একজন মানুষের একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থাকা এখন বেশ স্বাভাবিক। ব্যক্তিগত জীবনের জন্য একটি অ্যাকাউন্ট, কাজের জন্য আরেকটি, আবার শুধু ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য থাকতে পারে আলাদা ‘প্রাইভেট’ প্রোফাইল। একই মানুষের অনলাইনে এতগুলো আলাদা পরিচয়ের পেছনে শুধু প্রয়োজন নয়, কাজ করতে পারে মনস্তাত্ত্বিক কিছু কারণও।
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর নির্দিষ্ট একটি ব্যাখ্যা নেই। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সামাজিক পরিচয়, আত্মপ্রকাশের ধরন, সম্পর্কের পরিধি এবং অন্যের কাছে নিজেকে কীভাবে তুলে ধরা হবে-এসব বিষয় একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণায়ও সোশ্যাল মিডিয়াকে মানুষের আত্মপরিচয় গঠন ও নিজেকে উপস্থাপনের গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়।
আলাদা অ্যাকাউন্টে আলাদা
সামাজিক
পরিচয়
বাস্তব জীবনে একজন মানুষ কর্মক্ষেত্রে যেমন আচরণ করেন, বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে তাঁর আচরণ সবসময় একই থাকে না। অনলাইনেও অনেকেই এই ভিন্ন সামাজিক পরিসরগুলো আলাদা রাখতে চান।
একটি অ্যাকাউন্টে থাকতে পারেন আত্মীয়স্বজন ও সহকর্মীরা। অন্যটিতে থাকতে পারে কেবল ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা। আবার কোনো অ্যাকাউন্টে শুধু পেশাগত কাজ, ব্যবসা কিংবা সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের বিষয় তুলে ধরা হতে পারে।
অর্থাৎ একাধিক অ্যাকাউন্ট থাকার অর্থ সবসময় আলাদা মানুষ হয়ে ওঠা নয়। বরং জীবনের ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা ও সামাজিক সম্পর্ককে আলাদা রাখার একটি কৌশলও হতে পারে এটি।
গোপনীয়তা রক্ষার সহজ উপায়
সব কথা সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান না অনেকেই। পরিবারের সদস্য, সহকর্মী ও বন্ধুরা একই অ্যাকাউন্টে থাকলে ব্যক্তিগত কিছু বিষয় প্রকাশে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তাই আলাদা অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মানুষের জন্য নির্দিষ্ট পরিসর তৈরি করেন অনেকে।
কেউ পেশাগত পরিচয়কে সামনে রাখেন মূল অ্যাকাউন্টে, আবার ব্যক্তিগত ছবি, অনুভূতি কিংবা দৈনন্দিন জীবনের গল্প রাখেন সীমিত দর্শকের জন্য। এতে নিজের ব্যক্তিগত পরিসরের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণও থাকে।
যেখানে ‘কে কী ভাববে’-এই চিন্তা কম
মূল বা বড় অ্যাকাউন্টে পোস্ট করার আগে অনেকেই ভাবেন, পরিচিতরা বিষয়টি কীভাবে নেবেন। এই সামাজিক চাপের কারণে নিজের মতামত, রসবোধ, শখ বা ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশে দ্বিধা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে অল্প কয়েকজন পরিচিত মানুষের জন্য তৈরি অ্যাকাউন্টে সেই চাপ তুলনামূলক কম থাকে। ফলে সেখানে নিজের এমন কিছু দিক প্রকাশ করা সহজ হয়, যা বৃহত্তর সামাজিক পরিসরে প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না কেউ কেউ।
লাইক ও স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষাও ভূমিকা
রাখে
সোশ্যাল মিডিয়া শুধু যোগাযোগের জায়গা নয়, নিজের একটি নির্দিষ্ট ভাবমূর্তি তৈরি করার মাধ্যমও। পছন্দের ছবি, ভ্রমণ, অর্জন কিংবা সৃজনশীল কাজ আলাদা অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করে নির্দিষ্ট একটি দর্শকের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
মনোবিজ্ঞানে এটিকে ‘সেলফ-প্রেজেন্টেশন’ বা আত্ম-উপস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখা হয়। মানুষ সচেতনভাবে নিজের পছন্দের তথ্য সামনে আনতে পারেন এবং এর মাধ্যমে অন্যের কাছে নিজের একটি কাঙ্ক্ষিত ধারণা তৈরি করতে পারেন।
তবে একাধিক অ্যাকাউন্ট থাকলেই কাউকে আত্মমুগ্ধ, প্রতারক বা মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত বলা ঠিক নয়। একই আচরণের পেছনে মানুষের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
কখন বিষয়টি চিন্তার কারণ
হতে
পারে?
মনোবিজ্ঞানীরা সাধারণত কোনো ব্যক্তির অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দেখে তাঁর মানসিক অবস্থা বিচার করেন না। বরং গুরুত্ব দেন—কেন তিনি একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছেন, এতে তিনি কেমন অনুভব করছেন এবং এর প্রভাব তাঁর বাস্তব জীবনে কী পড়ছে।
গোপনীয়তা, পেশাগত প্রয়োজন কিংবা ভিন্ন সামাজিক পরিসর ধরে রাখার জন্য একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করলে এবং এতে দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা না হলে তা অস্বাভাবিক আচরণ নয়। তবে অনলাইন পরিচয়গুলো সামলাতে গিয়ে যদি অতিরিক্ত চাপ, উদ্বেগ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা বাস্তব সম্পর্কের সমস্যা তৈরি হয়, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট মানেই কারও ‘দ্বৈত জীবন’ নয়। বরং আধুনিক জীবনে ব্যক্তিগত ও পেশাগত পরিচয় আলাদা রাখা, গোপনীয়তা বজায় রাখা কিংবা নিজের ভিন্ন আগ্রহ প্রকাশের একটি উপায় হতে পারে এটি। শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অ্যাকাউন্টের সংখ্যা নয়, বরং সেগুলো ব্যবহারের উদ্দেশ্য ও তার প্রভাব।

মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
একজন মানুষের একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থাকা এখন বেশ স্বাভাবিক। ব্যক্তিগত জীবনের জন্য একটি অ্যাকাউন্ট, কাজের জন্য আরেকটি, আবার শুধু ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য থাকতে পারে আলাদা ‘প্রাইভেট’ প্রোফাইল। একই মানুষের অনলাইনে এতগুলো আলাদা পরিচয়ের পেছনে শুধু প্রয়োজন নয়, কাজ করতে পারে মনস্তাত্ত্বিক কিছু কারণও।
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর নির্দিষ্ট একটি ব্যাখ্যা নেই। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সামাজিক পরিচয়, আত্মপ্রকাশের ধরন, সম্পর্কের পরিধি এবং অন্যের কাছে নিজেকে কীভাবে তুলে ধরা হবে-এসব বিষয় একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণায়ও সোশ্যাল মিডিয়াকে মানুষের আত্মপরিচয় গঠন ও নিজেকে উপস্থাপনের গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়।
আলাদা অ্যাকাউন্টে আলাদা
সামাজিক
পরিচয়
বাস্তব জীবনে একজন মানুষ কর্মক্ষেত্রে যেমন আচরণ করেন, বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে তাঁর আচরণ সবসময় একই থাকে না। অনলাইনেও অনেকেই এই ভিন্ন সামাজিক পরিসরগুলো আলাদা রাখতে চান।
একটি অ্যাকাউন্টে থাকতে পারেন আত্মীয়স্বজন ও সহকর্মীরা। অন্যটিতে থাকতে পারে কেবল ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা। আবার কোনো অ্যাকাউন্টে শুধু পেশাগত কাজ, ব্যবসা কিংবা সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের বিষয় তুলে ধরা হতে পারে।
অর্থাৎ একাধিক অ্যাকাউন্ট থাকার অর্থ সবসময় আলাদা মানুষ হয়ে ওঠা নয়। বরং জীবনের ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা ও সামাজিক সম্পর্ককে আলাদা রাখার একটি কৌশলও হতে পারে এটি।
গোপনীয়তা রক্ষার সহজ উপায়
সব কথা সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান না অনেকেই। পরিবারের সদস্য, সহকর্মী ও বন্ধুরা একই অ্যাকাউন্টে থাকলে ব্যক্তিগত কিছু বিষয় প্রকাশে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তাই আলাদা অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মানুষের জন্য নির্দিষ্ট পরিসর তৈরি করেন অনেকে।
কেউ পেশাগত পরিচয়কে সামনে রাখেন মূল অ্যাকাউন্টে, আবার ব্যক্তিগত ছবি, অনুভূতি কিংবা দৈনন্দিন জীবনের গল্প রাখেন সীমিত দর্শকের জন্য। এতে নিজের ব্যক্তিগত পরিসরের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণও থাকে।
যেখানে ‘কে কী ভাববে’-এই চিন্তা কম
মূল বা বড় অ্যাকাউন্টে পোস্ট করার আগে অনেকেই ভাবেন, পরিচিতরা বিষয়টি কীভাবে নেবেন। এই সামাজিক চাপের কারণে নিজের মতামত, রসবোধ, শখ বা ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশে দ্বিধা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে অল্প কয়েকজন পরিচিত মানুষের জন্য তৈরি অ্যাকাউন্টে সেই চাপ তুলনামূলক কম থাকে। ফলে সেখানে নিজের এমন কিছু দিক প্রকাশ করা সহজ হয়, যা বৃহত্তর সামাজিক পরিসরে প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না কেউ কেউ।
লাইক ও স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষাও ভূমিকা
রাখে
সোশ্যাল মিডিয়া শুধু যোগাযোগের জায়গা নয়, নিজের একটি নির্দিষ্ট ভাবমূর্তি তৈরি করার মাধ্যমও। পছন্দের ছবি, ভ্রমণ, অর্জন কিংবা সৃজনশীল কাজ আলাদা অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করে নির্দিষ্ট একটি দর্শকের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
মনোবিজ্ঞানে এটিকে ‘সেলফ-প্রেজেন্টেশন’ বা আত্ম-উপস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখা হয়। মানুষ সচেতনভাবে নিজের পছন্দের তথ্য সামনে আনতে পারেন এবং এর মাধ্যমে অন্যের কাছে নিজের একটি কাঙ্ক্ষিত ধারণা তৈরি করতে পারেন।
তবে একাধিক অ্যাকাউন্ট থাকলেই কাউকে আত্মমুগ্ধ, প্রতারক বা মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত বলা ঠিক নয়। একই আচরণের পেছনে মানুষের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
কখন বিষয়টি চিন্তার কারণ
হতে
পারে?
মনোবিজ্ঞানীরা সাধারণত কোনো ব্যক্তির অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দেখে তাঁর মানসিক অবস্থা বিচার করেন না। বরং গুরুত্ব দেন—কেন তিনি একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছেন, এতে তিনি কেমন অনুভব করছেন এবং এর প্রভাব তাঁর বাস্তব জীবনে কী পড়ছে।
গোপনীয়তা, পেশাগত প্রয়োজন কিংবা ভিন্ন সামাজিক পরিসর ধরে রাখার জন্য একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করলে এবং এতে দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা না হলে তা অস্বাভাবিক আচরণ নয়। তবে অনলাইন পরিচয়গুলো সামলাতে গিয়ে যদি অতিরিক্ত চাপ, উদ্বেগ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা বাস্তব সম্পর্কের সমস্যা তৈরি হয়, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট মানেই কারও ‘দ্বৈত জীবন’ নয়। বরং আধুনিক জীবনে ব্যক্তিগত ও পেশাগত পরিচয় আলাদা রাখা, গোপনীয়তা বজায় রাখা কিংবা নিজের ভিন্ন আগ্রহ প্রকাশের একটি উপায় হতে পারে এটি। শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অ্যাকাউন্টের সংখ্যা নয়, বরং সেগুলো ব্যবহারের উদ্দেশ্য ও তার প্রভাব।

আপনার মতামত লিখুন