একটি গান লিখেছিলাম
লিখেছিলাম একটি সে গান দুপুর ভাঙা রোদে
আলোতে সে গান হলো না তো একটু আলোকিত
নদীতে গান খেলো না ঢেউ, ভাসলো না তো জলে
পুষ্পে সে গান হয়নি কারও খোঁপায় শোভিত
লিখেছিলাম একটি সে গান, রঙধনু মেঘ বুকে
বৃষ্টিতে সে গান সলাজ স্নানের গল্প হলো না
সবুজবেণী ডাগর চোখের কাব্য হলো না
পাখিদের ওই উৎসবে গান গাওয়াও হলো না
লিখেছিলাম একটি সে গান, একটি দেশের মায়া
হাওরবাওড় দিঘিজলে কাঁপলো দৃষ্টি তার
মাঠে পারে প্রেমিক পুরুষ বুক চেতিয়ে ডাকে
কোথাও সে গান, সুর হলো না, শুধুই হাহাকার!
একদিন স্বাধীন হবে ফিলিস্তিন
আমার জন্ম কোথায়—পৃথিবী কোথায়—কতদূর!
পৃথিবীর মানুষেরা দেখতে কেমন
আদৌ কি মানুষ আছে এই পৃথিবীতে
আমি-তুমি ফিলিস্তিনি—আমাকে-তোমাকে
দিনরাত হত্যা করা হচ্ছে—
খণ্ডবিখণ্ড করছে
বুক জুড়ে অগ্নিকুণ্ড—পোড়া গন্ধ-বিভীষিকাময়
মানুষের কি হাত থাকে? শরীর-পা থাকে? বুক থাকে?
ক্ষুধা ও যন্ত্রণা থাকে? মৃত্যু ও আর্তনাদ থাকে?
আমি ফিলিস্তিনি—কোন গ্রহে জন্ম আমাদের
ফিলিস্তিন ও পৃথিবী অনেক দূরের কোনো গ্রহ?
আমরা হয়তো আর খাবারের জন্য দাঁড়াবো না—
পানির জন্যও নয়|
রক্তাক্ত চোখের জলে তাকাবো না করুণ আর্তিতে!
তবুুও শেষ হবে না— ফিলিস্তিন|
নতুন রক্তের লালে লাল হবে ফিলিস্তিন
পৃথিবী, তোমার বুকে একদিন স্বাধীনতা পাবে
রক্তলাল ফিলিস্তিন|
তখন দেখবে
আমরা এক গ্রহের—মানুষ ছিলাম
শুধু আর আমাদের সন্তানেরা ফিরবে না ঘরে|
গহিন প্রণতি
কতটা দূরের পথ দূরে রেখে এসেছ আমার
শহরে চোখের তৃষ্ণা নিয়ে গৌরী মনের দেউলে;
শান্তির উপমা লিখে—এই তো প্রথম দেখাদেখি
সবুজের জমিনে মুগ্ধতা যেমন সরল কৃষকের|
নদীর উপচে পড়া কণ্ঠ তোমার তিমিরে আলো
হয়ে এসেছে রঙধনু মেঘের মতো—আসোনি তুমি;
আলোর যে গান হয়ে এলে তুমি আজ মাটির প্রদীপ
তোমাকে জানাই অভিবাদন জবাফুল হৃদয়ে আমার|
একই মাটিতে আমাদের শ্বাস প্রশ্বাস মরমি আকুতি
একতারা হাসিমুখ তোমার— প্রাণের গহিন প্রণতি|
অদ্ভুত আঁধার
আমার জননী কাঁদছে— আটাশ কোটি পায়ের শব্দ কাঁদছে
আজন্ম সবুজ চেতনায় উজ্জীবিত সেইসব শাণিত মানুষেরা কোথায়
সমুদ্র গভীরের মতো বোধের পাখিদের সাহসী কণ্ঠ কোথায়
শ্মশান আগুনে পুড়ে একাকী দাঁড়িয়ে আছি এখনো গভীর প্রতীক্ষায়
আমার জননী কাঁদছে— আমার আঙিনা অলিগলি আলপথ কাঁদছে
ভালোবাসার পাখিরা ইটপাথরে যেখানে সেখানে লুকোচ্ছে যে যার মতোন
বাঁচামরা নিয়ে টেনশনে কপালে অযুত রেখা যন্ত্রণার বিষদাঁতে বিদ্ধ সময়
বিবর্ণ মানুষ— জীবন্ত লাশ যেন— লাশের শরীরে শকুনের উৎসব
আমার জননী কাঁদছে— আমার শৈশব কৈশোর আঁতুড়ে গন্ধ কাঁদছে
খেলার রঙিন মাঠ, গৌরিতীর, নৌকোর পাহাড়ি ছই, সন্ধ্যার মায়াবী আকাশ কাঁদছে
ভয়ার্ত আতঙ্কে জড়োকুড়ো হয়ে নানান রঙের সোনালি দিন কাঁদছে
বুকের গভীরে তুষের আগুন— এ কেমন বেঁচে থাকা— এ কেমন জীবনযাপন
আমার জননী কাঁদছে— ক্ষয়িতা খুঁটির ভঙ্গুর শরীর কাঁদছে
সোনালি জমিনে লিকলিকে বিষাক্ত সাপের মতো কারা এসে কিলবিল করে
কারা এসে লুট করে যখন তখন শুচিতা শরীর— সিঁথির সিঁদুর নিখাদ জার্মন
আমি বেদনায় চোখ বুজে কেবলি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকি
আমার জননী কাঁদছে দুঃসহ যন্ত্রণায়
আজন্ম সবুজ চেতনায় উজ্জীবিত সেইসব শাণিত মানুষেরা কোথায়
সেইসব সাহসী কণ্ঠ কোথায়
ঝড়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি
ঝড়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি ভেঙেচুরে ভাঙাবুক দূর পাখি
ভালো লাগে না কিছুই—কী চাই কী বুঝি—বুঝি না কিছুই;
চোখের গভীর ঘোলা হয়ে আসে—কত দূর যেতে হবে
পথের হিসাব ভুলে গেছি—প্রচণ্ড ঝড়ের ভেতর উড়ছি|
কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না নিজেকে—কোথায় আমার আমি
কীসের আঁধার ঢেকে দিচ্ছে আমাকে যে, আমার শরীরে
কোত্থেকে যে এত মাটি এসে ঢেকে দিচ্ছে—স্বপ্নগুলো
মাটিচাপা হয়ে অতল আঁধারে ডুবে যাচ্ছে নীরবে নিভৃতে|
এও কি আপন আত্মহত্যা নিজের ভেতর—কষ্টের রশিতে
ঝুলে থাকি; কিছুই তো পাই না খুঁজে কীভাবে যে স্বপ্নহন্তা
কালো বিষ বসবাস নিয়েছে নিশ্বাসে—ঝড়ের ভেতর
ভেঙে যাচ্ছে সব—খুঁজে পাচ্ছি না আমাকে অতল আঁধার|
সরল কৃষকের স্বপ্নবীজ
তোমাকে কীভাবে বলি দারুণ একটা তৃষ্ণা
মেঘের পালকে এসে নেমেছে ভোরের রোদে;
বৈশাখে পুড়েছে মন মনের নদীতে সখি তুমি
বুকের কুসুমে ঘ্রাণ নিয়ে একা জাগো নিশিভূমি|
আমি তো চেয়েছি রাধা পরাণে গড়াই নদী
চরণে তোমার এক দূরের দোয়েল চুমুর নূপুর
পরায় আগুন বুকে| পলিমাটি যৌবনা শরীরে
সরল কৃষক বোনে সাধন সংগীতে স্বপ্নবীজ|
তোমাকে কীভাবে বলি রাতের পালকে নেমে
তৃষ্ণারা—ছাদের কোণে সন্ধ্যাভাঙা পুষ্পঘ্রাণে;
অবাধ্য বৈশাখী বৃষ্টি তুমি| ব্যাকুল পিপাসা পায়
নবযৌবন রাধিকা বুকে সুখনদী গোপন যমুনা|
মাজিভাই
ক তো মাজি ভাই, ক তো ক্যাম্বা—কোথায় আছিস
কতদিন কুনো কথা হয় না তেমন
পোটনিতে তোর সাথে রাতবিরাত কবিতা নিয়ে
কথাও হয় না আর— তখন যে চালশূন্য ভাতের হাঁড়িটা|
কবিতারা একদিন ক্যাম্বা জীবনের খরস্রোতা নদী
হয়ে বয়ে বয়ে যেতো নগর-বন্দর!
মাজি ভাই,
কচুরিফুল তুলতে পাল্লা দিয়ে সাঁতারের খেলা
পুকুরের পচা পানি—কী সুন্দর ফুল
কবিতার শরীরের মতো জড়িয়ে জড়িয়ে
যেতো রাতের জোস্নায়
আহা! যেন লাউডগা অষ্টাদশী কোনো রূপবতী!
রবিঠাকুরের শ্যামা নায়িকার গল্প
করতে করতে তোর সাথে কতদিন
হাঁটি না শিলিদা|
মাজিভাই, তোর কথা খুব মনে হয়
কুশোরের রসে টিনভর্তি রাতজাগা ঘুমচোখ
সেই রসে ঢেউ খেলতো আগুন—
আহা! গুড় জন্মানোর টগবগে আগুনের ঢেউ!
শামুক খেলায় মেতে ওঠা
বিস্তীর্ণ মাঠের পর মাঠ
সদরপুরের বিলে কতদিন যে সাপ গলায় জড়িয়েছি
মনে আছে তোর ওই সব?
এখন ক্যাম্বা আছিস তুই—মাজি ভাই?
মাজিভাই, তোর ভাঙা চেয়ার টেবিল
মা’র গা’র গন্ধমাখা খাট
ওসব কোথায় মিশে গেছে
তোর গলায় জড়ানো তেলচিটচিটে গামছাটা
খুব মনে আছে মাজি ভাই,
তুই কী যে যত্ন করে ছোট ভাইবোনদের রোদে ঘামানো গা
মুছে দিতি-তারপর কোলের ভেতর
নিয়ে কাঁচা তুলতুলে ফুলের মতোন...
বাতাসে ওসব গন্ধ এখন কি তোকে খোঁজে মাজি ভাই?
মাজি ভাই, তুই আজ শূন্যে বসে কী সুন্দর হেসে
হাঁটিস পথের পরে পথ—নিজের ভেতর নিজেকে লুকিয়ে
কী সুন্দর তুই সুখী একতারা হয়ে ভেসে যাস
নদীপথ আলপথ কত পথ ঘুরে ঘুরে আপন মনের সুরে,
তুই একদিন আমাকে কবি তো মাজি ভাই
শিশিরভেজা দুবলাঘাস
কেমন আপন করে ভালোবেসে পা জড়িয়ে ধরে ভোরের আলোয়
কেমন দরদ করে আঁচলভরা আকুতি করে বুকে ধরে রাখে প্রেম!
তুই কি এখনো কষ্ট পাস পাখির ছানার মৃত্যু দেখে!
এখনো কি তুই কাঁদিস নিশুতি মধ্যরাতে
এখনো কি তোর চোখে ভাসে অপমানে বাবার রোদন
এখনো কি তোর চোখে ভাসে অপমানে মায়ের রোদন
এখনো কি তোর চোখে ভাসে অপমানে পিতামহের রোদন!
আহারে সেই যে বাতাস এখনো কী ভীষণ আতর্নাদে ভেঙে পড়ে
নদীর বিশাল পাড় ভাঙার বিকট শব্দে তোর বুকে বাজে!
মাজি ভাই কোনো কথা কয় না—কিছুই তো কয় না,
মাজি ভাইয়ের চোখে কোনো আলো থাকে না—শুধুই আঁধার
মাজি ভাইয়ের বুকে কোনো ব্যথা থাকে না—অবস সমুদ্র,
মৃত মানুষ এবং মাজি ভায়ের ভেতর কোনো পার্থক্য থাকে না|
বাতাসে ব্যাকুল একতারা কেঁদে যায়
একতারা সুর এখন নিজেও মরে মরে ভেসে যায়
মাজিভাই ভেসে যায়
ভেসে যায়
ভেসে যায়
অথই নদীর বুকভাঙা জীবনঢেউয়ে কূল-কিনারা ঠিকানাহীন|
সম্রাজ্ঞী, তোমার প্রেমে পড়েছিল
পুরনো নগর ভরা এখনো আলোতে
অভিনব,
তোমাকে রেখেছে মনে সুন্দর নগর!
জানি এ নগর তুমি দেখোনি কখনো!
কী অসীম শক্তি রাখো এখনো সম্রাজ্ঞী
শ্যামবর্ণের রমণী, অথচ কী ভীষণ আশ্চর্য!
সেই কবেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে সম্রাট-সাম্রাজ্য!
তোমাকে বাঁচাতে আর পারেনি শাণিত
তলোয়ার পৃথিবীর চোখ ঝলাসানো প্রাসাদ-সম্পদ
তবুও এখনো তুমি ভীষণ রূপশ্রী!
কারণ, তোমার প্রেমে পড়েছিল মাটিবুক
খাঁটি এক কবি!
প্রশ্ন
তোমার দুচোখ ক্লান্ত ভারী, চুলও এলোমেলো
হাওয়ায় হাওয়ায় উড়ে উড়ে মেঘের দেশে গেলো
ঘুমাওনি কি কাল সারারাত চোখের কোণে কালি
অনাদরে কাটছে সময়? দেয়ালজোড়া বালি?
নদীর গল্প
বাঘা যতীনের দাপিয়ে বেড়ানো নদীটা এখন নেই
নেই সেই সেই পানসি নৌকা, সাম্পান সারি নেই
যৌবনে ঢেউ তোলা সেই স্রোত সেই সুর বাঁশি নেই
বিবর্ণ দিন রাত পড়ে আছে আঁধারে হারিয়ে খেই—
কয়া বাজারের শুকনো ঘাটের পেছনে দাঁড়ানো সেই
দেবতীকে বলি, ‘তুমি নদী হও’, সে বলে, ‘সাহস নেই’
আবারও বলি, ‘তুমি হও ঢেউ— দুকূল উপচেপড়া
যৌবনভরা দেহ থাক আজ দুই পাড়ে ভাঙাগড়া’|
বিরান জমিনে ফলেনি ফসল কত দিন কেটে গেলো
¯^প্ন দেখতে ভয় পাওয়া চাষি ছুটে যায় এলোমেলো
শ্মশানের মতো পড়ে আছে মাঠ চৌচির পিপাসায়
এখানে এখন তৃষ্ণাকাতর পাখিরাই কাতরায়|
দেবতীকে বলি, ‘তুমি হও নদী, হও খরস্রোতা নদী
দুকূল ভাসানো জলের দাপটে বয়ে যাওয়া নিরবধি’
দেবতী তাকায় আকাশের দিকে শূন্যদৃষ্টি মেলে;
তারপর মিশে যায় দিগন্তে আমাকে পেছনে ফেলে|
অপণা হরিণীপ্রেম
অপণা হরিণীপ্রেম জেগে থাকে
খোলাচুলে মেঘলা দুচোখে;
চেয়ে আছে দূরের পথিকে
নদীও নতুন বাঁকে ভাঙে|
তোমার চোখের আলোয়-আলোয়
কাদামাটির সরল সবুজ প্রেমেতে;
আলো আসে প্রান্তরের রেখা ছুঁয়ে-ছুঁয়ে
নদীরা ব্যাকুল প্রাণ নিজেরে সঁপিতে|
তোমার হাতের পুষ্পিত আঙুলে
কবিতারা ফিরে আসে তবু বারবার;
ডেকে যায় প্রিয়তমা নতুন জীবনে
পেতে চায় এই কালে নতুন শরীর|
নদী ও সূর্যের ঢেউখেলানো সন্ধ্যায়
এক আশ্চর্য রমণী জানি আফ্রোদিতি;
অপলক চেয়ে থাকে মগ্নতায়
দূরপাখি উড়ে যায় দূর নিলীমায় |
পিকাসো আমার দুঃখ আঁকে
এখন কোনো অপমানেই হয় না খারাপ মন
বারেক হাজার প্রত্যাখ্যানও তোলে না কম্পন
তাঁতের শাড়ি মাটিরঙা আঁচলপাতা নারী
হৃদয় ভাঙার শব্দ তুলে দিক না যতই আড়ি...
আমার তাতে যায় না কিছুই, আমার পাথর মন|
শরমলাগা পাপড়ি ছিঁড়ে কাহ্নপাও লেখে
আমার মতোই পদ্য কিছু আমার দুঃখ দেখে
তাই তো এখন কিছুতেই আর হয় না খারাপ মন
সময় আমার হাতের মুঠোয়, ঘণ্টা-মিনিট-ক্ষণ|
তাই পিকাসোর কাটছে সময় আমার দুঃখ এঁকে|
বিমান-ডানায়
কক্সবাজার বাতাসে তার হলো না আর ওড়া
প্রজাপতি মেয়ের পাখায় বসলো না আর রোদ
নিভে গেলো ভেজামেঘে রঙধনু চোখ তার
বৈশাখী ঝড় নিয়েছিল মধুর প্রতিশোধ?
কেনো তবে এভাবের জীবন-জীবন খেলা!
সাগরতীরের নিশ্বাসে হিম পেলো না তার ছোঁয়া
বুক ভরে তাই শ্বাস পেলো না, মর ভরা সুর-গান
বিমান-ডানায় উড়ছে শুধু পরকীয়ার ধোঁয়া!
বেদনার নীল মেঘ
আকাশের নীল মেঘ আমায় যে ডাকে
নদীর রুপালি ঢেউ আমায় যে ডাকে
কে যেন মায়ায় তারা আমায় যে বাঁধে
কে যেন আমার বুকে তার ছবি আঁকে|
নিশিথের কবিতারা গান হয়ে ভাসে
গোলাপের ঘ্রাণ তাই ভেসে ভেসে আসে
পথেরা যে বারবার কেন তারে চায়
সে কি জানে না তারে কেউ ভালোবাসে?
আকাশের নীলমেঘ আমায় যে ডাকে
আমার বুক ভরে কে তার ছবি আঁকে
আমি তো চিনি না তারে জানিও না তারে
জীবন যে কেন বাঁক খায় বাঁকে বাঁকে|
তুমি কি ভাবোনি রাত বিহনে আমাকে
আমি কেন তবে জাগি তোমাকেই ভেবে
কত দুপুর রাত্রির বিরহের ছবি এঁকে
বেদনার নীল মেঘ যায় ডেকে ডেকে!
তোমার কণ্ঠে
কুসুম দুপুরে তোমার কণ্ঠ বাজে
বেজে ওঠে ওই দূরের জানালা পথে
বুকের ভেতর ভিষণ আর্তনাদ,
দুমড়ে মুচড়ে ভেসে যায় ভেসে যায়
বাতাসে বাতাসে করুণ শরীর নাচে|
কোকিল-দোয়েল তোমার কণ্ঠে গায়
কে যেন সেদিন ডুবে ছিল বেদনায়
দু’চোখের পানি নিয়েছিল শুষে শুষে
ঠোঁটের রোয়ায়, চৈত্রের পিপাসায়|
যার কম্পিত বুকে মুখ ঢেকে রেখে
দূরের দোয়েল ভেজা ডানা ঝাপটায়
সেও ভালোবেসে রমণী তোমাকে খোঁজে,
শরীরের ঘ্রাণে খোঁজে ভোরে সন্ধ্যায়|
***
রকিবুল হাসান গত শতকের নব্বইয়ের দশকের বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। বর্তমানে প্রাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬
একটি গান লিখেছিলাম
লিখেছিলাম একটি সে গান দুপুর ভাঙা রোদে
আলোতে সে গান হলো না তো একটু আলোকিত
নদীতে গান খেলো না ঢেউ, ভাসলো না তো জলে
পুষ্পে সে গান হয়নি কারও খোঁপায় শোভিত
লিখেছিলাম একটি সে গান, রঙধনু মেঘ বুকে
বৃষ্টিতে সে গান সলাজ স্নানের গল্প হলো না
সবুজবেণী ডাগর চোখের কাব্য হলো না
পাখিদের ওই উৎসবে গান গাওয়াও হলো না
লিখেছিলাম একটি সে গান, একটি দেশের মায়া
হাওরবাওড় দিঘিজলে কাঁপলো দৃষ্টি তার
মাঠে পারে প্রেমিক পুরুষ বুক চেতিয়ে ডাকে
কোথাও সে গান, সুর হলো না, শুধুই হাহাকার!
একদিন স্বাধীন হবে ফিলিস্তিন
আমার জন্ম কোথায়—পৃথিবী কোথায়—কতদূর!
পৃথিবীর মানুষেরা দেখতে কেমন
আদৌ কি মানুষ আছে এই পৃথিবীতে
আমি-তুমি ফিলিস্তিনি—আমাকে-তোমাকে
দিনরাত হত্যা করা হচ্ছে—
খণ্ডবিখণ্ড করছে
বুক জুড়ে অগ্নিকুণ্ড—পোড়া গন্ধ-বিভীষিকাময়
মানুষের কি হাত থাকে? শরীর-পা থাকে? বুক থাকে?
ক্ষুধা ও যন্ত্রণা থাকে? মৃত্যু ও আর্তনাদ থাকে?
আমি ফিলিস্তিনি—কোন গ্রহে জন্ম আমাদের
ফিলিস্তিন ও পৃথিবী অনেক দূরের কোনো গ্রহ?
আমরা হয়তো আর খাবারের জন্য দাঁড়াবো না—
পানির জন্যও নয়|
রক্তাক্ত চোখের জলে তাকাবো না করুণ আর্তিতে!
তবুুও শেষ হবে না— ফিলিস্তিন|
নতুন রক্তের লালে লাল হবে ফিলিস্তিন
পৃথিবী, তোমার বুকে একদিন স্বাধীনতা পাবে
রক্তলাল ফিলিস্তিন|
তখন দেখবে
আমরা এক গ্রহের—মানুষ ছিলাম
শুধু আর আমাদের সন্তানেরা ফিরবে না ঘরে|
গহিন প্রণতি
কতটা দূরের পথ দূরে রেখে এসেছ আমার
শহরে চোখের তৃষ্ণা নিয়ে গৌরী মনের দেউলে;
শান্তির উপমা লিখে—এই তো প্রথম দেখাদেখি
সবুজের জমিনে মুগ্ধতা যেমন সরল কৃষকের|
নদীর উপচে পড়া কণ্ঠ তোমার তিমিরে আলো
হয়ে এসেছে রঙধনু মেঘের মতো—আসোনি তুমি;
আলোর যে গান হয়ে এলে তুমি আজ মাটির প্রদীপ
তোমাকে জানাই অভিবাদন জবাফুল হৃদয়ে আমার|
একই মাটিতে আমাদের শ্বাস প্রশ্বাস মরমি আকুতি
একতারা হাসিমুখ তোমার— প্রাণের গহিন প্রণতি|
অদ্ভুত আঁধার
আমার জননী কাঁদছে— আটাশ কোটি পায়ের শব্দ কাঁদছে
আজন্ম সবুজ চেতনায় উজ্জীবিত সেইসব শাণিত মানুষেরা কোথায়
সমুদ্র গভীরের মতো বোধের পাখিদের সাহসী কণ্ঠ কোথায়
শ্মশান আগুনে পুড়ে একাকী দাঁড়িয়ে আছি এখনো গভীর প্রতীক্ষায়
আমার জননী কাঁদছে— আমার আঙিনা অলিগলি আলপথ কাঁদছে
ভালোবাসার পাখিরা ইটপাথরে যেখানে সেখানে লুকোচ্ছে যে যার মতোন
বাঁচামরা নিয়ে টেনশনে কপালে অযুত রেখা যন্ত্রণার বিষদাঁতে বিদ্ধ সময়
বিবর্ণ মানুষ— জীবন্ত লাশ যেন— লাশের শরীরে শকুনের উৎসব
আমার জননী কাঁদছে— আমার শৈশব কৈশোর আঁতুড়ে গন্ধ কাঁদছে
খেলার রঙিন মাঠ, গৌরিতীর, নৌকোর পাহাড়ি ছই, সন্ধ্যার মায়াবী আকাশ কাঁদছে
ভয়ার্ত আতঙ্কে জড়োকুড়ো হয়ে নানান রঙের সোনালি দিন কাঁদছে
বুকের গভীরে তুষের আগুন— এ কেমন বেঁচে থাকা— এ কেমন জীবনযাপন
আমার জননী কাঁদছে— ক্ষয়িতা খুঁটির ভঙ্গুর শরীর কাঁদছে
সোনালি জমিনে লিকলিকে বিষাক্ত সাপের মতো কারা এসে কিলবিল করে
কারা এসে লুট করে যখন তখন শুচিতা শরীর— সিঁথির সিঁদুর নিখাদ জার্মন
আমি বেদনায় চোখ বুজে কেবলি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকি
আমার জননী কাঁদছে দুঃসহ যন্ত্রণায়
আজন্ম সবুজ চেতনায় উজ্জীবিত সেইসব শাণিত মানুষেরা কোথায়
সেইসব সাহসী কণ্ঠ কোথায়
ঝড়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি
ঝড়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি ভেঙেচুরে ভাঙাবুক দূর পাখি
ভালো লাগে না কিছুই—কী চাই কী বুঝি—বুঝি না কিছুই;
চোখের গভীর ঘোলা হয়ে আসে—কত দূর যেতে হবে
পথের হিসাব ভুলে গেছি—প্রচণ্ড ঝড়ের ভেতর উড়ছি|
কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না নিজেকে—কোথায় আমার আমি
কীসের আঁধার ঢেকে দিচ্ছে আমাকে যে, আমার শরীরে
কোত্থেকে যে এত মাটি এসে ঢেকে দিচ্ছে—স্বপ্নগুলো
মাটিচাপা হয়ে অতল আঁধারে ডুবে যাচ্ছে নীরবে নিভৃতে|
এও কি আপন আত্মহত্যা নিজের ভেতর—কষ্টের রশিতে
ঝুলে থাকি; কিছুই তো পাই না খুঁজে কীভাবে যে স্বপ্নহন্তা
কালো বিষ বসবাস নিয়েছে নিশ্বাসে—ঝড়ের ভেতর
ভেঙে যাচ্ছে সব—খুঁজে পাচ্ছি না আমাকে অতল আঁধার|
সরল কৃষকের স্বপ্নবীজ
তোমাকে কীভাবে বলি দারুণ একটা তৃষ্ণা
মেঘের পালকে এসে নেমেছে ভোরের রোদে;
বৈশাখে পুড়েছে মন মনের নদীতে সখি তুমি
বুকের কুসুমে ঘ্রাণ নিয়ে একা জাগো নিশিভূমি|
আমি তো চেয়েছি রাধা পরাণে গড়াই নদী
চরণে তোমার এক দূরের দোয়েল চুমুর নূপুর
পরায় আগুন বুকে| পলিমাটি যৌবনা শরীরে
সরল কৃষক বোনে সাধন সংগীতে স্বপ্নবীজ|
তোমাকে কীভাবে বলি রাতের পালকে নেমে
তৃষ্ণারা—ছাদের কোণে সন্ধ্যাভাঙা পুষ্পঘ্রাণে;
অবাধ্য বৈশাখী বৃষ্টি তুমি| ব্যাকুল পিপাসা পায়
নবযৌবন রাধিকা বুকে সুখনদী গোপন যমুনা|
মাজিভাই
ক তো মাজি ভাই, ক তো ক্যাম্বা—কোথায় আছিস
কতদিন কুনো কথা হয় না তেমন
পোটনিতে তোর সাথে রাতবিরাত কবিতা নিয়ে
কথাও হয় না আর— তখন যে চালশূন্য ভাতের হাঁড়িটা|
কবিতারা একদিন ক্যাম্বা জীবনের খরস্রোতা নদী
হয়ে বয়ে বয়ে যেতো নগর-বন্দর!
মাজি ভাই,
কচুরিফুল তুলতে পাল্লা দিয়ে সাঁতারের খেলা
পুকুরের পচা পানি—কী সুন্দর ফুল
কবিতার শরীরের মতো জড়িয়ে জড়িয়ে
যেতো রাতের জোস্নায়
আহা! যেন লাউডগা অষ্টাদশী কোনো রূপবতী!
রবিঠাকুরের শ্যামা নায়িকার গল্প
করতে করতে তোর সাথে কতদিন
হাঁটি না শিলিদা|
মাজিভাই, তোর কথা খুব মনে হয়
কুশোরের রসে টিনভর্তি রাতজাগা ঘুমচোখ
সেই রসে ঢেউ খেলতো আগুন—
আহা! গুড় জন্মানোর টগবগে আগুনের ঢেউ!
শামুক খেলায় মেতে ওঠা
বিস্তীর্ণ মাঠের পর মাঠ
সদরপুরের বিলে কতদিন যে সাপ গলায় জড়িয়েছি
মনে আছে তোর ওই সব?
এখন ক্যাম্বা আছিস তুই—মাজি ভাই?
মাজিভাই, তোর ভাঙা চেয়ার টেবিল
মা’র গা’র গন্ধমাখা খাট
ওসব কোথায় মিশে গেছে
তোর গলায় জড়ানো তেলচিটচিটে গামছাটা
খুব মনে আছে মাজি ভাই,
তুই কী যে যত্ন করে ছোট ভাইবোনদের রোদে ঘামানো গা
মুছে দিতি-তারপর কোলের ভেতর
নিয়ে কাঁচা তুলতুলে ফুলের মতোন...
বাতাসে ওসব গন্ধ এখন কি তোকে খোঁজে মাজি ভাই?
মাজি ভাই, তুই আজ শূন্যে বসে কী সুন্দর হেসে
হাঁটিস পথের পরে পথ—নিজের ভেতর নিজেকে লুকিয়ে
কী সুন্দর তুই সুখী একতারা হয়ে ভেসে যাস
নদীপথ আলপথ কত পথ ঘুরে ঘুরে আপন মনের সুরে,
তুই একদিন আমাকে কবি তো মাজি ভাই
শিশিরভেজা দুবলাঘাস
কেমন আপন করে ভালোবেসে পা জড়িয়ে ধরে ভোরের আলোয়
কেমন দরদ করে আঁচলভরা আকুতি করে বুকে ধরে রাখে প্রেম!
তুই কি এখনো কষ্ট পাস পাখির ছানার মৃত্যু দেখে!
এখনো কি তুই কাঁদিস নিশুতি মধ্যরাতে
এখনো কি তোর চোখে ভাসে অপমানে বাবার রোদন
এখনো কি তোর চোখে ভাসে অপমানে মায়ের রোদন
এখনো কি তোর চোখে ভাসে অপমানে পিতামহের রোদন!
আহারে সেই যে বাতাস এখনো কী ভীষণ আতর্নাদে ভেঙে পড়ে
নদীর বিশাল পাড় ভাঙার বিকট শব্দে তোর বুকে বাজে!
মাজি ভাই কোনো কথা কয় না—কিছুই তো কয় না,
মাজি ভাইয়ের চোখে কোনো আলো থাকে না—শুধুই আঁধার
মাজি ভাইয়ের বুকে কোনো ব্যথা থাকে না—অবস সমুদ্র,
মৃত মানুষ এবং মাজি ভায়ের ভেতর কোনো পার্থক্য থাকে না|
বাতাসে ব্যাকুল একতারা কেঁদে যায়
একতারা সুর এখন নিজেও মরে মরে ভেসে যায়
মাজিভাই ভেসে যায়
ভেসে যায়
ভেসে যায়
অথই নদীর বুকভাঙা জীবনঢেউয়ে কূল-কিনারা ঠিকানাহীন|
সম্রাজ্ঞী, তোমার প্রেমে পড়েছিল
পুরনো নগর ভরা এখনো আলোতে
অভিনব,
তোমাকে রেখেছে মনে সুন্দর নগর!
জানি এ নগর তুমি দেখোনি কখনো!
কী অসীম শক্তি রাখো এখনো সম্রাজ্ঞী
শ্যামবর্ণের রমণী, অথচ কী ভীষণ আশ্চর্য!
সেই কবেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে সম্রাট-সাম্রাজ্য!
তোমাকে বাঁচাতে আর পারেনি শাণিত
তলোয়ার পৃথিবীর চোখ ঝলাসানো প্রাসাদ-সম্পদ
তবুও এখনো তুমি ভীষণ রূপশ্রী!
কারণ, তোমার প্রেমে পড়েছিল মাটিবুক
খাঁটি এক কবি!
প্রশ্ন
তোমার দুচোখ ক্লান্ত ভারী, চুলও এলোমেলো
হাওয়ায় হাওয়ায় উড়ে উড়ে মেঘের দেশে গেলো
ঘুমাওনি কি কাল সারারাত চোখের কোণে কালি
অনাদরে কাটছে সময়? দেয়ালজোড়া বালি?
নদীর গল্প
বাঘা যতীনের দাপিয়ে বেড়ানো নদীটা এখন নেই
নেই সেই সেই পানসি নৌকা, সাম্পান সারি নেই
যৌবনে ঢেউ তোলা সেই স্রোত সেই সুর বাঁশি নেই
বিবর্ণ দিন রাত পড়ে আছে আঁধারে হারিয়ে খেই—
কয়া বাজারের শুকনো ঘাটের পেছনে দাঁড়ানো সেই
দেবতীকে বলি, ‘তুমি নদী হও’, সে বলে, ‘সাহস নেই’
আবারও বলি, ‘তুমি হও ঢেউ— দুকূল উপচেপড়া
যৌবনভরা দেহ থাক আজ দুই পাড়ে ভাঙাগড়া’|
বিরান জমিনে ফলেনি ফসল কত দিন কেটে গেলো
¯^প্ন দেখতে ভয় পাওয়া চাষি ছুটে যায় এলোমেলো
শ্মশানের মতো পড়ে আছে মাঠ চৌচির পিপাসায়
এখানে এখন তৃষ্ণাকাতর পাখিরাই কাতরায়|
দেবতীকে বলি, ‘তুমি হও নদী, হও খরস্রোতা নদী
দুকূল ভাসানো জলের দাপটে বয়ে যাওয়া নিরবধি’
দেবতী তাকায় আকাশের দিকে শূন্যদৃষ্টি মেলে;
তারপর মিশে যায় দিগন্তে আমাকে পেছনে ফেলে|
অপণা হরিণীপ্রেম
অপণা হরিণীপ্রেম জেগে থাকে
খোলাচুলে মেঘলা দুচোখে;
চেয়ে আছে দূরের পথিকে
নদীও নতুন বাঁকে ভাঙে|
তোমার চোখের আলোয়-আলোয়
কাদামাটির সরল সবুজ প্রেমেতে;
আলো আসে প্রান্তরের রেখা ছুঁয়ে-ছুঁয়ে
নদীরা ব্যাকুল প্রাণ নিজেরে সঁপিতে|
তোমার হাতের পুষ্পিত আঙুলে
কবিতারা ফিরে আসে তবু বারবার;
ডেকে যায় প্রিয়তমা নতুন জীবনে
পেতে চায় এই কালে নতুন শরীর|
নদী ও সূর্যের ঢেউখেলানো সন্ধ্যায়
এক আশ্চর্য রমণী জানি আফ্রোদিতি;
অপলক চেয়ে থাকে মগ্নতায়
দূরপাখি উড়ে যায় দূর নিলীমায় |
পিকাসো আমার দুঃখ আঁকে
এখন কোনো অপমানেই হয় না খারাপ মন
বারেক হাজার প্রত্যাখ্যানও তোলে না কম্পন
তাঁতের শাড়ি মাটিরঙা আঁচলপাতা নারী
হৃদয় ভাঙার শব্দ তুলে দিক না যতই আড়ি...
আমার তাতে যায় না কিছুই, আমার পাথর মন|
শরমলাগা পাপড়ি ছিঁড়ে কাহ্নপাও লেখে
আমার মতোই পদ্য কিছু আমার দুঃখ দেখে
তাই তো এখন কিছুতেই আর হয় না খারাপ মন
সময় আমার হাতের মুঠোয়, ঘণ্টা-মিনিট-ক্ষণ|
তাই পিকাসোর কাটছে সময় আমার দুঃখ এঁকে|
বিমান-ডানায়
কক্সবাজার বাতাসে তার হলো না আর ওড়া
প্রজাপতি মেয়ের পাখায় বসলো না আর রোদ
নিভে গেলো ভেজামেঘে রঙধনু চোখ তার
বৈশাখী ঝড় নিয়েছিল মধুর প্রতিশোধ?
কেনো তবে এভাবের জীবন-জীবন খেলা!
সাগরতীরের নিশ্বাসে হিম পেলো না তার ছোঁয়া
বুক ভরে তাই শ্বাস পেলো না, মর ভরা সুর-গান
বিমান-ডানায় উড়ছে শুধু পরকীয়ার ধোঁয়া!
বেদনার নীল মেঘ
আকাশের নীল মেঘ আমায় যে ডাকে
নদীর রুপালি ঢেউ আমায় যে ডাকে
কে যেন মায়ায় তারা আমায় যে বাঁধে
কে যেন আমার বুকে তার ছবি আঁকে|
নিশিথের কবিতারা গান হয়ে ভাসে
গোলাপের ঘ্রাণ তাই ভেসে ভেসে আসে
পথেরা যে বারবার কেন তারে চায়
সে কি জানে না তারে কেউ ভালোবাসে?
আকাশের নীলমেঘ আমায় যে ডাকে
আমার বুক ভরে কে তার ছবি আঁকে
আমি তো চিনি না তারে জানিও না তারে
জীবন যে কেন বাঁক খায় বাঁকে বাঁকে|
তুমি কি ভাবোনি রাত বিহনে আমাকে
আমি কেন তবে জাগি তোমাকেই ভেবে
কত দুপুর রাত্রির বিরহের ছবি এঁকে
বেদনার নীল মেঘ যায় ডেকে ডেকে!
তোমার কণ্ঠে
কুসুম দুপুরে তোমার কণ্ঠ বাজে
বেজে ওঠে ওই দূরের জানালা পথে
বুকের ভেতর ভিষণ আর্তনাদ,
দুমড়ে মুচড়ে ভেসে যায় ভেসে যায়
বাতাসে বাতাসে করুণ শরীর নাচে|
কোকিল-দোয়েল তোমার কণ্ঠে গায়
কে যেন সেদিন ডুবে ছিল বেদনায়
দু’চোখের পানি নিয়েছিল শুষে শুষে
ঠোঁটের রোয়ায়, চৈত্রের পিপাসায়|
যার কম্পিত বুকে মুখ ঢেকে রেখে
দূরের দোয়েল ভেজা ডানা ঝাপটায়
সেও ভালোবেসে রমণী তোমাকে খোঁজে,
শরীরের ঘ্রাণে খোঁজে ভোরে সন্ধ্যায়|
***
রকিবুল হাসান গত শতকের নব্বইয়ের দশকের বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। বর্তমানে প্রাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আপনার মতামত লিখুন