মাত্র এক মাস আগেও যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে মোদী সরকার সংসদের বাদল অধিবেশনে ঢুকেছিল, সেই আত্মবিশ্বাসেই কি এখন ফাটল ধরেছে?
সংসদে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ বিল, সাংবিধানিক পরিবর্তনের পরিকল্পনা এবং বিরোধীদের মোকাবিলায় দৃঢ় অবস্থান–সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, সংখ্যার রাজনীতিতে সরকার যথেষ্ট শক্তিশালী। কিন্তু অধিবেশন যত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে অন্য ছবি। সাংবিধানিক সংশোধনী নিয়ে ধাক্কা, বিরোধীদের লাগাতার চাপ, সংসদে অচলাবস্থা এবং তার সঙ্গে রাস্তায় তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ–সব মিলিয়ে বিজেপির সামনে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই পরিস্থিতির জন্য কি শুধু জেন-জি আন্দোলনকে দায়ী করা যায়? একেবারেই নয়। এর পিছনে রয়েছে একাধিক কারণ।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই মোদী সরকারের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে। বিজেপি এককভাবে ২৪০টি আসন পেয়েছে, অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২৭২-এর চেয়ে ৩২টি কম। সরকার গঠনের জন্য তাই এনডিএ-র শরিকদের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এই পরিবর্তন সাংবিধানিক সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সেখানে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যথেষ্ট নয়, বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়। ২০২৬ সালের ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল লোকসভাতেই ২৯৮-২৩০ ভোটে পরাজিত হওয়া দেখিয়ে দিয়েছে, বড় ধরনের সাংবিধানিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে রাজনৈতিক সমর্থন তৈরি করার চ্যালেঞ্জ কতটা বড়।
এর মধ্যেই সামনে এসেছে জেন-জির ক্ষোভ। NEET-সহ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ–এই বিষয়গুলো তরুণদের মধ্যে জমে থাকা অসন্তোষকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই আন্দোলন প্রচলিত রাজনৈতিক সংগঠনের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করেনি। সোশ্যাল মিডিয়া, মিম, শর্ট ভিডিও এবং ডিজিটাল মবিলাইজেশনের মাধ্যমে তরুণরা নিজেদের বক্তব্য নিজেরাই ছড়িয়েছে। যে ডিজিটাল ইকোসিস্টেম বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, সেই একই মাধ্যম এবার সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
এখানেই জেন-জি আন্দোলনের রাজনৈতিক গুরুত্ব। এটি শুধু একটি ছাত্র আন্দোলন নয়; এটি প্রমাণ করেছে, নতুন প্রজন্ম রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচলিত ভাষার বাইরে নিজেদের জনমত তৈরি করতে পারে। ফলে সরকারের পক্ষে শুধুমাত্র বিরোধীদের আন্দোলন বলে বিষয়টিকে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে–যে সরকার জাতীয় স্তরে এত শক্তিশালী রাজনৈতিক জনমত তৈরি করতে সক্ষম, তারা কি দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ, চাকরি এবং পরীক্ষার নিরাপত্তা নিয়ে একই মাত্রায় বিশ্বাস তৈরি করতে পারছে?ভ
তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন। বাদল অধিবেশনে বারবার বিরোধী পক্ষের সঙ্গে সরকারের সংঘাত, অচলাবস্থা এবং সীমিত পার্লামেন্টেরি প্রোডাক্টিভিটি দেখিয়েছে, রাজনৈতিক মেরুকরণ কতটা গভীর হয়েছে। ফলে সরকারের পক্ষে শুধু আইন প্রণয়ন করাই যথেষ্ট নয়; সেই আইন নিয়ে জনসমর্থন তৈরি করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সাংবিধানিক পরিবর্তনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে বিরোধী দল, শরিক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি না হলে রাজনৈতিক ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তবে এখানেই বলা ভুল হবে যে বিজেপির রাজনৈতিক শক্তি শেষ হয়ে গেছে বা জেন-জি আন্দোলন মোদী সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার অবস্থায় পৌঁছে গেছে। বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। বিজেপি এখনও দেশের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন এবং মোদী সরকারের হাতে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু পরিবর্তনটা হচ্ছে অন্য জায়গায়–সরকারের সামনে এখন আগের চেয়ে বেশি প্রশ্ন, বেশি প্রতিরোধ এবং বেশি স্ক্রুতিনি ।
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হয়তো এখানেই–বিজেপি কি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে তার রাজনৈতিক যোগাযোগের ধরন বদলাতে পারবে? কারণ জেন-জি শুধু ভোটার নয়; তারা সোশ্যাল মিডিয়া-র মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে একটি ইস্যুকে জাতীয় বিতর্কে পরিণত করতে পারে। তাদের কাছে পুরনো রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার স্বচ্ছতা, চাকরি, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা এবং সরকারের জবাবদিহি।
তাই পুরো ঘটনাকে শুধু “মোদী বনাম জেন-জি” হিসেবে দেখলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আসলে এটি একদিকে জেন-জির নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, অন্যদিকে ২০২৪-এর পর বিজেপি-র বদলে যাওয়া সংসদীয় সমীকরণ, বিরোধীদের নতুন সুযোগ এবং সরকারের জনমত ব্যবস্থাপনার পরীক্ষা। মোদী সরকার এখনও শক্তিশালী, কিন্তু আগের মতো অপ্রতিদ্বন্দ্বী নয়। আর জেন-জির আন্দোলন সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান সংকেতগুলোর একটি। এখন দেখার বিষয়, এই ক্ষোভ কি সাময়িক আন্দোলন হিসেবেই থেমে যাবে, নাকি আগামী নির্বাচনের আগে ভারতের রাজনীতিতে একটি নতুন প্রজন্মের ধারনা স্থায়ী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে।
\

শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ আগস্ট ২০২৬
মাত্র এক মাস আগেও যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে মোদী সরকার সংসদের বাদল অধিবেশনে ঢুকেছিল, সেই আত্মবিশ্বাসেই কি এখন ফাটল ধরেছে?
সংসদে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ বিল, সাংবিধানিক পরিবর্তনের পরিকল্পনা এবং বিরোধীদের মোকাবিলায় দৃঢ় অবস্থান–সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, সংখ্যার রাজনীতিতে সরকার যথেষ্ট শক্তিশালী। কিন্তু অধিবেশন যত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে অন্য ছবি। সাংবিধানিক সংশোধনী নিয়ে ধাক্কা, বিরোধীদের লাগাতার চাপ, সংসদে অচলাবস্থা এবং তার সঙ্গে রাস্তায় তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ–সব মিলিয়ে বিজেপির সামনে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই পরিস্থিতির জন্য কি শুধু জেন-জি আন্দোলনকে দায়ী করা যায়? একেবারেই নয়। এর পিছনে রয়েছে একাধিক কারণ।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই মোদী সরকারের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে। বিজেপি এককভাবে ২৪০টি আসন পেয়েছে, অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২৭২-এর চেয়ে ৩২টি কম। সরকার গঠনের জন্য তাই এনডিএ-র শরিকদের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এই পরিবর্তন সাংবিধানিক সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সেখানে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যথেষ্ট নয়, বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়। ২০২৬ সালের ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল লোকসভাতেই ২৯৮-২৩০ ভোটে পরাজিত হওয়া দেখিয়ে দিয়েছে, বড় ধরনের সাংবিধানিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে রাজনৈতিক সমর্থন তৈরি করার চ্যালেঞ্জ কতটা বড়।
এর মধ্যেই সামনে এসেছে জেন-জির ক্ষোভ। NEET-সহ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ–এই বিষয়গুলো তরুণদের মধ্যে জমে থাকা অসন্তোষকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই আন্দোলন প্রচলিত রাজনৈতিক সংগঠনের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করেনি। সোশ্যাল মিডিয়া, মিম, শর্ট ভিডিও এবং ডিজিটাল মবিলাইজেশনের মাধ্যমে তরুণরা নিজেদের বক্তব্য নিজেরাই ছড়িয়েছে। যে ডিজিটাল ইকোসিস্টেম বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, সেই একই মাধ্যম এবার সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
এখানেই জেন-জি আন্দোলনের রাজনৈতিক গুরুত্ব। এটি শুধু একটি ছাত্র আন্দোলন নয়; এটি প্রমাণ করেছে, নতুন প্রজন্ম রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচলিত ভাষার বাইরে নিজেদের জনমত তৈরি করতে পারে। ফলে সরকারের পক্ষে শুধুমাত্র বিরোধীদের আন্দোলন বলে বিষয়টিকে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে–যে সরকার জাতীয় স্তরে এত শক্তিশালী রাজনৈতিক জনমত তৈরি করতে সক্ষম, তারা কি দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ, চাকরি এবং পরীক্ষার নিরাপত্তা নিয়ে একই মাত্রায় বিশ্বাস তৈরি করতে পারছে?ভ
তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন। বাদল অধিবেশনে বারবার বিরোধী পক্ষের সঙ্গে সরকারের সংঘাত, অচলাবস্থা এবং সীমিত পার্লামেন্টেরি প্রোডাক্টিভিটি দেখিয়েছে, রাজনৈতিক মেরুকরণ কতটা গভীর হয়েছে। ফলে সরকারের পক্ষে শুধু আইন প্রণয়ন করাই যথেষ্ট নয়; সেই আইন নিয়ে জনসমর্থন তৈরি করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সাংবিধানিক পরিবর্তনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে বিরোধী দল, শরিক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি না হলে রাজনৈতিক ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তবে এখানেই বলা ভুল হবে যে বিজেপির রাজনৈতিক শক্তি শেষ হয়ে গেছে বা জেন-জি আন্দোলন মোদী সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার অবস্থায় পৌঁছে গেছে। বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। বিজেপি এখনও দেশের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন এবং মোদী সরকারের হাতে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু পরিবর্তনটা হচ্ছে অন্য জায়গায়–সরকারের সামনে এখন আগের চেয়ে বেশি প্রশ্ন, বেশি প্রতিরোধ এবং বেশি স্ক্রুতিনি ।
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হয়তো এখানেই–বিজেপি কি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে তার রাজনৈতিক যোগাযোগের ধরন বদলাতে পারবে? কারণ জেন-জি শুধু ভোটার নয়; তারা সোশ্যাল মিডিয়া-র মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে একটি ইস্যুকে জাতীয় বিতর্কে পরিণত করতে পারে। তাদের কাছে পুরনো রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার স্বচ্ছতা, চাকরি, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা এবং সরকারের জবাবদিহি।
তাই পুরো ঘটনাকে শুধু “মোদী বনাম জেন-জি” হিসেবে দেখলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আসলে এটি একদিকে জেন-জির নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, অন্যদিকে ২০২৪-এর পর বিজেপি-র বদলে যাওয়া সংসদীয় সমীকরণ, বিরোধীদের নতুন সুযোগ এবং সরকারের জনমত ব্যবস্থাপনার পরীক্ষা। মোদী সরকার এখনও শক্তিশালী, কিন্তু আগের মতো অপ্রতিদ্বন্দ্বী নয়। আর জেন-জির আন্দোলন সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান সংকেতগুলোর একটি। এখন দেখার বিষয়, এই ক্ষোভ কি সাময়িক আন্দোলন হিসেবেই থেমে যাবে, নাকি আগামী নির্বাচনের আগে ভারতের রাজনীতিতে একটি নতুন প্রজন্মের ধারনা স্থায়ী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে।
\

আপনার মতামত লিখুন