বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক জোট BRICS–Brazil, Russia, India, China and South Africa, অর্থাৎ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার আদ্যক্ষর থেকে তৈরি এই জোট বর্তমানে সম্প্রসারিত হয়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ Global South প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। সম্প্রসারণের পর BRICS-এ এখন ১১টি পূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র। আর সেই সম্প্রসারিত BRICS-এর ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন বসতে চলেছে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাশাপাশি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে নজর কাড়ছে।
২০২৬ সালে BRICS-এর সভাপতিত্ব ভারতের হাতে। এবারের সম্মেলনে ভারতের ঘোষিত অগ্রাধিকার–স্থিতিশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়ন। ফলে এবারের আলোচনায় শুধু ভূরাজনীতি নয়, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, সরবরাহ-শৃঙ্খল এবং Global South-এর উন্নয়ন সহযোগিতার মতো বিষয়ও গুরুত্ব পেতে চলেছে।
সম্প্রসারণের পর BRICS-এর পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী। অর্থাৎ একদিকে এশিয়ার বৃহৎ অর্থনীতি, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ দেশ–সব মিলিয়ে BRICS-এর ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক পরিসর আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত হয়েছে।
দিল্লি সম্মেলনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হতে চলেছে ভারত, চীন ও রাশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্মেলনের আয়োজক রাষ্ট্রের নেতা হিসেবে বৈঠকে নেতৃত্ব দেবেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইতিমধ্যেই নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন। অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ বিরতির পর তাঁর ভারত সফর এবং দিল্লিতে মোদির সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠক ভারত-চীন সম্পর্কের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের দিকে আন্তর্জাতিক নজর টেনে এনেছে।
পুতিনের উপস্থিতিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক এবং একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক–এই তিনটি সমীকরণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা দিল্লির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষা। ভারত বরাবরই BRICS-কে কোনও পশ্চিমবিরোধী সামরিক জোট হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও Global South-এর স্বার্থের একটি বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরতে আগ্রহী।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের উপস্থিতিও এবারের সম্মেলনে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের মধ্যেই ইরানের রাষ্ট্রপ্রধানের দিল্লি সফর হচ্ছে। এখানে BRICS-এর অভ্যন্তরীণ একটি জটিল সমীকরণও রয়েছে। ইরান যেমন পূর্ণ সদস্য, তেমনই সংযুক্ত আরব আমিরশাহীও এই জোটের সদস্য। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত BRICS-এর অভ্যন্তরীণ ঐকমত্যের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর মতো নেতাদের উপস্থিতিও সম্মেলনের গুরুত্ব বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার পূর্ণ সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণ BRICS-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তারের নতুন মাত্রা তৈরি করেছে।
তবে সব সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব একই পর্যায়ের নয়। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রতিনিধিত্ব করবেন আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। ব্রাজিলের ক্ষেত্রেও শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধি হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েইরার অংশগ্রহণের কথা সামনে এসেছে। ফলে দিল্লির সম্মেলনকে শুধু রাষ্ট্রপ্রধানদের বৈঠক হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না; এটি হবে বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের একটি বড় কূটনৈতিক সমাবেশ।
BRICS-এর অংশীদার ও আমন্ত্রিত দেশগুলোর প্রতিনিধিরাও এবারের বৈঠকের পরিধি বাড়াচ্ছেন। বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো, কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল, নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা আহমেদ টিনুবু এবং উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মির্জিয়োয়েভের মতো নেতাদের উপস্থিতির বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের অংশগ্রহণও সম্মেলনের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বাড়াবে।
এবারের সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা। BRICS দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো, ডিজিটাল অর্থনীতি, প্রযুক্তি, স্টার্টআপ সহযোগিতা, সরবরাহ-শৃঙ্খল এবং সীমান্তপারের আর্থিক লেনদেন সহজ করার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের ভূমিকা, বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনের সম্ভাবনাও আলোচনার অংশ হতে পারে।
তবে এখানেও বড় প্রশ্ন রয়েছে। BRICS-এর সদস্য সংখ্যা বাড়লেও সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ এক নয়। চীন ও রাশিয়া যেমন পশ্চিমা-নির্ভর আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প তৈরির বিষয়ে বেশি আগ্রহী, ভারত আবার একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গেও নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চাইছে। ফলে BRICS-কে একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক ব্লকে পরিণত করার চেয়ে বাস্তব অর্থনৈতিক সহযোগিতার দিকে এগিয়ে নেওয়াই ভারতের জন্য তুলনামূলকভাবে কার্যকর পথ হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ও ইউক্রেন যুদ্ধ। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহী একই জোটের সদস্য হলেও তাদের আঞ্চলিক স্বার্থ সব ক্ষেত্রে এক নয়। ফলে কোনও একটি ইস্যুতে BRICS-এর সব সদস্যের অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা সহজ হবে না। একইভাবে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অবস্থানের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এই বাস্তবতায় এবারের দিল্লি সম্মেলনে ভারতের অন্যতম বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হবে–বিভিন্ন মত ও স্বার্থকে এক জায়গায় এনে একটি গ্রহণযোগ্য যৌথ অবস্থান তৈরি করা।
আর এই বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সমীকরণের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বাংলাদেশের অবস্থান। বাংলাদেশ বর্তমানে BRICS-এর পূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র নয়। ফলে ১১ সদস্য দেশের শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সদস্য রাষ্ট্রের নেতা হিসেবে অংশ নিচ্ছেন না। তবে বাংলাদেশের জন্য এবারের দিল্লি সম্মেলনের গুরুত্ব একেবারেই কম নয়। কারণ ভারত, চীন, রাশিয়া, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, ইন্দোনেশিয়া, মিশরসহ বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক দেশ একই মঞ্চে বসছে।
বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে BIMSTEC। বাংলাদেশ বর্তমানে BIMSTEC-এর চেয়ারম্যান। ফলে BRICS-এর সরাসরি সদস্য না হয়েও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ঢাকার একটি আলাদা কূটনৈতিক ভূমিকা রয়েছে। ভারত BRICS-এর বর্তমান চেয়ার এবং BIMSTEC-এরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়ায় এই দুই আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক কাঠামোর মধ্যে ভবিষ্যতে যোগাযোগ বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে BRICS-এর Outreach Session-এ আমন্ত্রণ জানানো নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছিল, সেখানে পরে বিষয়টি BIMSTEC-এর চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ব্যাখ্যা সামনে আসে। ফলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে BRICS-এর সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই বিষয়টি বাংলাদেশের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য তাই প্রশ্নটি এখন শুধু BRICS-এর সদস্য হওয়া নয়। বরং BRICS-এর সম্প্রসারিত অর্থনৈতিক বলয়ের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক তৈরি করা যায়, ভারত ও চীনের মতো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে অর্থনৈতিক ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা যায় এবং Global South-এর নতুন সহযোগিতা কাঠামোয় বাংলাদেশ নিজের অবস্থান কতটা শক্তিশালী করতে পারে–সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে নয়াদিল্লির ১৮তম BRICS শীর্ষ সম্মেলন তিনটি কারণে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, মোদি, শি জিনপিং ও পুতিনের উপস্থিতিতে ভারত-চীন-রাশিয়া সমীকরণের নতুন বার্তা সামনে আসতে পারে। দ্বিতীয়ত, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং ইউক্রেন যুদ্ধের মতো জটিল ইস্যুতে BRICS-এর অভ্যন্তরীণ ঐক্যের পরীক্ষা হবে। তৃতীয়ত, সম্প্রসারিত BRICS শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মঞ্চ থাকবে, নাকি বাস্তব অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার আরও কার্যকর কাঠামো তৈরি করবে–তারও পরীক্ষা হবে এই সম্মেলনে।
আর বাংলাদেশের জন্য দিল্লির বার্তা আরও সূক্ষ্ম। সরাসরি BRICS সদস্য না হয়েও BIMSTEC, দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি এবং Global South-এর বিভিন্ন সহযোগিতা কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিসর বাড়াতে পারে। দিল্লিতে যে নতুন সমীকরণ তৈরি হবে, তার প্রভাব সরাসরি না হলেও বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং ভারত-চীন-রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ওপর পড়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
তাই ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বরের দিল্লি সম্মেলন শুধু BRICS-এর একটি নিয়মিত শীর্ষ বৈঠক নয়। এটি পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ভারত কোথায় দাঁড়াচ্ছে, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক কোন দিকে যাচ্ছে, Global South কতটা সমন্বিত হতে পারছে এবং বাংলাদেশের মতো আঞ্চলিক দেশগুলো সেই পরিবর্তিত ব্যবস্থায় নিজেদের জায়গা কতটা তৈরি করতে পারছে–তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষা।
/

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক জোট BRICS–Brazil, Russia, India, China and South Africa, অর্থাৎ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার আদ্যক্ষর থেকে তৈরি এই জোট বর্তমানে সম্প্রসারিত হয়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ Global South প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। সম্প্রসারণের পর BRICS-এ এখন ১১টি পূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র। আর সেই সম্প্রসারিত BRICS-এর ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন বসতে চলেছে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাশাপাশি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে নজর কাড়ছে।
২০২৬ সালে BRICS-এর সভাপতিত্ব ভারতের হাতে। এবারের সম্মেলনে ভারতের ঘোষিত অগ্রাধিকার–স্থিতিশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়ন। ফলে এবারের আলোচনায় শুধু ভূরাজনীতি নয়, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, সরবরাহ-শৃঙ্খল এবং Global South-এর উন্নয়ন সহযোগিতার মতো বিষয়ও গুরুত্ব পেতে চলেছে।
সম্প্রসারণের পর BRICS-এর পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী। অর্থাৎ একদিকে এশিয়ার বৃহৎ অর্থনীতি, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ দেশ–সব মিলিয়ে BRICS-এর ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক পরিসর আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত হয়েছে।
দিল্লি সম্মেলনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হতে চলেছে ভারত, চীন ও রাশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্মেলনের আয়োজক রাষ্ট্রের নেতা হিসেবে বৈঠকে নেতৃত্ব দেবেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইতিমধ্যেই নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন। অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ বিরতির পর তাঁর ভারত সফর এবং দিল্লিতে মোদির সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠক ভারত-চীন সম্পর্কের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের দিকে আন্তর্জাতিক নজর টেনে এনেছে।
পুতিনের উপস্থিতিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক এবং একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক–এই তিনটি সমীকরণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা দিল্লির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষা। ভারত বরাবরই BRICS-কে কোনও পশ্চিমবিরোধী সামরিক জোট হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও Global South-এর স্বার্থের একটি বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরতে আগ্রহী।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের উপস্থিতিও এবারের সম্মেলনে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের মধ্যেই ইরানের রাষ্ট্রপ্রধানের দিল্লি সফর হচ্ছে। এখানে BRICS-এর অভ্যন্তরীণ একটি জটিল সমীকরণও রয়েছে। ইরান যেমন পূর্ণ সদস্য, তেমনই সংযুক্ত আরব আমিরশাহীও এই জোটের সদস্য। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত BRICS-এর অভ্যন্তরীণ ঐকমত্যের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর মতো নেতাদের উপস্থিতিও সম্মেলনের গুরুত্ব বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার পূর্ণ সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণ BRICS-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তারের নতুন মাত্রা তৈরি করেছে।
তবে সব সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব একই পর্যায়ের নয়। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রতিনিধিত্ব করবেন আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। ব্রাজিলের ক্ষেত্রেও শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধি হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েইরার অংশগ্রহণের কথা সামনে এসেছে। ফলে দিল্লির সম্মেলনকে শুধু রাষ্ট্রপ্রধানদের বৈঠক হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না; এটি হবে বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের একটি বড় কূটনৈতিক সমাবেশ।
BRICS-এর অংশীদার ও আমন্ত্রিত দেশগুলোর প্রতিনিধিরাও এবারের বৈঠকের পরিধি বাড়াচ্ছেন। বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো, কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল, নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা আহমেদ টিনুবু এবং উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মির্জিয়োয়েভের মতো নেতাদের উপস্থিতির বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের অংশগ্রহণও সম্মেলনের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বাড়াবে।
এবারের সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা। BRICS দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো, ডিজিটাল অর্থনীতি, প্রযুক্তি, স্টার্টআপ সহযোগিতা, সরবরাহ-শৃঙ্খল এবং সীমান্তপারের আর্থিক লেনদেন সহজ করার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের ভূমিকা, বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনের সম্ভাবনাও আলোচনার অংশ হতে পারে।
তবে এখানেও বড় প্রশ্ন রয়েছে। BRICS-এর সদস্য সংখ্যা বাড়লেও সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ এক নয়। চীন ও রাশিয়া যেমন পশ্চিমা-নির্ভর আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প তৈরির বিষয়ে বেশি আগ্রহী, ভারত আবার একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গেও নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চাইছে। ফলে BRICS-কে একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক ব্লকে পরিণত করার চেয়ে বাস্তব অর্থনৈতিক সহযোগিতার দিকে এগিয়ে নেওয়াই ভারতের জন্য তুলনামূলকভাবে কার্যকর পথ হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ও ইউক্রেন যুদ্ধ। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহী একই জোটের সদস্য হলেও তাদের আঞ্চলিক স্বার্থ সব ক্ষেত্রে এক নয়। ফলে কোনও একটি ইস্যুতে BRICS-এর সব সদস্যের অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা সহজ হবে না। একইভাবে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অবস্থানের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এই বাস্তবতায় এবারের দিল্লি সম্মেলনে ভারতের অন্যতম বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হবে–বিভিন্ন মত ও স্বার্থকে এক জায়গায় এনে একটি গ্রহণযোগ্য যৌথ অবস্থান তৈরি করা।
আর এই বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সমীকরণের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বাংলাদেশের অবস্থান। বাংলাদেশ বর্তমানে BRICS-এর পূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র নয়। ফলে ১১ সদস্য দেশের শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সদস্য রাষ্ট্রের নেতা হিসেবে অংশ নিচ্ছেন না। তবে বাংলাদেশের জন্য এবারের দিল্লি সম্মেলনের গুরুত্ব একেবারেই কম নয়। কারণ ভারত, চীন, রাশিয়া, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, ইন্দোনেশিয়া, মিশরসহ বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক দেশ একই মঞ্চে বসছে।
বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে BIMSTEC। বাংলাদেশ বর্তমানে BIMSTEC-এর চেয়ারম্যান। ফলে BRICS-এর সরাসরি সদস্য না হয়েও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ঢাকার একটি আলাদা কূটনৈতিক ভূমিকা রয়েছে। ভারত BRICS-এর বর্তমান চেয়ার এবং BIMSTEC-এরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়ায় এই দুই আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক কাঠামোর মধ্যে ভবিষ্যতে যোগাযোগ বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে BRICS-এর Outreach Session-এ আমন্ত্রণ জানানো নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছিল, সেখানে পরে বিষয়টি BIMSTEC-এর চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ব্যাখ্যা সামনে আসে। ফলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে BRICS-এর সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই বিষয়টি বাংলাদেশের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য তাই প্রশ্নটি এখন শুধু BRICS-এর সদস্য হওয়া নয়। বরং BRICS-এর সম্প্রসারিত অর্থনৈতিক বলয়ের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক তৈরি করা যায়, ভারত ও চীনের মতো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে অর্থনৈতিক ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা যায় এবং Global South-এর নতুন সহযোগিতা কাঠামোয় বাংলাদেশ নিজের অবস্থান কতটা শক্তিশালী করতে পারে–সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে নয়াদিল্লির ১৮তম BRICS শীর্ষ সম্মেলন তিনটি কারণে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, মোদি, শি জিনপিং ও পুতিনের উপস্থিতিতে ভারত-চীন-রাশিয়া সমীকরণের নতুন বার্তা সামনে আসতে পারে। দ্বিতীয়ত, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং ইউক্রেন যুদ্ধের মতো জটিল ইস্যুতে BRICS-এর অভ্যন্তরীণ ঐক্যের পরীক্ষা হবে। তৃতীয়ত, সম্প্রসারিত BRICS শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মঞ্চ থাকবে, নাকি বাস্তব অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার আরও কার্যকর কাঠামো তৈরি করবে–তারও পরীক্ষা হবে এই সম্মেলনে।
আর বাংলাদেশের জন্য দিল্লির বার্তা আরও সূক্ষ্ম। সরাসরি BRICS সদস্য না হয়েও BIMSTEC, দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি এবং Global South-এর বিভিন্ন সহযোগিতা কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিসর বাড়াতে পারে। দিল্লিতে যে নতুন সমীকরণ তৈরি হবে, তার প্রভাব সরাসরি না হলেও বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং ভারত-চীন-রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ওপর পড়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
তাই ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বরের দিল্লি সম্মেলন শুধু BRICS-এর একটি নিয়মিত শীর্ষ বৈঠক নয়। এটি পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ভারত কোথায় দাঁড়াচ্ছে, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক কোন দিকে যাচ্ছে, Global South কতটা সমন্বিত হতে পারছে এবং বাংলাদেশের মতো আঞ্চলিক দেশগুলো সেই পরিবর্তিত ব্যবস্থায় নিজেদের জায়গা কতটা তৈরি করতে পারছে–তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষা।
/

আপনার মতামত লিখুন