নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জে পদ্মা রেল সংযোগ সেতুর পিলারের নিচে অন্তত ১৫ ফুট গভীর করে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। এতে রেলসেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে বলেও মনে করছেন স্থানীয়রা। তবে, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দাবি, প্রকল্পের অংশ হিসেবে চায়নার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাটি কাটা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব মাটি স্থানীয় ইটভাটায় বিক্রি করছেন কয়েকজন ব্যক্তি। মাটি কাটার কাজটিতে স্থানীয় বিএনপির নেতারাও জড়িত আছেন বলে অভিযোগ করেন তারা।
মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, পদ্মা রেল সংযোগ সেতুর ৮৪ থেকে ৯১ নম্বর পিলারের অংশে অন্তত ১৫ ফুট মাটি কেটে ফেলা হয়েছে। এ সেতুর আশেপাশের জমি পাশের ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ (পঞ্চবটি-পোস্তগোলা) পুরাতন সড়কের সমান্তরালে থাকলেও মাটি কেটে নেওয়ায় সেতুর নিচের পিলারের অংশ নিচু হয়ে গেছে। এসব জায়গায় বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় সেখানে বৃষ্টির পানিও জমে গেছে। এতে সেতুর পিলার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এদিকে, সেতুটির আরেক অংশ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কে পশ্চিম পাশে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে থাকলেও সেখানে মাটি কাটা হয়নি। ওই জায়গাটিও সড়কের সমান্তরাল উচ্চতায় রয়েছে। এ সেতুটির আশেপাশে বেশকিছু নির্মাণ সামগ্রী বিক্রির মোকাম ও ইটভাটা রয়েছে।
গত দুইদিনে স্থানীয় ব্যক্তি, প্রশাসন ও পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের অন্তত দশজন ব্যক্তির ভাষ্যমতে, এক বছর আগেও এই সংযোগ সেতুর পিলারের মাটি কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ওই সময় স্থানীয় লোকজনের বাধার মুখে ওই কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। মাসখানেক আগে মাটি কাটার কাজ পুনরায় শুরু হয়। এ সময়ও স্থানীয়রা বাধা হয়ে দাঁড়ান। পরে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কার্যক্রম আবার শুরু হয়।
রেলসেতুটির পাশে একটি সিমেন্ট কারখানায় কাজ করেন বগুড়া জেলার বাসিন্দা মো. আমিনুর। গত একমাসেরও বেশি সময় ধরে রেল সংযোগ সেতুর নিচে পিলার ঘেঁষে মাটি কাটতে দেখছেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, “এই সেতুটির নিচে মাটি কাটা হলে পিলার দুর্বল হয়ে পড়বে। এই কারণে লোকজন বাধা দিয়েছিল। কোরবানির ঈদের আগে আবার কাজ ধরলে স্থানীয় এলাকাবাসী পুনরায় বাধা দেয়। ওই সময় সেনাবাহিনী ও রেলপুলিশ ইমরান নামে এলাকার একজনকে আটক করেও নিয়ে যায়। পরে মুচলেকায় তাকে ছাড়া হয়।”
ইমরান ও তার পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে এ বিষয়ে গণমাধ্যমে তারা কথা বলতে চাননি। তাদের পরিবারের এক সদস্য বলেন, “এলাকার লোকজন ব্রিজটি ঝুঁকিতে পড়বে ভেবে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু ভালো কাজ করতে গিয়ে আমরা ঝামেলায় পড়েছি, আবারও কথা বলে ঝামেলায় পড়তে চাই না।”
মোসলেহ উদ্দিন সজল নামে আলীগঞ্জের এক বাসিন্দা বলেন, “কোনো ব্রিজের পিলারের নিচে এভাবে মাটি কাটতে আমরা কখনো দেখিনি। এত বড় ট্রেন রানিং অবস্থায় এই সেতুর উপর দিয়ে যাবে, পিলারের নিচে মাটি কাটলে তো ঝুঁকি তৈরি হবেই। ভয়াবহ দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। এইটা তো যেকোনো সাধারণ মানুষও জানে। এখন সরকারি লোকজনই এই কাজ করলে তো আমাদের কিছু বলার থাকে না।”
পিলারের নিচে এইভাবে মাটি কেটে ঝুঁকি তৈরি না করে সেতুর নিচে বাইপাস সড়ক নির্মাণ করার প্রস্তাবও দেন স্থানীয়দের অনেকে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হয় রেল সংযোগ প্রকল্পের কর্মকর্তা রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ট্র্যাক অ্যান্ড ওয়ার্কস) আবু ইউসুফ মোহাম্মদ শামীমের সঙ্গে। তিনি বলেন, “এ প্রকল্প এলাকাটিতে নিচু জমি এবং জলাশয় ছিল। প্রকল্পের কাজের সময় নিজ উদ্যোগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাটি-বালু ফেলে ভরাট করেছিল। এজন্য তাকে কোনো পেমেন্টও করা হয়নি।
আবু ইউসুফ মোহাম্মদ শামীম বলেন, চুক্তি অনুযায়ী বলা আছে, প্রকল্প সাইটটিকে রেস্টোরেশন করতে হবে। মানে, আগে যেমন ছিল এলাকাটি তেমনই রাখতে হবে। তারই অংশ হিসেবে মাটি কাটা হচ্ছে। অবশ্যই সেফটি নিশ্চিত করেই এ কাজটি করতে হয়।”
“আমাদের কনসালটেন্ট হচ্ছে বাংলাদেশ আর্মি। তাদের তত্ত্বাবধানেই ওদিকের সাইটটি আগের মতো করা হচ্ছে। আগে কেমন ছিল তার ডেটা আমাদের কাছে আছে। ওইটা অনুসারেই কাজ করার কথা। ওইটা অনুসারে কাজটা যাতে করে, মানে ঠিকাদার যাতে বেশি কিছু না করে সেজন্যই আর্মির লোকজন সেটার তত্ত্বাবধানে আছে।”
এ প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড। প্রকৌশলী শামীম বলেন, “কাজটি পেয়েছে চায়না প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তারা হয়তো মাটি কাটার কাজটি অন্য কাউকে দিয়ে করাচ্ছে।”
২০২৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত এ প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
পিলারের নিচ থেকে কেটে নেওয়া হচ্ছে মাটি। ছবি: প্রতিনিধি
এদিকে, মঙ্গলবার দুপুরে আবারও প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যান ইউএনও ফয়েজ উদ্দিন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা সোশ্যাল মিডিয়াতে বিষয়টি দেখেই এসিল্যান্ডকে পাঠাই এবং কাজটি বন্ধ দেই। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন কিছু কাগজপত্র দেখান, কিন্তু তাতে আমরা স্থানীয় প্রশাসন সন্তুষ্ট হইনি। আমরা বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছি, শিগগিরই এ নিয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।”

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জে পদ্মা রেল সংযোগ সেতুর পিলারের নিচে অন্তত ১৫ ফুট গভীর করে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। এতে রেলসেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে বলেও মনে করছেন স্থানীয়রা। তবে, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দাবি, প্রকল্পের অংশ হিসেবে চায়নার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাটি কাটা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব মাটি স্থানীয় ইটভাটায় বিক্রি করছেন কয়েকজন ব্যক্তি। মাটি কাটার কাজটিতে স্থানীয় বিএনপির নেতারাও জড়িত আছেন বলে অভিযোগ করেন তারা।
মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, পদ্মা রেল সংযোগ সেতুর ৮৪ থেকে ৯১ নম্বর পিলারের অংশে অন্তত ১৫ ফুট মাটি কেটে ফেলা হয়েছে। এ সেতুর আশেপাশের জমি পাশের ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ (পঞ্চবটি-পোস্তগোলা) পুরাতন সড়কের সমান্তরালে থাকলেও মাটি কেটে নেওয়ায় সেতুর নিচের পিলারের অংশ নিচু হয়ে গেছে। এসব জায়গায় বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় সেখানে বৃষ্টির পানিও জমে গেছে। এতে সেতুর পিলার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এদিকে, সেতুটির আরেক অংশ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কে পশ্চিম পাশে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে থাকলেও সেখানে মাটি কাটা হয়নি। ওই জায়গাটিও সড়কের সমান্তরাল উচ্চতায় রয়েছে। এ সেতুটির আশেপাশে বেশকিছু নির্মাণ সামগ্রী বিক্রির মোকাম ও ইটভাটা রয়েছে।
গত দুইদিনে স্থানীয় ব্যক্তি, প্রশাসন ও পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের অন্তত দশজন ব্যক্তির ভাষ্যমতে, এক বছর আগেও এই সংযোগ সেতুর পিলারের মাটি কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ওই সময় স্থানীয় লোকজনের বাধার মুখে ওই কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। মাসখানেক আগে মাটি কাটার কাজ পুনরায় শুরু হয়। এ সময়ও স্থানীয়রা বাধা হয়ে দাঁড়ান। পরে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কার্যক্রম আবার শুরু হয়।
রেলসেতুটির পাশে একটি সিমেন্ট কারখানায় কাজ করেন বগুড়া জেলার বাসিন্দা মো. আমিনুর। গত একমাসেরও বেশি সময় ধরে রেল সংযোগ সেতুর নিচে পিলার ঘেঁষে মাটি কাটতে দেখছেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, “এই সেতুটির নিচে মাটি কাটা হলে পিলার দুর্বল হয়ে পড়বে। এই কারণে লোকজন বাধা দিয়েছিল। কোরবানির ঈদের আগে আবার কাজ ধরলে স্থানীয় এলাকাবাসী পুনরায় বাধা দেয়। ওই সময় সেনাবাহিনী ও রেলপুলিশ ইমরান নামে এলাকার একজনকে আটক করেও নিয়ে যায়। পরে মুচলেকায় তাকে ছাড়া হয়।”
ইমরান ও তার পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে এ বিষয়ে গণমাধ্যমে তারা কথা বলতে চাননি। তাদের পরিবারের এক সদস্য বলেন, “এলাকার লোকজন ব্রিজটি ঝুঁকিতে পড়বে ভেবে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু ভালো কাজ করতে গিয়ে আমরা ঝামেলায় পড়েছি, আবারও কথা বলে ঝামেলায় পড়তে চাই না।”
মোসলেহ উদ্দিন সজল নামে আলীগঞ্জের এক বাসিন্দা বলেন, “কোনো ব্রিজের পিলারের নিচে এভাবে মাটি কাটতে আমরা কখনো দেখিনি। এত বড় ট্রেন রানিং অবস্থায় এই সেতুর উপর দিয়ে যাবে, পিলারের নিচে মাটি কাটলে তো ঝুঁকি তৈরি হবেই। ভয়াবহ দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। এইটা তো যেকোনো সাধারণ মানুষও জানে। এখন সরকারি লোকজনই এই কাজ করলে তো আমাদের কিছু বলার থাকে না।”
পিলারের নিচে এইভাবে মাটি কেটে ঝুঁকি তৈরি না করে সেতুর নিচে বাইপাস সড়ক নির্মাণ করার প্রস্তাবও দেন স্থানীয়দের অনেকে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হয় রেল সংযোগ প্রকল্পের কর্মকর্তা রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ট্র্যাক অ্যান্ড ওয়ার্কস) আবু ইউসুফ মোহাম্মদ শামীমের সঙ্গে। তিনি বলেন, “এ প্রকল্প এলাকাটিতে নিচু জমি এবং জলাশয় ছিল। প্রকল্পের কাজের সময় নিজ উদ্যোগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাটি-বালু ফেলে ভরাট করেছিল। এজন্য তাকে কোনো পেমেন্টও করা হয়নি।
আবু ইউসুফ মোহাম্মদ শামীম বলেন, চুক্তি অনুযায়ী বলা আছে, প্রকল্প সাইটটিকে রেস্টোরেশন করতে হবে। মানে, আগে যেমন ছিল এলাকাটি তেমনই রাখতে হবে। তারই অংশ হিসেবে মাটি কাটা হচ্ছে। অবশ্যই সেফটি নিশ্চিত করেই এ কাজটি করতে হয়।”
“আমাদের কনসালটেন্ট হচ্ছে বাংলাদেশ আর্মি। তাদের তত্ত্বাবধানেই ওদিকের সাইটটি আগের মতো করা হচ্ছে। আগে কেমন ছিল তার ডেটা আমাদের কাছে আছে। ওইটা অনুসারেই কাজ করার কথা। ওইটা অনুসারে কাজটা যাতে করে, মানে ঠিকাদার যাতে বেশি কিছু না করে সেজন্যই আর্মির লোকজন সেটার তত্ত্বাবধানে আছে।”
এ প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড। প্রকৌশলী শামীম বলেন, “কাজটি পেয়েছে চায়না প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তারা হয়তো মাটি কাটার কাজটি অন্য কাউকে দিয়ে করাচ্ছে।”
২০২৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত এ প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
পিলারের নিচ থেকে কেটে নেওয়া হচ্ছে মাটি। ছবি: প্রতিনিধি
এদিকে, মঙ্গলবার দুপুরে আবারও প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যান ইউএনও ফয়েজ উদ্দিন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা সোশ্যাল মিডিয়াতে বিষয়টি দেখেই এসিল্যান্ডকে পাঠাই এবং কাজটি বন্ধ দেই। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন কিছু কাগজপত্র দেখান, কিন্তু তাতে আমরা স্থানীয় প্রশাসন সন্তুষ্ট হইনি। আমরা বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছি, শিগগিরই এ নিয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।”

আপনার মতামত লিখুন