নিষ্পাপ আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারের মস্তকবিহীন সেই রক্তাক্ত নিথর দেহ যখন পল্লবীর একটি খাটের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল, তখন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো বাংলাদেশ। এরপর বিচারিক আদালত দ্রুততম সময়ে সেই পৈশাচিক লালসার দুই নরপশুকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। কিন্তু এই রায়ই কি শেষ? বিচারিক আদালতের ফাঁসির রায় কার্যকর হতে উচ্চ আদালতে বছরের পর বছর কেটে যাওয়ার যে জটলা, তা কি রামিসার পরিবারকেও তাড়া করে বেড়াবে? দেশের কোটি কোটি মানুষের মনে যখন এই শঙ্কা আর দীর্ঘশ্বাসের মেঘ জমছিল, ঠিক তখনই বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও মানবিক অধ্যায়ের সূচনা হলো।
নারী
ও শিশু নির্যাতনের স্পর্শকাতর
মামলাগুলোর আপিল ও ডেথ
রেফারেন্স দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে একটি সম্পূর্ণ ডেডিকেটেড
বিশেষ বেঞ্চ গঠনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। এর ফলে দীর্ঘ
বিলম্বের অবসান ঘটে একাত্তরের চেতনার
বাংলাদেশে ন্যায়বিচার প্রাপ্তি আরও ত্বরান্বিত হবে
বলে আশা করা হচ্ছে।
গত রবিবার আপিল বিভাগের এজলাসে
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলের একটি মানবিক ও
যৌক্তিক প্রস্তাবে তাৎক্ষণিক সাড়া দিয়ে প্রধান
বিচারপতি এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত
নেন। আগামী রোববার থেকেই এই বিশেষ বেঞ্চে
আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারকাজ শুরু হতে যাচ্ছে।
নিম্ন আদালতে বিচার হলেও উচ্চ আদালতে
বছরের পর বছর মামলার
ডেথ রেফারেন্স ঝুলে থাকার কারণে
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মনে যে ক্ষোভ
ও হতাশা তৈরি হয়, তাকে
অত্যন্ত যৌক্তিক বলে মনে করেন
খোদ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা।
অ্যাটর্নি
জেনারেল কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে
রুহুল কুদ্দুস কাজল নিম্ন আদালতের
রায়ের আইনি সীমাবদ্ধতা উল্লেখ
করে বলেন, “এই মৃত্যুদণ্ডের রায়টিই
কিন্তু চূড়ান্ত নয়, যতক্ষণ না
পর্যন্ত এই রায়টি সুপ্রিম
কোর্টের হাইকোর্ট কর্তৃক অনুমোদিত না হয়।” তিনি
আরও যোগ করেন, “বাংলাদেশে
এমন অনেক চাঞ্চল্যকর মামলার
রায় হয়, কিন্তু মানুষ
এই রায়— তার কার্যকর
দেখতে পায় না বিলম্বের
কারণে। আমরা যে দৃষ্টান্তমূলক
শাস্তির কথা সবসময় বলে
থাকি, যতক্ষণ না সেই শাস্তি
কার্যকর হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের মনে শঙ্কা থেকে
যাচ্ছে।”
জনগণের
এই গভীর উদ্বেগ ও
মানসিক যন্ত্রণার বিষয়টি তিনি উন্মুক্ত আদালতে
প্রধান বিচারপতির দৃষ্টিগোচর করার পর যে
অভাবনীয় সাড়া পেয়েছেন, তার
প্রশংসা করে অ্যাটর্নি জেনারেল
সাংবাদিকদের জানান, মাননীয় প্রধান বিচারপতি সুস্পষ্ট বলেছেন যে এই বেঞ্চটি
শুধুমাত্র নারী এবং শিশু
নির্যাতন দমন আইনের অধীনে
এই জাতীয় মামলা; অর্থাৎ শিশু রামিসা, আসিয়া
বা রসু খাঁ-এর
মতো মামলার আপিল ও রেফারেন্স
শুনানির জন্যে ডেডিকেটেড থাকবে।
উচ্চ
আদালতের এই বিশেষ উদ্যোগকে
সফল করতে অ্যাটর্নি জেনারেলের
কার্যালয় থেকেও নেওয়া হয়েছে কঠোর ও বিশেষ
প্রস্তুতি। ল’ অফিসারদের মধ্য
থেকে গঠন করা হয়েছে
একটি সুনির্দিষ্ট ‘ডেডিকেটেড স্পেশাল টিম’। ঘাতকদের
সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো
ধরনের সময়ক্ষেপণ বরদাশত করবে না।
দৃঢ়
প্রত্যয় ব্যক্ত করে অ্যাটর্নি জেনারেল
বলেন, “অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের পক্ষ থেকে আমাদের
নিয়োজিত আইন কর্মকর্তারা কোনো
মামলায় কোনো রকম অ্যাডজার্নমেন্ট
(শুনানি মূলতবি) চাইবেন না। কোনো অ্যাডজার্নমেন্ট
ছাড়াই এই মামলাগুলো শুনানির
জন্যে আমি আমাদের আইন
কর্মকর্তাদেরকে নির্দেশনা দিয়েছি।” এমনকি আদালতগুলোতে সাধারণ অবকাশকালীন ছুটি চললেও, অসহায়
মা-বোন আর শিশুদের
কান্নার বিষয়টি বিবেচনা করে নারী ও
শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারিক
কার্যক্রম পুরোপুরি অব্যাহত রেখেছেন প্রধান বিচারপতি।
এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপকে দেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি 'মাইলফলক' হিসেবে বর্ণনা করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। অ্যাটর্নি
জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “এই
যে একটা উদ্যোগ, বিচারকে
সুনিশ্চিত করার জন্য, ন্যায়বিচার
প্রতিষ্ঠা করার জন্য, সেটিও
কিন্তু মানুষের কাছে প্রতিভাত হচ্ছে।
বিশেষ করে আদালতের প্রতি
মানুষের যে আস্থা, সে
আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যে তিনি আজকে যে
উদ্যোগটি গ্রহণ করেছেন সেটি মাইলফলক হয়ে
থাকবে।”
তবে
কেবল আলোচিত কয়েকটি মামলাই নয়, বরং দেশের
প্রতিটি কোণায় ঘটে যাওয়া অন্যায়ের
বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে সমানভাবে জাগ্রত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে এই ‘মানবিক আইন
কর্মকর্তা’ আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “কোনো একটা মামলা
আলোচিত হলেই আমরা সেটার
পিছনে ছুটি, এটাও সত্যি বাস্তবতা
আমাদের মতো দেশে। কিন্তু
সুন্দর রাষ্ট্র গঠন করতে চাইলে
প্রত্যেকটা অপরাধেরই সমান গুরুত্ব দেওয়া
উচিত। দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপরাধের বিচার, অপরাধীদেরকে আইনের আওতায় আনা এবং তাদের
শাস্তির মুখোমুখি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”

রোববার, ০৭ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬
নিষ্পাপ আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারের মস্তকবিহীন সেই রক্তাক্ত নিথর দেহ যখন পল্লবীর একটি খাটের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল, তখন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো বাংলাদেশ। এরপর বিচারিক আদালত দ্রুততম সময়ে সেই পৈশাচিক লালসার দুই নরপশুকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। কিন্তু এই রায়ই কি শেষ? বিচারিক আদালতের ফাঁসির রায় কার্যকর হতে উচ্চ আদালতে বছরের পর বছর কেটে যাওয়ার যে জটলা, তা কি রামিসার পরিবারকেও তাড়া করে বেড়াবে? দেশের কোটি কোটি মানুষের মনে যখন এই শঙ্কা আর দীর্ঘশ্বাসের মেঘ জমছিল, ঠিক তখনই বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও মানবিক অধ্যায়ের সূচনা হলো।
নারী
ও শিশু নির্যাতনের স্পর্শকাতর
মামলাগুলোর আপিল ও ডেথ
রেফারেন্স দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে একটি সম্পূর্ণ ডেডিকেটেড
বিশেষ বেঞ্চ গঠনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। এর ফলে দীর্ঘ
বিলম্বের অবসান ঘটে একাত্তরের চেতনার
বাংলাদেশে ন্যায়বিচার প্রাপ্তি আরও ত্বরান্বিত হবে
বলে আশা করা হচ্ছে।
গত রবিবার আপিল বিভাগের এজলাসে
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলের একটি মানবিক ও
যৌক্তিক প্রস্তাবে তাৎক্ষণিক সাড়া দিয়ে প্রধান
বিচারপতি এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত
নেন। আগামী রোববার থেকেই এই বিশেষ বেঞ্চে
আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারকাজ শুরু হতে যাচ্ছে।
নিম্ন আদালতে বিচার হলেও উচ্চ আদালতে
বছরের পর বছর মামলার
ডেথ রেফারেন্স ঝুলে থাকার কারণে
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মনে যে ক্ষোভ
ও হতাশা তৈরি হয়, তাকে
অত্যন্ত যৌক্তিক বলে মনে করেন
খোদ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা।
অ্যাটর্নি
জেনারেল কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে
রুহুল কুদ্দুস কাজল নিম্ন আদালতের
রায়ের আইনি সীমাবদ্ধতা উল্লেখ
করে বলেন, “এই মৃত্যুদণ্ডের রায়টিই
কিন্তু চূড়ান্ত নয়, যতক্ষণ না
পর্যন্ত এই রায়টি সুপ্রিম
কোর্টের হাইকোর্ট কর্তৃক অনুমোদিত না হয়।” তিনি
আরও যোগ করেন, “বাংলাদেশে
এমন অনেক চাঞ্চল্যকর মামলার
রায় হয়, কিন্তু মানুষ
এই রায়— তার কার্যকর
দেখতে পায় না বিলম্বের
কারণে। আমরা যে দৃষ্টান্তমূলক
শাস্তির কথা সবসময় বলে
থাকি, যতক্ষণ না সেই শাস্তি
কার্যকর হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের মনে শঙ্কা থেকে
যাচ্ছে।”
জনগণের
এই গভীর উদ্বেগ ও
মানসিক যন্ত্রণার বিষয়টি তিনি উন্মুক্ত আদালতে
প্রধান বিচারপতির দৃষ্টিগোচর করার পর যে
অভাবনীয় সাড়া পেয়েছেন, তার
প্রশংসা করে অ্যাটর্নি জেনারেল
সাংবাদিকদের জানান, মাননীয় প্রধান বিচারপতি সুস্পষ্ট বলেছেন যে এই বেঞ্চটি
শুধুমাত্র নারী এবং শিশু
নির্যাতন দমন আইনের অধীনে
এই জাতীয় মামলা; অর্থাৎ শিশু রামিসা, আসিয়া
বা রসু খাঁ-এর
মতো মামলার আপিল ও রেফারেন্স
শুনানির জন্যে ডেডিকেটেড থাকবে।
উচ্চ
আদালতের এই বিশেষ উদ্যোগকে
সফল করতে অ্যাটর্নি জেনারেলের
কার্যালয় থেকেও নেওয়া হয়েছে কঠোর ও বিশেষ
প্রস্তুতি। ল’ অফিসারদের মধ্য
থেকে গঠন করা হয়েছে
একটি সুনির্দিষ্ট ‘ডেডিকেটেড স্পেশাল টিম’। ঘাতকদের
সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো
ধরনের সময়ক্ষেপণ বরদাশত করবে না।
দৃঢ়
প্রত্যয় ব্যক্ত করে অ্যাটর্নি জেনারেল
বলেন, “অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের পক্ষ থেকে আমাদের
নিয়োজিত আইন কর্মকর্তারা কোনো
মামলায় কোনো রকম অ্যাডজার্নমেন্ট
(শুনানি মূলতবি) চাইবেন না। কোনো অ্যাডজার্নমেন্ট
ছাড়াই এই মামলাগুলো শুনানির
জন্যে আমি আমাদের আইন
কর্মকর্তাদেরকে নির্দেশনা দিয়েছি।” এমনকি আদালতগুলোতে সাধারণ অবকাশকালীন ছুটি চললেও, অসহায়
মা-বোন আর শিশুদের
কান্নার বিষয়টি বিবেচনা করে নারী ও
শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারিক
কার্যক্রম পুরোপুরি অব্যাহত রেখেছেন প্রধান বিচারপতি।
এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপকে দেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি 'মাইলফলক' হিসেবে বর্ণনা করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। অ্যাটর্নি
জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “এই
যে একটা উদ্যোগ, বিচারকে
সুনিশ্চিত করার জন্য, ন্যায়বিচার
প্রতিষ্ঠা করার জন্য, সেটিও
কিন্তু মানুষের কাছে প্রতিভাত হচ্ছে।
বিশেষ করে আদালতের প্রতি
মানুষের যে আস্থা, সে
আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যে তিনি আজকে যে
উদ্যোগটি গ্রহণ করেছেন সেটি মাইলফলক হয়ে
থাকবে।”
তবে
কেবল আলোচিত কয়েকটি মামলাই নয়, বরং দেশের
প্রতিটি কোণায় ঘটে যাওয়া অন্যায়ের
বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে সমানভাবে জাগ্রত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে এই ‘মানবিক আইন
কর্মকর্তা’ আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “কোনো একটা মামলা
আলোচিত হলেই আমরা সেটার
পিছনে ছুটি, এটাও সত্যি বাস্তবতা
আমাদের মতো দেশে। কিন্তু
সুন্দর রাষ্ট্র গঠন করতে চাইলে
প্রত্যেকটা অপরাধেরই সমান গুরুত্ব দেওয়া
উচিত। দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপরাধের বিচার, অপরাধীদেরকে আইনের আওতায় আনা এবং তাদের
শাস্তির মুখোমুখি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”

আপনার মতামত লিখুন