আহ্বান জানান — ভোট দিয়ে ভিভিপ্যাট পরীক্ষা করার।

আর সিপিএম নেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জী প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

সব মিলিয়ে, ভোটের আগে শেষ মুহূর্তে বাংলার চিত্র- প্রচার, হিংসা, বোমা উদ্ধার, গুলির ঘটনা, ভোটার তালিকা বিতর্ক এবং প্রশাসনিক অভিযোগ— সবকিছু মিলিয়ে এক চরম উত্তেজনার আবহ তৈরি হয়েছে।

এখন প্রচার থেমে গেছে, কিন্তু উত্তেজনা নয়।

২৯ এপ্রিলের ভোটই নির্ধারণ করবে, বাংলার মানুষ কোন পথে এগোতে চান এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক দিশা কী হবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬


পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে টানটান উত্তেজনা, বিতর্ক

প্রকাশের তারিখ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

পশ্চিমবঙ্গের জন্য ২৯ এপ্রিল একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় তথা শেষ দফার ভোট। এবার ১৪২টি আসনে ভোট। তার আগে সোমবার বিকেল ৫টায় শেষ হয়ে গেছে নির্বাচনী প্রচারপর্ব। এখন শুরু হয়েছে নীরব পর্ব। কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেই উত্তেজনা, বিতর্ক এবং উদ্বেগে টানটান গোটা রাজ্য।

প্রথম দফার মতোই শান্তিপূর্ণ ভোট করাতে ‘মরিয়া’ ভারতের নির্বাচন কমিশন। তবে ভোটের আগেই হিংসা, প্রশাসনিক প্রশ্ন এবং ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক নতুন মাত্রা যোগ করেছে নির্বাচনী লড়াইয়ে।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে দ্বিতীয় দফার আগে সোমবার গভীর রাতে প্রকাশ করা হয়েছে সাপ্লিমেন্টারি বা সম্পূরক ভোটার তালিকা। ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তির ভিত্তিতে ১৪৬৮ জন নতুন ভোটারকে চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আর ৬ জনের নাম বাতিল করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী ‘নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়া’ আবেদনগুলিকেই এই তালিকায় রাখা হয়েছে।

তবে প্রায় ৯২ লাখ বাদ পড়া ভোটারের তুলনায় এই সংখ্যা অত্যন্ত কম। ফলে বহু ভোটার এখনও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত বলে অভিযোগ উঠছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, দ্বিতীয় দফার আগে আর কোনও ট্রাইব্যুনাল নিষ্পত্তি বা নতুন সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করা হবে না— যা নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়েছে বিভিন্ন মহলে।

এই প্রশাসনিক বিতর্কের মাঝেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একের পর এক উদ্বেগজনক খবর সামনে আসছে। মঙ্গলবার ভোরে মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘির মনিগ্রামে জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে ব্যাগভর্তি তাজা বোমা উদ্ধার হওয়ায় চাঞ্চল্য ছড়ায়। ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

এছাড়াও তল্লাশির নামে বাড়িতে ঢুকে মহিলাদের হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে, যেখানে নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে অভিযোগ। এই ঘটনাগুলি ভোটের আগে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।

এরই মধ্যে ভোটারদের মধ্যেও ক্ষোভ এবং প্রতিক্রিয়া সামনে আসছে। ভবানীপুরের সাধারণ মানুষের একাংশের বক্তব্য- ‘আমরাই তো সেই স্পেশাল ভোটার, যারা মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন করি’।

এই উত্তপ্ত আবহেই ভোটের আগের সন্ধ্যায় উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহরে গুলির ঘটনায় চরম উত্তেজনা ছড়ায়। তৃণমূল কর্মী প্রসেনজিৎ মৌলিক ওরফে রাজাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মিস্রি পুকুর রোডে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় বাইকে করে আসা কয়েকজন অন্তত তিন রাউন্ড গুলি চালায়। একটি গুলি তাঁর পেটে লাগে এবং বাকি দুটি তাঁর পকেটে থাকা মোবাইলে লাগে, ফলে বড় বিপদ অল্পের জন্য এড়ানো যায় বলে মনে করা হচ্ছে।

গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে কল্যাণীর জেএনএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনায় তৃণমূল বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে, যদিও বিজেপি সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে এবং এলাকায় জোর তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

শেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক প্রচারেও ছিল তুঙ্গ উত্তেজনা। ব্যারাকপুর থেকে উত্তর কলকাতা পর্যন্ত একাধিক সভা ও রোড শোর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘পরিবর্তনের হাওয়া’র বার্তা দিয়েছেন।

উত্তর ২৪ পরগণার বারাসাতে মধ্যমগ্রামের বিজেপি প্রার্থী অনিন্দ্য রাজু ব্যানার্জীর সমর্থনে সভা করেন মিঠুন চক্রবর্তী, যা শেষ মুহূর্তে কর্মী-সমর্থকদের উজ্জীবিত করেছে।

আর, প্রচারের শেষ দিনে কলকাতায় বিশাল পদযাত্রার মাধ্যমে শক্তি প্রদর্শন করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। সুলেখা মোড় থেকে ভবানীপুর পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে এই পদযাত্রায় জনস্রোত দেখা যায়। বিজেপিকে উৎখাতের ডাক দিয়ে তিনি বলেন, “এই লড়াই আত্মসম্মান রক্ষার লড়াই।”

এই পদযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন বিহারের প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী তেজশ্বী যাদব সহ তৃণমূলের একাধিক নেতা-মন্ত্রী। মিছিলের রুট জুড়ে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণ এই প্রচারকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।

ভোটের রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গে।

একইসঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া ইস্যুতেও সরব হন তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান মমতা। তিনি অভিযোগ করেন, ‘যোগ্য’ ভোটারদের বাদ দেওয়ার মাধ্যমে ‘পরিকল্পিতভাবে’ ভোটাধিকার ‘খর্ব করার’ চেষ্টা হচ্ছে। ভোটারদের উদ্দেশে তিনি আহ্বান জানান — ভোট দিয়ে ভিভিপ্যাট পরীক্ষা করার।

আর সিপিএম নেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জী প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

সব মিলিয়ে, ভোটের আগে শেষ মুহূর্তে বাংলার চিত্র- প্রচার, হিংসা, বোমা উদ্ধার, গুলির ঘটনা, ভোটার তালিকা বিতর্ক এবং প্রশাসনিক অভিযোগ— সবকিছু মিলিয়ে এক চরম উত্তেজনার আবহ তৈরি হয়েছে।

এখন প্রচার থেমে গেছে, কিন্তু উত্তেজনা নয়।

২৯ এপ্রিলের ভোটই নির্ধারণ করবে, বাংলার মানুষ কোন পথে এগোতে চান এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক দিশা কী হবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত