সংবাদ

এলপি গ্যাস: দুর্ঘটনার ‘প্রধান কারণ’ অসচেতনতা


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ১০:৫৫ পিএম

এলপি গ্যাস: দুর্ঘটনার ‘প্রধান কারণ’ অসচেতনতা

  • সচেতনা বাড়িয়ে দুর্ঘটনা ‘৮৫% কমিয়ে আনা সম্ভব’
  • এলপিজি খাতের নিরাপত্তা দেখভালের দায়িত্বে মাত্র ১১ জন: বিস্ফোরক অধিদপ্তর
  • হোস পাইপ ও রেগুলেটর থেকে বেশি দুর্ঘটনা হয়: ফায়ার সার্ভিস
  • নিয়ন্ত্রণহীন বাজার, জরাজীর্ণ সিলিন্ডার
  • অটোগ্যাস স্টেশনকে রিফিলিংয়ের ‘সুযোগ দেওয়ার’ বিপক্ষে লোয়াব

রান্নায় বহুল ব্যবহৃত এলপি গ্যাস থেকেঅগ্নিকা- বিস্ফোরণেহতাহতের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবেগ্যাস লিকেজ, মানহীন সিলিন্ডার এবং অসচেতনতারকথা উঠে আসছে। তবে অসচেতনতাই এলপি গ্যাসবিস্ফোরণ বা দুর্ঘটনারপ্রধান কারণ বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

খাতের বিশেষজ্ঞদের দাবি, সচেনতা বৃদ্ধির মধ্যমে এলপিজি দুর্ঘটনা ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। তারা বলেছেন, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি বা এলপি গ্যাস) খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ আইন প্রণয়ন অতি জরুরি। তবে তার বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে।

রবিবার (১৭ মে) ঢাকার রমনায় বিইআরসি সম্মেলন কক্ষেবাংলাদেশের এলপিজি খাত ক্রমবর্ধতান নিরাপত্তা ঝুঁকি রেগুলেটরি চ্যালেঞ্জের মুখেশীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা উপরের মতামত তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), এলপিজি অপারেটর এসোসিয়েশন বাংলাদেশ (লোয়াব) এবং এনার্জি এন্ড পাওয়ার যৌথভাবে এই গোলটেবিল বৈঠকে আয়েজন করে।

মূল প্রবন্ধে বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর . ইয়াসির আরাফাত খান সম্প্রতি এলপিজি অটোগ্যাস দুর্ঘটনার কিছু উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, “সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এলপিজি খাতের দুর্ঘটনা ৮০-৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে প্রতিটি দুর্ঘটনার সঠিক কারণ অনুসন্ধান করে আগামীতে এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

মূল প্রবন্ধে অংশীজনদের করণীয় হিসেবে ১৭টি সুপারিশ তুলে ধরে ইয়াসির আরাফাত খান বলেন, “এগুলো থেকে বেরিয়ে আসার জন্য দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। নিরাপত্তা বিধিমালা সুনির্দিষ্ট করে তা কার্যকর করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক (পরিকল্পনা) ইকবাল বাহার বুলবুল বলেন, “তৈরি পোশাক খাতে নিরাপত্তা বিধিমালা অনুসরণ করার কারণে এখানে দুর্ঘটনা অনেক কমে এসেছে। অন্যদিকে আবাসিক খাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে যারা এলপিজি ব্যবহার করেন, তারা এর নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে সচেতন নন। তাই দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য তাদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে হোস পাইপ রেগুলেটর থেকে বেশি দুর্ঘটনা হয়। ফলে এগুলোর মান নিশ্চিত করতে হবে।

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক মোহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান বলেন, “এলপিজি খাতের নিরাপত্তা বিধি অনুসরণ করার বিষয়টি দেখভাল করার দায়িত্ব বিস্ফোরক অধিদপ্তরের। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের জনবল মাত্র ১১ জন। ইতোমধ্যে নানা পর্যায়ে নকশা অনুমোদন করার জন্য বুয়েট অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো হচ্ছে। আর আমদানিসহ বিভিন্ন অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি অনলাইন নির্ভর করা হয়েছে। তিনি আশা করেন আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তাদের পুরো সেবা ডিজিটাইজ করা সম্ভব হবে।

নিয়ন্ত্রণহীন বাজার

যুগের বেশী আগে সরকার আবাসিক খাতে রান্নায় পাইপলাইনে প্রাকৃতি গ্যাসের সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ার পর এলপি গ্যাসের ব্যবহার বাড়তে থাকে। এখন এটি রান্নায় শহরের পাশপাশি মফস্বলেও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

সরকার পাইপের গ্যাস বন্ধ করলেও বিকল্প হিসেবে দীর্ঘদিনেও এলপিজির উৎপাদন বাড়ায়নি। খাতের ৯৯ শতাংশের বেশী ব্যবসায়দের দখলে। সরকারি প্রতিষ্ঠান শতাংশের নিচে এলপিজি উৎপাদন সরবরাহ করে। বিইআরসি এলপিজির দাম নির্ধারণ করলেও এই দামে সাধারণ মানুষ গ্যাস পায় না। সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত ১২ কেজি সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে দুই থেকে তিনশ টাকা বেশী দিয়ে কিনতে হয় গ্রাহককে। এরপরও রং ওঠা, পুরাতান, জরাজীর্ণ সিলিন্ডার রিফিল করে ধরিয়ে দেওয়া হয় সাধারণ মানুষকে।

দুর্ঘটনা এড়াতে পূর্ব প্রস্তুতি

দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ দেওয়া হয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো থেকে। খাতের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোও ধরণের পরামর্শ দেয়:

নিয়মিত পরীক্ষা: হোস পাইপে কোনো ফাটল আছে কিনা এবং রেগুলেটর ঠিকমতো কাজ করছে কিনা তা নিয়মিত পরীক্ষা করা।

বায়ু চলাচল: রান্নাঘর সবসময় পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের উপযোগী রাখা।

তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ: গ্যাসের গন্ধ পেলে ঘরের কোনো বৈদ্যুতিক সুইচ বা আগুন  না ¦ালানো। দ্রুত সব দরজা-জানলা খুলে দেওয়া এবং এবং সিলিন্ডারের রেগুলেটর বন্ধ করে দেওয়া।

বিধি না মানার সংস্কৃতি

গোলটেবিল আলোচনায় বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, “মূল প্রবন্ধে যথাযথভাবেই উল্লেখ্য করা হয়েছে যে নিরাপত্তা বিধি মানার সংস্কৃতি আমাদের এখানে অনুপস্থিত। ফলে এই বিধিমালা মেনে চলার জন্য সচেতনতা সৃষ্টি এবং এই খাতের জনবলকে প্রশিক্ষিত করার লক্ষ্যে বিইআরসি লোয়াবসহ সকল অংশীজনদের সাথে নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী।তিনি বলেন, “এলপিজি নীতিমালা সংশোধন করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তাতে শুরু থেকেই অংশীজনদের মতামত নেওয়া উচিত।

লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, “আমরা নিরাপত্তা বিধিমালা পুরোপুরি অনুসরণ করেই ব্যবসা পরিচালনা করতে চাই। লোয়াব এবং তার সদস্যরা দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে। আগামীতে বিইআরসির নেতৃত্বে সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম এবং জনবলের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করতে আগ্রহী।তিনি প্রত্যাশা করেন বিইআরসি এই বিষয়ে উদ্যোগ নেবে।

খাত সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা

বিইআরসি সদস্য সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া বলেন, “এলপিজি খাত ক্রমবিকাশমান। কিন্তু নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। এই কাজটি সমন্বিতভাবে করার জন্য বিইআরসি ইতোমধ্যে নিরাপত্তা বিধিমালার খসড়া প্রণয়ন করেছে। অংশীজনদের সাথে কথা বলে এটি চূড়ান্ত করা হবে। তবে খাতসংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক অংশগ্রহণ ছাড়া এলপিজি খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

জ্বালানি খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব একেএম ফজলুল হক বলেন, “সরকার এলপিজি নীতিমালা সংশোধন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অংশীজনদের মতামত নিয়ে এটি চূড়ান্ত করা হবে। এখানে নিরাপত্তা বিধি এবং তা প্রতিপালনে দায়দায়িত্ব নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বহুতল ভবনের জন্য গাইডলাইন

রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট বরকত উল্লাহ বলেন, “আমরা ভবন নির্মাণের সময় ফায়ার সার্ভিসের কাছ থেকে অনুমোদন গ্রহণ করি। কিন্তু সেখানে এখনো এলপিজি সিলিন্ডার রেটিকুলেশন সিস্টেমের জন্য কী ধরনের নকশা করা দরকার তার গাইডলাইন নেই। সরকারের পক্ষ থেকে এটার জন্য নিরাপত্তা গাইডলাইন দিলে আগামীতে তা অনুসরণ করা হবে।

বসুন্ধরা গ্রুপের জাকারিয়া জালাল বলেন, “বিশ্বের রান্নার জন্য সবচেয়ে বেশি এলপিজি ব্যবহার হয় ভারতে। সেখানে মোট গ্রাহক সংখ্যা ৩০০ মিলিয়ন। সেখানে এলপিজি খাতের পুরো নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করে স্পেসো নামের একটি প্রতিষ্ঠান। যার জনবল লাখ ৫৬ হাজার।

ইউনাইটেড আইগ্যাসের এলপিজির চিফ ফিনানশিয়াল অফিসার ওসমান চিলিক বলেন, “নিরাপত্তা বিধিমালা কেবল কাগজে থাকলে হবে না। তা মাঠ পর্যায়ে চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।

তুরস্কের উদাহরণ

তুরস্কের উদাহরণ টেনে ওসমান চিলিক বলেন, “সেখানে এলপিজি দুর্ঘটনার মাত্র শতাংশ হয় সিলিন্ডার দুর্ঘটনার কারণে। আর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সেখানে সিলিন্ডার বীমা চালু আছে। যা বাংলাদেশ অনুসরণ করতে পারে।তিনি বলেন, “বাল্ক এলপিজি পরিবহনে নিয়োজিত যানবাহন চালকদের উচ্চতর প্রশিক্ষণসহ ভিন্ন লাইসেন্স দেওয়া জরুরি। আবার অটোগ্যাস স্টেশনের অপারেটদেরও লাইসেন্স দেওয়া উচিত।

এনার্জি এন্ড পাওয়ার সম্পাদক মোল্লাহ আমজাদ হোসেনের সঞ্চালনায় বৈঠকে আরো বক্তব্য রাখেন, লোয়াবের সিনিয়র সহ-সভাপতি হুমায়ুন রশীদ, বাংলাদেশ অটোগ্যাস এলপিজি স্টেশন এন্ড কনভারশন ওয়াকশপ ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি ইঞ্জি. সিরাজুল মাওলা, ইউনাইটেড আইগ্যাসের এলপিজির চিফ ফিনানশিয়াল অফিসার ওসমান চিলিক, বসুন্ধরা গ্রুপের জাকারিয়া জালাল, মেঘনা ফ্রেস এলপিজির আবু সাইদ রাজা, সাইদুল ইসলাম, ওরিয়ন এলপিজির মহিউদ্দিন খালেদ, বেক্সিমকো এলপিজির মেহেদী হাসান প্রমুখ।

ক্রস ফিলিং

বাংলাদেশে ক্রস ফিলিং একটি বড় সমস্যা উল্লেখ করে বৈঠকে বলা হয়, ইতোমধ্যে অটোগ্যাস স্টেশন মালিকদের পক্ষ থেকে তাদের রিফিলিংয়েরসুযোগ দেওয়ারদাবি উঠেছে। এই সুযোগ দেওয়া হলে এলপিজির নিরাপত্তায়বড় ধরনের স্খলন হবে

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬


এলপি গ্যাস: দুর্ঘটনার ‘প্রধান কারণ’ অসচেতনতা

প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬

featured Image

  • সচেতনা বাড়িয়ে দুর্ঘটনা ‘৮৫% কমিয়ে আনা সম্ভব’
  • এলপিজি খাতের নিরাপত্তা দেখভালের দায়িত্বে মাত্র ১১ জন: বিস্ফোরক অধিদপ্তর
  • হোস পাইপ ও রেগুলেটর থেকে বেশি দুর্ঘটনা হয়: ফায়ার সার্ভিস
  • নিয়ন্ত্রণহীন বাজার, জরাজীর্ণ সিলিন্ডার
  • অটোগ্যাস স্টেশনকে রিফিলিংয়ের ‘সুযোগ দেওয়ার’ বিপক্ষে লোয়াব

রান্নায় বহুল ব্যবহৃত এলপি গ্যাস থেকেঅগ্নিকা- বিস্ফোরণেহতাহতের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবেগ্যাস লিকেজ, মানহীন সিলিন্ডার এবং অসচেতনতারকথা উঠে আসছে। তবে অসচেতনতাই এলপি গ্যাসবিস্ফোরণ বা দুর্ঘটনারপ্রধান কারণ বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

খাতের বিশেষজ্ঞদের দাবি, সচেনতা বৃদ্ধির মধ্যমে এলপিজি দুর্ঘটনা ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। তারা বলেছেন, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি বা এলপি গ্যাস) খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ আইন প্রণয়ন অতি জরুরি। তবে তার বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে।

রবিবার (১৭ মে) ঢাকার রমনায় বিইআরসি সম্মেলন কক্ষেবাংলাদেশের এলপিজি খাত ক্রমবর্ধতান নিরাপত্তা ঝুঁকি রেগুলেটরি চ্যালেঞ্জের মুখেশীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা উপরের মতামত তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), এলপিজি অপারেটর এসোসিয়েশন বাংলাদেশ (লোয়াব) এবং এনার্জি এন্ড পাওয়ার যৌথভাবে এই গোলটেবিল বৈঠকে আয়েজন করে।

মূল প্রবন্ধে বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর . ইয়াসির আরাফাত খান সম্প্রতি এলপিজি অটোগ্যাস দুর্ঘটনার কিছু উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, “সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এলপিজি খাতের দুর্ঘটনা ৮০-৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে প্রতিটি দুর্ঘটনার সঠিক কারণ অনুসন্ধান করে আগামীতে এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

মূল প্রবন্ধে অংশীজনদের করণীয় হিসেবে ১৭টি সুপারিশ তুলে ধরে ইয়াসির আরাফাত খান বলেন, “এগুলো থেকে বেরিয়ে আসার জন্য দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। নিরাপত্তা বিধিমালা সুনির্দিষ্ট করে তা কার্যকর করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক (পরিকল্পনা) ইকবাল বাহার বুলবুল বলেন, “তৈরি পোশাক খাতে নিরাপত্তা বিধিমালা অনুসরণ করার কারণে এখানে দুর্ঘটনা অনেক কমে এসেছে। অন্যদিকে আবাসিক খাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে যারা এলপিজি ব্যবহার করেন, তারা এর নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে সচেতন নন। তাই দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য তাদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে হোস পাইপ রেগুলেটর থেকে বেশি দুর্ঘটনা হয়। ফলে এগুলোর মান নিশ্চিত করতে হবে।

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক মোহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান বলেন, “এলপিজি খাতের নিরাপত্তা বিধি অনুসরণ করার বিষয়টি দেখভাল করার দায়িত্ব বিস্ফোরক অধিদপ্তরের। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের জনবল মাত্র ১১ জন। ইতোমধ্যে নানা পর্যায়ে নকশা অনুমোদন করার জন্য বুয়েট অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো হচ্ছে। আর আমদানিসহ বিভিন্ন অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি অনলাইন নির্ভর করা হয়েছে। তিনি আশা করেন আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তাদের পুরো সেবা ডিজিটাইজ করা সম্ভব হবে।

নিয়ন্ত্রণহীন বাজার

যুগের বেশী আগে সরকার আবাসিক খাতে রান্নায় পাইপলাইনে প্রাকৃতি গ্যাসের সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ার পর এলপি গ্যাসের ব্যবহার বাড়তে থাকে। এখন এটি রান্নায় শহরের পাশপাশি মফস্বলেও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

সরকার পাইপের গ্যাস বন্ধ করলেও বিকল্প হিসেবে দীর্ঘদিনেও এলপিজির উৎপাদন বাড়ায়নি। খাতের ৯৯ শতাংশের বেশী ব্যবসায়দের দখলে। সরকারি প্রতিষ্ঠান শতাংশের নিচে এলপিজি উৎপাদন সরবরাহ করে। বিইআরসি এলপিজির দাম নির্ধারণ করলেও এই দামে সাধারণ মানুষ গ্যাস পায় না। সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত ১২ কেজি সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে দুই থেকে তিনশ টাকা বেশী দিয়ে কিনতে হয় গ্রাহককে। এরপরও রং ওঠা, পুরাতান, জরাজীর্ণ সিলিন্ডার রিফিল করে ধরিয়ে দেওয়া হয় সাধারণ মানুষকে।

দুর্ঘটনা এড়াতে পূর্ব প্রস্তুতি

দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ দেওয়া হয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো থেকে। খাতের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোও ধরণের পরামর্শ দেয়:

নিয়মিত পরীক্ষা: হোস পাইপে কোনো ফাটল আছে কিনা এবং রেগুলেটর ঠিকমতো কাজ করছে কিনা তা নিয়মিত পরীক্ষা করা।

বায়ু চলাচল: রান্নাঘর সবসময় পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের উপযোগী রাখা।

তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ: গ্যাসের গন্ধ পেলে ঘরের কোনো বৈদ্যুতিক সুইচ বা আগুন  না ¦ালানো। দ্রুত সব দরজা-জানলা খুলে দেওয়া এবং এবং সিলিন্ডারের রেগুলেটর বন্ধ করে দেওয়া।

বিধি না মানার সংস্কৃতি

গোলটেবিল আলোচনায় বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, “মূল প্রবন্ধে যথাযথভাবেই উল্লেখ্য করা হয়েছে যে নিরাপত্তা বিধি মানার সংস্কৃতি আমাদের এখানে অনুপস্থিত। ফলে এই বিধিমালা মেনে চলার জন্য সচেতনতা সৃষ্টি এবং এই খাতের জনবলকে প্রশিক্ষিত করার লক্ষ্যে বিইআরসি লোয়াবসহ সকল অংশীজনদের সাথে নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী।তিনি বলেন, “এলপিজি নীতিমালা সংশোধন করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তাতে শুরু থেকেই অংশীজনদের মতামত নেওয়া উচিত।

লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, “আমরা নিরাপত্তা বিধিমালা পুরোপুরি অনুসরণ করেই ব্যবসা পরিচালনা করতে চাই। লোয়াব এবং তার সদস্যরা দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে। আগামীতে বিইআরসির নেতৃত্বে সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম এবং জনবলের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করতে আগ্রহী।তিনি প্রত্যাশা করেন বিইআরসি এই বিষয়ে উদ্যোগ নেবে।

খাত সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা

বিইআরসি সদস্য সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া বলেন, “এলপিজি খাত ক্রমবিকাশমান। কিন্তু নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। এই কাজটি সমন্বিতভাবে করার জন্য বিইআরসি ইতোমধ্যে নিরাপত্তা বিধিমালার খসড়া প্রণয়ন করেছে। অংশীজনদের সাথে কথা বলে এটি চূড়ান্ত করা হবে। তবে খাতসংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক অংশগ্রহণ ছাড়া এলপিজি খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

জ্বালানি খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব একেএম ফজলুল হক বলেন, “সরকার এলপিজি নীতিমালা সংশোধন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অংশীজনদের মতামত নিয়ে এটি চূড়ান্ত করা হবে। এখানে নিরাপত্তা বিধি এবং তা প্রতিপালনে দায়দায়িত্ব নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বহুতল ভবনের জন্য গাইডলাইন

রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট বরকত উল্লাহ বলেন, “আমরা ভবন নির্মাণের সময় ফায়ার সার্ভিসের কাছ থেকে অনুমোদন গ্রহণ করি। কিন্তু সেখানে এখনো এলপিজি সিলিন্ডার রেটিকুলেশন সিস্টেমের জন্য কী ধরনের নকশা করা দরকার তার গাইডলাইন নেই। সরকারের পক্ষ থেকে এটার জন্য নিরাপত্তা গাইডলাইন দিলে আগামীতে তা অনুসরণ করা হবে।

বসুন্ধরা গ্রুপের জাকারিয়া জালাল বলেন, “বিশ্বের রান্নার জন্য সবচেয়ে বেশি এলপিজি ব্যবহার হয় ভারতে। সেখানে মোট গ্রাহক সংখ্যা ৩০০ মিলিয়ন। সেখানে এলপিজি খাতের পুরো নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করে স্পেসো নামের একটি প্রতিষ্ঠান। যার জনবল লাখ ৫৬ হাজার।

ইউনাইটেড আইগ্যাসের এলপিজির চিফ ফিনানশিয়াল অফিসার ওসমান চিলিক বলেন, “নিরাপত্তা বিধিমালা কেবল কাগজে থাকলে হবে না। তা মাঠ পর্যায়ে চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।

তুরস্কের উদাহরণ

তুরস্কের উদাহরণ টেনে ওসমান চিলিক বলেন, “সেখানে এলপিজি দুর্ঘটনার মাত্র শতাংশ হয় সিলিন্ডার দুর্ঘটনার কারণে। আর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সেখানে সিলিন্ডার বীমা চালু আছে। যা বাংলাদেশ অনুসরণ করতে পারে।তিনি বলেন, “বাল্ক এলপিজি পরিবহনে নিয়োজিত যানবাহন চালকদের উচ্চতর প্রশিক্ষণসহ ভিন্ন লাইসেন্স দেওয়া জরুরি। আবার অটোগ্যাস স্টেশনের অপারেটদেরও লাইসেন্স দেওয়া উচিত।

এনার্জি এন্ড পাওয়ার সম্পাদক মোল্লাহ আমজাদ হোসেনের সঞ্চালনায় বৈঠকে আরো বক্তব্য রাখেন, লোয়াবের সিনিয়র সহ-সভাপতি হুমায়ুন রশীদ, বাংলাদেশ অটোগ্যাস এলপিজি স্টেশন এন্ড কনভারশন ওয়াকশপ ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি ইঞ্জি. সিরাজুল মাওলা, ইউনাইটেড আইগ্যাসের এলপিজির চিফ ফিনানশিয়াল অফিসার ওসমান চিলিক, বসুন্ধরা গ্রুপের জাকারিয়া জালাল, মেঘনা ফ্রেস এলপিজির আবু সাইদ রাজা, সাইদুল ইসলাম, ওরিয়ন এলপিজির মহিউদ্দিন খালেদ, বেক্সিমকো এলপিজির মেহেদী হাসান প্রমুখ।

ক্রস ফিলিং

বাংলাদেশে ক্রস ফিলিং একটি বড় সমস্যা উল্লেখ করে বৈঠকে বলা হয়, ইতোমধ্যে অটোগ্যাস স্টেশন মালিকদের পক্ষ থেকে তাদের রিফিলিংয়েরসুযোগ দেওয়ারদাবি উঠেছে। এই সুযোগ দেওয়া হলে এলপিজির নিরাপত্তায়বড় ধরনের স্খলন হবে


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত