কারখানার ভেতর তখন দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। চারদিকে ধোঁয়া আর আতঙ্ক। বের হওয়ার একমাত্র পথটিও বন্ধ। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন দুই ভাই মোহন প্রামাণিক ও সুমন প্রামাণিক। বারবার ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দিচ্ছিলেন তারা। কিন্তু বাড়িতে তখন বিদ্যুৎ ছিল না। মুঠোফোনে ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় সেই আকুতি আর পৌঁছায়নি বাবা-মায়ের কানে।
কথা বলতে না পেরে পরে ভয়েস মেসেজ পাঠান দুই ভাই। তাতে তারা বলেন, ‘কারখানায় আগুন লেগেছে। দরজা বন্ধ থাকায় বের হতে পারছি না। হয়তো আমরা মারা যাব। আমাদের সঙ্গে আর দেখা হবে না। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।’ ওই মেসেজের পর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। ভয়েস মেসেজেই শেষ হয়ে যায় বাবা-মায়ের সঙ্গে দুই সন্তানের শেষ বন্ধন।
নিহত মোহন ও সুমন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালী গ্রামের গোফ্ফার প্রামাণিকের ছেলে। গত রোববার সৌদি আরবের রিয়াদের খোরদাম শহরের একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই সহোদরসহ অন্তত ১৭ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ১৩ জনই নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বাসিন্দা।
দুই ছেলের মৃত্যুর খবর আসার পর থেকে নির্বাক বাবা গোফ্ফার প্রামাণিক। তিনি নিজেও শারীরিক প্রতিবন্ধী। পরিবারের অভাব ঘোচাতে প্রায় আট বছর আগে ধারদেনা করে বড় ছেলে মোহনকে সৌদি আরব পাঠিয়েছিলেন। কয়েক বছরের শ্রমে মোহন দেনা শোধ করেন। এরপর দুই বছর আগে ছোট ভাই সুমনকেও সেখানে নিয়ে যান। দুই ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল প্রবাসে আয় করে দেশে একটি পাকা বাড়ি করবেন। সেই স্বপ্নের পথ ধরে গত বুধবারই বাড়িতে নতুন ঘরের ভিত্তি দেওয়া হয়েছিল। কাজও শুরু হয়েছিল। কিন্তু বাড়ি তৈরির আনন্দ বিষাদে রূপ নিল কয়েক দিনের মাথাতেই।
কান্নায় ভেঙে পড়ে গোফ্ফার প্রামাণিক বলেন, ‘আগুন লাগার পর ওরা বারবার ফোন করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না বলে আমরা ফোন পাইনি। শেষবারের মতো কথাও বলতে পারলাম না। পরে পাঠানো ভয়েস মেসেজে ওরা শুধু দোয়া চাইল।’
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, আত্রাইয়ের নিহত অন্য শ্রমিকেরা হলেন-পারকাসুন্দা গ্রামের জালাল; ডুবাই গ্রামের সুমন হোসেন, হাসিবুল হাসান শুভ ও সোহেল রানা; গন্ডগোহালী গ্রামের রুবেল হোসেন ও কলিউদ্দিন প্রামাণিক; সাধনগর গ্রামের সাগর হোসেন; উদনপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ; মাদবপুর গ্রামের মজিদুল ইসলাম; মধ্যেবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ এবং খরসতী গ্রামের মহিদুল ইসলাম।
আত্রাইয়ের বিভিন্ন গ্রামে এখন শোকের মাতম। স্বজনেরা দ্রুত তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সরকারের কাছে আর্থিক সহযোগিতার দাবি জানিয়েছেন।
আপনার মতামত লিখুন