সংবাদ

শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে


শেখর ভট্টাচার্য
শেখর ভট্টাচার্য
প্রকাশ: ১ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪১ এএম

শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে
শিশুবান্ধব আধুনিক শিক্ষাদান ও শিক্ষকের ব্যক্তি স্বাধীনতাকে কেন কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে?
ছন্দে ছন্দে অঝোর ধারায় বর্ষায় যখন বৃষ্টি ঝরতে থাকে, মাসটি শ্রাবণ না হলেও কর্ণ কূহরে সেই অমর গানটি বাজতে থাকে। অফিসের কাজ, খাওয়া দাওয়া, আড্ডা আলাপে মশগুল থাকলেও অনবরত কানে অনুরণন হতে থাকে ‘শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে / তোমারি সুরটি আমার মুখের ’পরে, বুকের’ পরে/পুরবের আলোর সঙ্গে পড়ুক পাতে দুই নয়ানে/–নিশীথের অন্ধকারে গভীর ধারে পড়ুক প্রাণে।/” আহা কী অসাধারণ গান। এবারের শ্রাবণে সেই অমর গানকে ছাপিয়ে আর একটি গান বাঙালির হৃদয় মন দখল করে ফেলেছে ইতোমধ্যে। সে গানটি হঠাত করে প্রতিটি বাঙালির অন্তর আবার জয় করলো কী ভাবে, সেই গল্পটি পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই। 

সিলেট জেলা শহরের খুব কাছেই ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা। সিলেট শহর থেকে মাত্র ত্রিশ, চল্লিশ মিনিটের দুরত্ব। ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রাণী পাল। বিউটি রাণী পাল সিলেটের শাহাজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করেছেন। প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বল। চোখের ভেতরে অপার স্বপ্ন। শিশু শিক্ষার জন্য উপযুক্ত একজন শিক্ষক। সাধারণত প্রধান শিক্ষকেরা খুব বেশি ক্লাস নিতে দেখা যায়না। বিউটি রানী পাল ব্যতিক্রম। তার ফেসবুকে প্রবেশ করে দেখা গেলো তিনি শিশুদের অঙ্ক শেখান নানা সৃজনশীল, আনন্দময় ভঙ্গীতে । একই ভাবে দেখতে পেলাম তিনি সাত বারের নাম ছড়ার ছন্দে শিক্ষার্থীদের শেখাচ্ছেন। কী আনন্দময় শ্রেণীকক্ষের পরিবেশ। তার ফেইসবুক আইডিতে বিদ্যালয়ে পাঠদান, শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা করানো, নাচ-গানের মাধ্যমে গণিতের বিভিন্ন চিহ্ন ও পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু শেখানো, শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৃক্ষরোপণ এবং গাছের চারা বিতরণের বিভিন্ন ভিডিও দেখা যায়। তার আইডি সকলের জন্য উন্মুক্ত। এরকম আইডিতে প্রবেশ করলে মন ভালো হয়ে যায়। প্রধাণ শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রতি তার নিবেদন দেখলে এই অন্ধকার সময়ে কিছুটা হলেও আলোর রেখার অস্তিত্ব উপলব্ধি করা যায়। 

সম্প্রতি ২৩ জুলাই তারিখে এই নিবেদিত প্রাণ প্রধান শিক্ষিকার একটি ভিডিও সামজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়। খুব সাধারণ একটি ভিডিও। তাকে দেখা যায় নব্বইয়ের দশকের সাড়া জাগানো ‘ডিফারেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের একটি শ্রুতি মধুর গানের সঙ্গে হেটে যেতে। গানটির কথা ছন্দময়। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে/অঝোরে নামবে বুঝি শ্রাবনে ঝরায়ে/আজ কেন মন উদাসী হয়ে/দূর অজানায় চায় হারাতে’, কাব্যময় গীতিকবিতা। ডিফারেন্ট টাচের শিল্পী মেজবাহ্ রহমান গানটি গেয়েছিলেন নব্বই সালে। তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিলো গানটি। বিউটি রাণী পাল স্কুল সময়ের বাইরে গানটির সঙ্গে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তালে তালেও নয় শুধুমাত্র হেঁটে। নৃত্যের ভঙ্গিতে হাঁটা নয়। অত্যন্ত সহজ সরল হাঁটা তবে নান্দনিক। এই ভিডিওটি ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের একটি ফেইসবুক পেজ থেকে নেতিবাচক ক্যাপশন দিয়ে আসিফ ইকবাল ইরন নামে এক প্রবাসী তরুণ ভিডিওটি ছড়িয়ে দেন। ‘ছড়িয়ে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু লোক প্রানবন্ত এই শিক্ষককে সাইবার বুলিং শুরু করেন। অশ্লীলতা, শিষ্টাচার বহির্ভুত ভিডিও হিসেবে অনেকেই চিহ্নিত করে অশালীন ভাবে গালি গালাজ শুরু করেন। তবে দেশের অধিকাংশ শুভ চিন্তার মানুষ এর মধ্যে কোন অভব্যতার চিহ্ন খোঁজে পাননি। বিউটি রানীর সহকর্মীরা তাকে অকুন্ঠ সুমর্থন জানিয়ে এ’গান দিয়ে নিজেরা এক ভিন্ন ধর্মী প্রতিবাদের সূচনা করেন। গত কয়েকদিন ফেইসবুকের নিউজফিড ছেয়ে গেছে অগণন শিক্ষক এবং সুশীল নাগরিকদের অভিনব সঙ্গীত ময় প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে। 

সকলের একি কথা,একজন নারী শিক্ষক কি তার প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের বাইরে একটি ব্যক্তিগত জীবন যাপন করতে পারেন না? শিশুবান্ধব আধুনিক শিক্ষাদান ও শিক্ষকের ব্যক্তি স্বাধীনতাকে কেন কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে? ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো গুণী শিক্ষকের চরিত্রহনন কি সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়? 

শিশু মনস্তত্ব এবং শিশু শিক্ষা নিয়ে যারা কাজ করে থাকেন তারা জানেন আনন্দঘন পরিবেশে শিশুদের শিক্ষা দানের বিকল্প কিছু নেই। খেলার মাধ্যমে শিখন, গানের মাধ্যমে শিখন সর্বোপরি আনন্দের মাধ্যমে শিখন হলো শিশুদের নির্ভয়ে শিক্ষাজীবনে প্রবেশের উপযুক্ত উপাদান। একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকতা কেবল ব্লাকবোর্ড, খড়ি কিংবা একমুখী বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ করে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে কোমলমতি শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ, মনোযোগ আকর্ষণ এবং ভীতিহীন পরিবেশ তৈরির জন্য 'আনন্দদায়ক শিখন' বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও বাধ্যতামূলক একটি মাধ্যম। বর্তমান ডিজিটাল যুগে শিক্ষক কর্তৃক শ্রেণীকক্ষে বা সহ-শিক্ষামূলক কার্যক্রমে নাচের তালে ছড়া ও গান শেখানো এবং তা শিক্ষামূলক ভিডিও বা রিলস আকারে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার বিষয়টি আইনি, প্রশাসনিক, শিক্ষাতাত্ত্বিক ও সাংবিধানিক- প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও সমর্থনযোগ্য। 

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তাই শিক্ষা দানের জন্য নৃত্য, গীত, চারুকলা, ক্রীড়ার মাধ্যমে শিক্ষক প্রশিক্ষন দেয়া হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তাই নিজেদেরকে প্রশিক্ষিত করে রাখতে হয় শিশু মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী পাঠদানের জন্য। এই প্রস্তুতি সরকারি প্রশিক্ষানালয় ‘প্রাথিমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট’ থেকে প্রদান করা হয়। দক্ষ, নিবেদিত শিক্ষকেরা স্বতঃপ্রণদিত হয়ে নিজেদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা দিয়ে নিজেদেরকে প্রস্তুত রাখতে চেষ্টা করেন। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পাল এরকম স্বঃউদয়োগী শিক্ষক। তার উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সৃজনশীলতার জন্য তিনি চলমান বছরে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে জেলা শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হন। এরকম সম্ভাবনাময় শিক্ষকের উদ্যমকে পেছন থেকে টেনে ধরার কী এখন আমাদের জাতীয় জীবনে অগ্রাধিকার। বিষয়টি গভীর ভাবে ভেবে দেখতে হবে। 

সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক বিউটি পালের পক্ষে এগিয়ে এসেছে সরকার, সুশীল সমাজের লোক, মূল ধারার সংবাদ মাধ্যম। নেতি বাচক অসংখ্য ঘটনা ও পরিবেশ পরিস্থিতির মধ্যে বড়ই আশাপ্রদ বিষয় এটি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, ঘটনাটিকে তিনি কোনো অন্যায় বা অপরাধ হিসেবে দেখছেন না। গান গাওয়া অন্যায় কোন বিষয় নয়।’

 এরকম বিষয় নিয়ে সরকার এবং নাগরিক সমাজের যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে আগামীর যে কোন সময়ে। বিশ্ব জুড়ে শিশু শিক্ষাকে সব চেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। কেনো দেখা হয় এর ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন য়াছে বলে মনে করিনা। নাগরিক সমাজকে সচেতন থাকতে হবে। শিশুর নিজস্ব ধারায় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়ে বেড়ে উঠতে সাহায্য করতে হবে। শিক্ষকের আচরণ হবে বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সহযোগিতামূলক। শিশুর অবুঝ মন বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে। পাঠদান পদ্ধতি হবে আনন্দপূর্ণ। যা শিশুরা শিক্ষকের সঙ্গে হাসতে-খেলতে শিখবে। এ’ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের কথা স্মরণ রাখতে হবে। তিনি বলেছেন: ‘আনন্দহীন শিক্ষা, শিক্ষা নয়, যে শিক্ষায় আনন্দ নেই সে শিক্ষা প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে না’। 

লেখাটি শেষ করি বিউটি রাণী পালের মুখের কথা দিয়ে। সম্প্রতি তিনি বিডি নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমরা মুখে বলব কারিকুলাম উন্নত, আর আমাদের মন-মানসিকতা থাকবে সংকীর্ণ-তাহলে আমরা কীভাবে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নেব?’। সংকীর্নতা ছেড়ে আকাশের মতো উদার না হলে শিশু শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আমরা আধুনিক বিশ্বের উপযোগি করে গড়ে তুলতে পারবো না। বিষয়টি যে কতো গুরুত্বপূর্ণ জাতি হিসেবে আমাদের অষ্ট প্রহর মনে রাখতে হবে।

[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬


শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে

প্রকাশের তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৬

featured Image
ছন্দে ছন্দে অঝোর ধারায় বর্ষায় যখন বৃষ্টি ঝরতে থাকে, মাসটি শ্রাবণ না হলেও কর্ণ কূহরে সেই অমর গানটি বাজতে থাকে। অফিসের কাজ, খাওয়া দাওয়া, আড্ডা আলাপে মশগুল থাকলেও অনবরত কানে অনুরণন হতে থাকে ‘শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে / তোমারি সুরটি আমার মুখের ’পরে, বুকের’ পরে/পুরবের আলোর সঙ্গে পড়ুক পাতে দুই নয়ানে/–নিশীথের অন্ধকারে গভীর ধারে পড়ুক প্রাণে।/” আহা কী অসাধারণ গান। এবারের শ্রাবণে সেই অমর গানকে ছাপিয়ে আর একটি গান বাঙালির হৃদয় মন দখল করে ফেলেছে ইতোমধ্যে। সে গানটি হঠাত করে প্রতিটি বাঙালির অন্তর আবার জয় করলো কী ভাবে, সেই গল্পটি পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই। 

সিলেট জেলা শহরের খুব কাছেই ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা। সিলেট শহর থেকে মাত্র ত্রিশ, চল্লিশ মিনিটের দুরত্ব। ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রাণী পাল। বিউটি রাণী পাল সিলেটের শাহাজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করেছেন। প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বল। চোখের ভেতরে অপার স্বপ্ন। শিশু শিক্ষার জন্য উপযুক্ত একজন শিক্ষক। সাধারণত প্রধান শিক্ষকেরা খুব বেশি ক্লাস নিতে দেখা যায়না। বিউটি রানী পাল ব্যতিক্রম। তার ফেসবুকে প্রবেশ করে দেখা গেলো তিনি শিশুদের অঙ্ক শেখান নানা সৃজনশীল, আনন্দময় ভঙ্গীতে । একই ভাবে দেখতে পেলাম তিনি সাত বারের নাম ছড়ার ছন্দে শিক্ষার্থীদের শেখাচ্ছেন। কী আনন্দময় শ্রেণীকক্ষের পরিবেশ। তার ফেইসবুক আইডিতে বিদ্যালয়ে পাঠদান, শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা করানো, নাচ-গানের মাধ্যমে গণিতের বিভিন্ন চিহ্ন ও পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু শেখানো, শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৃক্ষরোপণ এবং গাছের চারা বিতরণের বিভিন্ন ভিডিও দেখা যায়। তার আইডি সকলের জন্য উন্মুক্ত। এরকম আইডিতে প্রবেশ করলে মন ভালো হয়ে যায়। প্রধাণ শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রতি তার নিবেদন দেখলে এই অন্ধকার সময়ে কিছুটা হলেও আলোর রেখার অস্তিত্ব উপলব্ধি করা যায়। 

সম্প্রতি ২৩ জুলাই তারিখে এই নিবেদিত প্রাণ প্রধান শিক্ষিকার একটি ভিডিও সামজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়। খুব সাধারণ একটি ভিডিও। তাকে দেখা যায় নব্বইয়ের দশকের সাড়া জাগানো ‘ডিফারেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের একটি শ্রুতি মধুর গানের সঙ্গে হেটে যেতে। গানটির কথা ছন্দময়। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে/অঝোরে নামবে বুঝি শ্রাবনে ঝরায়ে/আজ কেন মন উদাসী হয়ে/দূর অজানায় চায় হারাতে’, কাব্যময় গীতিকবিতা। ডিফারেন্ট টাচের শিল্পী মেজবাহ্ রহমান গানটি গেয়েছিলেন নব্বই সালে। তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিলো গানটি। বিউটি রাণী পাল স্কুল সময়ের বাইরে গানটির সঙ্গে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তালে তালেও নয় শুধুমাত্র হেঁটে। নৃত্যের ভঙ্গিতে হাঁটা নয়। অত্যন্ত সহজ সরল হাঁটা তবে নান্দনিক। এই ভিডিওটি ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের একটি ফেইসবুক পেজ থেকে নেতিবাচক ক্যাপশন দিয়ে আসিফ ইকবাল ইরন নামে এক প্রবাসী তরুণ ভিডিওটি ছড়িয়ে দেন। ‘ছড়িয়ে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু লোক প্রানবন্ত এই শিক্ষককে সাইবার বুলিং শুরু করেন। অশ্লীলতা, শিষ্টাচার বহির্ভুত ভিডিও হিসেবে অনেকেই চিহ্নিত করে অশালীন ভাবে গালি গালাজ শুরু করেন। তবে দেশের অধিকাংশ শুভ চিন্তার মানুষ এর মধ্যে কোন অভব্যতার চিহ্ন খোঁজে পাননি। বিউটি রানীর সহকর্মীরা তাকে অকুন্ঠ সুমর্থন জানিয়ে এ’গান দিয়ে নিজেরা এক ভিন্ন ধর্মী প্রতিবাদের সূচনা করেন। গত কয়েকদিন ফেইসবুকের নিউজফিড ছেয়ে গেছে অগণন শিক্ষক এবং সুশীল নাগরিকদের অভিনব সঙ্গীত ময় প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে। 

সকলের একি কথা,একজন নারী শিক্ষক কি তার প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের বাইরে একটি ব্যক্তিগত জীবন যাপন করতে পারেন না? শিশুবান্ধব আধুনিক শিক্ষাদান ও শিক্ষকের ব্যক্তি স্বাধীনতাকে কেন কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে? ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো গুণী শিক্ষকের চরিত্রহনন কি সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়? 

শিশু মনস্তত্ব এবং শিশু শিক্ষা নিয়ে যারা কাজ করে থাকেন তারা জানেন আনন্দঘন পরিবেশে শিশুদের শিক্ষা দানের বিকল্প কিছু নেই। খেলার মাধ্যমে শিখন, গানের মাধ্যমে শিখন সর্বোপরি আনন্দের মাধ্যমে শিখন হলো শিশুদের নির্ভয়ে শিক্ষাজীবনে প্রবেশের উপযুক্ত উপাদান। একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকতা কেবল ব্লাকবোর্ড, খড়ি কিংবা একমুখী বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ করে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে কোমলমতি শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ, মনোযোগ আকর্ষণ এবং ভীতিহীন পরিবেশ তৈরির জন্য 'আনন্দদায়ক শিখন' বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও বাধ্যতামূলক একটি মাধ্যম। বর্তমান ডিজিটাল যুগে শিক্ষক কর্তৃক শ্রেণীকক্ষে বা সহ-শিক্ষামূলক কার্যক্রমে নাচের তালে ছড়া ও গান শেখানো এবং তা শিক্ষামূলক ভিডিও বা রিলস আকারে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার বিষয়টি আইনি, প্রশাসনিক, শিক্ষাতাত্ত্বিক ও সাংবিধানিক- প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও সমর্থনযোগ্য। 

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তাই শিক্ষা দানের জন্য নৃত্য, গীত, চারুকলা, ক্রীড়ার মাধ্যমে শিক্ষক প্রশিক্ষন দেয়া হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তাই নিজেদেরকে প্রশিক্ষিত করে রাখতে হয় শিশু মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী পাঠদানের জন্য। এই প্রস্তুতি সরকারি প্রশিক্ষানালয় ‘প্রাথিমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট’ থেকে প্রদান করা হয়। দক্ষ, নিবেদিত শিক্ষকেরা স্বতঃপ্রণদিত হয়ে নিজেদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা দিয়ে নিজেদেরকে প্রস্তুত রাখতে চেষ্টা করেন। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পাল এরকম স্বঃউদয়োগী শিক্ষক। তার উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সৃজনশীলতার জন্য তিনি চলমান বছরে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে জেলা শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হন। এরকম সম্ভাবনাময় শিক্ষকের উদ্যমকে পেছন থেকে টেনে ধরার কী এখন আমাদের জাতীয় জীবনে অগ্রাধিকার। বিষয়টি গভীর ভাবে ভেবে দেখতে হবে। 

সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক বিউটি পালের পক্ষে এগিয়ে এসেছে সরকার, সুশীল সমাজের লোক, মূল ধারার সংবাদ মাধ্যম। নেতি বাচক অসংখ্য ঘটনা ও পরিবেশ পরিস্থিতির মধ্যে বড়ই আশাপ্রদ বিষয় এটি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, ঘটনাটিকে তিনি কোনো অন্যায় বা অপরাধ হিসেবে দেখছেন না। গান গাওয়া অন্যায় কোন বিষয় নয়।’

 এরকম বিষয় নিয়ে সরকার এবং নাগরিক সমাজের যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে আগামীর যে কোন সময়ে। বিশ্ব জুড়ে শিশু শিক্ষাকে সব চেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। কেনো দেখা হয় এর ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন য়াছে বলে মনে করিনা। নাগরিক সমাজকে সচেতন থাকতে হবে। শিশুর নিজস্ব ধারায় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়ে বেড়ে উঠতে সাহায্য করতে হবে। শিক্ষকের আচরণ হবে বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সহযোগিতামূলক। শিশুর অবুঝ মন বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে। পাঠদান পদ্ধতি হবে আনন্দপূর্ণ। যা শিশুরা শিক্ষকের সঙ্গে হাসতে-খেলতে শিখবে। এ’ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের কথা স্মরণ রাখতে হবে। তিনি বলেছেন: ‘আনন্দহীন শিক্ষা, শিক্ষা নয়, যে শিক্ষায় আনন্দ নেই সে শিক্ষা প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে না’। 

লেখাটি শেষ করি বিউটি রাণী পালের মুখের কথা দিয়ে। সম্প্রতি তিনি বিডি নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমরা মুখে বলব কারিকুলাম উন্নত, আর আমাদের মন-মানসিকতা থাকবে সংকীর্ণ-তাহলে আমরা কীভাবে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নেব?’। সংকীর্নতা ছেড়ে আকাশের মতো উদার না হলে শিশু শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আমরা আধুনিক বিশ্বের উপযোগি করে গড়ে তুলতে পারবো না। বিষয়টি যে কতো গুরুত্বপূর্ণ জাতি হিসেবে আমাদের অষ্ট প্রহর মনে রাখতে হবে।

[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত