সংবাদ

গুরু-শিষ্যের লড়াই

মাদ্রিদের ক্লাসরুম থেকে বিশ্বমঞ্চের ফাইনাল


সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৫ পিএম

মাদ্রিদের ক্লাসরুম থেকে বিশ্বমঞ্চের ফাইনাল

নয় বছর আগে স্পেনের মাদ্রিদের এক শান্ত শহরতলির ক্লাসরুম। ব্ল্যাকবোর্ডে চক আর ডাস্টার হাতে পরম মমতায় ফুটবলের আদি-অন্ত বোঝাচ্ছিলেন এক শিক্ষক। আর প্রথম বেঞ্চে বসে, চোখের পলক না ফেলে শিক্ষকের প্রতিটি কথা ডায়েরিতে টুকে নিচ্ছিলেন এক বিনীত ছাত্র। শিক্ষকের নাম লুইস দে লা ফুয়েন্তে, আর সেই বাধ্য ছাত্রটি ছিলেন লিওনেল স্কালোনি। সময়ের চাকা ঘুরে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের মহাকাব্যিক ফাইনালে আজ সেই শিক্ষক আর ছাত্রই একে অপরের মুখোমুখি। সবুজ গালিচায় আজ তারা কেউ কাউকে ছাড় দেবেন না, দুজনের চোখেই এখন বিশ্বজয়ের অদম্য নেশা।

ফুটবল বিশ্ব যখন লিওনেল মেসি আর লামিন ইয়ামালের পায়ের জাদুর অপেক্ষায় বুঁদ হয়ে আছে, তখন ডাগআউটের আবহটা একদম ভিন্ন। সেখানে কোনো চিরবৈরিতা নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত মায়াবী রসায়ন। স্পেনের ডাগআউটে ৬৫ বছর বয়সী ‘গুরু’ লুইস দে লা ফুয়েন্তে; আর ঠিক উল্টোদিকে আর্জেন্টিনার ডাগআউটে তাঁরই এক সময়ের ‘প্রিয় ছাত্র’, ৪৮ বছরের লিওনেল স্কালোনি। বিশ্বমঞ্চের এই ফাইনাল যেন রূপ নিয়েছে গুরু-শিষ্যের এক পরম মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগঘন লড়াইয়ে।

পেছনে ফিরে তাকালে হয়তো অনেকেরই বিশ্বাস করতে কঠিন হতে পারে। ২০১৭ সালের শেষদিকের কথা। বুটজোড়া তুলে রেখে সদ্য সাবেক হওয়া ফুটবলার লিওনেল স্কালোনি তখন কোচিং লাইসেন্সের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন। স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের মাদ্রিদের ‘লা রোজাস’ Training সেন্টারে প্রফেশনাল লাইসেন্সের কোর্সে ভর্তি হলেন তিনি। সেখানে তার শিক্ষক হিসেবে ক্লাসরুম আলো করে এলেন দে লা ফুয়েন্তে। কে জানত, সেই ক্লাসরুমের পাঠ শেষ করার মাত্র এক বছরের মাথায় স্কালোনি আর্জেন্টিনার অন্তর্বর্তীকালীন কোচের দায়িত্ব পাবেন? আর কে-ই বা জানত, ক্লাসরুমের সেই শিক্ষা দিয়ে তিনি আর্জেন্টিনাকে এনে দেবেন একের পর এক ট্রফি!

ফাইনালের এই মহামঞ্চে এসেও দুজনের কণ্ঠে একে অপরের প্রতি ঝরে পড়ল অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। গুরুকে নিয়ে আবেগাপ্লুত স্কালোনি বলেন, "তিনি আমার মেন্টর ছিলেন। আমি যা জানি, তাঁর সবকিছুই তিনি আমাকে শিখিয়েছেন। আর আজ আমরা ফাইনালে মুখোমুখি! কাতার বিশ্বকাপের পর যখন কোচদের কনফারেন্সে আমাদের দেখা হলো, আমরা দীর্ঘক্ষণ আড্ডা দিয়েছি। তিনি স্পেনের সঙ্গে যা করেছেন, তা অবিশ্বাস্য। তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা আকাশসম।"

ব্যক্তিগত জীবনে স্কালোনির সঙ্গে স্পেনের নাড়ির টান ভীষণ গভীর হলেও আজ বিশ্বজয়ের লড়াইয়ে গুরুর প্রতি ভালোবাসাকে পাশে সরিয়ে রেখে মুচকি হেসে আলবিসেলেস্তেদের হেডমাস্টার হঙ্কার দিয়ে বললেন, "সবাই জানে স্পেনে আমার পরিবার। তবে আমি খুবই দুঃখিত, আজ আমি মিস্টার দে লা ফুয়েন্তেকে হারাতে মাঠে নামব।"

প্রিয় ছাত্রের এমন হুঙ্কারে অবশ্য একটুও ক্ষুব্ধ নন শিক্ষক, বরং গর্বে বুক ভরে উঠছে দে লা ফুয়েন্তের। স্কালোনিকে একজন ‘আদর্শ ছাত্র’ হিসেবে উল্লেখ করে স্প্যানিশ বস বলেন, "লিওনেলের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা। সে আর্জেন্টিনার হয়ে সবকিছু জিতেছে। শিক্ষক হিসেবে ও ছিল আমার অত্যন্ত বাধ্য ও পরিশ্রমী ছাত্র। ক্লাসে ওর শেখার আগ্রহ আর মনোযোগ দেখেই বুঝেছিলাম, ও অনেক দূর যাবে। ওর শিক্ষক হতে পারাটা আমার জন্য গর্বের।" পেশাদারিত্বের দেয়াল ভেঙে ফুয়েন্তে আরও যোগ করেন, "সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমি ওর একজন বন্ধু। আমাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার সম্পর্কটা দারুণ।"

সবুজ ঘাসের ক্যানভাসে আজ যখন ট্যাকটিক্যাল বোর্ডের লড়াই চলবে, তখন একদিকে থাকবে দে লা ফুয়েন্তের শেখানো জ্যামিতিক ফুটবল, আর অন্যদিকে থাকবে সেই শিক্ষা নিয়েই বিশ্বজয় করা স্কালোনির ইস্পাতদৃঢ় দেওয়াল। দিনশেষে হাসবেন কে; গুরু নাকি শিষ্য? ফুটবল বিশ্ব এখন সেই রোমাঞ্চকর উত্তরের অপেক্ষায়।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬


মাদ্রিদের ক্লাসরুম থেকে বিশ্বমঞ্চের ফাইনাল

প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুলাই ২০২৬

featured Image

নয় বছর আগে স্পেনের মাদ্রিদের এক শান্ত শহরতলির ক্লাসরুম। ব্ল্যাকবোর্ডে চক আর ডাস্টার হাতে পরম মমতায় ফুটবলের আদি-অন্ত বোঝাচ্ছিলেন এক শিক্ষক। আর প্রথম বেঞ্চে বসে, চোখের পলক না ফেলে শিক্ষকের প্রতিটি কথা ডায়েরিতে টুকে নিচ্ছিলেন এক বিনীত ছাত্র। শিক্ষকের নাম লুইস দে লা ফুয়েন্তে, আর সেই বাধ্য ছাত্রটি ছিলেন লিওনেল স্কালোনি। সময়ের চাকা ঘুরে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের মহাকাব্যিক ফাইনালে আজ সেই শিক্ষক আর ছাত্রই একে অপরের মুখোমুখি। সবুজ গালিচায় আজ তারা কেউ কাউকে ছাড় দেবেন না, দুজনের চোখেই এখন বিশ্বজয়ের অদম্য নেশা।

ফুটবল বিশ্ব যখন লিওনেল মেসি আর লামিন ইয়ামালের পায়ের জাদুর অপেক্ষায় বুঁদ হয়ে আছে, তখন ডাগআউটের আবহটা একদম ভিন্ন। সেখানে কোনো চিরবৈরিতা নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত মায়াবী রসায়ন। স্পেনের ডাগআউটে ৬৫ বছর বয়সী ‘গুরু’ লুইস দে লা ফুয়েন্তে; আর ঠিক উল্টোদিকে আর্জেন্টিনার ডাগআউটে তাঁরই এক সময়ের ‘প্রিয় ছাত্র’, ৪৮ বছরের লিওনেল স্কালোনি। বিশ্বমঞ্চের এই ফাইনাল যেন রূপ নিয়েছে গুরু-শিষ্যের এক পরম মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগঘন লড়াইয়ে।

পেছনে ফিরে তাকালে হয়তো অনেকেরই বিশ্বাস করতে কঠিন হতে পারে। ২০১৭ সালের শেষদিকের কথা। বুটজোড়া তুলে রেখে সদ্য সাবেক হওয়া ফুটবলার লিওনেল স্কালোনি তখন কোচিং লাইসেন্সের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন। স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের মাদ্রিদের ‘লা রোজাস’ Training সেন্টারে প্রফেশনাল লাইসেন্সের কোর্সে ভর্তি হলেন তিনি। সেখানে তার শিক্ষক হিসেবে ক্লাসরুম আলো করে এলেন দে লা ফুয়েন্তে। কে জানত, সেই ক্লাসরুমের পাঠ শেষ করার মাত্র এক বছরের মাথায় স্কালোনি আর্জেন্টিনার অন্তর্বর্তীকালীন কোচের দায়িত্ব পাবেন? আর কে-ই বা জানত, ক্লাসরুমের সেই শিক্ষা দিয়ে তিনি আর্জেন্টিনাকে এনে দেবেন একের পর এক ট্রফি!

ফাইনালের এই মহামঞ্চে এসেও দুজনের কণ্ঠে একে অপরের প্রতি ঝরে পড়ল অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। গুরুকে নিয়ে আবেগাপ্লুত স্কালোনি বলেন, "তিনি আমার মেন্টর ছিলেন। আমি যা জানি, তাঁর সবকিছুই তিনি আমাকে শিখিয়েছেন। আর আজ আমরা ফাইনালে মুখোমুখি! কাতার বিশ্বকাপের পর যখন কোচদের কনফারেন্সে আমাদের দেখা হলো, আমরা দীর্ঘক্ষণ আড্ডা দিয়েছি। তিনি স্পেনের সঙ্গে যা করেছেন, তা অবিশ্বাস্য। তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা আকাশসম।"

ব্যক্তিগত জীবনে স্কালোনির সঙ্গে স্পেনের নাড়ির টান ভীষণ গভীর হলেও আজ বিশ্বজয়ের লড়াইয়ে গুরুর প্রতি ভালোবাসাকে পাশে সরিয়ে রেখে মুচকি হেসে আলবিসেলেস্তেদের হেডমাস্টার হঙ্কার দিয়ে বললেন, "সবাই জানে স্পেনে আমার পরিবার। তবে আমি খুবই দুঃখিত, আজ আমি মিস্টার দে লা ফুয়েন্তেকে হারাতে মাঠে নামব।"

প্রিয় ছাত্রের এমন হুঙ্কারে অবশ্য একটুও ক্ষুব্ধ নন শিক্ষক, বরং গর্বে বুক ভরে উঠছে দে লা ফুয়েন্তের। স্কালোনিকে একজন ‘আদর্শ ছাত্র’ হিসেবে উল্লেখ করে স্প্যানিশ বস বলেন, "লিওনেলের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা। সে আর্জেন্টিনার হয়ে সবকিছু জিতেছে। শিক্ষক হিসেবে ও ছিল আমার অত্যন্ত বাধ্য ও পরিশ্রমী ছাত্র। ক্লাসে ওর শেখার আগ্রহ আর মনোযোগ দেখেই বুঝেছিলাম, ও অনেক দূর যাবে। ওর শিক্ষক হতে পারাটা আমার জন্য গর্বের।" পেশাদারিত্বের দেয়াল ভেঙে ফুয়েন্তে আরও যোগ করেন, "সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমি ওর একজন বন্ধু। আমাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার সম্পর্কটা দারুণ।"

সবুজ ঘাসের ক্যানভাসে আজ যখন ট্যাকটিক্যাল বোর্ডের লড়াই চলবে, তখন একদিকে থাকবে দে লা ফুয়েন্তের শেখানো জ্যামিতিক ফুটবল, আর অন্যদিকে থাকবে সেই শিক্ষা নিয়েই বিশ্বজয় করা স্কালোনির ইস্পাতদৃঢ় দেওয়াল। দিনশেষে হাসবেন কে; গুরু নাকি শিষ্য? ফুটবল বিশ্ব এখন সেই রোমাঞ্চকর উত্তরের অপেক্ষায়।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত