সংবাদ

আটলান্টিকে ভয়ঙ্কর ‘জলদানব’, ধরা পড়ে না ক্যামেরায়


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০৬:২৭ পিএম

আটলান্টিকে ভয়ঙ্কর ‘জলদানব’, ধরা পড়ে না ক্যামেরায়
ছবি : সংগৃহীত

পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী ‘অ্যামোক’- এর গতি কমছে। বাড়ছে শীতল ইউরোপের আশঙ্কা। কিন্তু কেন এই সংকট মিডিয়ার শিরোনামে আসে মুহূর্তের জন্য। অথচ হারিয়ে যায় নজরের আড়ালে? গভীর সমুদ্রের এই অলৌকিক শক্তিকে ঘিরে রহস্য এক গুরুতর চ্যালেঞ্জ।

আপনি হয়তো জ্বলন্ত অ্যামাজন, গলতে থাকা গ্রিনল্যান্ডের বরফ, কিংবা সৈকতে ভেসে আসা প্লাস্টিকের বোতলের ছবি দেখে অভ্যস্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ছবিগুলো আমাদের চোখে ভাসে- খুব দ্রুত, খুব স্পষ্ট। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাগুলোর একটি অ্যামোক আছে আমাদের চোখের কাছেই, অথচ অদৃশ্য।

দক্ষিণ আটলান্টিকের উষ্ণ জলরাশি এক বিশাল পরিবাহকের মতো উত্তরে গ্রিনল্যান্ডের দিকে ধেয়ে যায়। ঠাণ্ডা হয়ে ঘনীভূত হয়। প্রায় ৫ কিলোমিটার গভীরে তলিয়ে যায়। আবার দক্ষিণে ফিরে আসে। বিজ্ঞানের ভাষায় যার নাম আটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সঞ্চালন (অ্যামোক)।  বাংলায় যাকে বলা যায় আটলান্টিকের মহাজলস্রোত।

এই স্রোতই ইউরোপকে শীতকালে অস্বাভাবিক উষ্ণ রাখে। আমেরিকার পূর্ব উপকূলকে বাড়তি উচ্চতায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে রক্ষা করে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় মৌসুমি বায়ুকে স্থিতিশীল রাখে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই স্রোত দুর্বল হয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, ‘অ্যামোক’ যদি আরও ১৫-৩০ শতাংশ মন্থর হয়, তাহলে ঘটতে পারে ভয়াবহ ঘটনা।

গ্রিনহাউস গ্যাস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর ইউরোপে বসতে পারে হিমশীতল শীত। যেখানে তাপমাত্রা নেমে যেতে পারে মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আমেরিকার পূর্ব উপকূলে হঠাৎ করে কয়েক ফুট বাড়তে পারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা।  বদলে যেতে পারে এশিয়া ও আফ্রিকার মৌসুমি বায়ুর ধারা। যা কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলবে। অথচ, এই ভয়াবহ সতর্কতা প্রতিবারই বিশ্ব গণমাধ্যমের দৃষ্টি থেকে সরে যায় কয়েক দিনের মধ্যেই।  কিন্তু কেন?

এর পেছনে রয়েছে এক অদ্ভুত 'ইমেজ সমস্যা'। ডারহাম ইউনিভার্সিটির গবেষক ফিয়োনাগ থমসন তার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, ‘অ্যামোকের’ যেমন কোনো ‘দর্শনীয় চেহারা’ নেই, তেমনি এর গতি এতই ধীর (প্রতি সেকেন্ডে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার) যে তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ধাঁচের সঙ্গে মেলানো ভার। অধিকাংশ গণমাধ্যম, সাধারণ মানুষ এই প্রক্রিয়াটি কল্পনাও করতে পারেন না।

বিজ্ঞানীরা এর অস্তিত্ব প্রমাণ করেছেন কোরালের জীবাশ্মের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে। সমুদ্রতলের পলিকণায় জমা হওয়া ইতিহাস ঘেঁটে। আর স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার নগণ্য তারতম্য মেপে। কিন্তু এই উপাত্তগুলো গণমাধ্যমের জন্য কোনো নাটকীয় ছবি তৈরি করতে পারে না। 

যেখানে একটি প্লাস্টিকের বোতল কিংবা জ্বলন্ত বনের ছবি হাজার শব্দ বলে দেয়, সেখানে অ্যামোকের জন্য সংবাদমাধ্যমকে ভরসা করতে হয় নাসা বা মেট অফিসের মতো সংস্থার লাল-নীল তীর চিহ্নিত গ্রাফের ওপর।

এক সময় স্কটিশ সাংবাদিক ভিকি অ্যালানকে যখন ‘অ্যামোক’ নিয়ে প্রতিবেদন করতে হয়েছিল, তিনি এক লেকচারে স্কটল্যান্ডের ওপর একটি ‘নীল দাগ’ দেখেছিলেন। ওই একটি স্লাইড তার কাছে সব হিসেব-নিকাশের চেয়ে বেশি স্পষ্ট করে দিয়েছিল ইউরোপের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ। কিন্তু যিনি স্কটল্যান্ডে বাস করেন না, তার কাছে ওই নীল দাগটি কোনো অর্থই বহন করে না।

এখানেই থমসনের মূল পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, জলবায়ু সাংবাদিকতা এক ‘ভিজুয়াল ফিল্টারের’ মধ্যে আবদ্ধ। এই ফিল্টার শুধু সেসব গল্পকে প্রাধান্য দেয় যা আমরা ‘দেখতে’ ও ‘অনুভব’ করতে পারি। অ্যামোকের মতো অদৃশ্য, ধীর অথচ মহাবিপন্ন সিস্টেমগুলো বারবার বাদ পড়ে যায়।

গ্রেট প্যাসিফিক গার্বেজ প্যাচের উদাহরণ টানেন থমসন। আদতে এটি মাইক্রোপ্লাস্টিকের এক বিশাল ‘স্যুপ’, যা সমুদ্রপৃষ্ঠে চোখে পড়ে না। কিন্তু সামুদ্রিক প্রাণী বা ফেলে দেওয়া জালের ছবি তুলে সাংবাদিকরা সেই অদৃশ্য দূষণকে ‘দৃশ্যমান’ করে তোলেন। কিন্তু ‘অ্যামোকের’ তো তেমন কোনো প্রোক্সি (প্রতিনিধি) নেই। কোনো ‘মৃত অ্যামোক’ কিংবা এর কোনো ‘ধ্বংসাবশেষ’ নেই।

আসল কথা হচ্ছে, যখন কোনো সংকটকে ছবিতে ধরা যায় না, তখন সেটি গণমাধ্যমে ‘সংকট’ হিসেবেও পরিচিতি পায় না।

বিজ্ঞানীরা যদি অ্যামোকের গতিপথ নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেন, সেটা বিজ্ঞানেরই অংশ (কারণ সমুদ্রের গভীরতা অদেখা থেকে যায়)। কিন্তু সাংবাদিকরা সেই ‘অনিশ্চয়তাকে’ গুরুত্ব দেওয়ার বদলে বাড়াবাড়ি করে ‘হিমায়িত ইউরোপ’-এর শিরোনাম তৈরি করেন, যা অনেক বিজ্ঞানীই অতিরঞ্জিত বলে মনে করেন। ফলে একদিকে সত্যিকারের বিজ্ঞান মিডিয়ায় কম জায়গা পায়, অন্যদিকে ভীতিকর (কিন্তু অসম্ভাব্য) ছবিগুলো ভাইরাল হয়।

ভবিষ্যৎ কী

বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন যে ‘অ্যামোক’ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে, নাকি শুধু ধীর হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এর দুর্বলতা একটা অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডেনমার্কের বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণা বলছে, ২১০০ সালের মধ্যে ‘অ্যামোক’ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। যা পুরো উত্তর গোলার্ধের আবহাওয়াকে পাল্টে দিতে পারে।

অ্যামোক ডেকে আনবে এক ভয়াবহ বিপর্যয়। ছবি: গার্ডিয়ান।

বলাই যায়, আমরা হয়তো অদৃশ্য কোনো স্রোতকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ মনে করি না, কারণ তা আমাদের দৈনন্দিন চোখে পড়ে না। কিন্তু মহাসাগর, বায়ুমণ্ডল এবং ভূ-তাত্ত্বিক সময় আমাদের চেয়ে অনেক ধীর গতিতে, নীরবে বদলাচ্ছে। আর সেই বদলের গতি যখন আমাদের নজর এড়িয়ে যায়, তখন ভিজুয়াল ভাষাও স্তব্ধ হয়ে যায়। ‘অ্যামোক’ শুধু একটি সমুদ্রস্রোত নয়, এটি আমাদের বোঝার সীমাবদ্ধতার এক দর্পণ- যেখানে আদতে যা গুরুত্বপূর্ণ, তা চোখে পড়ে না; আর যা চোখে পড়ে, তা হয় গুরুত্বহীন।

পৃথিবীকে বাঁচাতে শুধু নীতি-নির্ধারক বা বিজ্ঞানীদেরই নয়, বরং সংবাদমাধ্যমকে আরও সৃজনশীল হতে হবে। অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করতে নতুন গল্প বলার ভাষা খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি, নইলে ‘অ্যামোক’সহ অনেক বড় সংকট থেকেই আমরা চোখ ফিরিয়ে নেব- যতক্ষণ না তা আমাদের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬


আটলান্টিকে ভয়ঙ্কর ‘জলদানব’, ধরা পড়ে না ক্যামেরায়

প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুন ২০২৬

featured Image

পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী ‘অ্যামোক’- এর গতি কমছে। বাড়ছে শীতল ইউরোপের আশঙ্কা। কিন্তু কেন এই সংকট মিডিয়ার শিরোনামে আসে মুহূর্তের জন্য। অথচ হারিয়ে যায় নজরের আড়ালে? গভীর সমুদ্রের এই অলৌকিক শক্তিকে ঘিরে রহস্য এক গুরুতর চ্যালেঞ্জ।

আপনি হয়তো জ্বলন্ত অ্যামাজন, গলতে থাকা গ্রিনল্যান্ডের বরফ, কিংবা সৈকতে ভেসে আসা প্লাস্টিকের বোতলের ছবি দেখে অভ্যস্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ছবিগুলো আমাদের চোখে ভাসে- খুব দ্রুত, খুব স্পষ্ট। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাগুলোর একটি অ্যামোক আছে আমাদের চোখের কাছেই, অথচ অদৃশ্য।

দক্ষিণ আটলান্টিকের উষ্ণ জলরাশি এক বিশাল পরিবাহকের মতো উত্তরে গ্রিনল্যান্ডের দিকে ধেয়ে যায়। ঠাণ্ডা হয়ে ঘনীভূত হয়। প্রায় ৫ কিলোমিটার গভীরে তলিয়ে যায়। আবার দক্ষিণে ফিরে আসে। বিজ্ঞানের ভাষায় যার নাম আটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সঞ্চালন (অ্যামোক)।  বাংলায় যাকে বলা যায় আটলান্টিকের মহাজলস্রোত।

এই স্রোতই ইউরোপকে শীতকালে অস্বাভাবিক উষ্ণ রাখে। আমেরিকার পূর্ব উপকূলকে বাড়তি উচ্চতায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে রক্ষা করে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় মৌসুমি বায়ুকে স্থিতিশীল রাখে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই স্রোত দুর্বল হয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, ‘অ্যামোক’ যদি আরও ১৫-৩০ শতাংশ মন্থর হয়, তাহলে ঘটতে পারে ভয়াবহ ঘটনা।

গ্রিনহাউস গ্যাস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর ইউরোপে বসতে পারে হিমশীতল শীত। যেখানে তাপমাত্রা নেমে যেতে পারে মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আমেরিকার পূর্ব উপকূলে হঠাৎ করে কয়েক ফুট বাড়তে পারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা।  বদলে যেতে পারে এশিয়া ও আফ্রিকার মৌসুমি বায়ুর ধারা। যা কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলবে। অথচ, এই ভয়াবহ সতর্কতা প্রতিবারই বিশ্ব গণমাধ্যমের দৃষ্টি থেকে সরে যায় কয়েক দিনের মধ্যেই।  কিন্তু কেন?

এর পেছনে রয়েছে এক অদ্ভুত 'ইমেজ সমস্যা'। ডারহাম ইউনিভার্সিটির গবেষক ফিয়োনাগ থমসন তার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, ‘অ্যামোকের’ যেমন কোনো ‘দর্শনীয় চেহারা’ নেই, তেমনি এর গতি এতই ধীর (প্রতি সেকেন্ডে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার) যে তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ধাঁচের সঙ্গে মেলানো ভার। অধিকাংশ গণমাধ্যম, সাধারণ মানুষ এই প্রক্রিয়াটি কল্পনাও করতে পারেন না।

বিজ্ঞানীরা এর অস্তিত্ব প্রমাণ করেছেন কোরালের জীবাশ্মের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে। সমুদ্রতলের পলিকণায় জমা হওয়া ইতিহাস ঘেঁটে। আর স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার নগণ্য তারতম্য মেপে। কিন্তু এই উপাত্তগুলো গণমাধ্যমের জন্য কোনো নাটকীয় ছবি তৈরি করতে পারে না। 

যেখানে একটি প্লাস্টিকের বোতল কিংবা জ্বলন্ত বনের ছবি হাজার শব্দ বলে দেয়, সেখানে অ্যামোকের জন্য সংবাদমাধ্যমকে ভরসা করতে হয় নাসা বা মেট অফিসের মতো সংস্থার লাল-নীল তীর চিহ্নিত গ্রাফের ওপর।

এক সময় স্কটিশ সাংবাদিক ভিকি অ্যালানকে যখন ‘অ্যামোক’ নিয়ে প্রতিবেদন করতে হয়েছিল, তিনি এক লেকচারে স্কটল্যান্ডের ওপর একটি ‘নীল দাগ’ দেখেছিলেন। ওই একটি স্লাইড তার কাছে সব হিসেব-নিকাশের চেয়ে বেশি স্পষ্ট করে দিয়েছিল ইউরোপের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ। কিন্তু যিনি স্কটল্যান্ডে বাস করেন না, তার কাছে ওই নীল দাগটি কোনো অর্থই বহন করে না।

এখানেই থমসনের মূল পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, জলবায়ু সাংবাদিকতা এক ‘ভিজুয়াল ফিল্টারের’ মধ্যে আবদ্ধ। এই ফিল্টার শুধু সেসব গল্পকে প্রাধান্য দেয় যা আমরা ‘দেখতে’ ও ‘অনুভব’ করতে পারি। অ্যামোকের মতো অদৃশ্য, ধীর অথচ মহাবিপন্ন সিস্টেমগুলো বারবার বাদ পড়ে যায়।

গ্রেট প্যাসিফিক গার্বেজ প্যাচের উদাহরণ টানেন থমসন। আদতে এটি মাইক্রোপ্লাস্টিকের এক বিশাল ‘স্যুপ’, যা সমুদ্রপৃষ্ঠে চোখে পড়ে না। কিন্তু সামুদ্রিক প্রাণী বা ফেলে দেওয়া জালের ছবি তুলে সাংবাদিকরা সেই অদৃশ্য দূষণকে ‘দৃশ্যমান’ করে তোলেন। কিন্তু ‘অ্যামোকের’ তো তেমন কোনো প্রোক্সি (প্রতিনিধি) নেই। কোনো ‘মৃত অ্যামোক’ কিংবা এর কোনো ‘ধ্বংসাবশেষ’ নেই।

আসল কথা হচ্ছে, যখন কোনো সংকটকে ছবিতে ধরা যায় না, তখন সেটি গণমাধ্যমে ‘সংকট’ হিসেবেও পরিচিতি পায় না।

বিজ্ঞানীরা যদি অ্যামোকের গতিপথ নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেন, সেটা বিজ্ঞানেরই অংশ (কারণ সমুদ্রের গভীরতা অদেখা থেকে যায়)। কিন্তু সাংবাদিকরা সেই ‘অনিশ্চয়তাকে’ গুরুত্ব দেওয়ার বদলে বাড়াবাড়ি করে ‘হিমায়িত ইউরোপ’-এর শিরোনাম তৈরি করেন, যা অনেক বিজ্ঞানীই অতিরঞ্জিত বলে মনে করেন। ফলে একদিকে সত্যিকারের বিজ্ঞান মিডিয়ায় কম জায়গা পায়, অন্যদিকে ভীতিকর (কিন্তু অসম্ভাব্য) ছবিগুলো ভাইরাল হয়।

ভবিষ্যৎ কী

বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন যে ‘অ্যামোক’ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে, নাকি শুধু ধীর হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এর দুর্বলতা একটা অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডেনমার্কের বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণা বলছে, ২১০০ সালের মধ্যে ‘অ্যামোক’ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। যা পুরো উত্তর গোলার্ধের আবহাওয়াকে পাল্টে দিতে পারে।

অ্যামোক ডেকে আনবে এক ভয়াবহ বিপর্যয়। ছবি: গার্ডিয়ান।

বলাই যায়, আমরা হয়তো অদৃশ্য কোনো স্রোতকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ মনে করি না, কারণ তা আমাদের দৈনন্দিন চোখে পড়ে না। কিন্তু মহাসাগর, বায়ুমণ্ডল এবং ভূ-তাত্ত্বিক সময় আমাদের চেয়ে অনেক ধীর গতিতে, নীরবে বদলাচ্ছে। আর সেই বদলের গতি যখন আমাদের নজর এড়িয়ে যায়, তখন ভিজুয়াল ভাষাও স্তব্ধ হয়ে যায়। ‘অ্যামোক’ শুধু একটি সমুদ্রস্রোত নয়, এটি আমাদের বোঝার সীমাবদ্ধতার এক দর্পণ- যেখানে আদতে যা গুরুত্বপূর্ণ, তা চোখে পড়ে না; আর যা চোখে পড়ে, তা হয় গুরুত্বহীন।

পৃথিবীকে বাঁচাতে শুধু নীতি-নির্ধারক বা বিজ্ঞানীদেরই নয়, বরং সংবাদমাধ্যমকে আরও সৃজনশীল হতে হবে। অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করতে নতুন গল্প বলার ভাষা খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি, নইলে ‘অ্যামোক’সহ অনেক বড় সংকট থেকেই আমরা চোখ ফিরিয়ে নেব- যতক্ষণ না তা আমাদের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত