রাজধানীর অদূরে সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাসে বহিরাগত বখাটেদের হাতে ছাত্রীদের উত্যক্ত ও শ্লীলতাহানির চেষ্টায় তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
রবিবার
বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ভবনের
সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনা
ঘটে। ক্যাম্পাসের ভেতরে ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে এক বখাটের গেঞ্জি
খুলে ‘অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির’ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে
পড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে।
তবে
ঘটনার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী সাহসিকতার
পরিচয় দিয়ে দ্রুত এগিয়ে
যান এবং ইভটিজারদের প্রতিহত
করে একজনকে হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম
হন। পরে তাকে গণধোলাই
দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখায় নিয়ে যাওয়া হয়।
এই ঘটনায় জড়িত মূল অভিযুক্তকে
ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
কলা
ভবনের সামনে শার্ট খুলে ‘অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি’, ধাওয়া দিয়ে বখাটেকে আটক
আইনশৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বিকেল ৪টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ভবনের
সামনে কয়েকজন ছাত্রী অবস্থান করছিলেন। ঠিক সেই সময়
সাভারের রূপনগর এলাকার বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন নামের এক বহিরাগত যুবক
প্রধান গেট দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়
ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে।
সাদ্দাম
কলা ভবনের সামনে গিয়ে সেখানে অবস্থানরত
ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কুৎসিত ও অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি
করতে থাকে। একপর্যায়ে সে নিজের পরিহিত
গেঞ্জি খুলে ফেলে ছাত্রীদের
লক্ষ্য করে চরম আপত্তিকর
আচরণ শুরু করে। এই
দৃশ্য দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন
সাধারণ ছাত্র তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানান এবং বখাটেকে ধরে
ফেলেন।
পরে
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখার সহযোগিতায় তাকে আশুলিয়া থানা
পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা
হয়। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের
ডেপুটি রেজিস্ট্রার (নিরাপত্তা) বাদী হয়ে আশুলিয়া
থানায় একটি মামলা দায়ের
করেছেন। পুলিশ এই মামলায় সাদ্দাম
হোসেনকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে এবং ঘটনার সাথে
জড়িত অন্য সহযোগীদের গ্রেপ্তারে
অভিযান চালাচ্ছে।
আইনী
ব্যবস্থা নিলেও থামছে না সামাজিক ব্যাধি: নেপথ্যে আরও যারা
বিশ্ববিদ্যালয়
ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের নিরাপদে চলাচলের জায়গায় এমন প্রকাশ্য উত্যক্তের
ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। ঘটনার পর থেকে বিভিন্ন
গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং ঘটনার সাথে
আর কারা জড়িত রয়েছে
তা চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন।
আশুলিয়া
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল
ইসলাম মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, "এ
নিয়ে আশুলিয়া থানায় মামলাও দায়ের করা হয়েছে। ঘটনার
আরও কারা জড়িত আছে
তাদেরকে চিহ্নিত করে আইনী ব্যবস্থা
নেওয়া হবে।"
তবে
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিভিন্ন
এলাকায় প্রায়ই এমন ইভটিজিংয়ের ঘটনা
ঘটলেও লোকলজ্জা ও ভয়ভীতির কারণে
অনেক ঘটনাই পুলিশ পর্যন্ত পৌঁছায় না। অনেক পরিবারই
সামাজিক ও পারিবারিক সম্মানের
কথা চিন্তা করে মামলা করতে
অনীহা প্রকাশ করে, যার ফলে
অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।
‘মাইনর
রেপ’ ও সমাজবিজ্ঞানীদের উদ্বেগ: নারীর অস্তিত্বের সংকট
অপরাধ
বিজ্ঞানীরা ইভটিজিংকে কেবল সাধারণ উত্যক্তকরণ
হিসেবে দেখতে নারাজ। তাদের মতে, এটি একটি
অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিক ব্যাধি, যার অর্থ নারীদেরকে
প্রতারণামূলকভাবে উপহাস করা। সাধারণত উঠতি
বয়সী কিশোর ও যুবকরা আধিপত্য
বিস্তার ও ঐশ্বর্যের প্রভাবে
এই ধরনের অপরাধ করে থাকে। অপরিচিত
নারীদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি
দেখা গেলেও, কখনো কখনো পারিবারিক
বিরোধ বা ব্যক্তিগত পছন্দের
জেরেও উঠতি তরুণরা ইভটিজিংয়ের
আশ্রয় নেয়।
অপরাধ
বিজ্ঞানীরা এই অপরাধকে ‘মাইনর
রেপ’ বা মৃদু ধর্ষণ
হিসেবে অভিহিত করেছেন।
নারীবাদীদের
মতে, ইভটিজিং হলো নারীর চরম
অবমাননার অন্যতম একটি ধাপ, যার
ফলে নারীরা জনসম্মুখে, গণপরিবহনে, অফিস-আদালতে বা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে ভয় পায়
এবং তাদের স্বাধীনতা চরমভাবে বিঘ্নিত হয়। ১৯৭০ সালে
প্রথম গণমাধ্যমে ইভটিজিং একটি সামাজিক সমস্যা
হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর কালপরিক্রমায় সার্কভুক্ত
অঞ্চলসমূহে এর ভয়াবহতা ক্রমেই
বাড়ছে। নৈতিক শিক্ষার অভাব, পারিবারিক শৃঙ্খলার অভাব, মূল্যবোধের অবক্ষয়, আকাশ সংস্কৃতির কুপ্রভাব,
নারীর মর্যাদার অবনমন এবং বিজ্ঞাপন চিত্রে
নারীকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার মানসিকতাই এর
জন্য দায়ী। অনেকেই মনে করেন, এটি
মানব আচরণের একটি বিকৃত দিক
যা নারীর ভেতরের সৃজনশীলতা বিনষ্ট করে এবং আত্মহত্যাসহ
নানা অনাকাঙ্ক্ষিত আত্মঘাতী ঘটনার জন্ম দেয়।
নারী
শিক্ষায় বড় বাধা ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়: বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি
ইভটিজিংয়ের
এই ভয়াবহ কুফল সম্পর্কে সতর্ক
করে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা
বলেন, "ইভটিজিং প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন। আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ
জোরদার করা দরকার। গণমাধ্যমে
সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইভটিজিং নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।"
এর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে ওই কর্মকর্তা আরও
বলেন, "ইভটিজিংয়ের ফলে নারী শিক্ষা
পিছিয়ে পড়বে। নারীর অধিকার রক্ষার আন্দোলন স্থিমিত হবে। মেয়েদের নিরাপত্তা
বিঘিœত হবে। আর
সামাজিক নেতৃত্ব কাঠামোতে মেয়েরা পিছিয়ে পড়বে। সমঅধিকারের আন্দোলন স্থিমিত হয়ে যাবে। কর্মসংস্থানের
ক্ষেত্রে একই অবস্থার সৃষ্টি
হবে। অপর দিকে নারী
পুরুষের মধ্যে মনস্তাত্বিক দ্বন্ধ বাড়বে। সুষ্টি হবে হতাশা। আর
অপরাধীরা এতে উৎসাহিত হবে
হবে।"
একই
সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে চিকিৎসকদের কণ্ঠেও। মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ সুলতানা আলগিন
এই ব্যাধির গভীরতা তুলে ধরে বলেন,
"ইভটিজিং অনেক পুরনো সমস্যা।
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে
এই ইভটিজিং হচ্ছে। এর ফলে মেয়েদের
নিরাপত্তা ও পড়াশুনাসহ নানা
সমস্যা দেখা দিয়েছে। এই
সব ঘটনা শুধু স্কুলে
নয়,অফিসে,কর্মস্থলেও বিভিন্ন পেশার মহিলারা প্রায় সময় এই ধরনের
পরিস্থিতির শিকার হন।"
অন্য
একজন মনোবিজ্ঞানীর মতে, ইভটিজিং এখন
একটি মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ব্যাধিতে
পরিণত হয়েছে। এর পেছনে কিশোর-তরুণদের হতাশা, সঙ্গী দলের কুপ্রভাব ও
মাদকাসক্তি সরাসরি কাজ করে। অনেক
সময় খেলার ছলে বা বন্ধুদের
সাথে স্রেফ আনন্দ করতে গিয়ে তারা
এই ঘটনা ঘটায়, যা
পরবর্তীতে স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত হয়। এছাড়া আকাশ
সংস্কৃতির প্রভাবে কিশোরদের মধ্যে এক ধরণের অন্ধ
অনুকরণ প্রবণতা তৈরি হয়, যার
ফলে তারা দিবাস্বপ্নে ভোগে
এবং নারীর সত্ত্বাকে আঘাত করে।
প্রতিরোধে
কঠোর প্রশাসন ও সামাজিক সচেতনতার ডাক
যদিও
ইভটিজিং একটি সামাজিক অপরাধ
এবং আদালতে এটি প্রমাণ করা
অত্যন্ত জটিল, তবুও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনী নারীদের অধিকার রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি
ঘোষণা করেছে।
পুলিশ
কর্মকর্তাদের মতে, "ইভটিজিং অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। এই অপরাধ দমনে
সকল ধরনের আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও
সামাজিক ভাবে প্রতিরোধ গড়ে
তোলার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে
ইভটিজিং বিরোধী বিভিন্ন প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সচেতন মহল সক্রিয় হলে
এটা অনেক কমে যাবে।"
রাষ্ট্র
ও সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর
আইনী প্রক্রিয়ায় উত্যক্তকারী যুবকদের শাস্তির মুখোমুখি করা হচ্ছে যাতে
কেউ পার পেয়ে না
যায়। তবে কেবল আইন
দিয়ে নয়, সমাজবিজ্ঞানীদের মতে,
সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক শৃঙ্খলা, নৈতিক শিক্ষা এবং মূল্যবোধের উন্নয়নই
পারে এই ব্যাধিকে সমাজ
থেকে চিরতরে নির্মূল করতে। জাবির মতো দেশের প্রতিটি
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে এমন প্রতিরোধ গড়ে
তোলা এখন সময়ের দাবি।

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
রাজধানীর অদূরে সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাসে বহিরাগত বখাটেদের হাতে ছাত্রীদের উত্যক্ত ও শ্লীলতাহানির চেষ্টায় তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
রবিবার
বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ভবনের
সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনা
ঘটে। ক্যাম্পাসের ভেতরে ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে এক বখাটের গেঞ্জি
খুলে ‘অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির’ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে
পড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে।
তবে
ঘটনার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী সাহসিকতার
পরিচয় দিয়ে দ্রুত এগিয়ে
যান এবং ইভটিজারদের প্রতিহত
করে একজনকে হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম
হন। পরে তাকে গণধোলাই
দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখায় নিয়ে যাওয়া হয়।
এই ঘটনায় জড়িত মূল অভিযুক্তকে
ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
কলা
ভবনের সামনে শার্ট খুলে ‘অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি’, ধাওয়া দিয়ে বখাটেকে আটক
আইনশৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বিকেল ৪টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ভবনের
সামনে কয়েকজন ছাত্রী অবস্থান করছিলেন। ঠিক সেই সময়
সাভারের রূপনগর এলাকার বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন নামের এক বহিরাগত যুবক
প্রধান গেট দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়
ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে।
সাদ্দাম
কলা ভবনের সামনে গিয়ে সেখানে অবস্থানরত
ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কুৎসিত ও অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি
করতে থাকে। একপর্যায়ে সে নিজের পরিহিত
গেঞ্জি খুলে ফেলে ছাত্রীদের
লক্ষ্য করে চরম আপত্তিকর
আচরণ শুরু করে। এই
দৃশ্য দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন
সাধারণ ছাত্র তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানান এবং বখাটেকে ধরে
ফেলেন।
পরে
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখার সহযোগিতায় তাকে আশুলিয়া থানা
পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা
হয়। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের
ডেপুটি রেজিস্ট্রার (নিরাপত্তা) বাদী হয়ে আশুলিয়া
থানায় একটি মামলা দায়ের
করেছেন। পুলিশ এই মামলায় সাদ্দাম
হোসেনকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে এবং ঘটনার সাথে
জড়িত অন্য সহযোগীদের গ্রেপ্তারে
অভিযান চালাচ্ছে।
আইনী
ব্যবস্থা নিলেও থামছে না সামাজিক ব্যাধি: নেপথ্যে আরও যারা
বিশ্ববিদ্যালয়
ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের নিরাপদে চলাচলের জায়গায় এমন প্রকাশ্য উত্যক্তের
ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। ঘটনার পর থেকে বিভিন্ন
গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং ঘটনার সাথে
আর কারা জড়িত রয়েছে
তা চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন।
আশুলিয়া
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল
ইসলাম মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, "এ
নিয়ে আশুলিয়া থানায় মামলাও দায়ের করা হয়েছে। ঘটনার
আরও কারা জড়িত আছে
তাদেরকে চিহ্নিত করে আইনী ব্যবস্থা
নেওয়া হবে।"
তবে
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিভিন্ন
এলাকায় প্রায়ই এমন ইভটিজিংয়ের ঘটনা
ঘটলেও লোকলজ্জা ও ভয়ভীতির কারণে
অনেক ঘটনাই পুলিশ পর্যন্ত পৌঁছায় না। অনেক পরিবারই
সামাজিক ও পারিবারিক সম্মানের
কথা চিন্তা করে মামলা করতে
অনীহা প্রকাশ করে, যার ফলে
অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।
‘মাইনর
রেপ’ ও সমাজবিজ্ঞানীদের উদ্বেগ: নারীর অস্তিত্বের সংকট
অপরাধ
বিজ্ঞানীরা ইভটিজিংকে কেবল সাধারণ উত্যক্তকরণ
হিসেবে দেখতে নারাজ। তাদের মতে, এটি একটি
অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিক ব্যাধি, যার অর্থ নারীদেরকে
প্রতারণামূলকভাবে উপহাস করা। সাধারণত উঠতি
বয়সী কিশোর ও যুবকরা আধিপত্য
বিস্তার ও ঐশ্বর্যের প্রভাবে
এই ধরনের অপরাধ করে থাকে। অপরিচিত
নারীদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি
দেখা গেলেও, কখনো কখনো পারিবারিক
বিরোধ বা ব্যক্তিগত পছন্দের
জেরেও উঠতি তরুণরা ইভটিজিংয়ের
আশ্রয় নেয়।
অপরাধ
বিজ্ঞানীরা এই অপরাধকে ‘মাইনর
রেপ’ বা মৃদু ধর্ষণ
হিসেবে অভিহিত করেছেন।
নারীবাদীদের
মতে, ইভটিজিং হলো নারীর চরম
অবমাননার অন্যতম একটি ধাপ, যার
ফলে নারীরা জনসম্মুখে, গণপরিবহনে, অফিস-আদালতে বা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে ভয় পায়
এবং তাদের স্বাধীনতা চরমভাবে বিঘ্নিত হয়। ১৯৭০ সালে
প্রথম গণমাধ্যমে ইভটিজিং একটি সামাজিক সমস্যা
হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর কালপরিক্রমায় সার্কভুক্ত
অঞ্চলসমূহে এর ভয়াবহতা ক্রমেই
বাড়ছে। নৈতিক শিক্ষার অভাব, পারিবারিক শৃঙ্খলার অভাব, মূল্যবোধের অবক্ষয়, আকাশ সংস্কৃতির কুপ্রভাব,
নারীর মর্যাদার অবনমন এবং বিজ্ঞাপন চিত্রে
নারীকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার মানসিকতাই এর
জন্য দায়ী। অনেকেই মনে করেন, এটি
মানব আচরণের একটি বিকৃত দিক
যা নারীর ভেতরের সৃজনশীলতা বিনষ্ট করে এবং আত্মহত্যাসহ
নানা অনাকাঙ্ক্ষিত আত্মঘাতী ঘটনার জন্ম দেয়।
নারী
শিক্ষায় বড় বাধা ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়: বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি
ইভটিজিংয়ের
এই ভয়াবহ কুফল সম্পর্কে সতর্ক
করে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা
বলেন, "ইভটিজিং প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন। আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ
জোরদার করা দরকার। গণমাধ্যমে
সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইভটিজিং নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।"
এর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে ওই কর্মকর্তা আরও
বলেন, "ইভটিজিংয়ের ফলে নারী শিক্ষা
পিছিয়ে পড়বে। নারীর অধিকার রক্ষার আন্দোলন স্থিমিত হবে। মেয়েদের নিরাপত্তা
বিঘিœত হবে। আর
সামাজিক নেতৃত্ব কাঠামোতে মেয়েরা পিছিয়ে পড়বে। সমঅধিকারের আন্দোলন স্থিমিত হয়ে যাবে। কর্মসংস্থানের
ক্ষেত্রে একই অবস্থার সৃষ্টি
হবে। অপর দিকে নারী
পুরুষের মধ্যে মনস্তাত্বিক দ্বন্ধ বাড়বে। সুষ্টি হবে হতাশা। আর
অপরাধীরা এতে উৎসাহিত হবে
হবে।"
একই
সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে চিকিৎসকদের কণ্ঠেও। মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ সুলতানা আলগিন
এই ব্যাধির গভীরতা তুলে ধরে বলেন,
"ইভটিজিং অনেক পুরনো সমস্যা।
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে
এই ইভটিজিং হচ্ছে। এর ফলে মেয়েদের
নিরাপত্তা ও পড়াশুনাসহ নানা
সমস্যা দেখা দিয়েছে। এই
সব ঘটনা শুধু স্কুলে
নয়,অফিসে,কর্মস্থলেও বিভিন্ন পেশার মহিলারা প্রায় সময় এই ধরনের
পরিস্থিতির শিকার হন।"
অন্য
একজন মনোবিজ্ঞানীর মতে, ইভটিজিং এখন
একটি মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ব্যাধিতে
পরিণত হয়েছে। এর পেছনে কিশোর-তরুণদের হতাশা, সঙ্গী দলের কুপ্রভাব ও
মাদকাসক্তি সরাসরি কাজ করে। অনেক
সময় খেলার ছলে বা বন্ধুদের
সাথে স্রেফ আনন্দ করতে গিয়ে তারা
এই ঘটনা ঘটায়, যা
পরবর্তীতে স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত হয়। এছাড়া আকাশ
সংস্কৃতির প্রভাবে কিশোরদের মধ্যে এক ধরণের অন্ধ
অনুকরণ প্রবণতা তৈরি হয়, যার
ফলে তারা দিবাস্বপ্নে ভোগে
এবং নারীর সত্ত্বাকে আঘাত করে।
প্রতিরোধে
কঠোর প্রশাসন ও সামাজিক সচেতনতার ডাক
যদিও
ইভটিজিং একটি সামাজিক অপরাধ
এবং আদালতে এটি প্রমাণ করা
অত্যন্ত জটিল, তবুও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনী নারীদের অধিকার রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি
ঘোষণা করেছে।
পুলিশ
কর্মকর্তাদের মতে, "ইভটিজিং অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। এই অপরাধ দমনে
সকল ধরনের আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও
সামাজিক ভাবে প্রতিরোধ গড়ে
তোলার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে
ইভটিজিং বিরোধী বিভিন্ন প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সচেতন মহল সক্রিয় হলে
এটা অনেক কমে যাবে।"
রাষ্ট্র
ও সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর
আইনী প্রক্রিয়ায় উত্যক্তকারী যুবকদের শাস্তির মুখোমুখি করা হচ্ছে যাতে
কেউ পার পেয়ে না
যায়। তবে কেবল আইন
দিয়ে নয়, সমাজবিজ্ঞানীদের মতে,
সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক শৃঙ্খলা, নৈতিক শিক্ষা এবং মূল্যবোধের উন্নয়নই
পারে এই ব্যাধিকে সমাজ
থেকে চিরতরে নির্মূল করতে। জাবির মতো দেশের প্রতিটি
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে এমন প্রতিরোধ গড়ে
তোলা এখন সময়ের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন