সংবাদ

অ্যানালগ আর ডিজিটাল যুগের রিপোর্টার


রাশেদ আহমেদ
রাশেদ আহমেদ
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ০৩:২৯ পিএম

অ্যানালগ আর ডিজিটাল যুগের রিপোর্টার
রাশেদ আহমেদ

টিএন্ডটি ফোনে ওপার থেকে বলা হলো ‘সানকিপাড়া’ আর আমি ‘স’ এর বদলে ‘খ’ শুনলাম। ঢাকা থেকে বাসে চড়ে গেলাম ময়মনসিংহ টার্মিনালে। রিকশাওয়ালাকে কি করে যে এমন জায়গার নাম বলি! মুখের মধ্যে ‘খ’ উচ্চারণটি আধো রেখে বললাম যাবে নাকি? উত্তর, ‘উডুন, যাইতাম।’ চেপে বসলাম। আর মনে মনে প্রতিনিধিকে বকতে লাগলাম। এমন একটি জায়গার লোকেশন কেন দিলো? রিকশা চলছে ময়মনসিংহ শহরের ইটের খোয়া উঠে যাওয়া ভাঙাচোড়া রাস্তা দিয়ে। এর আগে আমি কখনও এই শহরে আসিনি। বৃটিশ সময়ের পুরোনো শহর। মাঝে মাঝে সেই ঐতিহ্যের ছাপ উঁকি দিচ্ছে। প্রায় আধ ঘণ্টা ঘুরে একটি মোড়ে এসে রিকশা থামলো- ‘নামুইন’। জিজ্ঞেস করলাম, এখানে নাকি। চালকের হ্যাঁ সূচক জবাব। রাস্তার দু’পাশে তাকিয়ে দেখি দোকানের সাইন বোর্ডে লেখা সানকিপাড়া। আমি মুখে যা-ই বলি না কেন রিকশাওয়ালা বুঝতে ভুল করেনি। আমার ভ্রান্তি ভাঙলো। এটি একটি আবাসিক এলাকা। যাহোক সেখান থেকে আমার কাজে গেলাম। এই ঘটনা ১৯৮৯ সালের শেষ দিকের। তখন টিএন্ডটি টেলিফোনে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় লাইন প্রায় ডিস্টার্ব দিতো। অনেক সময় কথা অষ্পষ্ট শোনা যেতো, বিভ্রাটও হতো। আমার মতো ওই সময়ে ফোনের এ রকম বাজে অভিজ্ঞতা কম বেশি সবারই আছে।

যারা ৮০ দশকে বা ৯০ দশকে সাংবাদিকতা শুরু করেছেন তাদের অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত অনেক পরিবর্তন দেখতে হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। অবশ্য এরও আগের সাংবাদিকদের আরও পুরোনো অভিজ্ঞতা আছে এতে কোন সন্দেহ নেই। আমি ৮০ দশকের একেবারে শেষের দিকে সাংবাদিকতার কলম ধরি। এর আগে স্কুল-কলেজে ম্যাগাজিন বের করার অভিজ্ঞতা অর্জন করি নিজের শিল্প-সংষ্কৃতি মনন প্রকাশ করার তাগিদ থেকে। তখন ছিল টাইপো প্রেসের যুগ। সিসার অক্ষর বসিয়ে বসিয়ে ফ্রেম তৈরি করে মেশিনে তোলা হতো। ছবি ছাপতে ব্লক লাগতো। কারিগররা লাইন ব্লক হাতে তৈরি করতেন। হাফটোন ব্লকের জন্য প্রয়োজন হতো ক্যামেরা ও স্ক্রিনের, সেই সঙ্গে দক্ষ কারিগর। সেই যুগে একটা ম্যাগাজিন বের করতে কতো যে ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হতো নতুন প্রজন্মের অনেকেই তা অনুধাবন করতে পারবেন না। যা হোক ৮০ দশকের শেষে যখন সাংবাদিকতা শুরু করি তখন জোহানেস গুটেনবার্গের ছাপাখানার বড় পরিবর্তন এসেছে। অফসেট লিথোগ্রাফি, গ্র্যাভিউর, অটোপ্লেট প্রসেসর কতো কি এলো। আরও এলো ফোর কালারে এক সঙ্গে ১৬ পৃষ্ঠা ছাপার মেশিন। খবরের কাগজে রঙিন ছবি, রঙিন হেডলাইন, নতুন এক আমেজ। কিন্তু সংবাদিকদের প্রযুক্তির ব্যবহার তখনও হাতে আসেনি। হেঁটে হেঁটে অফিসে বা বাড়ি বাড়ি গিয়ে খবর সংগ্রহ করতে হতো। সন্ধ্যার পর সেই খবর নিয়ে ঢুকতে হতো পত্রিকা অফিসে। স্ক্রিপ্ট লিখতে হতো নিউজপ্রিন্ট কাগজের বানানো এক ফুট বাই ৬ ইঞ্চি প্যাডে। নিউজ এডিটর কপি এডিট করতেন কলম খুঁচিয়ে। এরপর টাইপ হলে যেতো প্রুফ রিডার টেবিলে। তারা এসএসসি পরীক্ষার পড়া মুখস্থ করার মতো জোরে জোরে স্ক্রিপ্ট পড়ে ভুল বানান সংশোধন করতেন। কম্পিউটার রুমে সংশোধিত কপির প্রিন্ট বের হতো ট্রেসিং পেপারে। কম্পিউটার রুমে সবার যাওয়ার পারমিশন ছিল না। কারও প্রয়োজন হলে প্রার্থনা ঘরের মতো জুতা-মুজা খুলে ঢুকতে হতো। ট্রেসিং পেপারগুলো আট কলামের সেলোফিনে স্বচ্ছ শিটে সাজিয়ে স্কচটেপ দিয়ে আটকিয়ে মেকআপ করা হতো। পরে অনেকটা এক্সরের মতো এক মেশিনে দিয়ে ডিমাই সাইজের সেই শিটের নেগেটিভ বানানো হতো। নিউজের সেই নেগেটিভকে আবার রে দিয়ে প্লেটে বসানো হতো। এক একটি প্লেট মানে পত্রিকার দুই পৃষ্ঠা। প্লেট থেকেই ছাপা হতো হাজার হাজার কপির সংবাদপত্র। তখন কোনো সংবাদ আপডেট হলে মাঝরাতে ছাপা বন্ধ করে প্লেট বদল করতে হতো। সে ক্ষেত্র বাতিল হতো ছাপা হয়ে যাওয়া কাগজগুলো। উদাহরণ দেয়া যাক, যেমন জাতীয় পার্টির নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, রাত ১২টা পর্যন্ত আমরা এটাই রিপোর্ট করলাম। রাত ২টার দিকে জানা গেলো তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তখন ছাপা বন্ধ করে আবার সংশোধিত নিউজ দিয়ে প্লেট তৈরি করে ছাপানো হতো। অনেক সময় ঢাকার এডিশনে আপডেট নিউজ থাকতো আর ঢাকার বাইরের এডিশনে যেতো আগের নিউজ। বিশেষ কারণে কখনও পত্রিকার ৪টি এডিশনও হতো।

আমরা যারা রিপোর্টার ছিলাম তাদের খবর সংগ্রহে হতে হতো অনেক সতর্ক, অনেক যত্নবান। নিউজ লিখতে বসলে এখনকার মতো হাতের কাছে ৫টি অনলাইন পোর্টাল খুলে দেখার সুযোগ ছিল না। ম্যাসেঞ্জার বা হোয়াসঅ্যাপে স্ক্রিপ্ট শেয়ারও করা যেতো না। হতো না হুবহু কপি পেস্ট। প্রত্যেকে নিজ নিজ মেধা দিয়ে লিখতেন। অ্যাসাইনমেন্টে গেলে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নোট নিতে হতো। লেখার সময় সেটি বারবার খুঁজে দেখতে হতো। যাতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়ে না যায় বা ভুল না হয়ে যায়। অনেক ইনফরমেশনও মনে রাখতে হতো। পুরোনো তথ্য পেতে যেতে হতো পাবলিক লাইব্রেরি, প্রেস ইনস্টিটিউটে বা পত্রিকা অফিসের পুরোনা পত্রিকা ঘাঁটতে হতো। তখন প্রত্যেক রিপোর্টারের লেখার স্টাইল ছিল আলাদা। একই অ্যাসাইনমেন্ট কাভার করেছেন বিভিন্ন পত্রিকায় দেখতাম ভিন্ন ভিন্ন স্টাইলে রিপোর্ট হয়েছে। দৈনিক ইত্তেফাকের নাজীমউদ্দিন মোস্তান, মতিউর রহমান চৌধুরী, দৈনিক বাংলার জহিরুল হক, সংবাদের শওকত মাহমুদ, মোনাজাত উদ্দিন, বাংলার বাণীর ফারুক কাজী, খবরের আশরাফ খান, সুনীল ব্যানার্জি, শফিকুর রহমান, অরুণাভ সরকার, মাহমুদ শফিক, সৈকত রুশদী- এদের দেখতাম নিজস্ব ঢঙে রিপোর্ট লিখতে। এছাড়া শাহজাহান সরদার, হাসান শাহরিয়ার, জাফর ওয়াজেদ, সাইফুল আলম, আমীর খসরু - এদেরও লেখার একটা ঢঙ ছিল। বিবিসির আতাউস সামাদ ও ভয়েজ অব আমেরিকার গিয়াস কামাল চৌধুরীও ভাষার ভালো দখল রেখে স্ক্রিপ্ট লিখতেন। আমরা তাদের ফলো করতাম। আরও নাম আছে কিন্তু এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।

বাসা থেকে বের হতাম প্রতিদিন সকালে। অ্যাসাইনমেন্ট থাকলে সেটি তো করলামই, পাশাপাশি বিশেষ রিপোর্টের খোঁজে যেতাম নানা অফিসে। কয়েকদিন ঘুরে একটি ভালো রিপোর্ট পাওয়া যেতো, সেটি আবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য না পেলে নিউজ এডিটর ফিরিয়ে দিতেন-যাও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নিয়ে আসো। না হলে যাবে না। গিয়ে বসে থাকতে হতো কর্তৃপক্ষের অফিসে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য না পাওয়ায় কতো রিপোর্ট যে আলোর মুখ দেখেনি তার হিসাব নেই। আমার সরাসরি এডিটর ছিলেন কে জি মোস্তাফা। রিপোর্টের স্ক্রিপ্টে অসঙ্গতি পেলে ছিঁড়ে ফেলে বলতেন ‘কিল্ড’। আরেক এডিটর ছিলেন বজলুর রহমান। ভুল তথ্য তো সহ্যই করতে পারতেন না। মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল ছিলেন আমার নিউজ এডিটর।

একবার টিএন্ডটি অফিসের দুর্নীতি নিয়ে একটি রিপোর্ট করলাম। দৈনিক সংবাদের মালিক আহমদুল কবিরের কাছে টিএন্ডটির চেয়ারম্যান নালিশ করলেন। আহমদুল কবির রুমে আমাকে ডেকে পাঠালেন। এই ফাঁকে সকালে নিজেই টিএন্ডটি অফিসে গিয়ে খোঁজ-খবর নিলেন। যখন তার রুমে ঢুকলাম বললেন, তোমার ডকুমেন্টগুলো কোথায়? দেখালাম। ‘রিপোর্টটি ঠিকই আছে, নিজে গিয়ে দেখেছি’। তারপর বললেন, এই রিপোর্টে তোমার ঘাটতি কোথায় ছিল জানো? তুমি চেয়ারম্যানের ভাষ্য নাওনি। এটি করলে তিনি অভিযোগ জানানোর সুযোগই পেতেন না। আহমদুল কবিরের সেদিনের পরামর্শ পরবর্তীতে আর ভুলিনি।

আমাদের ঢাকার বাইরে সফরে গেলে নিউজ পাঠাতে হতো টেলিফোনে। সেই টেলিফোন আবার সব জায়গায় ছিল না। কোনো সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতার বাসা এবং সার্কিট হাউসের টেলিফোন ব্যবহার করতে হতো। এসব জায়গাতেই কেবল এসটিডি (সাবসক্রাইবার ট্রাঙ্ক ডায়েলিং) টেলিফোন পাওয়া যেতো। টিএন্ডটি টেলিফোন ছিল তিন ধরণের, লোকাল, এসটিডি ও আইএসডি। সার্কিট হাউস বা অন্য কোথাও সুযোগ না পেলে ধরনা দিতে হতো স্থানীয় টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিসে। বৃষ্টি বাদল বা নানা কারণে লাইন খারাপ থাকতো। এ প্রান্ত থেকে বলতাম এক কথা আর অপর প্রান্তে শুনতো আরেকটা। যদি বলতাম ‘ভালো’ সেটি শুনতো ‘কালো’। যদি বলতাম বীরগঞ্জ শুনতো পীরগঞ্জ। কতো যে জায়গার নাম ভুল শুনেছে কতোজনে? তখন চিৎকার করে অক্ষর বলা বা নানা উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে হতো।

জেলা শহরে রাজনৈতিক সফরে গিয়ে লাইনের সিরিয়াল ধরে নিউজ পাঠানোর অভিজ্ঞতা এখনকার পঞ্চাশোর্ধ সব সাংবাদিকেরই আছে। শেখ হাসিনা ১৯৯১-৯৫ সালে ছিলেন বিরোধী দলীয় নেত্রী। তখন তার রাজনৈতিক সফরে অ্যাসাইনমেন্ট পড়েছে অনেক। জনসভা শেষে নিউজ পাঠাতে অনেকদিন সার্কিট হাউসে তার রুমের টেলিফোনও ব্যবহার করেছি। অনেক ক্ষেত্রে ফেরার দিন হয়তো রাত ১০টায় পৌঁছাবো গাড়িতে বসে স্ক্রিপ্ট লেখা শেষ করতাম। অফিসে ঢুকে রিপোর্ট জমা দিয়ে ছাপা পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতাম। তখন বাসায় যেতে যেতে রাত ২টা থেকে আড়াইটা বাজতো। এমনিতেই প্রতিরাতে বাসায় যেতে হতো রাত ১২টা অথবা ১টায়। অ্যাসাইনমেন্টই দেয়া হতো রাত ১১টার পর। অ্যাসাইনমেন্ট না দেখে অফিস ত্যাগ করা বারণ ছিল। আমি যখন সংবাদে চাকরি করি অফিসের গাড়ি অর্থাৎ বেবি ট্যাক্সি বা স্কুটার ছাড়তো রাত সাড়ে ১২টায়। এর আগে অফিস ছাড়লে যেতে হতো নিজের ব্যবস্থাপনায়। ১৯৯৬-৯৭ সালে যখন ঢাকার বাইরে সকালে পত্রিকা পৌঁছানোর জন্য ছাপা এগিয়ে আনা হলো তখন অবশ্য রাত সাড়ে ১০ থেকে ১১টার মধ্যে ছুটি হতো। অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হতো সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে। সংবাদে আমার আরেক সম্পাদক ছিলেন বজলুর রহমান। তিনি তখন প্রায়ই বলতেন কেউ ৮/৯টায় বাসায় যেও না হয়তো ভেবে বসতে পারে চাকরি চলে গেছে। সাংবাদিকদের মাঝরাত ছাড়া বাসায় যাওয়ার কালচার নেই। 

বজলু ভাই প্রায়ই বলতেন তাদের আমলে বাসায় যেতেন রাত ২টার পর। মতিয়া চৌধুরীর সঙ্গে তার যখন বিয়ে হয় প্রথম প্রথম মতিয়া আপা নাকি রাতের খাবারের জন্য অপেক্ষায় থাকতেন। বজলু ভাই তখন বলে দিলেন এভাবে অপেক্ষা করলে এক সময় বিরক্ত হয়ে যাবে। তার চেয়ে খাবার টেবিলে রেখে তুমি ঘুমিয়ে যেও। এসব বজলুর রহমানের মুখ থেকেই শোনা। শেষ রাতে ছাপা শেষে গরম পত্রিকা হাতে নিয়ে বাসায় যাওয়ার গল্প সন্তোষ গুপ্ত, ফয়েজ আহমদ, কামাল লোহানীসহ ওই প্রজন্মের অনেক সাংবাদিকই করেছেন। ফয়েজ আহমদের তো বই রয়েছে ‘মধ্যরাতের অশ্বারহী’ নামে। সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা আলতাফ মাহমুদ প্রায়ই বলতেন, পত্রিকার ছাপার সিডিউল এগিয়ে গেলেও তিনি কখনো রাত ১২টার আগে বাসায় ঢুকতেন না। কোনো কারণে আগে চলে গেলেও বাসার সামনে ঘোরাঘুরি করতেন। ঢুকতেন ১২টা বাজার পর।

৯০ দশকের প্রথম দিকে ফ্যাক্স মেশিন আমাদের রিপোর্ট পাঠানো কিছুটা সহজ করে দেয়। দূরের কোথাও অ্যাসাইনমেন্টে গেলে বড় সাদা কাগজে নিউজ লিখে কোনো দোকান থেকে ফ্যাক্স করে দিতাম। এটির খরচ অবশ্য নিজের বহন করতে হতো। টেলিফোনে নিউজে শব্দের বা বাক্যের যে বিভ্রাট হতো সেটি থেকে মুক্তি মিললো তখন। তবে অনুসন্ধানী বা বিশেষ রিপোর্ট অফিসে এসেই লিখতে হতো, সময় নিয়ে। তখন বাই নেইম রিপোর্ট খুব কম হতো। রিপোর্ট হতো কিন্তু রিপোর্টারের নাম খুব কম যেতো। বেশি ভালো রিপোর্ট হলে সেখানে নিউজ এডিটর নাম বসাতেন। এর বাইরে নয়। আবার অনেক বিশেষ রিপোর্ট নিয়ে সমস্যায় পড়তে পারে তাই রিপোর্টারের নাম দেয়া হতো না।

এরপর মোবাইল ফোন এলো কিন্তু সাংবাদিকদের কেনার সামর্থের মধ্যে ছিলো না। ব্যবহার করতেন ব্যবসায়ীরা। কিছু কিছু রাজনীতিবিদ অবশ্য ব্যবহার শুরু করেন তখন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মোবাইল ফোনের লাইসেন্স কয়েকটি কোম্পানিকে দিলে বাজার সহজ হয়। কিন্তু বিল এতো বেশি, ব্যবহার করা কঠিন ছিল। প্রতি মিনিট কলরেট ছিল ৭টাকা।

তবুও এই সময়ে তথ্য আদান-প্রদান অনেক সহজ হয়ে যায়। আমরা তখন টিএন্ডটির মাধ্যমে নেতা অথবা ব্যবসায়ীদের কাছে ফোন করে তথ্য নিতাম বা গতিবিধি জানতাম। আগেতো ল্যান্ড ফোনে সবাইকে পাওয়া যেতো না। কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে পাওয়ার কাজটি সহজ হলো।

কিন্তু বিপরীতে ক্ষতিও হলো। রিপোর্টাররা পরিশ্রম কমিয়ে দেয়ায় খবরের গভীরতা কমে গেলো। স্পট থেকে ঘুরে এসে রিপোর্টের যে ধার সেটিতো আর টেলিফোন বা অন্যদের কাছ থেকে শুনে থাকার কথা নয়। টেলিফোনে নিউজ খাওয়ানো শুরু হলো। বিভ্রান্তিকর তথ্যে গুজব সংবাদ বেড়ে গেলো।

দৈনিক যুগান্তরে যখন কাজ করি, সম্পাদক ছিলেন গোলাম সারওয়ার। একটা মহীরুহ। তার কাছে স্ক্রিপ্ট গেলে রিপোর্টারকে ডেকে দাঁড় করিয়ে স্ক্রিপ্টে কলম দিয়ে খোঁচাতেন আর বলতেন কী লিখেছো? হয়েছে কিছু? এখনও লেখা শেখোনি। তারপর এডিট করতেন নিজের মতো করে। পরদিন বড় হেডলাইনে নিজের নামে রিপোর্টটি যখন ছাপা দেখতাম, মনটা ভরে যেতো। এই পত্রিকায় কিছুদিনের জন্য মুসা ভাইকে (এবিএম মুসা) পেয়েছিলাম। পরে তাকে যেকোনো দরকারে ফোন দিলে সহযোগিতা করতেন। ছিলেন তথ্যের ভাণ্ডার। এমন আরেকজনকে পেয়েছিলাম সংবাদে মকবুলার রহমানকে। তার নাম দিয়েছিলাম চলন্ত এনসাক্লোপিডিয়া।

আমাদের একঝাঁক তরুণকে নিয়ে সারওয়ার ভাই ২০০৫ সালে দৈনিক সমকাল পত্রিকার যাত্রা শুরু করেছিলেন। সেখানেও তার দক্ষতা দেখেছি। এক মাসের মধ্যেই পত্রিকাটির সার্কুলেশন হু হু করে বাড়তে লাগলো। রিপোর্টারের কাছ থেকে কী করে কাজ আদায় করতে হয় তিনি ভালো করে জানতেন। কাজে আমাদেরও তাগিদ ছিল এটা দাবি করতে পারি। ওই সময় এরশাদ ও বিদিশার ঘর ভাঙার ব্রেকিং নিউজ দিয়েছিলাম। পরদিন তিনি আমাকে পাঠালেন যে কাজীর মাধ্যমে এরশাদ তালাক দিয়েছিলেন তাকে খুঁজে বের করতে। এরপর এরশাদের সম্পদের হিসাব বের করতে বললেন। আবার বললেন বিদিশার সাক্ষাতকার নিতে। এভাবে অনেকদিন ইস্যুটি ধরে রাখলেন পত্রিকায়। এমন করেই পাঠক ধরে রাখতে হয়-এই কৌশলটি ভালোই জানতেন সরওয়ার ভাই।

সম্ভবত ১৯৯৮ কি ৯৯ সালে এরশাদ ও জিনাত মোশাররফের পরকীয়ার রিপোর্ট করার পর জাতীয় পার্টি আরেকবার ভেঙেছিল। শুধু তাই নয় জিনাতের স্বামী মোশাররফ হোসেন সেবার তাকে তালাকও দিয়েছিলেন। এই রিপোর্টটি করি দৈনিক সংবাদে। এরশাদের সঙ্গে কথা বলতে তখন নিউজ এডিটর বুলবুল ভাই (মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল) ও চিফ রিপোর্টার কাশেম ভাই (কাশেম হুমায়ুন) একসঙ্গে গিয়েছিলাম গুলশানের বাসায়। সাক্ষাতকারে এরশাদ স্বীকার করেন জিনাতের সঙ্গে তার ১৪ বছর ধরে প্রেম চলছে।

২০০০ সালের শুরুতে গণমাধ্যমে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এলো। প্রিন্ট মিডিয়ার সঙ্গে পাল্লা দিতে এলো ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া। একুশে টেলিভিশন যাত্রা শুরু করলো। এরপর চ্যানেল আই। পরে সংবাদ বুলেটিন যুক্ত হলো এটিএন বাংলায়। শুরুর দিকে এই মাধ্যমে কাজ করা আমার কাছে সাংবাদিকতা মনে হতো না। তাই ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় চাকরি করার আগ্রহও দেখাইনি। কিন্তু স্রোত তখন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার দিকে। একুশের সাংবাদিকরা রাতারাতি স্টার বনে গেছেন। বেতনও ভালো, অ্যাসাইনমেন্টে গাড়ি সুবিধা পাওয়া যায়। এসব আকর্ষণ ও আলমগীর ভাইয়ের (শাহ আলমগীর) আহ্বানে উৎসাহিত হই। চ্যানেল আই দিয়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় যাত্রা শুরু। তারকা পরিচিতি পেলেও সৃষ্টিশীলতায় আনন্দ পাচ্ছিলাম না। মনে হতে লাগলো হালকা ধরনের কাজ। বাইটনির্ভর সাংবাদিকতা টেলিভিশনকে বেশিদূর এগিয়ে নিতে পারবে না। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও বার্কলের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক প্রণব বর্ধনও তার আত্মজীবনীতে টেলিভিশন সম্পর্কে একই কথা লিখেছেন। তাই হলো শুরুর দিকে এসব রিপোর্টিং দর্শকপ্রিয়তা পেলেও আস্তে আস্তে কমতে লাগলো। কারণ মানুষ পত্রিকাতেই অনুসন্ধানী অনেক খবর পাচ্ছে। টেলিভিশনগুলো সে জায়গাতে পিছিয়ে আছে।

সংবাদপত্রের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে শুরু করলাম। টেলিভিশনে ২০০৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে চ্যানেল আইতে আমার করা ভুয়া ভোটার তালিকার রিপোর্ট সাড়া ফেলে দেয়। ওই সময় দেশে ১ কোটি ২০ লাখ ভুয়া ভোটার হয়েছিল আমার অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে। সুপ্রিম কোর্ট ওই ভোটার তালিকা বাতিল করে দেয়। দৈনিক প্রথম আলো তখন সেই রিপোর্ট কপি করে ব্যানার লিড করেছিল। বিষয়টি ছিল সহজ, ৫ বছর আগের ভোটার তালিকা ও সবশেষ তালিকার পার্থক্য দেখে পরিসংখ্যান ব্যুরো অফিসে গেলাম। ৫ বছরে কতো লোক ১৮ বছর পূর্ণ বা ভোটারযোগ্য হয়েছে। আর মৃত্যুর হার কতো। এই হিসেব বের করে অসামঞ্জস্যতা খুঁজে পাই। এরপর শুরু করি ফিল্ড লেভেলে কাজ। স্থানীয় নির্বাচন অফিস থেকে নতুন ভোটার তালিকা নিয়ে ঠিকানা অনুযায়ী বাড়ি বাড়ি গিয়ে সঠিকতা যাচাই করি। ব্যস, গড়মিল বের হয়ে আসে। এই উদাহরণটি দিলাম নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য। তারা যেন এভাবেই খবরের ভেতরের খবরের জন্য তাগিদ অনুভব করেন।

তবে টেলিভিশনের শুরুর দিকে আমাদের কাজ এখনকার মতো এতো মসৃণ ছিলো না। অ্যাসাইনমেন্ট শেষে দৌঁড়াতে হতো অফিসে। ঢাকার বাইরে গেলে সেখান থেকেও নিউজ পাঠাতে অনেক যন্ত্রণা ছিল। ডিএসএনজি গাড়ি গেলে হয়তো সহজ হতো কিন্তু স্যাটালাইট ভাড়া অনেক বেশি তাই কর্তৃপক্ষ রাজি হতো না। রাজনৈতিক সফরে গেলে জনসভা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুখে মুখেই একটি স্ক্রিপ্ট তৈরি করে ক্যামেরায় ভয়েসওভার দিয়ে সেই ক্যাসেট প্রধানমন্ত্রী অথবা বিরোধী দলীয় নেত্রীকে বহন করা হেলিকপ্টারে দিয়ে দিতাম। ঢাকার বিমান বন্দর থেকে সেই ক্যাসেট অফিসের লোক গিয়ে নিয়ে যেতো। বুলেটিনে ধরানোর জন্য কখনও কখনও দূর পাল্লার বাসেও ক্যাসেট পাঠিয়েছি। কোনো কোনো সময় অ্যাসাইনমেন্টে বেরুবার আগে অফিসে আগাম ভয়েসওভার দিয়ে যেতাম। পরে ছবি পাঠাতাম মেইলে। একুশে টেলিভিশনে থাকা অবস্থায় ২০০৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে নির্বাচনী সফরে যাই। সকাল বেলা রওনা দেয়ার আগে একটি বড় স্ক্রিপ্টের ভয়েস দিয়ে গিয়েছিলাম। বলে গিয়েছিলাম কেটেছেঁটে যতোটুকু কাজে লাগানো যায় সেটুকু ব্যবহার করতে। ফুটেজ মেইলে পাঠাবো। সেই সফরে সিরাজগঞ্জের হাটিকমরুলে মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়ি। তখন বেলা ১টার বুলেটিনে অফিসের সঙ্গে টেলিফোনে যুক্ত ছিলাম। জীবন মৃত্যুর মুখে পড়ে নিজেই লিড নিউজ হয়ে যাই। তখন কতো মানুষ যে আমার জন্য দোয়া করেছে তার হিসাব নেই। টেলিভিশন চ্যানেলের সেই ক্রেজ আর নেই।

টেলিভিশন মিডিয়াকে এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে নিউমিডিয়ার। ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, ইন্সট্রাগ্রামসহ কতো কতো মিডিয়া। এসব মাধ্যমে আনএডিটেড অনেক খবর প্রচার হচ্ছে। দর্শকও লুফে নিচ্ছেন। ইদানিং দেখা যায় অনেক খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় আগে বের হয়। সেখান থেকে টেলিভিশনগুলো তুলে নেয়।

আগে সংবাদপত্রের হুমকি ছিল ডিজিটাল মিডিয়া। এখন টেলিভিশনও এর হুমকির মধ্যে পড়েছে। সেখানে ভিন্নতা দেখাতে না পারলে পিছিয়ে থেকে থেকে মৃত্যুর মুখে চলে যাবে। কারণ সব বিজ্ঞাপন চলে যাবে ডিজিটাল মিডিয়ায়।

গবেষণার তথ্যে দেখা গেছে, মাত্র কয়েক বছর আগেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ টেলিভিশনের প্রাইম টাইম প্রোগ্রামগুলো দেখতো। বর্তমানে মাত্র ১৪ শতাংশের নিচে দর্শক তা দেখে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অনেকটা এরকম পরিসংখ্যান।

বর্তমানে দেশে ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ সেল ফোন ব্যবহার করছে। যুব সম্প্রদায়ের প্রায় শতভাগের হাতেই মোবাইল। আছে স্মার্ট ফোন, ল্যাপটপ, নোটবুক, ট্যাব। এর মাধ্যমে খবর, বিজ্ঞাপন, শিক্ষা, বিজ্ঞান, বিনোদন যাবতীয় উপাদান সবার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এবং উপভোগও করছে। এ সবের কারণে সংবাদপত্রতো বটেই ইলেকট্রনিক মিডিয়াও আবেদন হারিয়ে ফেলছে।

সোশ্যাল মিডিয়ার বাধাহীন ও বাছবিচারহীনতার যুগে কোনটি নির্ভরযোগ্য কোনটি নির্ভরযোগ্য নয় তা বলা মুশকিল। তবে প্রতিষ্ঠানিক গণমাধ্যমে পেশাদারিত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করে সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করার নিয়ম এখনও আছে। আগামীতে এটিই গ্রহণযোগ্য থাকবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। এ জন্য বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে হবে। এই বস্তুনিষ্ঠতার হালটি শক্ত হাতে ধরতে হবে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদেরই। খবরের ভেতরের খবর দিতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়া গুজব দিয়ে আকাশ অন্ধকারে ঢেকে দিক। সেখানে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাবে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাই। আজকে যারা সংবাদপত্র, অনলাইন পোর্টাল বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সাংবাদিকতা করছেন তাদের মধ্যে অনেক ঘাটতি দেখি। পরিশ্রম করতে চান না, পড়াশুনা করতে চা ননা। লেখার কথাতো বাদই দিলাম। নিজের লেখা স্ক্রিপ্ট নিজেই বুঝতে পারেন না। জিজ্ঞেস করলে বলেন, কী যেন বোঝাতে চেয়েছিলাম। ভারতের বিখ্যাত সাংবাদিক হামিদ বে তার একটি লেখায় লিখেছেন, রিপোর্টাররা খবরের জন্য অপেক্ষা করে যতো সময় ব্যয় করেন তার এক চতুর্থাংশও লেখার পেছনে ব্যয় করেন না। এ কারণে গাঁথুনি সুন্দর হয় না। নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের এই জায়গাটিতে মনোযোগী হতে হবে। সেই সঙ্গে নিজেদের তথ্যের ভান্ডার বানাতে হবে। একজন সাংবাদিকের সঙ্গে যে কারোরই দেখা হলে প্রথম প্রশ্নটি করেন, কী খবর আছে? অর্থাৎ তার কাছ থেকে অনেক কিছু জানার প্রত্যাশা করেন।

সাংবাদিক জাওয়াদুর রহমান পিআইবিতে অনেক আগে এক ট্রেনিংয়ে বলেছিলেন, একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হচ্ছে সবশেষ তথ্যটি জানা। আর এটি জানতে গেলেই তার যোগাযোগ বাড়বে। যোগাযোগ বাড়লেই রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে আমলা, ব্যবসায়ী সবাই তাকেই তথ্য শেয়ার করবেন। এভাবেই তিনি বড় সাংবাদিক হয়ে উঠবেন। তথ্য পাওয়ার জায়গাগুলোতে বেশি যাতায়াত, আড্ডা দেয়া, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ফোন করা একজন রিপোর্টারের ফরজ কাজ। অনেক পুরোনো প্রবাদ- সাংবাদিকের পায়ে লক্ষী। যতো চলাচল ততো তথ্য, ততো রিপোর্ট।

লেখাটিতে নিজের কিছু অভিজ্ঞতা বলার উদ্দেশ্য ডিজিটাল জুগের নতুন সাংবাদিকরা যেন পেশার প্রতি যত্নবান হন। কারণ পেশাটি গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম এখনও রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এর প্রয়োজনীয়তা এখনও ফুরিয়ে যায়নি।

লেখক: হেড অব নিউজ, সংবাদ

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬


অ্যানালগ আর ডিজিটাল যুগের রিপোর্টার

প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬

featured Image

টিএন্ডটি ফোনে ওপার থেকে বলা হলো ‘সানকিপাড়া’ আর আমি ‘স’ এর বদলে ‘খ’ শুনলাম। ঢাকা থেকে বাসে চড়ে গেলাম ময়মনসিংহ টার্মিনালে। রিকশাওয়ালাকে কি করে যে এমন জায়গার নাম বলি! মুখের মধ্যে ‘খ’ উচ্চারণটি আধো রেখে বললাম যাবে নাকি? উত্তর, ‘উডুন, যাইতাম।’ চেপে বসলাম। আর মনে মনে প্রতিনিধিকে বকতে লাগলাম। এমন একটি জায়গার লোকেশন কেন দিলো? রিকশা চলছে ময়মনসিংহ শহরের ইটের খোয়া উঠে যাওয়া ভাঙাচোড়া রাস্তা দিয়ে। এর আগে আমি কখনও এই শহরে আসিনি। বৃটিশ সময়ের পুরোনো শহর। মাঝে মাঝে সেই ঐতিহ্যের ছাপ উঁকি দিচ্ছে। প্রায় আধ ঘণ্টা ঘুরে একটি মোড়ে এসে রিকশা থামলো- ‘নামুইন’। জিজ্ঞেস করলাম, এখানে নাকি। চালকের হ্যাঁ সূচক জবাব। রাস্তার দু’পাশে তাকিয়ে দেখি দোকানের সাইন বোর্ডে লেখা সানকিপাড়া। আমি মুখে যা-ই বলি না কেন রিকশাওয়ালা বুঝতে ভুল করেনি। আমার ভ্রান্তি ভাঙলো। এটি একটি আবাসিক এলাকা। যাহোক সেখান থেকে আমার কাজে গেলাম। এই ঘটনা ১৯৮৯ সালের শেষ দিকের। তখন টিএন্ডটি টেলিফোনে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় লাইন প্রায় ডিস্টার্ব দিতো। অনেক সময় কথা অষ্পষ্ট শোনা যেতো, বিভ্রাটও হতো। আমার মতো ওই সময়ে ফোনের এ রকম বাজে অভিজ্ঞতা কম বেশি সবারই আছে।

যারা ৮০ দশকে বা ৯০ দশকে সাংবাদিকতা শুরু করেছেন তাদের অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত অনেক পরিবর্তন দেখতে হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। অবশ্য এরও আগের সাংবাদিকদের আরও পুরোনো অভিজ্ঞতা আছে এতে কোন সন্দেহ নেই। আমি ৮০ দশকের একেবারে শেষের দিকে সাংবাদিকতার কলম ধরি। এর আগে স্কুল-কলেজে ম্যাগাজিন বের করার অভিজ্ঞতা অর্জন করি নিজের শিল্প-সংষ্কৃতি মনন প্রকাশ করার তাগিদ থেকে। তখন ছিল টাইপো প্রেসের যুগ। সিসার অক্ষর বসিয়ে বসিয়ে ফ্রেম তৈরি করে মেশিনে তোলা হতো। ছবি ছাপতে ব্লক লাগতো। কারিগররা লাইন ব্লক হাতে তৈরি করতেন। হাফটোন ব্লকের জন্য প্রয়োজন হতো ক্যামেরা ও স্ক্রিনের, সেই সঙ্গে দক্ষ কারিগর। সেই যুগে একটা ম্যাগাজিন বের করতে কতো যে ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হতো নতুন প্রজন্মের অনেকেই তা অনুধাবন করতে পারবেন না। যা হোক ৮০ দশকের শেষে যখন সাংবাদিকতা শুরু করি তখন জোহানেস গুটেনবার্গের ছাপাখানার বড় পরিবর্তন এসেছে। অফসেট লিথোগ্রাফি, গ্র্যাভিউর, অটোপ্লেট প্রসেসর কতো কি এলো। আরও এলো ফোর কালারে এক সঙ্গে ১৬ পৃষ্ঠা ছাপার মেশিন। খবরের কাগজে রঙিন ছবি, রঙিন হেডলাইন, নতুন এক আমেজ। কিন্তু সংবাদিকদের প্রযুক্তির ব্যবহার তখনও হাতে আসেনি। হেঁটে হেঁটে অফিসে বা বাড়ি বাড়ি গিয়ে খবর সংগ্রহ করতে হতো। সন্ধ্যার পর সেই খবর নিয়ে ঢুকতে হতো পত্রিকা অফিসে। স্ক্রিপ্ট লিখতে হতো নিউজপ্রিন্ট কাগজের বানানো এক ফুট বাই ৬ ইঞ্চি প্যাডে। নিউজ এডিটর কপি এডিট করতেন কলম খুঁচিয়ে। এরপর টাইপ হলে যেতো প্রুফ রিডার টেবিলে। তারা এসএসসি পরীক্ষার পড়া মুখস্থ করার মতো জোরে জোরে স্ক্রিপ্ট পড়ে ভুল বানান সংশোধন করতেন। কম্পিউটার রুমে সংশোধিত কপির প্রিন্ট বের হতো ট্রেসিং পেপারে। কম্পিউটার রুমে সবার যাওয়ার পারমিশন ছিল না। কারও প্রয়োজন হলে প্রার্থনা ঘরের মতো জুতা-মুজা খুলে ঢুকতে হতো। ট্রেসিং পেপারগুলো আট কলামের সেলোফিনে স্বচ্ছ শিটে সাজিয়ে স্কচটেপ দিয়ে আটকিয়ে মেকআপ করা হতো। পরে অনেকটা এক্সরের মতো এক মেশিনে দিয়ে ডিমাই সাইজের সেই শিটের নেগেটিভ বানানো হতো। নিউজের সেই নেগেটিভকে আবার রে দিয়ে প্লেটে বসানো হতো। এক একটি প্লেট মানে পত্রিকার দুই পৃষ্ঠা। প্লেট থেকেই ছাপা হতো হাজার হাজার কপির সংবাদপত্র। তখন কোনো সংবাদ আপডেট হলে মাঝরাতে ছাপা বন্ধ করে প্লেট বদল করতে হতো। সে ক্ষেত্র বাতিল হতো ছাপা হয়ে যাওয়া কাগজগুলো। উদাহরণ দেয়া যাক, যেমন জাতীয় পার্টির নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, রাত ১২টা পর্যন্ত আমরা এটাই রিপোর্ট করলাম। রাত ২টার দিকে জানা গেলো তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তখন ছাপা বন্ধ করে আবার সংশোধিত নিউজ দিয়ে প্লেট তৈরি করে ছাপানো হতো। অনেক সময় ঢাকার এডিশনে আপডেট নিউজ থাকতো আর ঢাকার বাইরের এডিশনে যেতো আগের নিউজ। বিশেষ কারণে কখনও পত্রিকার ৪টি এডিশনও হতো।

আমরা যারা রিপোর্টার ছিলাম তাদের খবর সংগ্রহে হতে হতো অনেক সতর্ক, অনেক যত্নবান। নিউজ লিখতে বসলে এখনকার মতো হাতের কাছে ৫টি অনলাইন পোর্টাল খুলে দেখার সুযোগ ছিল না। ম্যাসেঞ্জার বা হোয়াসঅ্যাপে স্ক্রিপ্ট শেয়ারও করা যেতো না। হতো না হুবহু কপি পেস্ট। প্রত্যেকে নিজ নিজ মেধা দিয়ে লিখতেন। অ্যাসাইনমেন্টে গেলে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নোট নিতে হতো। লেখার সময় সেটি বারবার খুঁজে দেখতে হতো। যাতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়ে না যায় বা ভুল না হয়ে যায়। অনেক ইনফরমেশনও মনে রাখতে হতো। পুরোনো তথ্য পেতে যেতে হতো পাবলিক লাইব্রেরি, প্রেস ইনস্টিটিউটে বা পত্রিকা অফিসের পুরোনা পত্রিকা ঘাঁটতে হতো। তখন প্রত্যেক রিপোর্টারের লেখার স্টাইল ছিল আলাদা। একই অ্যাসাইনমেন্ট কাভার করেছেন বিভিন্ন পত্রিকায় দেখতাম ভিন্ন ভিন্ন স্টাইলে রিপোর্ট হয়েছে। দৈনিক ইত্তেফাকের নাজীমউদ্দিন মোস্তান, মতিউর রহমান চৌধুরী, দৈনিক বাংলার জহিরুল হক, সংবাদের শওকত মাহমুদ, মোনাজাত উদ্দিন, বাংলার বাণীর ফারুক কাজী, খবরের আশরাফ খান, সুনীল ব্যানার্জি, শফিকুর রহমান, অরুণাভ সরকার, মাহমুদ শফিক, সৈকত রুশদী- এদের দেখতাম নিজস্ব ঢঙে রিপোর্ট লিখতে। এছাড়া শাহজাহান সরদার, হাসান শাহরিয়ার, জাফর ওয়াজেদ, সাইফুল আলম, আমীর খসরু - এদেরও লেখার একটা ঢঙ ছিল। বিবিসির আতাউস সামাদ ও ভয়েজ অব আমেরিকার গিয়াস কামাল চৌধুরীও ভাষার ভালো দখল রেখে স্ক্রিপ্ট লিখতেন। আমরা তাদের ফলো করতাম। আরও নাম আছে কিন্তু এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।

বাসা থেকে বের হতাম প্রতিদিন সকালে। অ্যাসাইনমেন্ট থাকলে সেটি তো করলামই, পাশাপাশি বিশেষ রিপোর্টের খোঁজে যেতাম নানা অফিসে। কয়েকদিন ঘুরে একটি ভালো রিপোর্ট পাওয়া যেতো, সেটি আবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য না পেলে নিউজ এডিটর ফিরিয়ে দিতেন-যাও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নিয়ে আসো। না হলে যাবে না। গিয়ে বসে থাকতে হতো কর্তৃপক্ষের অফিসে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য না পাওয়ায় কতো রিপোর্ট যে আলোর মুখ দেখেনি তার হিসাব নেই। আমার সরাসরি এডিটর ছিলেন কে জি মোস্তাফা। রিপোর্টের স্ক্রিপ্টে অসঙ্গতি পেলে ছিঁড়ে ফেলে বলতেন ‘কিল্ড’। আরেক এডিটর ছিলেন বজলুর রহমান। ভুল তথ্য তো সহ্যই করতে পারতেন না। মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল ছিলেন আমার নিউজ এডিটর।

একবার টিএন্ডটি অফিসের দুর্নীতি নিয়ে একটি রিপোর্ট করলাম। দৈনিক সংবাদের মালিক আহমদুল কবিরের কাছে টিএন্ডটির চেয়ারম্যান নালিশ করলেন। আহমদুল কবির রুমে আমাকে ডেকে পাঠালেন। এই ফাঁকে সকালে নিজেই টিএন্ডটি অফিসে গিয়ে খোঁজ-খবর নিলেন। যখন তার রুমে ঢুকলাম বললেন, তোমার ডকুমেন্টগুলো কোথায়? দেখালাম। ‘রিপোর্টটি ঠিকই আছে, নিজে গিয়ে দেখেছি’। তারপর বললেন, এই রিপোর্টে তোমার ঘাটতি কোথায় ছিল জানো? তুমি চেয়ারম্যানের ভাষ্য নাওনি। এটি করলে তিনি অভিযোগ জানানোর সুযোগই পেতেন না। আহমদুল কবিরের সেদিনের পরামর্শ পরবর্তীতে আর ভুলিনি।

আমাদের ঢাকার বাইরে সফরে গেলে নিউজ পাঠাতে হতো টেলিফোনে। সেই টেলিফোন আবার সব জায়গায় ছিল না। কোনো সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতার বাসা এবং সার্কিট হাউসের টেলিফোন ব্যবহার করতে হতো। এসব জায়গাতেই কেবল এসটিডি (সাবসক্রাইবার ট্রাঙ্ক ডায়েলিং) টেলিফোন পাওয়া যেতো। টিএন্ডটি টেলিফোন ছিল তিন ধরণের, লোকাল, এসটিডি ও আইএসডি। সার্কিট হাউস বা অন্য কোথাও সুযোগ না পেলে ধরনা দিতে হতো স্থানীয় টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিসে। বৃষ্টি বাদল বা নানা কারণে লাইন খারাপ থাকতো। এ প্রান্ত থেকে বলতাম এক কথা আর অপর প্রান্তে শুনতো আরেকটা। যদি বলতাম ‘ভালো’ সেটি শুনতো ‘কালো’। যদি বলতাম বীরগঞ্জ শুনতো পীরগঞ্জ। কতো যে জায়গার নাম ভুল শুনেছে কতোজনে? তখন চিৎকার করে অক্ষর বলা বা নানা উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে হতো।

জেলা শহরে রাজনৈতিক সফরে গিয়ে লাইনের সিরিয়াল ধরে নিউজ পাঠানোর অভিজ্ঞতা এখনকার পঞ্চাশোর্ধ সব সাংবাদিকেরই আছে। শেখ হাসিনা ১৯৯১-৯৫ সালে ছিলেন বিরোধী দলীয় নেত্রী। তখন তার রাজনৈতিক সফরে অ্যাসাইনমেন্ট পড়েছে অনেক। জনসভা শেষে নিউজ পাঠাতে অনেকদিন সার্কিট হাউসে তার রুমের টেলিফোনও ব্যবহার করেছি। অনেক ক্ষেত্রে ফেরার দিন হয়তো রাত ১০টায় পৌঁছাবো গাড়িতে বসে স্ক্রিপ্ট লেখা শেষ করতাম। অফিসে ঢুকে রিপোর্ট জমা দিয়ে ছাপা পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতাম। তখন বাসায় যেতে যেতে রাত ২টা থেকে আড়াইটা বাজতো। এমনিতেই প্রতিরাতে বাসায় যেতে হতো রাত ১২টা অথবা ১টায়। অ্যাসাইনমেন্টই দেয়া হতো রাত ১১টার পর। অ্যাসাইনমেন্ট না দেখে অফিস ত্যাগ করা বারণ ছিল। আমি যখন সংবাদে চাকরি করি অফিসের গাড়ি অর্থাৎ বেবি ট্যাক্সি বা স্কুটার ছাড়তো রাত সাড়ে ১২টায়। এর আগে অফিস ছাড়লে যেতে হতো নিজের ব্যবস্থাপনায়। ১৯৯৬-৯৭ সালে যখন ঢাকার বাইরে সকালে পত্রিকা পৌঁছানোর জন্য ছাপা এগিয়ে আনা হলো তখন অবশ্য রাত সাড়ে ১০ থেকে ১১টার মধ্যে ছুটি হতো। অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হতো সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে। সংবাদে আমার আরেক সম্পাদক ছিলেন বজলুর রহমান। তিনি তখন প্রায়ই বলতেন কেউ ৮/৯টায় বাসায় যেও না হয়তো ভেবে বসতে পারে চাকরি চলে গেছে। সাংবাদিকদের মাঝরাত ছাড়া বাসায় যাওয়ার কালচার নেই। 

বজলু ভাই প্রায়ই বলতেন তাদের আমলে বাসায় যেতেন রাত ২টার পর। মতিয়া চৌধুরীর সঙ্গে তার যখন বিয়ে হয় প্রথম প্রথম মতিয়া আপা নাকি রাতের খাবারের জন্য অপেক্ষায় থাকতেন। বজলু ভাই তখন বলে দিলেন এভাবে অপেক্ষা করলে এক সময় বিরক্ত হয়ে যাবে। তার চেয়ে খাবার টেবিলে রেখে তুমি ঘুমিয়ে যেও। এসব বজলুর রহমানের মুখ থেকেই শোনা। শেষ রাতে ছাপা শেষে গরম পত্রিকা হাতে নিয়ে বাসায় যাওয়ার গল্প সন্তোষ গুপ্ত, ফয়েজ আহমদ, কামাল লোহানীসহ ওই প্রজন্মের অনেক সাংবাদিকই করেছেন। ফয়েজ আহমদের তো বই রয়েছে ‘মধ্যরাতের অশ্বারহী’ নামে। সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা আলতাফ মাহমুদ প্রায়ই বলতেন, পত্রিকার ছাপার সিডিউল এগিয়ে গেলেও তিনি কখনো রাত ১২টার আগে বাসায় ঢুকতেন না। কোনো কারণে আগে চলে গেলেও বাসার সামনে ঘোরাঘুরি করতেন। ঢুকতেন ১২টা বাজার পর।

৯০ দশকের প্রথম দিকে ফ্যাক্স মেশিন আমাদের রিপোর্ট পাঠানো কিছুটা সহজ করে দেয়। দূরের কোথাও অ্যাসাইনমেন্টে গেলে বড় সাদা কাগজে নিউজ লিখে কোনো দোকান থেকে ফ্যাক্স করে দিতাম। এটির খরচ অবশ্য নিজের বহন করতে হতো। টেলিফোনে নিউজে শব্দের বা বাক্যের যে বিভ্রাট হতো সেটি থেকে মুক্তি মিললো তখন। তবে অনুসন্ধানী বা বিশেষ রিপোর্ট অফিসে এসেই লিখতে হতো, সময় নিয়ে। তখন বাই নেইম রিপোর্ট খুব কম হতো। রিপোর্ট হতো কিন্তু রিপোর্টারের নাম খুব কম যেতো। বেশি ভালো রিপোর্ট হলে সেখানে নিউজ এডিটর নাম বসাতেন। এর বাইরে নয়। আবার অনেক বিশেষ রিপোর্ট নিয়ে সমস্যায় পড়তে পারে তাই রিপোর্টারের নাম দেয়া হতো না।

এরপর মোবাইল ফোন এলো কিন্তু সাংবাদিকদের কেনার সামর্থের মধ্যে ছিলো না। ব্যবহার করতেন ব্যবসায়ীরা। কিছু কিছু রাজনীতিবিদ অবশ্য ব্যবহার শুরু করেন তখন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মোবাইল ফোনের লাইসেন্স কয়েকটি কোম্পানিকে দিলে বাজার সহজ হয়। কিন্তু বিল এতো বেশি, ব্যবহার করা কঠিন ছিল। প্রতি মিনিট কলরেট ছিল ৭টাকা।

তবুও এই সময়ে তথ্য আদান-প্রদান অনেক সহজ হয়ে যায়। আমরা তখন টিএন্ডটির মাধ্যমে নেতা অথবা ব্যবসায়ীদের কাছে ফোন করে তথ্য নিতাম বা গতিবিধি জানতাম। আগেতো ল্যান্ড ফোনে সবাইকে পাওয়া যেতো না। কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে পাওয়ার কাজটি সহজ হলো।

কিন্তু বিপরীতে ক্ষতিও হলো। রিপোর্টাররা পরিশ্রম কমিয়ে দেয়ায় খবরের গভীরতা কমে গেলো। স্পট থেকে ঘুরে এসে রিপোর্টের যে ধার সেটিতো আর টেলিফোন বা অন্যদের কাছ থেকে শুনে থাকার কথা নয়। টেলিফোনে নিউজ খাওয়ানো শুরু হলো। বিভ্রান্তিকর তথ্যে গুজব সংবাদ বেড়ে গেলো।

দৈনিক যুগান্তরে যখন কাজ করি, সম্পাদক ছিলেন গোলাম সারওয়ার। একটা মহীরুহ। তার কাছে স্ক্রিপ্ট গেলে রিপোর্টারকে ডেকে দাঁড় করিয়ে স্ক্রিপ্টে কলম দিয়ে খোঁচাতেন আর বলতেন কী লিখেছো? হয়েছে কিছু? এখনও লেখা শেখোনি। তারপর এডিট করতেন নিজের মতো করে। পরদিন বড় হেডলাইনে নিজের নামে রিপোর্টটি যখন ছাপা দেখতাম, মনটা ভরে যেতো। এই পত্রিকায় কিছুদিনের জন্য মুসা ভাইকে (এবিএম মুসা) পেয়েছিলাম। পরে তাকে যেকোনো দরকারে ফোন দিলে সহযোগিতা করতেন। ছিলেন তথ্যের ভাণ্ডার। এমন আরেকজনকে পেয়েছিলাম সংবাদে মকবুলার রহমানকে। তার নাম দিয়েছিলাম চলন্ত এনসাক্লোপিডিয়া।

আমাদের একঝাঁক তরুণকে নিয়ে সারওয়ার ভাই ২০০৫ সালে দৈনিক সমকাল পত্রিকার যাত্রা শুরু করেছিলেন। সেখানেও তার দক্ষতা দেখেছি। এক মাসের মধ্যেই পত্রিকাটির সার্কুলেশন হু হু করে বাড়তে লাগলো। রিপোর্টারের কাছ থেকে কী করে কাজ আদায় করতে হয় তিনি ভালো করে জানতেন। কাজে আমাদেরও তাগিদ ছিল এটা দাবি করতে পারি। ওই সময় এরশাদ ও বিদিশার ঘর ভাঙার ব্রেকিং নিউজ দিয়েছিলাম। পরদিন তিনি আমাকে পাঠালেন যে কাজীর মাধ্যমে এরশাদ তালাক দিয়েছিলেন তাকে খুঁজে বের করতে। এরপর এরশাদের সম্পদের হিসাব বের করতে বললেন। আবার বললেন বিদিশার সাক্ষাতকার নিতে। এভাবে অনেকদিন ইস্যুটি ধরে রাখলেন পত্রিকায়। এমন করেই পাঠক ধরে রাখতে হয়-এই কৌশলটি ভালোই জানতেন সরওয়ার ভাই।

সম্ভবত ১৯৯৮ কি ৯৯ সালে এরশাদ ও জিনাত মোশাররফের পরকীয়ার রিপোর্ট করার পর জাতীয় পার্টি আরেকবার ভেঙেছিল। শুধু তাই নয় জিনাতের স্বামী মোশাররফ হোসেন সেবার তাকে তালাকও দিয়েছিলেন। এই রিপোর্টটি করি দৈনিক সংবাদে। এরশাদের সঙ্গে কথা বলতে তখন নিউজ এডিটর বুলবুল ভাই (মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল) ও চিফ রিপোর্টার কাশেম ভাই (কাশেম হুমায়ুন) একসঙ্গে গিয়েছিলাম গুলশানের বাসায়। সাক্ষাতকারে এরশাদ স্বীকার করেন জিনাতের সঙ্গে তার ১৪ বছর ধরে প্রেম চলছে।

২০০০ সালের শুরুতে গণমাধ্যমে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এলো। প্রিন্ট মিডিয়ার সঙ্গে পাল্লা দিতে এলো ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া। একুশে টেলিভিশন যাত্রা শুরু করলো। এরপর চ্যানেল আই। পরে সংবাদ বুলেটিন যুক্ত হলো এটিএন বাংলায়। শুরুর দিকে এই মাধ্যমে কাজ করা আমার কাছে সাংবাদিকতা মনে হতো না। তাই ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় চাকরি করার আগ্রহও দেখাইনি। কিন্তু স্রোত তখন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার দিকে। একুশের সাংবাদিকরা রাতারাতি স্টার বনে গেছেন। বেতনও ভালো, অ্যাসাইনমেন্টে গাড়ি সুবিধা পাওয়া যায়। এসব আকর্ষণ ও আলমগীর ভাইয়ের (শাহ আলমগীর) আহ্বানে উৎসাহিত হই। চ্যানেল আই দিয়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় যাত্রা শুরু। তারকা পরিচিতি পেলেও সৃষ্টিশীলতায় আনন্দ পাচ্ছিলাম না। মনে হতে লাগলো হালকা ধরনের কাজ। বাইটনির্ভর সাংবাদিকতা টেলিভিশনকে বেশিদূর এগিয়ে নিতে পারবে না। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও বার্কলের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক প্রণব বর্ধনও তার আত্মজীবনীতে টেলিভিশন সম্পর্কে একই কথা লিখেছেন। তাই হলো শুরুর দিকে এসব রিপোর্টিং দর্শকপ্রিয়তা পেলেও আস্তে আস্তে কমতে লাগলো। কারণ মানুষ পত্রিকাতেই অনুসন্ধানী অনেক খবর পাচ্ছে। টেলিভিশনগুলো সে জায়গাতে পিছিয়ে আছে।

সংবাদপত্রের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে শুরু করলাম। টেলিভিশনে ২০০৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে চ্যানেল আইতে আমার করা ভুয়া ভোটার তালিকার রিপোর্ট সাড়া ফেলে দেয়। ওই সময় দেশে ১ কোটি ২০ লাখ ভুয়া ভোটার হয়েছিল আমার অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে। সুপ্রিম কোর্ট ওই ভোটার তালিকা বাতিল করে দেয়। দৈনিক প্রথম আলো তখন সেই রিপোর্ট কপি করে ব্যানার লিড করেছিল। বিষয়টি ছিল সহজ, ৫ বছর আগের ভোটার তালিকা ও সবশেষ তালিকার পার্থক্য দেখে পরিসংখ্যান ব্যুরো অফিসে গেলাম। ৫ বছরে কতো লোক ১৮ বছর পূর্ণ বা ভোটারযোগ্য হয়েছে। আর মৃত্যুর হার কতো। এই হিসেব বের করে অসামঞ্জস্যতা খুঁজে পাই। এরপর শুরু করি ফিল্ড লেভেলে কাজ। স্থানীয় নির্বাচন অফিস থেকে নতুন ভোটার তালিকা নিয়ে ঠিকানা অনুযায়ী বাড়ি বাড়ি গিয়ে সঠিকতা যাচাই করি। ব্যস, গড়মিল বের হয়ে আসে। এই উদাহরণটি দিলাম নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য। তারা যেন এভাবেই খবরের ভেতরের খবরের জন্য তাগিদ অনুভব করেন।

তবে টেলিভিশনের শুরুর দিকে আমাদের কাজ এখনকার মতো এতো মসৃণ ছিলো না। অ্যাসাইনমেন্ট শেষে দৌঁড়াতে হতো অফিসে। ঢাকার বাইরে গেলে সেখান থেকেও নিউজ পাঠাতে অনেক যন্ত্রণা ছিল। ডিএসএনজি গাড়ি গেলে হয়তো সহজ হতো কিন্তু স্যাটালাইট ভাড়া অনেক বেশি তাই কর্তৃপক্ষ রাজি হতো না। রাজনৈতিক সফরে গেলে জনসভা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুখে মুখেই একটি স্ক্রিপ্ট তৈরি করে ক্যামেরায় ভয়েসওভার দিয়ে সেই ক্যাসেট প্রধানমন্ত্রী অথবা বিরোধী দলীয় নেত্রীকে বহন করা হেলিকপ্টারে দিয়ে দিতাম। ঢাকার বিমান বন্দর থেকে সেই ক্যাসেট অফিসের লোক গিয়ে নিয়ে যেতো। বুলেটিনে ধরানোর জন্য কখনও কখনও দূর পাল্লার বাসেও ক্যাসেট পাঠিয়েছি। কোনো কোনো সময় অ্যাসাইনমেন্টে বেরুবার আগে অফিসে আগাম ভয়েসওভার দিয়ে যেতাম। পরে ছবি পাঠাতাম মেইলে। একুশে টেলিভিশনে থাকা অবস্থায় ২০০৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে নির্বাচনী সফরে যাই। সকাল বেলা রওনা দেয়ার আগে একটি বড় স্ক্রিপ্টের ভয়েস দিয়ে গিয়েছিলাম। বলে গিয়েছিলাম কেটেছেঁটে যতোটুকু কাজে লাগানো যায় সেটুকু ব্যবহার করতে। ফুটেজ মেইলে পাঠাবো। সেই সফরে সিরাজগঞ্জের হাটিকমরুলে মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়ি। তখন বেলা ১টার বুলেটিনে অফিসের সঙ্গে টেলিফোনে যুক্ত ছিলাম। জীবন মৃত্যুর মুখে পড়ে নিজেই লিড নিউজ হয়ে যাই। তখন কতো মানুষ যে আমার জন্য দোয়া করেছে তার হিসাব নেই। টেলিভিশন চ্যানেলের সেই ক্রেজ আর নেই।

টেলিভিশন মিডিয়াকে এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে নিউমিডিয়ার। ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, ইন্সট্রাগ্রামসহ কতো কতো মিডিয়া। এসব মাধ্যমে আনএডিটেড অনেক খবর প্রচার হচ্ছে। দর্শকও লুফে নিচ্ছেন। ইদানিং দেখা যায় অনেক খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় আগে বের হয়। সেখান থেকে টেলিভিশনগুলো তুলে নেয়।

আগে সংবাদপত্রের হুমকি ছিল ডিজিটাল মিডিয়া। এখন টেলিভিশনও এর হুমকির মধ্যে পড়েছে। সেখানে ভিন্নতা দেখাতে না পারলে পিছিয়ে থেকে থেকে মৃত্যুর মুখে চলে যাবে। কারণ সব বিজ্ঞাপন চলে যাবে ডিজিটাল মিডিয়ায়।

গবেষণার তথ্যে দেখা গেছে, মাত্র কয়েক বছর আগেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ টেলিভিশনের প্রাইম টাইম প্রোগ্রামগুলো দেখতো। বর্তমানে মাত্র ১৪ শতাংশের নিচে দর্শক তা দেখে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অনেকটা এরকম পরিসংখ্যান।

বর্তমানে দেশে ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ সেল ফোন ব্যবহার করছে। যুব সম্প্রদায়ের প্রায় শতভাগের হাতেই মোবাইল। আছে স্মার্ট ফোন, ল্যাপটপ, নোটবুক, ট্যাব। এর মাধ্যমে খবর, বিজ্ঞাপন, শিক্ষা, বিজ্ঞান, বিনোদন যাবতীয় উপাদান সবার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এবং উপভোগও করছে। এ সবের কারণে সংবাদপত্রতো বটেই ইলেকট্রনিক মিডিয়াও আবেদন হারিয়ে ফেলছে।

সোশ্যাল মিডিয়ার বাধাহীন ও বাছবিচারহীনতার যুগে কোনটি নির্ভরযোগ্য কোনটি নির্ভরযোগ্য নয় তা বলা মুশকিল। তবে প্রতিষ্ঠানিক গণমাধ্যমে পেশাদারিত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করে সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করার নিয়ম এখনও আছে। আগামীতে এটিই গ্রহণযোগ্য থাকবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। এ জন্য বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে হবে। এই বস্তুনিষ্ঠতার হালটি শক্ত হাতে ধরতে হবে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদেরই। খবরের ভেতরের খবর দিতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়া গুজব দিয়ে আকাশ অন্ধকারে ঢেকে দিক। সেখানে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাবে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাই। আজকে যারা সংবাদপত্র, অনলাইন পোর্টাল বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সাংবাদিকতা করছেন তাদের মধ্যে অনেক ঘাটতি দেখি। পরিশ্রম করতে চান না, পড়াশুনা করতে চা ননা। লেখার কথাতো বাদই দিলাম। নিজের লেখা স্ক্রিপ্ট নিজেই বুঝতে পারেন না। জিজ্ঞেস করলে বলেন, কী যেন বোঝাতে চেয়েছিলাম। ভারতের বিখ্যাত সাংবাদিক হামিদ বে তার একটি লেখায় লিখেছেন, রিপোর্টাররা খবরের জন্য অপেক্ষা করে যতো সময় ব্যয় করেন তার এক চতুর্থাংশও লেখার পেছনে ব্যয় করেন না। এ কারণে গাঁথুনি সুন্দর হয় না। নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের এই জায়গাটিতে মনোযোগী হতে হবে। সেই সঙ্গে নিজেদের তথ্যের ভান্ডার বানাতে হবে। একজন সাংবাদিকের সঙ্গে যে কারোরই দেখা হলে প্রথম প্রশ্নটি করেন, কী খবর আছে? অর্থাৎ তার কাছ থেকে অনেক কিছু জানার প্রত্যাশা করেন।

সাংবাদিক জাওয়াদুর রহমান পিআইবিতে অনেক আগে এক ট্রেনিংয়ে বলেছিলেন, একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হচ্ছে সবশেষ তথ্যটি জানা। আর এটি জানতে গেলেই তার যোগাযোগ বাড়বে। যোগাযোগ বাড়লেই রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে আমলা, ব্যবসায়ী সবাই তাকেই তথ্য শেয়ার করবেন। এভাবেই তিনি বড় সাংবাদিক হয়ে উঠবেন। তথ্য পাওয়ার জায়গাগুলোতে বেশি যাতায়াত, আড্ডা দেয়া, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ফোন করা একজন রিপোর্টারের ফরজ কাজ। অনেক পুরোনো প্রবাদ- সাংবাদিকের পায়ে লক্ষী। যতো চলাচল ততো তথ্য, ততো রিপোর্ট।

লেখাটিতে নিজের কিছু অভিজ্ঞতা বলার উদ্দেশ্য ডিজিটাল জুগের নতুন সাংবাদিকরা যেন পেশার প্রতি যত্নবান হন। কারণ পেশাটি গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম এখনও রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এর প্রয়োজনীয়তা এখনও ফুরিয়ে যায়নি।

লেখক: হেড অব নিউজ, সংবাদ


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত