সংবাদ

‘ডার্টি গেইম’ নাকি 'মাস্টারপ্ল্যান'?


সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম

‘ডার্টি গেইম’ নাকি 'মাস্টারপ্ল্যান'?

আলজেরিয়াকে ২-০ ব্যবধানে হারানোর পর থেকেই ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের প্রতিটি ম্যাচের স্কোরলাইন যেন এক মহাকাব্য। ৩-১, ৩-২ অনিন্দ্য সুন্দর এই সংখ্যাগুলো কেবলই ম্যাচের রেজাল্ট বুক। এভাবে ম্যাচ জেতাকে কেউ খারাপ বলবে না নিশ্চিত, কিন্তু কোটি কোটি আর্জেন্টাইন ভক্ত কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন; লিওনেল মেসিদের এই খেলায় তারা পুরোপুরি তৃপ্ত?

মাঠের ফুটবলটা যেন রোজই ভক্তদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিচ্ছে, রক্তচাপ তুঙ্গে তুলছে। প্রতি ম্যাচের ৭০ মিনিট পর্যন্ত দলটা মন্থর, আলসে। এক গোল করার পর ডিফেন্সিভ ব্লকের এমন এক দেয়াল তুলছে, যাকে ল্যাটিন ফুটবলের চিরায়ত ছন্দ বা ‘ট্যাঙ্গো’ বলা চলে না। ভক্তদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়ে মনে হয়, এই বুঝি গোল হজম করল আলবিসেলেস্তেরা!

কিন্তু ঠিক শেষ ১৫-২০ মিনিটে ছড়ায় আসল বারুদ। শেষ মুহূর্তের সেই বিধ্বংসী কাউন্টার অ্যাটাকে খড়কুটোর মতো উড়ে যায় প্রতিপক্ষ। মিশর কিংবা কেপ ভার্দে ম্যাচের পর সবশেষ সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে কানসাস স্টেডিয়ামেও দেখা গেল সেই চেনা নাটক।

তীব্র দাবদাহ ও স্কালোনির ‘ধীরে চলো’ নীতি

ডাগআউটে যখন ভ্যালেন্টিন বার্কো, নিকো পাজ কিংবা জুলিয়ানো সিমেওনের মতো তরুণ তুর্কিরা ঝলঝল করছেন, তখন কেন এই স্লো গেইম? কেন শুরু থেকেই অল-আউট অ্যাটাকে যাচ্ছে না আর্জেন্টিনা? উত্তর লুকিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র বৈরি আবহাওয়ায়। ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সেই উত্তপ্ত বাতাস আর দমবন্ধ করা গরমে মূলত নিজেদের এনার্জি প্রিজার্ভ বা শক্তি জমিয়ে রাখাই লিওনেল স্কালোনির মূল স্ট্র্যাটেজি।

এটি টুর্নামেন্ট-বেইজড কোচের এক চরম মনস্তাত্ত্বিক খেলা। ম্যাচ বাই ম্যাচ প্রতিপক্ষকে রিড করা, তাদের শক্তি ক্ষয় হতে দেওয়া এবং ঠিক মোক্ষম সময়ে আঘাত করাই আর্জেন্টিনার বর্তমান দর্শন। কাতার বিশ্বকাপেও এই দলটা মরতে মরতে বেঁচে ফিরেছিল। তবে এবার যেন তারা ব্লেডের ধারের ওপর দাঁড়িয়ে অবিশ্বাস্য এক দাবা খেলছে মাঠে।

সেই ২৯ সেকেন্ড, যা বদলে দিল কোয়ার্টার ফাইনালের ভাগ্য

সুইসদের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচ যখন ১-১ সমতায়, ঠিক তখনই দ্বিতীয় অধ্যায়ের হাইড্রেশন ব্রেকে জন্ম নেয় এক অবিশ্বাস্য মুহূর্ত। কোচ লিওনেল স্কালোনি ও অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেসের মধ্যকার মাত্র ২৯ সেকেন্ডের একটি নিবিড় ট্যাকটিক্যাল আলোচনা ক্যামেরায় ধরা পড়ে, যা এখন নেটদুনিয়ায় রীতিমতো ভাইরাল।

১০ জনের সুইজারল্যান্ড তখন লো-ব্লকে রক্ষণ সামলাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে মাঠের পজিশনগত ত্রুটি নিয়ে কোচের মুখোমুখি হন পারেদেস। পারেদেস কোচকে বুঝিয়ে বলেন, “প্রতিপক্ষের সেন্টার-ব্যাক ডান প্রান্ত দিয়ে ওপরে উঠে আসছিল। আমি যখন ওই অঞ্চল কভার করতে যাচ্ছি, তখন মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি। সেখানে ওদের স্ট্রাইকার এমবোলোর পেছনে থাকা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার রিডার একদম আনমার্কড বা ফাঁকা থেকে যাচ্ছে।”

স্কালোনি তখন নিজের ট্যাকটিক্স ধরে রাখতে পারেদেসকে অনুরোধ করে বলেন, “তোমার জন্য নির্ধারিত খেলোয়াড় ছাড়া অন্য কাউকে মার্ক করার প্রয়োজন নেই।”

কিন্তু দলের ভারসাম্য ধরে রাখতে নাছোড়বান্দা পারেদেস জোর দিয়ে বলেন, “মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের একজন খেলোয়াড় সম্পূর্ণ ফাঁকা রয়ে যাচ্ছে।”

পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে স্কালোনি তখন জিজ্ঞেস করেন, “আচ্ছা, তোমার কি একজন সেন্টার-ব্যাক প্রয়োজন?”

পারেদেস মাথা নেড়ে সায় দিলে স্কালোনি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা শেষ করেন, “আচ্ছা, তাহলে আমরা ওটাকে (নিকোলাস ওতামেন্দি) নামাচ্ছি।”

কোচের এই দূরদর্শিতা আর অভিজ্ঞ শিষ্যের মাঠের রিডিং— দুইয়ের যুগলবন্দিতে অতিরিক্ত সময়ের শেষার্ধে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর বদলে মাঠে নামেন ওতামেন্দি। রক্ষণ নিরেট হতেই মাঝমাঠের ওপর চাপ কমে। আর ঠিক তার পরেই অতিরিক্ত সময়ে ‘স্পাইডার’ হুলিয়ান আলভারেজের বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া সেই চোখ ধাঁধানো লং রেঞ্জের কার্লিং শট এবং লাউতারো মার্তিনেজের ‘ঝোপ বুঝে কোপ’ মারা ফিনিশিংয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় কানসাস।

দিনশেষে স্কালোনির এই তথাকথিত নিরেট রক্ষণাত্মক ফুটবল বা ডার্টি গেইমের শেষটা কিন্তু সেই চেনা চওড়া হাসিতেই শেষ হচ্ছে। দিন শেষে ট্রফিটাই আসল, আর ব্লেডের ধারে হেঁটে সেই জয় এনে দেওয়ায় ভক্তদের আক্ষেপ উবে যাচ্ছে আনন্দের জোয়ারে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬


‘ডার্টি গেইম’ নাকি 'মাস্টারপ্ল্যান'?

প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুলাই ২০২৬

featured Image

আলজেরিয়াকে ২-০ ব্যবধানে হারানোর পর থেকেই ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের প্রতিটি ম্যাচের স্কোরলাইন যেন এক মহাকাব্য। ৩-১, ৩-২ অনিন্দ্য সুন্দর এই সংখ্যাগুলো কেবলই ম্যাচের রেজাল্ট বুক। এভাবে ম্যাচ জেতাকে কেউ খারাপ বলবে না নিশ্চিত, কিন্তু কোটি কোটি আর্জেন্টাইন ভক্ত কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন; লিওনেল মেসিদের এই খেলায় তারা পুরোপুরি তৃপ্ত?

মাঠের ফুটবলটা যেন রোজই ভক্তদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিচ্ছে, রক্তচাপ তুঙ্গে তুলছে। প্রতি ম্যাচের ৭০ মিনিট পর্যন্ত দলটা মন্থর, আলসে। এক গোল করার পর ডিফেন্সিভ ব্লকের এমন এক দেয়াল তুলছে, যাকে ল্যাটিন ফুটবলের চিরায়ত ছন্দ বা ‘ট্যাঙ্গো’ বলা চলে না। ভক্তদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়ে মনে হয়, এই বুঝি গোল হজম করল আলবিসেলেস্তেরা!

কিন্তু ঠিক শেষ ১৫-২০ মিনিটে ছড়ায় আসল বারুদ। শেষ মুহূর্তের সেই বিধ্বংসী কাউন্টার অ্যাটাকে খড়কুটোর মতো উড়ে যায় প্রতিপক্ষ। মিশর কিংবা কেপ ভার্দে ম্যাচের পর সবশেষ সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে কানসাস স্টেডিয়ামেও দেখা গেল সেই চেনা নাটক।

তীব্র দাবদাহ ও স্কালোনির ‘ধীরে চলো’ নীতি

ডাগআউটে যখন ভ্যালেন্টিন বার্কো, নিকো পাজ কিংবা জুলিয়ানো সিমেওনের মতো তরুণ তুর্কিরা ঝলঝল করছেন, তখন কেন এই স্লো গেইম? কেন শুরু থেকেই অল-আউট অ্যাটাকে যাচ্ছে না আর্জেন্টিনা? উত্তর লুকিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র বৈরি আবহাওয়ায়। ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সেই উত্তপ্ত বাতাস আর দমবন্ধ করা গরমে মূলত নিজেদের এনার্জি প্রিজার্ভ বা শক্তি জমিয়ে রাখাই লিওনেল স্কালোনির মূল স্ট্র্যাটেজি।

এটি টুর্নামেন্ট-বেইজড কোচের এক চরম মনস্তাত্ত্বিক খেলা। ম্যাচ বাই ম্যাচ প্রতিপক্ষকে রিড করা, তাদের শক্তি ক্ষয় হতে দেওয়া এবং ঠিক মোক্ষম সময়ে আঘাত করাই আর্জেন্টিনার বর্তমান দর্শন। কাতার বিশ্বকাপেও এই দলটা মরতে মরতে বেঁচে ফিরেছিল। তবে এবার যেন তারা ব্লেডের ধারের ওপর দাঁড়িয়ে অবিশ্বাস্য এক দাবা খেলছে মাঠে।

সেই ২৯ সেকেন্ড, যা বদলে দিল কোয়ার্টার ফাইনালের ভাগ্য

সুইসদের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচ যখন ১-১ সমতায়, ঠিক তখনই দ্বিতীয় অধ্যায়ের হাইড্রেশন ব্রেকে জন্ম নেয় এক অবিশ্বাস্য মুহূর্ত। কোচ লিওনেল স্কালোনি ও অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেসের মধ্যকার মাত্র ২৯ সেকেন্ডের একটি নিবিড় ট্যাকটিক্যাল আলোচনা ক্যামেরায় ধরা পড়ে, যা এখন নেটদুনিয়ায় রীতিমতো ভাইরাল।

১০ জনের সুইজারল্যান্ড তখন লো-ব্লকে রক্ষণ সামলাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে মাঠের পজিশনগত ত্রুটি নিয়ে কোচের মুখোমুখি হন পারেদেস। পারেদেস কোচকে বুঝিয়ে বলেন, “প্রতিপক্ষের সেন্টার-ব্যাক ডান প্রান্ত দিয়ে ওপরে উঠে আসছিল। আমি যখন ওই অঞ্চল কভার করতে যাচ্ছি, তখন মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি। সেখানে ওদের স্ট্রাইকার এমবোলোর পেছনে থাকা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার রিডার একদম আনমার্কড বা ফাঁকা থেকে যাচ্ছে।”

স্কালোনি তখন নিজের ট্যাকটিক্স ধরে রাখতে পারেদেসকে অনুরোধ করে বলেন, “তোমার জন্য নির্ধারিত খেলোয়াড় ছাড়া অন্য কাউকে মার্ক করার প্রয়োজন নেই।”

কিন্তু দলের ভারসাম্য ধরে রাখতে নাছোড়বান্দা পারেদেস জোর দিয়ে বলেন, “মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের একজন খেলোয়াড় সম্পূর্ণ ফাঁকা রয়ে যাচ্ছে।”

পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে স্কালোনি তখন জিজ্ঞেস করেন, “আচ্ছা, তোমার কি একজন সেন্টার-ব্যাক প্রয়োজন?”

পারেদেস মাথা নেড়ে সায় দিলে স্কালোনি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা শেষ করেন, “আচ্ছা, তাহলে আমরা ওটাকে (নিকোলাস ওতামেন্দি) নামাচ্ছি।”

কোচের এই দূরদর্শিতা আর অভিজ্ঞ শিষ্যের মাঠের রিডিং— দুইয়ের যুগলবন্দিতে অতিরিক্ত সময়ের শেষার্ধে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর বদলে মাঠে নামেন ওতামেন্দি। রক্ষণ নিরেট হতেই মাঝমাঠের ওপর চাপ কমে। আর ঠিক তার পরেই অতিরিক্ত সময়ে ‘স্পাইডার’ হুলিয়ান আলভারেজের বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া সেই চোখ ধাঁধানো লং রেঞ্জের কার্লিং শট এবং লাউতারো মার্তিনেজের ‘ঝোপ বুঝে কোপ’ মারা ফিনিশিংয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় কানসাস।

দিনশেষে স্কালোনির এই তথাকথিত নিরেট রক্ষণাত্মক ফুটবল বা ডার্টি গেইমের শেষটা কিন্তু সেই চেনা চওড়া হাসিতেই শেষ হচ্ছে। দিন শেষে ট্রফিটাই আসল, আর ব্লেডের ধারে হেঁটে সেই জয় এনে দেওয়ায় ভক্তদের আক্ষেপ উবে যাচ্ছে আনন্দের জোয়ারে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত