বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি। দেশ, রাজনীতি এবং সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে তার সাথে কথা বলেছেন সংবাদ ডিজিটাল বিভাগের বার্তা প্রধান রাশেদ আহমেদ। সাক্ষাৎকারটি হুবহু তুলে ধরা হলো।
রাশেদ আহমেদ: শুরু করি বর্তমান অবস্থা দিয়েই। ২৪-এ বাংলাদেশে একটি বড় রেজিম পরিবর্তন হলো।তারপর থেকে দেখা গেল যে মুক্তিযুদ্ধকে অপমান অপদস্থ করা হচ্ছে। কেন সেটি?
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: স্বাধীনতার ৫৪-৫৫ বছর পর এরকম একটি বিপর্যয়, নিশ্চয়ই হেতু ছিল, কারণ ছিল। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, পাকিস্তানি হানাদারদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করেছি, আমরা অতটা সচেতন হয়ে অনেকেই চলিনি। আপনি যদি খোলাখুলি দেখেন তাহলে দেখবেন, মুক্তিযোদ্ধার ছেলেরা, সন্তানেরা খুব একটা লেখাপড়া করেনি। অন্যদিকে পরাজিত শত্রু যারা—রাজাকার, আল-বদর, রাজনৈতিকভাবে জামায়াত—তারা কোণঠাসা হওয়ার কারণে তারা মাটি কামড়ে আর কিছু না হোক লেখাপড়া করার চেষ্টা করেছে। তারা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করেছে। আপনি রাস্তাঘাটে যত ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক দেখবেন, সেখানে জামায়াতের নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব। সেই দিক থেকে চিন্তা করলে আমাদের উদাসীনতা, অলসতা অনেক ক্ষেত্রে দায়ী। আরেকটা জিনিস, ৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়া ছিল অবধারিত। এখানে কোনো লুকোচুরি ছিল না। পৃথিবীর সমস্ত পরাশক্তিকে পরাজিত করে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনেছি। সেই সময় ভারত এবং রাশিয়া ছাড়া আমাদের পিছনে কোনো শক্তি এসে দাঁড়ায় নাই, সহযোগিতা করেনি। তাই সারা পৃথিবীর বৃহত্তর শক্তিকে পরাজিত করে যিনি বিজয়ী হন, তাঁকে মৃত্যুবরণ করতেই হয়। এবং সেটা করেছেন বঙ্গবন্ধু। এর কোনো বিকল্প ছিল না। কিন্তু আমরা তেমন বুঝবার চেষ্টা করি নাই। এটা কারো ব্যক্তিগত খেয়ালখুশি না। এটা একটা একেবারে বিশ্ব রাজনীতির পরিচিত একটা খেলা। সে কারণে বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছেন ৭৫ সালে। রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে, তারই ধারাবাহিকতা আজকের এই সময়।
রাশেদ আহমেদ: কিন্তু ২৪-এর অভ্যুত্থানের পরে আঘাতটা বেশি মুক্তিযুদ্ধের ওপরে হলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপরে হলো। আপনার বড় ভাই নিজে অপমানিত হলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে যুক্ত হতে গিয়ে। আপনাকেও মাঝে মাঝে বিভিন্ন সময়ে অপমানিত হতে হয়েছে। এই পরিবর্তনটা হলো কেন?
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: এ পরিবর্তন অস্বাভাবিক কিছু নয়। সেখানে যেমন আমাদের দুর্বলতা আছে, অলসতা আছে। পরাজিত শক্তির—যে একবার পরাজিত হয় সে জিতবার জন্য সব সময় চেষ্টা করে। কিন্তু যে বিজয়ী হয়, তার বিজয় ধরে রাখার জন্য যতটুকু করা দরকার, অনেক ক্ষেত্রে ততখানি করা হয় না। এবং সেটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও হয়েছে। তো সেই জন্য আপনাকে বলব এটা নতুন কিছু না। আমাদের যেটুকু ভুল আছে সেটুকু বোঝা উচিত ছিল। এখনো ততটা বোঝা হচ্ছে বলে আমার মনে হয় না।
রাশেদ আহমেদ: আপনি কি বর্তমান সরকারের কথা বলছেন?
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: না, শুধু সরকার না। আমি কখনো শুধু সরকার নিয়ে চিন্তা করি নাই। আমি সবগুলা মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই চিন্তা করেছি, দেশের সামগ্রিকভাবে সকল মানুষ নিয়ে চিন্তা করেছি। সেই জন্যে শুধু সরকারকে সব ব্যাপারে দায়িত্ব দেব এটা আমার কথা না, আমার ইচ্ছাও নয়, আমার চেতনাও নয়।
রাশেদ আহমেদ: সরকারকে দায়িত্ব দিচ্ছেন না, দায় দিচ্ছেন না ঠিক আছে। কিন্তু এখন করণীয়টা কী? আপনাদের মুক্তিযোদ্ধারা যাঁরা...
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: আমি কিন্তু সরকারের দায়িত্বকে বাদ দিচ্ছি না। কিন্তু সব দায়িত্ব সরকারের—এইটা বলছি না। আমি কখনো কখনো লক্ষ্য করি, আমার যেকোনো কথাকেই এদিক ওদিক টানা হয়। স্বাভাবিক অর্থে আমি যেটা বলতে চাই, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেটাকে যাঁরা শুনতে চান বা শোনাতে চান, তাঁরা তাঁদের মতো করে এর অর্থ বের করতে চান। সেই জন্য বলছি, সামগ্রিকভাবে আমাদের মানসিক, মানবিক উন্নয়ন না হলে অনেকগুলো সমস্যা অতিক্রম করা কঠিন। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের চরিত্রের যে উন্নতি হয়েছিল, পৃথিবীর কোনো দেশে এরকম উন্নতি হয় কি না জানি না। একজন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোককে যদি পাকিস্তানি হানাদাররা ধরে নিয়ে যেত, তাকে মারতে মারতে মারতে অপমান করতে করতে মেরে ফেললেও তাকে দিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে সমর্থন করাতে পারত না। যারা বাংলাদেশ চেয়েছে তারা জয় বাংলা বলেছে। যারা পাকিস্তান চেয়েছে তারা জিন্দাবাদ বলেছে। বাঙালির জয় বাংলা আর পাকিস্তানের জিন্দাবাদ। আমি নিজে দেখেছি দুই একজন পাকিস্তানের সমর্থক, গুপ্তচরবৃত্তি বা অন্য কোনো কাজে পাকিস্তানের আমাদের কাছে পাঠালে, ধরা পড়লে আপ্রাণ চেষ্টা করেও তাদের জয় বাংলা বলাতে পারিনি। জয় বাংলা বলেওনি। ঠিক তেমনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকেদের পাকিস্তানিরা ধরে মেরে ফেলেছে, পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলাতে পারেনি। কিন্তু আজকে জিন্দাবাদ আর জয় বাংলার কোনটা কী, কোনটা কী অনুভূতি, কোনটা হৃদয়ে ধারণ করতে হয়, কোনটাকে বর্জন করতে হয়—আমাদের মধ্যে এর বোধশক্তি অনেক লোপ পেয়েছে।
রাশেদ আহমেদ: নতুন একটি স্লোগান এসেছে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ নামে, যেটি ২৪-এর পরবর্তীতে আমরা শুনেছি।
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: ইনকিলাবটা ভালো কথা। যেমনি অনেকেই জানে কি না জানি না—রাজাকার। অত্যন্ত ভালো কথা। রাজাকার মুসলমানদের সাহায্যকারী। মদিনায় যারা সাহায্য করেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে, তাদেরকে রাজাকার বলা হয়েছে। সেই রাজাকার বাংলাদেশে হয়েছিল সবচাইতে নিকৃষ্ট ঘৃণিত। এবং তারা ঘৃণার কাজই করেছিল। সেই জন্য সবকিছু আবরণের নিচে থাকলেই সব না। রাজাকার, আল বদর, আল শামস এগুলোকে তৈরি করে জামায়াত যদি পাকিস্তানের পক্ষ না নিত, তাহলে জামায়াতের অবস্থা এরকম থাকত না। পাকিস্তান যখন সৃষ্টি হয়েছে ভারত—কী বলে—ব্রিটিশের কাছ থেকে ভারত এবং পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্র। তখন আমরা যারা জান প্রাণ দিয়ে আমাদের বাপ দাদারা পাকিস্তানের পক্ষে লড়াই করেছে, সেই সময় পাকিস্তানের জামায়াতের নেতা আবুল আলা মওদুদী ব্রিটিশের পক্ষ নিয়েছেন। আবার আমরা যারা পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছি, তখন কিন্তু এরা বাংলাদেশের পক্ষে না গিয়ে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছেন। পক্ষের জন্য আমি অতটা অভিযুক্ত করব না। কিন্তু আরও পক্ষ নিয়েছিল নেজামে ইসলাম নিয়েছিল, মুসলিম লীগ নিয়েছিল আরও ছোটখাটো দল এটা নিয়েছিল। কিন্তু জামায়াতের মতো সশস্ত্র ক্যাডার তৈরি করে বাড়িঘর ধ্বংস করা, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া, মানুষকে হত্যা করা, মা বোনদেরকে পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে তুলে দিয়ে ইজ্জত সম্ভ্রম নষ্ট করা—এটা না করলেও পারতেন। এটা না করলে রাজনৈতিক সাপোর্ট করলে এতটা বলার ছিল না। এখন অনেকে বলছে জামায়াতরা ভাবছে বিরোধী দল হয়েছে। না, এটাই শেষ কথা না। বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে জামায়াত কখনো জায়গা করতে পারবে না। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ যেভাবে ক্ষমা করেন, যেভাবে চাইলে ক্ষমা করেন, বাংলার মানুষের কাছে জামায়াতকে তার চাইতেও গভীরভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। তারপরে ক্ষমা করবে কি না সেটা পরের কথা। এখন যেগুলো হচ্ছে এগুলো বানানো জিনিস।
রাশেদ আহমেদ: যেমন?
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: যেমন কী শেখ হাসিনাকে বিতাড়িত করা। হয়তো যখন শেখ হাসিনার পতন হয়েছে তখন ব্যাপারটা বোঝা যায় নাই।
রাশেদ আহমেদ: আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপনার কী হয়েছিল? শেখ হাসিনার সঙ্গে যেহেতু আপনি বলছিলেন যে ভাই-বোনের সম্পর্ক, বঙ্গবন্ধুকে আপনি পিতা হিসেবে জানেন, বঙ্গবন্ধু আপনাকে সন্তানসমতুল্য মনে করতেন। তারপর আওয়ামী লীগ ছেড়ে দিলেন, আপনি নতুন পার্টি করলেন।
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: আপনার এটা সত্য কথা যে বঙ্গবন্ধু আমাকে সন্তানের মতো দেখতেন। আমিও তাঁকে পিতার মতো দেখতাম। দেখতাম না, দেখি আমি। আমার জন্মদাতা পিতা, তাঁর জন্য আমি যা করতে পারি বঙ্গবন্ধুর জন্য পারি। বঙ্গবন্ধু আমার রাজনৈতিক পিতা। বঙ্গবন্ধুর জন্যই আমি দেশকে চিনেছি। যদি আমাকে কোনো ভালো বলেন তাহলে দুজন মানুষ, একজন হলো আমার মা একজন বঙ্গবন্ধু। এখানে আমি আওয়ামী লীগ ছাড়ি নাই। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ, মাওলানা ভাসানীর আওয়ামী লীগ, শামসুল হক-এর আওয়ামী লীগ আমি ছাড়ি নাই। মুক্তিযুদ্ধের আওয়ামী লীগ আমি ছাড়ি নাই। স্বাধীনতার আওয়ামী লীগ আমি ছাড়ি নাই। আমি ছাড়ছি আমার বোন শেখ হাসিনার নেতৃত্বের আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে আমি অনেক পার্থক্য দেখতে পেয়েছি। বঙ্গবন্ধুর সময় সাধারণ কর্মীদের সম্মান ছিল, মূল্য ছিল। শেখ হাসিনার শাসন আমলের শেষ দিক পর্যন্ত... শেষে একেবারে শেষে... সাধারণ আওয়ামী লীগের কোনো মূল্য ছিল না। মূল্য ছিল হাইব্রিড আওয়ামী লীগের। যাদের টাকা আছে, যারা টাই পরে তাদের। গ্রামের বউয়ের দুল বিক্রি করে যারা দল করত, নেতাদের খাওয়াত, তাদের কোনো দাম ছিল না। আর আমি একটা বেকুব মানুষ, কোনো কথা বললে সেটাকে পালন না করে আমি থাকতে পারি না। স্বস্তি পাই না। আমার মনে হয়েছিল আওয়ামী লীগ এতকাল যে কথা দিয়ে এসেছে, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে সেটা করতে পারছেন না অথবা করতে চাচ্ছেন না। তিনি কিছু চাটুকারের দ্বারা বন্দি হয়ে গেছেন। কিছু কেন অনেক চাটুকারের দ্বারা। মানুষের প্রতি তাদের মায়া মমতা নেই। আমি মনে করি রাজনীতি হলো জনসেবা। আমি জনগণকে শক্তি দেখানো রাজনীতি মনে করি না। আমাকে কেউ গালাগাল করলে আমার কিছুই মনে হয় না।
রাশেদ আহমেদ: তাহলে আওয়ামী লীগ ছেড়ে যাওয়া মূলত যেই আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর ছিল সেটি নেই।
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: মূলত আমার আওয়ামী লীগ ত্যাগ করা—আওয়ামী লীগ যেটা ছিল, আওয়ামী লীগের যে ওয়াদা সেগুলোকে পালন করা হয়নি সেইভাবে। চেষ্টাও করা হয়নি। এবং আওয়ামী লীগের জনগণকে যে পরিমাণ সম্মান করার কথা তার থেকে অনেক কম সম্মান করেছে। শুধু শেখ হাসিনাকে বললেই হবে না। তাঁর অনেক কর্মীরা রাজনীতির যোগ্য না। এবং একটা জিনিস জানবেন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সবচাইতে গুরুতর অন্যায় হয়েছে নির্বাচনী পদ্ধতিটাকে নষ্ট করে দেওয়া। মানুষ নিজের ইচ্ছায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষ ভোট দিতে পারে নাই। ৩০ লক্ষ জনগণ যে শহীদ হয়েছে মানুষ, সাধারণ মানুষ। ৩০ লক্ষ কিন্তু যোদ্ধা শহীদ হয়নি, সাধারণ মানুষ শহীদ হয়েছে। সেই যে শহীদ, এটা কিন্তু ভোট না দিতে পারার জন্যে। বাংলাদেশ হয়তো স্বাধীন হতো আরও পরে হতো ২০ বছর পরে ৩০ বছর পরে। যদি সত্তরের নির্বাচনী রায় পাকিস্তানিরা মেনে নিত, তাহলে না হয় আরও ২০ বছর অপেক্ষা করতে হতো স্বাধীনতার জন্যে। এবং শেখ হাসিনার হাত দিয়ে যে-ই করে থাকুন, নির্বাচনটাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল।
রাশেদ আহমেদ: পতনটা কী কারণে আওয়ামী লীগের? যেটা ২৪-এ...
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: পতনটা মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া। আপনি এখন যা যে যা বলেন, তাঁকে উৎখাত করে যারা এসেছেন তারা তার চাইতে অনেক খারাপ করেছেন। এই জন্য আজকে দেশের অবস্থা এই। ১ জুন তোফায়েল আহমেদ মারা গেছে। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ। ৬৯ সালে বা ৭০ সালে উনি যদি বাংলাদেশটা চাইতেন নিয়ে নিতে পারতেন। ৬৯ সালের পরে উনি টাঙ্গাইলে গেছেন, তখনকার দিনের সবচাইতে ভালো গাড়িতে যান নাই, বাসে করেই গেছেন। আমাদের সম্মেলনে উনি বাসে করে গেছেন। আর এখানে এখনকার যারা কি জানি নাম সারজিস তারপর ঐ যে... হাসনাত আব্দুল্লাহ, নাহিদ। হাসনাত আব্দুল্লাহকে আমি পরে বলব, এখনো সে চেষ্টা করছে। যদিও তার চেষ্টায় কিছু কিছু তো ত্রুটি আছেই থাকেই এটা। আমি যদি এমপি হয়ে রাস্তা খুঁড়তে যেতাম কত ইঞ্চি দিছে, মানুষ সেটাকে বলত এই কাদের সিদ্দিকী এটা তো তোর কাজ না, তোর কাজ উপরে বইসা রাস্তা আইসা তোর রাস্তা দেখার কাজ না। কিন্তু আব্দুল্লাহ যে রাস্তা দেখতে গেছেন অধিকাংশ মানুষ সেটাকে সমর্থন করে। কিন্তু বাস্তবে এটা কিন্তু একসময় পারবে না। এই যে সেদিন কে জানি বলল তাকে ২৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। দুইজনকে। ২৫ কেন ২৫০০ কোটি টাকাও দেওয়া হতে পারে। এখানে এমপির কিছুই করার নেই। এটা যাদের হাতে দেওয়া হয়েছে সেই কর্তৃপক্ষ সেই বিভাগ এটাই। হ্যাঁ এত বড় একটা আন্দোলন হয়ে যাওয়ার কারণেই আব্দুল্লাহকে ভয় করছে, মানুষও খুশি হচ্ছে, এইজন্যে কিছুটা কাজ হচ্ছে। এটাও ইয়ের কাজ আমি স্বীকার করি। কিন্তু ঐ যে দিনাজপুরের কি জানি নাম ওর সারজিস নাকি? সারজিস আলম। তিনি ১৫০-২০০ গাড়ি নিয়ে তাঁর এলাকায় যাওয়া ঠিক হয়নি। এবং যখন সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছে মানুষের মনে প্রশ্ন এসেছে তখন বলেছে আমার দাদার যা আছে এটা দিয়ে চলে যাবে। না তার দাদার কিছু নাই। তার বাবারও কিছু নাই। তারও কিছু নাই। তারা কিন্তু এখন সব মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ এগুলো নিয়ে ঘুরছে। লাখ টাকা ভাড়ার বাড়িতে এখন থাকে। লাখ টাকা খরচ করে। এইখানে হলো পার্থক্য আমাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর কর্মীদের মধ্যে।
রাশেদ আহমেদ: তোফায়েল আহমেদের কথা বলছিলেন...
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: এইজন্য তোফায়েল আহমেদের কথা বললাম। বাংলাদেশে তোফায়েল আহমেদের চাইতে প্রিয়, শক্তিমান যতক্ষণ পর্যন্ত শক্তি থাকে আইয়ুব ইয়াহইয়ার সময় আর কেউ ছিল না। এইজন্য তোফায়েল আহমেদের কথা বলছি।
রাশেদ আহমেদ: তাঁকে তো সংসদ ভবনে জানাজা দেয়া হয়নি।
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: আমি সে কথাটাই বলছি। আমাকে সেদিন জিজ্ঞাসা করেছিল আমি বলেছিলাম যে অনির্বাচিত ইউনুস সরকারের চাইতে যেনতেনভাবে নির্বাচিত তারেক রহমানের সরকার ভালো। আমি তারেক রহমানকে ৫ই আগস্ট ২৪ পর্যন্ত উনি যখন লন্ডনে ছিলেন তার আগে হাওয়া ভবন ছিল। কেন জানি আমি তাঁকে তাঁর কাজকর্ম সমর্থন করতে পারতাম না। কিন্তু একটা কথা সত্য যে ৫ই আগস্টের পরে শেখ হাসিনার পতনের পরে তাঁর কথা খুব একটা অপছন্দ করতে পারতেছি না। এই তোফায়েল আহমেদের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা করতে না দেওয়া, শহীদ মিনারে জানাজা করতে না দেওয়া, ভোলায় জানাজায় বাধা দেওয়া এই সমস্ত কারণে আমার খুব দুঃখ লেগেছে। আমি মনে করেছিলাম তারেক রহমান বিএনপির প্রধানমন্ত্রী হবেন না। তিনি দেশের সাধারণ মানুষের প্রধানমন্ত্রী হবেন। তিনি আমারও প্রধানমন্ত্রী হবেন। তিনি সবার প্রধানমন্ত্রী হবেন। এইখানে তাঁর স্খলন দেখছি। আমি একটা প্রস্তাব করেছি পরশুদিন যে সবাই মিলে সব দল মত মিলে তাকে জাতীয়ভাবে একটি শোকসভা পালন করা হোক। কারণ নায়ক বহু হয় কিন্তু মহানায়ক খুব বেশি নয়।
রাশেদ আহমেদ: তোফায়েল আহমেদের কথা বলছেন?
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: জি জি জি। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের একমাত্র নেতা যে ওরকম নেতা হবে না। তোফায়েল আহমেদ একমাত্র তার জায়গায়। এবং তোফায়েল আহমেদ না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। কারণ তোফায়েল আহমেদ না হলে ৬৯-এর গণআন্দোলন হতো না। গণআন্দোলন না হলে আগরতলা মামলা থেকে বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেতেন না। আর বঙ্গবন্ধু না থাকলে বাংলাদেশ হতো না। এই সমস্ত দিক থেকে তোফায়েল আহমেদকে খুবই গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত ছিল সেটা দেখা হয়নি। আরেকটি কথা আপনাকে আমি বলি যে আমরা এত সংকীর্ণ হয়ে গেছি অন্যকে আমরা স্বীকার করতে চাই না। আমাদের নেত্রী আওয়ামী লীগের নেত্রী এক সময় জিয়াউর রহমানকে ব্যঙ্গ করে বলতেন, জিয়াউর রহমান মৃত্যুর সময় ছেঁড়া গেঞ্জি আর ভাঙ্গা সুটকেস রেখে গিয়েছিলেন। এটা কি সত্য? উনি কি বলেছেন? শেখ হাসিনা বলেছেন এটা কিন্তু সত্য। জিয়াউর রহমান ভাঙ্গা সুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জি রেখে গেছেন কি না এটা আমরা অনেকেই জানি না। কিন্তু শেখ হাসিনা যে শতবার বলেছেন জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার সময় কি রেখে গিয়েছিলেন। ভাঙ্গা সুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জি কি বোঝাবার জন্য? এটা বোঝাবার জন্য যে খালেদা জিয়া তিনি অসৎ, দুর্নীতিবাজ। জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক রহমান অসৎ, দুর্নীতিবাজ। এটা যদি প্রমাণ হয় এটা যদি মেনেও নেই, তাহলে জিয়াউর রহমান তো দুর্নীতিবাজ না। জিয়াউর রহমান তো অসৎ না নাকি? যিনি একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে মারা যাওয়ার সময় তাঁর সম্পদ বলতে একটা ছেঁড়া গেঞ্জি বা কয়েকটা ছেঁড়া গেঞ্জি একটা ভাঙ্গা সুটকেস রেখে গেছেন। তাহলে এটা কিন্তু তার প্রশংসা করা হলো। তারেক রহমানের বদনাম করতে গিয়ে তারেক রহমানকে অসৎ দেখাতে গিয়ে বা খালেদা জিয়াকে অসৎ দেখাতে গিয়ে এটা কিন্তু একটা সততার বাংলাদেশে শ্রেষ্ঠ উদাহরণ তুলে ধরা হলো। তো সেই জন্য ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না।
রাশেদ আহমেদ: ইউনুস সরকারের সময় একটা চুক্তি করা হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নির্বাচনের তিন দিন আগে। সেই চুক্তিটা তো কন্টিনিউ হচ্ছে এখন।
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: এই চুক্তিটা কেউ পছন্দ করেনি। দেশের জন্য এটা ভালো নয়। আপনি ব্যবসা বাণিজ্য করবেন ওখানে আমি জানি যে সেখানে প্রায় সবকিছুতেই আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা করতে হবে তার মতামত নিতে হবে। এটা যদি সামরিক প্যাক করা হতো সেখানে না হয় বলা যেত বাধ্য। কিন্তু ওপেন বাণিজ্য চুক্তিতে কোনো অর্থ হয় না। আর একটা জিনিস জানবেন আমি খুব দুঃখিত আমি অধ্যাপক ইউনুসকে খুব ভালোবাসতাম। আমি অধ্যাপক ইউনুসকে খুব সাহায্য করেছি। তাঁর গ্রামীণ ব্যাংক যখন ভেঙে যাচ্ছিল এই সরকার গ্রামীণ ব্যাংকের উপর যখন খড়গহস্ত হয়েছিল তখন ডক্টর কামাল হোসেনের কথায় আমি অধ্যাপক ইউনুসের সঙ্গে অনেক দিন কাজ করেছি, অনেক ব্যাপারে সহযোগিতা করেছি। উনিও বলেছেন যে কাদের সিদ্দিকীর মতো একজন মানুষ আমার পাশে আসায় আমরা অনেক সাহসী হয়েছি, অনেক নিরাপদ বোধ করেছি। কিন্তু আমি সব ভুল করেছি। অধ্যাপক ইউনুস মানুষের জন্য না। অধ্যাপক ইউনুস সুদের জন্য হতে পারেন। রাষ্ট্রের জন্য না। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর কোনো রকমের জ্ঞান অভিজ্ঞতা নাই। তিনি একটা স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বানিয়েছিলেন নূরজাহান কি নাম যেন। আজকে এই যে হামে ৬০০-এর উপর লোক মারা গেছে বাচ্চা মারা গেছে, ফুল মারা গেছে। এর জন্য ৬০০ বার যদি অধ্যাপক ইউনুসকে ফাঁসি দেওয়া হয় তবুও আমি মনে করব কম শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তো এরকম প্রেক্ষাপটে দেশকে সুন্দর চালানোর জন্য তারেক রহমানের হাতে একটা সুযোগ এসেছে। উনি সে সুযোগটাকে বিএনপির প্রধানমন্ত্রী না হয়ে সকলের প্রধানমন্ত্রী হয়ে সে সুযোগটা কাজে লাগাবেন কি না সেটা তাঁর হাতে। কিন্তু এখন পর্যন্ত অধ্যাপক ইউনুস যেভাবে চালিয়েছেন তার চেয়ে শতগুণ ভালো চলছে।
রাশেদ আহমেদ: আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ আছে। যে দলটি আপনি একসময় করতেন তারপর তো ছেড়ে দিয়েছেন। সেই হিসেবে প্রেক্ষাপটটা আপনি বলেছেন। তো একটা রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে সেটাকে নিষিদ্ধ থাকা ভালো হবে নাকি রাজনৈতিক কার্যক্রমটা চলতে পারে?
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: যে রাজনৈতিক দল দেশের আইন মেনে চলে তাকে নিষিদ্ধ করার কোনো ক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই। আর যে দল সেই রাষ্ট্রটার জন্ম দেওয়ার বেদনার সাথে জড়িত। এই দলের কোনো কোনো মানুষ যদি অপরাধ করে থাকে তার বিচার হতে পারে। কিন্তু দলের বিচার না। দলকে নিষিদ্ধ করে অধ্যাপক ইউনুসও মারাত্মক ভুল করেছেন। সেটাকে বহাল রেখে তারেক রহমান ভুল করছেন। আমি বলতে পারি এটা থাকবে না এটা উঠে যাবে।
রাশেদ আহমেদ: কীভাবে উঠে যাবে?
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: উঠে যাবে। মানুষ উঠিয়ে দিবে। মানুষের উপরে বড় কিছু নাই। সবার উপরে মানুষ সত্য। আপনার আমার কথাটা এখন হয়তো অবাক লাগছে। কিন্তু আমি বলছি আপনাকে যে এটা উঠে যাবে। মানুষ উঠিয়ে দিবে। দেশ মানুষের। দেশ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের না। আওয়ামী লীগকে দাবিয়ে রাখতে পারবে এমনটা আমি কখনো মনে করি না। কিন্তু আওয়ামী লীগের এখনো সংশোধন হয়নি। আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মীরা বড় কষ্ট করতেছে ভীষণ কষ্ট করতেছে জেল খাটতেছে। কিন্তু যাদের জন্য জেল খাটছে যে হাইব্রিডদের জন্য জেল খাটছে তাদের উপলব্ধিতেই এটা নাই। তারা ভাবছে তারা সবচাইতে পপুলার এবং তাদের নেত্রী মাদার তেরেসার চাইতেও বড় মাতা। যিশু খ্রিস্টের মায়ের নাম জানি কি?
রাশেদ আহমেদ: মেরি।
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: মা মেরির থেকেও বড়। ২৪-এর অভ্যুত্থান যারা করেছেন তারা তোফায়েল আহমেদের মতো যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারতেন, মানুষের বিশ্বাস ধরে রাখতে পারতেন, মানুষের সাথে সদআচরণ করতেন, মব না করতেন, বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়ি না ভাঙতেন। এই সমস্ত কাজগুলো তাদের দু-বছরেও যারা তাদেরকে সমর্থন করেছে দু-বছরেও তাদের আস্থা রাখতে পারেননি। সাধারণ মানুষের আস্থাটা হচ্ছে সবচাইতে বড় জিনিস।
রাশেদ আহমেদ: শেষ করব আমরা। শেষ বার্তাটা কী জনগণের প্রতি, রাষ্ট্রের প্রতি আপনার?
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: জনগণের প্রতি শেষ বার্তা বলে আমার কিছু নেই। আমি একদম অধম মানুষ। জনগণের প্রতি অনুরোধ করার আমার আছে সেটা হচ্ছে জমির মালিকানা যে মালিক তাকে খাজনা পত্র দিয়ে দাখিলা এসব ঠিক রাখতে হয়। দেশের মালিক জনগণ। তারা কী পছন্দ করেন কি করেন না অন্তত মুখ ফুটে তাদের বলতে হবে। রাস্তাঘাটে তারা বললেই সে কথা আকাশে যাবে আসমানে যাবে আল্লাহর কাছে যাবে এবং সেটা অবশ্যই পালন হবে। আমার কাছে অনুরোধ দেশের মানুষ অন্যায়ভাবে না স্বাভাবিকভাবে তাদেরকে অবহেলা করার কারণে তাদের গুরুত্ব না যাওয়ার কারণে তারা কিছুটা দেশের প্রতি উদাসীন হয়েছে। দেশ আমার আপনার সকলের। নিজের সন্তানের প্রতি উদাসীন থাকলে সন্তান যেমন ভালো হয় না স্বাস্থ্য ভালো থাকে না বিদ্যা বুদ্ধি ঠিক হয় না ঠিক তেমনি দেশের প্রতি উদাসীন থাকলেও দেশ ভালো চলতে পারে না।
রাশেদ আহমেদ: আপনাকে ধন্যবাদ, সময় দেয়ার জন্য।
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: আপনাকেও ধন্যবাদ কথাগুলো বলতে দেয়ার জন্য।

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুন ২০২৬
বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি। দেশ, রাজনীতি এবং সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে তার সাথে কথা বলেছেন সংবাদ ডিজিটাল বিভাগের বার্তা প্রধান রাশেদ আহমেদ। সাক্ষাৎকারটি হুবহু তুলে ধরা হলো।
রাশেদ আহমেদ: শুরু করি বর্তমান অবস্থা দিয়েই। ২৪-এ বাংলাদেশে একটি বড় রেজিম পরিবর্তন হলো।তারপর থেকে দেখা গেল যে মুক্তিযুদ্ধকে অপমান অপদস্থ করা হচ্ছে। কেন সেটি?
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: স্বাধীনতার ৫৪-৫৫ বছর পর এরকম একটি বিপর্যয়, নিশ্চয়ই হেতু ছিল, কারণ ছিল। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, পাকিস্তানি হানাদারদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করেছি, আমরা অতটা সচেতন হয়ে অনেকেই চলিনি। আপনি যদি খোলাখুলি দেখেন তাহলে দেখবেন, মুক্তিযোদ্ধার ছেলেরা, সন্তানেরা খুব একটা লেখাপড়া করেনি। অন্যদিকে পরাজিত শত্রু যারা—রাজাকার, আল-বদর, রাজনৈতিকভাবে জামায়াত—তারা কোণঠাসা হওয়ার কারণে তারা মাটি কামড়ে আর কিছু না হোক লেখাপড়া করার চেষ্টা করেছে। তারা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করেছে। আপনি রাস্তাঘাটে যত ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক দেখবেন, সেখানে জামায়াতের নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব। সেই দিক থেকে চিন্তা করলে আমাদের উদাসীনতা, অলসতা অনেক ক্ষেত্রে দায়ী। আরেকটা জিনিস, ৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়া ছিল অবধারিত। এখানে কোনো লুকোচুরি ছিল না। পৃথিবীর সমস্ত পরাশক্তিকে পরাজিত করে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনেছি। সেই সময় ভারত এবং রাশিয়া ছাড়া আমাদের পিছনে কোনো শক্তি এসে দাঁড়ায় নাই, সহযোগিতা করেনি। তাই সারা পৃথিবীর বৃহত্তর শক্তিকে পরাজিত করে যিনি বিজয়ী হন, তাঁকে মৃত্যুবরণ করতেই হয়। এবং সেটা করেছেন বঙ্গবন্ধু। এর কোনো বিকল্প ছিল না। কিন্তু আমরা তেমন বুঝবার চেষ্টা করি নাই। এটা কারো ব্যক্তিগত খেয়ালখুশি না। এটা একটা একেবারে বিশ্ব রাজনীতির পরিচিত একটা খেলা। সে কারণে বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছেন ৭৫ সালে। রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে, তারই ধারাবাহিকতা আজকের এই সময়।
রাশেদ আহমেদ: কিন্তু ২৪-এর অভ্যুত্থানের পরে আঘাতটা বেশি মুক্তিযুদ্ধের ওপরে হলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপরে হলো। আপনার বড় ভাই নিজে অপমানিত হলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে যুক্ত হতে গিয়ে। আপনাকেও মাঝে মাঝে বিভিন্ন সময়ে অপমানিত হতে হয়েছে। এই পরিবর্তনটা হলো কেন?
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: এ পরিবর্তন অস্বাভাবিক কিছু নয়। সেখানে যেমন আমাদের দুর্বলতা আছে, অলসতা আছে। পরাজিত শক্তির—যে একবার পরাজিত হয় সে জিতবার জন্য সব সময় চেষ্টা করে। কিন্তু যে বিজয়ী হয়, তার বিজয় ধরে রাখার জন্য যতটুকু করা দরকার, অনেক ক্ষেত্রে ততখানি করা হয় না। এবং সেটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও হয়েছে। তো সেই জন্য আপনাকে বলব এটা নতুন কিছু না। আমাদের যেটুকু ভুল আছে সেটুকু বোঝা উচিত ছিল। এখনো ততটা বোঝা হচ্ছে বলে আমার মনে হয় না।
রাশেদ আহমেদ: আপনি কি বর্তমান সরকারের কথা বলছেন?
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: না, শুধু সরকার না। আমি কখনো শুধু সরকার নিয়ে চিন্তা করি নাই। আমি সবগুলা মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই চিন্তা করেছি, দেশের সামগ্রিকভাবে সকল মানুষ নিয়ে চিন্তা করেছি। সেই জন্যে শুধু সরকারকে সব ব্যাপারে দায়িত্ব দেব এটা আমার কথা না, আমার ইচ্ছাও নয়, আমার চেতনাও নয়।
রাশেদ আহমেদ: সরকারকে দায়িত্ব দিচ্ছেন না, দায় দিচ্ছেন না ঠিক আছে। কিন্তু এখন করণীয়টা কী? আপনাদের মুক্তিযোদ্ধারা যাঁরা...
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: আমি কিন্তু সরকারের দায়িত্বকে বাদ দিচ্ছি না। কিন্তু সব দায়িত্ব সরকারের—এইটা বলছি না। আমি কখনো কখনো লক্ষ্য করি, আমার যেকোনো কথাকেই এদিক ওদিক টানা হয়। স্বাভাবিক অর্থে আমি যেটা বলতে চাই, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেটাকে যাঁরা শুনতে চান বা শোনাতে চান, তাঁরা তাঁদের মতো করে এর অর্থ বের করতে চান। সেই জন্য বলছি, সামগ্রিকভাবে আমাদের মানসিক, মানবিক উন্নয়ন না হলে অনেকগুলো সমস্যা অতিক্রম করা কঠিন। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের চরিত্রের যে উন্নতি হয়েছিল, পৃথিবীর কোনো দেশে এরকম উন্নতি হয় কি না জানি না। একজন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোককে যদি পাকিস্তানি হানাদাররা ধরে নিয়ে যেত, তাকে মারতে মারতে মারতে অপমান করতে করতে মেরে ফেললেও তাকে দিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে সমর্থন করাতে পারত না। যারা বাংলাদেশ চেয়েছে তারা জয় বাংলা বলেছে। যারা পাকিস্তান চেয়েছে তারা জিন্দাবাদ বলেছে। বাঙালির জয় বাংলা আর পাকিস্তানের জিন্দাবাদ। আমি নিজে দেখেছি দুই একজন পাকিস্তানের সমর্থক, গুপ্তচরবৃত্তি বা অন্য কোনো কাজে পাকিস্তানের আমাদের কাছে পাঠালে, ধরা পড়লে আপ্রাণ চেষ্টা করেও তাদের জয় বাংলা বলাতে পারিনি। জয় বাংলা বলেওনি। ঠিক তেমনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকেদের পাকিস্তানিরা ধরে মেরে ফেলেছে, পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলাতে পারেনি। কিন্তু আজকে জিন্দাবাদ আর জয় বাংলার কোনটা কী, কোনটা কী অনুভূতি, কোনটা হৃদয়ে ধারণ করতে হয়, কোনটাকে বর্জন করতে হয়—আমাদের মধ্যে এর বোধশক্তি অনেক লোপ পেয়েছে।
রাশেদ আহমেদ: নতুন একটি স্লোগান এসেছে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ নামে, যেটি ২৪-এর পরবর্তীতে আমরা শুনেছি।
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: ইনকিলাবটা ভালো কথা। যেমনি অনেকেই জানে কি না জানি না—রাজাকার। অত্যন্ত ভালো কথা। রাজাকার মুসলমানদের সাহায্যকারী। মদিনায় যারা সাহায্য করেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে, তাদেরকে রাজাকার বলা হয়েছে। সেই রাজাকার বাংলাদেশে হয়েছিল সবচাইতে নিকৃষ্ট ঘৃণিত। এবং তারা ঘৃণার কাজই করেছিল। সেই জন্য সবকিছু আবরণের নিচে থাকলেই সব না। রাজাকার, আল বদর, আল শামস এগুলোকে তৈরি করে জামায়াত যদি পাকিস্তানের পক্ষ না নিত, তাহলে জামায়াতের অবস্থা এরকম থাকত না। পাকিস্তান যখন সৃষ্টি হয়েছে ভারত—কী বলে—ব্রিটিশের কাছ থেকে ভারত এবং পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্র। তখন আমরা যারা জান প্রাণ দিয়ে আমাদের বাপ দাদারা পাকিস্তানের পক্ষে লড়াই করেছে, সেই সময় পাকিস্তানের জামায়াতের নেতা আবুল আলা মওদুদী ব্রিটিশের পক্ষ নিয়েছেন। আবার আমরা যারা পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছি, তখন কিন্তু এরা বাংলাদেশের পক্ষে না গিয়ে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছেন। পক্ষের জন্য আমি অতটা অভিযুক্ত করব না। কিন্তু আরও পক্ষ নিয়েছিল নেজামে ইসলাম নিয়েছিল, মুসলিম লীগ নিয়েছিল আরও ছোটখাটো দল এটা নিয়েছিল। কিন্তু জামায়াতের মতো সশস্ত্র ক্যাডার তৈরি করে বাড়িঘর ধ্বংস করা, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া, মানুষকে হত্যা করা, মা বোনদেরকে পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে তুলে দিয়ে ইজ্জত সম্ভ্রম নষ্ট করা—এটা না করলেও পারতেন। এটা না করলে রাজনৈতিক সাপোর্ট করলে এতটা বলার ছিল না। এখন অনেকে বলছে জামায়াতরা ভাবছে বিরোধী দল হয়েছে। না, এটাই শেষ কথা না। বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে জামায়াত কখনো জায়গা করতে পারবে না। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ যেভাবে ক্ষমা করেন, যেভাবে চাইলে ক্ষমা করেন, বাংলার মানুষের কাছে জামায়াতকে তার চাইতেও গভীরভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। তারপরে ক্ষমা করবে কি না সেটা পরের কথা। এখন যেগুলো হচ্ছে এগুলো বানানো জিনিস।
রাশেদ আহমেদ: যেমন?
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: যেমন কী শেখ হাসিনাকে বিতাড়িত করা। হয়তো যখন শেখ হাসিনার পতন হয়েছে তখন ব্যাপারটা বোঝা যায় নাই।
রাশেদ আহমেদ: আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপনার কী হয়েছিল? শেখ হাসিনার সঙ্গে যেহেতু আপনি বলছিলেন যে ভাই-বোনের সম্পর্ক, বঙ্গবন্ধুকে আপনি পিতা হিসেবে জানেন, বঙ্গবন্ধু আপনাকে সন্তানসমতুল্য মনে করতেন। তারপর আওয়ামী লীগ ছেড়ে দিলেন, আপনি নতুন পার্টি করলেন।
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: আপনার এটা সত্য কথা যে বঙ্গবন্ধু আমাকে সন্তানের মতো দেখতেন। আমিও তাঁকে পিতার মতো দেখতাম। দেখতাম না, দেখি আমি। আমার জন্মদাতা পিতা, তাঁর জন্য আমি যা করতে পারি বঙ্গবন্ধুর জন্য পারি। বঙ্গবন্ধু আমার রাজনৈতিক পিতা। বঙ্গবন্ধুর জন্যই আমি দেশকে চিনেছি। যদি আমাকে কোনো ভালো বলেন তাহলে দুজন মানুষ, একজন হলো আমার মা একজন বঙ্গবন্ধু। এখানে আমি আওয়ামী লীগ ছাড়ি নাই। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ, মাওলানা ভাসানীর আওয়ামী লীগ, শামসুল হক-এর আওয়ামী লীগ আমি ছাড়ি নাই। মুক্তিযুদ্ধের আওয়ামী লীগ আমি ছাড়ি নাই। স্বাধীনতার আওয়ামী লীগ আমি ছাড়ি নাই। আমি ছাড়ছি আমার বোন শেখ হাসিনার নেতৃত্বের আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে আমি অনেক পার্থক্য দেখতে পেয়েছি। বঙ্গবন্ধুর সময় সাধারণ কর্মীদের সম্মান ছিল, মূল্য ছিল। শেখ হাসিনার শাসন আমলের শেষ দিক পর্যন্ত... শেষে একেবারে শেষে... সাধারণ আওয়ামী লীগের কোনো মূল্য ছিল না। মূল্য ছিল হাইব্রিড আওয়ামী লীগের। যাদের টাকা আছে, যারা টাই পরে তাদের। গ্রামের বউয়ের দুল বিক্রি করে যারা দল করত, নেতাদের খাওয়াত, তাদের কোনো দাম ছিল না। আর আমি একটা বেকুব মানুষ, কোনো কথা বললে সেটাকে পালন না করে আমি থাকতে পারি না। স্বস্তি পাই না। আমার মনে হয়েছিল আওয়ামী লীগ এতকাল যে কথা দিয়ে এসেছে, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে সেটা করতে পারছেন না অথবা করতে চাচ্ছেন না। তিনি কিছু চাটুকারের দ্বারা বন্দি হয়ে গেছেন। কিছু কেন অনেক চাটুকারের দ্বারা। মানুষের প্রতি তাদের মায়া মমতা নেই। আমি মনে করি রাজনীতি হলো জনসেবা। আমি জনগণকে শক্তি দেখানো রাজনীতি মনে করি না। আমাকে কেউ গালাগাল করলে আমার কিছুই মনে হয় না।
রাশেদ আহমেদ: তাহলে আওয়ামী লীগ ছেড়ে যাওয়া মূলত যেই আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর ছিল সেটি নেই।
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: মূলত আমার আওয়ামী লীগ ত্যাগ করা—আওয়ামী লীগ যেটা ছিল, আওয়ামী লীগের যে ওয়াদা সেগুলোকে পালন করা হয়নি সেইভাবে। চেষ্টাও করা হয়নি। এবং আওয়ামী লীগের জনগণকে যে পরিমাণ সম্মান করার কথা তার থেকে অনেক কম সম্মান করেছে। শুধু শেখ হাসিনাকে বললেই হবে না। তাঁর অনেক কর্মীরা রাজনীতির যোগ্য না। এবং একটা জিনিস জানবেন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সবচাইতে গুরুতর অন্যায় হয়েছে নির্বাচনী পদ্ধতিটাকে নষ্ট করে দেওয়া। মানুষ নিজের ইচ্ছায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষ ভোট দিতে পারে নাই। ৩০ লক্ষ জনগণ যে শহীদ হয়েছে মানুষ, সাধারণ মানুষ। ৩০ লক্ষ কিন্তু যোদ্ধা শহীদ হয়নি, সাধারণ মানুষ শহীদ হয়েছে। সেই যে শহীদ, এটা কিন্তু ভোট না দিতে পারার জন্যে। বাংলাদেশ হয়তো স্বাধীন হতো আরও পরে হতো ২০ বছর পরে ৩০ বছর পরে। যদি সত্তরের নির্বাচনী রায় পাকিস্তানিরা মেনে নিত, তাহলে না হয় আরও ২০ বছর অপেক্ষা করতে হতো স্বাধীনতার জন্যে। এবং শেখ হাসিনার হাত দিয়ে যে-ই করে থাকুন, নির্বাচনটাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল।
রাশেদ আহমেদ: পতনটা কী কারণে আওয়ামী লীগের? যেটা ২৪-এ...
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: পতনটা মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া। আপনি এখন যা যে যা বলেন, তাঁকে উৎখাত করে যারা এসেছেন তারা তার চাইতে অনেক খারাপ করেছেন। এই জন্য আজকে দেশের অবস্থা এই। ১ জুন তোফায়েল আহমেদ মারা গেছে। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ। ৬৯ সালে বা ৭০ সালে উনি যদি বাংলাদেশটা চাইতেন নিয়ে নিতে পারতেন। ৬৯ সালের পরে উনি টাঙ্গাইলে গেছেন, তখনকার দিনের সবচাইতে ভালো গাড়িতে যান নাই, বাসে করেই গেছেন। আমাদের সম্মেলনে উনি বাসে করে গেছেন। আর এখানে এখনকার যারা কি জানি নাম সারজিস তারপর ঐ যে... হাসনাত আব্দুল্লাহ, নাহিদ। হাসনাত আব্দুল্লাহকে আমি পরে বলব, এখনো সে চেষ্টা করছে। যদিও তার চেষ্টায় কিছু কিছু তো ত্রুটি আছেই থাকেই এটা। আমি যদি এমপি হয়ে রাস্তা খুঁড়তে যেতাম কত ইঞ্চি দিছে, মানুষ সেটাকে বলত এই কাদের সিদ্দিকী এটা তো তোর কাজ না, তোর কাজ উপরে বইসা রাস্তা আইসা তোর রাস্তা দেখার কাজ না। কিন্তু আব্দুল্লাহ যে রাস্তা দেখতে গেছেন অধিকাংশ মানুষ সেটাকে সমর্থন করে। কিন্তু বাস্তবে এটা কিন্তু একসময় পারবে না। এই যে সেদিন কে জানি বলল তাকে ২৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। দুইজনকে। ২৫ কেন ২৫০০ কোটি টাকাও দেওয়া হতে পারে। এখানে এমপির কিছুই করার নেই। এটা যাদের হাতে দেওয়া হয়েছে সেই কর্তৃপক্ষ সেই বিভাগ এটাই। হ্যাঁ এত বড় একটা আন্দোলন হয়ে যাওয়ার কারণেই আব্দুল্লাহকে ভয় করছে, মানুষও খুশি হচ্ছে, এইজন্যে কিছুটা কাজ হচ্ছে। এটাও ইয়ের কাজ আমি স্বীকার করি। কিন্তু ঐ যে দিনাজপুরের কি জানি নাম ওর সারজিস নাকি? সারজিস আলম। তিনি ১৫০-২০০ গাড়ি নিয়ে তাঁর এলাকায় যাওয়া ঠিক হয়নি। এবং যখন সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছে মানুষের মনে প্রশ্ন এসেছে তখন বলেছে আমার দাদার যা আছে এটা দিয়ে চলে যাবে। না তার দাদার কিছু নাই। তার বাবারও কিছু নাই। তারও কিছু নাই। তারা কিন্তু এখন সব মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ এগুলো নিয়ে ঘুরছে। লাখ টাকা ভাড়ার বাড়িতে এখন থাকে। লাখ টাকা খরচ করে। এইখানে হলো পার্থক্য আমাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর কর্মীদের মধ্যে।
রাশেদ আহমেদ: তোফায়েল আহমেদের কথা বলছিলেন...
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: এইজন্য তোফায়েল আহমেদের কথা বললাম। বাংলাদেশে তোফায়েল আহমেদের চাইতে প্রিয়, শক্তিমান যতক্ষণ পর্যন্ত শক্তি থাকে আইয়ুব ইয়াহইয়ার সময় আর কেউ ছিল না। এইজন্য তোফায়েল আহমেদের কথা বলছি।
রাশেদ আহমেদ: তাঁকে তো সংসদ ভবনে জানাজা দেয়া হয়নি।
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: আমি সে কথাটাই বলছি। আমাকে সেদিন জিজ্ঞাসা করেছিল আমি বলেছিলাম যে অনির্বাচিত ইউনুস সরকারের চাইতে যেনতেনভাবে নির্বাচিত তারেক রহমানের সরকার ভালো। আমি তারেক রহমানকে ৫ই আগস্ট ২৪ পর্যন্ত উনি যখন লন্ডনে ছিলেন তার আগে হাওয়া ভবন ছিল। কেন জানি আমি তাঁকে তাঁর কাজকর্ম সমর্থন করতে পারতাম না। কিন্তু একটা কথা সত্য যে ৫ই আগস্টের পরে শেখ হাসিনার পতনের পরে তাঁর কথা খুব একটা অপছন্দ করতে পারতেছি না। এই তোফায়েল আহমেদের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা করতে না দেওয়া, শহীদ মিনারে জানাজা করতে না দেওয়া, ভোলায় জানাজায় বাধা দেওয়া এই সমস্ত কারণে আমার খুব দুঃখ লেগেছে। আমি মনে করেছিলাম তারেক রহমান বিএনপির প্রধানমন্ত্রী হবেন না। তিনি দেশের সাধারণ মানুষের প্রধানমন্ত্রী হবেন। তিনি আমারও প্রধানমন্ত্রী হবেন। তিনি সবার প্রধানমন্ত্রী হবেন। এইখানে তাঁর স্খলন দেখছি। আমি একটা প্রস্তাব করেছি পরশুদিন যে সবাই মিলে সব দল মত মিলে তাকে জাতীয়ভাবে একটি শোকসভা পালন করা হোক। কারণ নায়ক বহু হয় কিন্তু মহানায়ক খুব বেশি নয়।
রাশেদ আহমেদ: তোফায়েল আহমেদের কথা বলছেন?
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: জি জি জি। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের একমাত্র নেতা যে ওরকম নেতা হবে না। তোফায়েল আহমেদ একমাত্র তার জায়গায়। এবং তোফায়েল আহমেদ না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। কারণ তোফায়েল আহমেদ না হলে ৬৯-এর গণআন্দোলন হতো না। গণআন্দোলন না হলে আগরতলা মামলা থেকে বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেতেন না। আর বঙ্গবন্ধু না থাকলে বাংলাদেশ হতো না। এই সমস্ত দিক থেকে তোফায়েল আহমেদকে খুবই গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত ছিল সেটা দেখা হয়নি। আরেকটি কথা আপনাকে আমি বলি যে আমরা এত সংকীর্ণ হয়ে গেছি অন্যকে আমরা স্বীকার করতে চাই না। আমাদের নেত্রী আওয়ামী লীগের নেত্রী এক সময় জিয়াউর রহমানকে ব্যঙ্গ করে বলতেন, জিয়াউর রহমান মৃত্যুর সময় ছেঁড়া গেঞ্জি আর ভাঙ্গা সুটকেস রেখে গিয়েছিলেন। এটা কি সত্য? উনি কি বলেছেন? শেখ হাসিনা বলেছেন এটা কিন্তু সত্য। জিয়াউর রহমান ভাঙ্গা সুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জি রেখে গেছেন কি না এটা আমরা অনেকেই জানি না। কিন্তু শেখ হাসিনা যে শতবার বলেছেন জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার সময় কি রেখে গিয়েছিলেন। ভাঙ্গা সুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জি কি বোঝাবার জন্য? এটা বোঝাবার জন্য যে খালেদা জিয়া তিনি অসৎ, দুর্নীতিবাজ। জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক রহমান অসৎ, দুর্নীতিবাজ। এটা যদি প্রমাণ হয় এটা যদি মেনেও নেই, তাহলে জিয়াউর রহমান তো দুর্নীতিবাজ না। জিয়াউর রহমান তো অসৎ না নাকি? যিনি একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে মারা যাওয়ার সময় তাঁর সম্পদ বলতে একটা ছেঁড়া গেঞ্জি বা কয়েকটা ছেঁড়া গেঞ্জি একটা ভাঙ্গা সুটকেস রেখে গেছেন। তাহলে এটা কিন্তু তার প্রশংসা করা হলো। তারেক রহমানের বদনাম করতে গিয়ে তারেক রহমানকে অসৎ দেখাতে গিয়ে বা খালেদা জিয়াকে অসৎ দেখাতে গিয়ে এটা কিন্তু একটা সততার বাংলাদেশে শ্রেষ্ঠ উদাহরণ তুলে ধরা হলো। তো সেই জন্য ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না।
রাশেদ আহমেদ: ইউনুস সরকারের সময় একটা চুক্তি করা হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নির্বাচনের তিন দিন আগে। সেই চুক্তিটা তো কন্টিনিউ হচ্ছে এখন।
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: এই চুক্তিটা কেউ পছন্দ করেনি। দেশের জন্য এটা ভালো নয়। আপনি ব্যবসা বাণিজ্য করবেন ওখানে আমি জানি যে সেখানে প্রায় সবকিছুতেই আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা করতে হবে তার মতামত নিতে হবে। এটা যদি সামরিক প্যাক করা হতো সেখানে না হয় বলা যেত বাধ্য। কিন্তু ওপেন বাণিজ্য চুক্তিতে কোনো অর্থ হয় না। আর একটা জিনিস জানবেন আমি খুব দুঃখিত আমি অধ্যাপক ইউনুসকে খুব ভালোবাসতাম। আমি অধ্যাপক ইউনুসকে খুব সাহায্য করেছি। তাঁর গ্রামীণ ব্যাংক যখন ভেঙে যাচ্ছিল এই সরকার গ্রামীণ ব্যাংকের উপর যখন খড়গহস্ত হয়েছিল তখন ডক্টর কামাল হোসেনের কথায় আমি অধ্যাপক ইউনুসের সঙ্গে অনেক দিন কাজ করেছি, অনেক ব্যাপারে সহযোগিতা করেছি। উনিও বলেছেন যে কাদের সিদ্দিকীর মতো একজন মানুষ আমার পাশে আসায় আমরা অনেক সাহসী হয়েছি, অনেক নিরাপদ বোধ করেছি। কিন্তু আমি সব ভুল করেছি। অধ্যাপক ইউনুস মানুষের জন্য না। অধ্যাপক ইউনুস সুদের জন্য হতে পারেন। রাষ্ট্রের জন্য না। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর কোনো রকমের জ্ঞান অভিজ্ঞতা নাই। তিনি একটা স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বানিয়েছিলেন নূরজাহান কি নাম যেন। আজকে এই যে হামে ৬০০-এর উপর লোক মারা গেছে বাচ্চা মারা গেছে, ফুল মারা গেছে। এর জন্য ৬০০ বার যদি অধ্যাপক ইউনুসকে ফাঁসি দেওয়া হয় তবুও আমি মনে করব কম শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তো এরকম প্রেক্ষাপটে দেশকে সুন্দর চালানোর জন্য তারেক রহমানের হাতে একটা সুযোগ এসেছে। উনি সে সুযোগটাকে বিএনপির প্রধানমন্ত্রী না হয়ে সকলের প্রধানমন্ত্রী হয়ে সে সুযোগটা কাজে লাগাবেন কি না সেটা তাঁর হাতে। কিন্তু এখন পর্যন্ত অধ্যাপক ইউনুস যেভাবে চালিয়েছেন তার চেয়ে শতগুণ ভালো চলছে।
রাশেদ আহমেদ: আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ আছে। যে দলটি আপনি একসময় করতেন তারপর তো ছেড়ে দিয়েছেন। সেই হিসেবে প্রেক্ষাপটটা আপনি বলেছেন। তো একটা রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে সেটাকে নিষিদ্ধ থাকা ভালো হবে নাকি রাজনৈতিক কার্যক্রমটা চলতে পারে?
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: যে রাজনৈতিক দল দেশের আইন মেনে চলে তাকে নিষিদ্ধ করার কোনো ক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই। আর যে দল সেই রাষ্ট্রটার জন্ম দেওয়ার বেদনার সাথে জড়িত। এই দলের কোনো কোনো মানুষ যদি অপরাধ করে থাকে তার বিচার হতে পারে। কিন্তু দলের বিচার না। দলকে নিষিদ্ধ করে অধ্যাপক ইউনুসও মারাত্মক ভুল করেছেন। সেটাকে বহাল রেখে তারেক রহমান ভুল করছেন। আমি বলতে পারি এটা থাকবে না এটা উঠে যাবে।
রাশেদ আহমেদ: কীভাবে উঠে যাবে?
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: উঠে যাবে। মানুষ উঠিয়ে দিবে। মানুষের উপরে বড় কিছু নাই। সবার উপরে মানুষ সত্য। আপনার আমার কথাটা এখন হয়তো অবাক লাগছে। কিন্তু আমি বলছি আপনাকে যে এটা উঠে যাবে। মানুষ উঠিয়ে দিবে। দেশ মানুষের। দেশ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের না। আওয়ামী লীগকে দাবিয়ে রাখতে পারবে এমনটা আমি কখনো মনে করি না। কিন্তু আওয়ামী লীগের এখনো সংশোধন হয়নি। আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মীরা বড় কষ্ট করতেছে ভীষণ কষ্ট করতেছে জেল খাটতেছে। কিন্তু যাদের জন্য জেল খাটছে যে হাইব্রিডদের জন্য জেল খাটছে তাদের উপলব্ধিতেই এটা নাই। তারা ভাবছে তারা সবচাইতে পপুলার এবং তাদের নেত্রী মাদার তেরেসার চাইতেও বড় মাতা। যিশু খ্রিস্টের মায়ের নাম জানি কি?
রাশেদ আহমেদ: মেরি।
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: মা মেরির থেকেও বড়। ২৪-এর অভ্যুত্থান যারা করেছেন তারা তোফায়েল আহমেদের মতো যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারতেন, মানুষের বিশ্বাস ধরে রাখতে পারতেন, মানুষের সাথে সদআচরণ করতেন, মব না করতেন, বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়ি না ভাঙতেন। এই সমস্ত কাজগুলো তাদের দু-বছরেও যারা তাদেরকে সমর্থন করেছে দু-বছরেও তাদের আস্থা রাখতে পারেননি। সাধারণ মানুষের আস্থাটা হচ্ছে সবচাইতে বড় জিনিস।
রাশেদ আহমেদ: শেষ করব আমরা। শেষ বার্তাটা কী জনগণের প্রতি, রাষ্ট্রের প্রতি আপনার?
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: জনগণের প্রতি শেষ বার্তা বলে আমার কিছু নেই। আমি একদম অধম মানুষ। জনগণের প্রতি অনুরোধ করার আমার আছে সেটা হচ্ছে জমির মালিকানা যে মালিক তাকে খাজনা পত্র দিয়ে দাখিলা এসব ঠিক রাখতে হয়। দেশের মালিক জনগণ। তারা কী পছন্দ করেন কি করেন না অন্তত মুখ ফুটে তাদের বলতে হবে। রাস্তাঘাটে তারা বললেই সে কথা আকাশে যাবে আসমানে যাবে আল্লাহর কাছে যাবে এবং সেটা অবশ্যই পালন হবে। আমার কাছে অনুরোধ দেশের মানুষ অন্যায়ভাবে না স্বাভাবিকভাবে তাদেরকে অবহেলা করার কারণে তাদের গুরুত্ব না যাওয়ার কারণে তারা কিছুটা দেশের প্রতি উদাসীন হয়েছে। দেশ আমার আপনার সকলের। নিজের সন্তানের প্রতি উদাসীন থাকলে সন্তান যেমন ভালো হয় না স্বাস্থ্য ভালো থাকে না বিদ্যা বুদ্ধি ঠিক হয় না ঠিক তেমনি দেশের প্রতি উদাসীন থাকলেও দেশ ভালো চলতে পারে না।
রাশেদ আহমেদ: আপনাকে ধন্যবাদ, সময় দেয়ার জন্য।
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী: আপনাকেও ধন্যবাদ কথাগুলো বলতে দেয়ার জন্য।

আপনার মতামত লিখুন