অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন কেন সরাসরি যুদ্ধে জড়ায় না? হাজার বছরের দর্শন, কনফুসিয়াসের সম্প্রীতি আর সান জু-এর কৌশল- শেখায় কীভাবে ‘লড়াই না করেই জিততে হয়’।
বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে চীন আজ এক অনন্য শক্তি। একদিকে অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তি, অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বের মতো কোনো বড় যুদ্ধে জড়ানোর ইতিহাস সাম্প্রতিক অতীতে নেই। এই ‘শান্ত অথচ প্রভাবশালী’ আচরণের পেছনে রয়েছে হাজার বছরের দর্শন, রাজনৈতিক বিবর্তন ও একটি সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ছক।
চীনা ও মার্কিন রাজনীতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। চীন একদলীয় সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দেশ। যেখানে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সব সিদ্ধান্ত নেয়। যোগ্যতাভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি অনুসরণ করে তারা। ‘চীনা বৈশিষ্ট্যযুক্ত সমাজতন্ত্র’- রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণে বাজার অর্থনীতি চলে। সমষ্টির স্বার্থ এখানে আগে।
আর যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে ভিন্ন। দ্বিদলীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র, জনগণের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। সম্পূর্ণ মুক্তবাজার ও পুঁজিবাদী অর্থনীতি। ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মানবাধিকার সবার ওপরে। চীনের বৈদেশিক নীতির মূল ভিত্তি হচ্ছে, ‘বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নয়’। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার চর্চা না করা। আফ্রিকার একনায়কতন্ত্র হোক বা মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্র- চীনের নীতি স্পষ্ট- “আমরা ব্যবসা করব, তোমাদের রাজনীতি তোমাদের।”
বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সড়ক, বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে দিচ্ছে চীন। সামরিকভাবে দখল না করে অর্থনৈতিকভাবে দেশগুলোকে নিজেদের ওপর নির্ভরশীল করছে তারা। সম্প্রতি সৌদি আরব ও ইরানের দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক কূটনীতির টেবিলে বসিয়ে জোড়া লাগিয়েছে চীন।
যুক্তরাষ্ট্র যেখানে গত কয়েক দশকে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়ায় যুদ্ধ করেছে, চীন শেষ বড় যুদ্ধে জড়িয়েছিল ১৯৭৯ সালে। ভিয়েতনামের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে। কারণ সহজ, চীনের ইতিহাস আক্রমণাত্মক নয়, প্রতিরক্ষামূলক। গ্রেট ওয়াল তৈরি হয়েছিল বাইরের আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য, অন্য দেশ দখল করার জন্য নয়।
চীনারা বিশ্বাস করে তাদের দেশ ‘তিয়ানঝিয়া’ বা আকাশের নিচের কেন্দ্রবিন্দু। তাদের ধারণা, চীন নিজেই এত সমৃদ্ধ যে বাইরের জগৎ জয় করার প্রয়োজন নেই। চীনা সমাজের রন্ধ্রে মিশে আছে কনফুসিয়াসের দর্শন- যুদ্ধ বা বিশৃঙ্খলার চেয়ে ‘সামাজিক সম্প্রীতি’, ‘শৃঙ্খলা’ ও ‘ধৈর্য’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সান জু-এর বিখ্যাত ‘আর্ট অব ওয়ার’ বইয়ে লেখা, “লড়াই না করে শত্রুকে পরাস্ত করাই সর্বোচ্চ বীরত্ব।” চীনের মনস্তত্ত্ব হলো, যুদ্ধ করলে নিজেদের সম্পদ ও জনবল ক্ষয় হয়। তাই তারা প্রতিপক্ষকে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে এমনভাবে কোণঠাসা করতে চায় যেন যুদ্ধ ছাড়াই জয় নিশ্চিত হয়।
চীন জানে একটি যুদ্ধ তাদের চার দশকের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক অলৌকিক উত্থান ধূলিসাৎ করতে পারে। তাদের মূল লক্ষ্য ২০৪৯ সালের মধ্যে (বিপ্লবের শতবর্ষ) বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়া। যুদ্ধ বড় বিনিয়োগ নয়, বরং অর্থনীতি ধ্বংসের নাম।
চীন প্রথাগত বোমা-বারুদের যুদ্ধ এড়িয়ে ভিন্ন মাত্রার যুদ্ধ লড়ছে- যেগুলো হচ্ছে, সাইবার যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর চিপের নিয়ন্ত্রণ এবং গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে আধিপত্য। একে বলা হয় ‘রক্তপাতহীন যুদ্ধ’।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বরাজনীতি যদি হয় ‘সামরিক শক্তির জোরে আধিপত্য’, তবে চীনের কৌশল হলো ‘অর্থনৈতিক জালের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার’। চীন কাপুরুষ বা দুর্বল বলে যুদ্ধ এড়ায় না- তারা যুদ্ধকে অলাভজনক মনে করে। অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণের যে সুদূরপ্রসারী চাল ড্রাগন খেলছে, সেখানে বন্দুকের গুলির চেয়ে ডলার ও প্রযুক্তির ধার অনেক বেশি কার্যকরী।

শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬
অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন কেন সরাসরি যুদ্ধে জড়ায় না? হাজার বছরের দর্শন, কনফুসিয়াসের সম্প্রীতি আর সান জু-এর কৌশল- শেখায় কীভাবে ‘লড়াই না করেই জিততে হয়’।
বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে চীন আজ এক অনন্য শক্তি। একদিকে অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তি, অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বের মতো কোনো বড় যুদ্ধে জড়ানোর ইতিহাস সাম্প্রতিক অতীতে নেই। এই ‘শান্ত অথচ প্রভাবশালী’ আচরণের পেছনে রয়েছে হাজার বছরের দর্শন, রাজনৈতিক বিবর্তন ও একটি সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ছক।
চীনা ও মার্কিন রাজনীতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। চীন একদলীয় সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দেশ। যেখানে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সব সিদ্ধান্ত নেয়। যোগ্যতাভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি অনুসরণ করে তারা। ‘চীনা বৈশিষ্ট্যযুক্ত সমাজতন্ত্র’- রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণে বাজার অর্থনীতি চলে। সমষ্টির স্বার্থ এখানে আগে।
আর যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে ভিন্ন। দ্বিদলীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র, জনগণের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। সম্পূর্ণ মুক্তবাজার ও পুঁজিবাদী অর্থনীতি। ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মানবাধিকার সবার ওপরে। চীনের বৈদেশিক নীতির মূল ভিত্তি হচ্ছে, ‘বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নয়’। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার চর্চা না করা। আফ্রিকার একনায়কতন্ত্র হোক বা মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্র- চীনের নীতি স্পষ্ট- “আমরা ব্যবসা করব, তোমাদের রাজনীতি তোমাদের।”
বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সড়ক, বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে দিচ্ছে চীন। সামরিকভাবে দখল না করে অর্থনৈতিকভাবে দেশগুলোকে নিজেদের ওপর নির্ভরশীল করছে তারা। সম্প্রতি সৌদি আরব ও ইরানের দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক কূটনীতির টেবিলে বসিয়ে জোড়া লাগিয়েছে চীন।
যুক্তরাষ্ট্র যেখানে গত কয়েক দশকে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়ায় যুদ্ধ করেছে, চীন শেষ বড় যুদ্ধে জড়িয়েছিল ১৯৭৯ সালে। ভিয়েতনামের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে। কারণ সহজ, চীনের ইতিহাস আক্রমণাত্মক নয়, প্রতিরক্ষামূলক। গ্রেট ওয়াল তৈরি হয়েছিল বাইরের আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য, অন্য দেশ দখল করার জন্য নয়।
চীনারা বিশ্বাস করে তাদের দেশ ‘তিয়ানঝিয়া’ বা আকাশের নিচের কেন্দ্রবিন্দু। তাদের ধারণা, চীন নিজেই এত সমৃদ্ধ যে বাইরের জগৎ জয় করার প্রয়োজন নেই। চীনা সমাজের রন্ধ্রে মিশে আছে কনফুসিয়াসের দর্শন- যুদ্ধ বা বিশৃঙ্খলার চেয়ে ‘সামাজিক সম্প্রীতি’, ‘শৃঙ্খলা’ ও ‘ধৈর্য’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সান জু-এর বিখ্যাত ‘আর্ট অব ওয়ার’ বইয়ে লেখা, “লড়াই না করে শত্রুকে পরাস্ত করাই সর্বোচ্চ বীরত্ব।” চীনের মনস্তত্ত্ব হলো, যুদ্ধ করলে নিজেদের সম্পদ ও জনবল ক্ষয় হয়। তাই তারা প্রতিপক্ষকে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে এমনভাবে কোণঠাসা করতে চায় যেন যুদ্ধ ছাড়াই জয় নিশ্চিত হয়।
চীন জানে একটি যুদ্ধ তাদের চার দশকের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক অলৌকিক উত্থান ধূলিসাৎ করতে পারে। তাদের মূল লক্ষ্য ২০৪৯ সালের মধ্যে (বিপ্লবের শতবর্ষ) বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়া। যুদ্ধ বড় বিনিয়োগ নয়, বরং অর্থনীতি ধ্বংসের নাম।
চীন প্রথাগত বোমা-বারুদের যুদ্ধ এড়িয়ে ভিন্ন মাত্রার যুদ্ধ লড়ছে- যেগুলো হচ্ছে, সাইবার যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর চিপের নিয়ন্ত্রণ এবং গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে আধিপত্য। একে বলা হয় ‘রক্তপাতহীন যুদ্ধ’।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বরাজনীতি যদি হয় ‘সামরিক শক্তির জোরে আধিপত্য’, তবে চীনের কৌশল হলো ‘অর্থনৈতিক জালের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার’। চীন কাপুরুষ বা দুর্বল বলে যুদ্ধ এড়ায় না- তারা যুদ্ধকে অলাভজনক মনে করে। অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণের যে সুদূরপ্রসারী চাল ড্রাগন খেলছে, সেখানে বন্দুকের গুলির চেয়ে ডলার ও প্রযুক্তির ধার অনেক বেশি কার্যকরী।

আপনার মতামত লিখুন