ভালোবাসার গল্প মানেই যেন দুজন মানুষের গল্প। একজনের হাত ধরে আরেকজনের পথচলা, একসঙ্গে স্বপ্ন দেখা, বিশেষ দিনগুলোতে পাশাপাশি ছবি তোলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতাজুড়ে এমন দৃশ্যই বেশি চোখে পড়ে। কিন্তু জীবনের গল্প কি সবসময় দুজনকে নিয়েই হতে হবে?উত্তরটা হতে পারে না।
কেউ ভালোবাসার মানুষকে পাশে নিয়ে জীবন সাজাচ্ছেন, কেউ আবার নিজের মতো করেই এগিয়ে চলেছেন। কারও জীবনে সম্পর্ক এসেছে, টেকেনি; কেউ হয়তো এখনো সঙ্গী খুঁজে পাননি। আবার কেউ সচেতনভাবেই বেছে নিয়েছেন একা থাকার জীবন। তাই একা থাকা মানেই যে মন খারাপ করে বসে থাকা, এমন ধারণাও বদলাচ্ছে।
আজ ২৩ সেপ্টেম্বর, সিঙ্গেল দিবস। সম্পর্কের বাইরে থাকা মানুষদের জন্য দিনটি নিজের দিকে ফিরে তাকানোর একটি উপলক্ষ হিসেবেই দেখা যেতে পারে। অন্যের সঙ্গে নিজের জীবনকে মেলানোর বদলে নিজের অর্জন, স্বপ্ন, পছন্দ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার দিন হতে পারে এটি।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শত রূপে, শতবার জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।’ প্রেমের এমন চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কবিতায় পাওয়া যায় একা থাকার অন্যরকম স্বস্তি ‘একা থাকার এই ভালো লাগায় হারিয়ে গিয়েছি, নিঃসঙ্গতা আমাকে আর পাবে না।’ অর্থাৎ মানুষের অনুভূতির জগৎ একরৈখিক নয়। কেউ সঙ্গের মধ্যে পূর্ণতা খুঁজে পান, কেউ নিজের একান্ত জগতেই খুঁজে পান স্বস্তি।
একা মানেই কি একাকী?
একাকীত্ব আর একা থাকা এক বিষয় নয়। একা থাকা হতে পারে নিজের সিদ্ধান্ত, নিজের সময় ও নিজের স্বাধীনতার অংশ। সেখানে অন্য কারও পছন্দ-অপছন্দের সঙ্গে প্রতিনিয়ত নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের ইচ্ছেমতো কোথাও ঘুরতে যাওয়া, পছন্দের খাবার খাওয়া, রাত জেগে সিনেমা দেখা কিংবা নীরবে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করা সবই হতে পারে একা জীবনের ছোট ছোট আনন্দ।
বরং অনেকের কাছে এই সময়টুকু নিজের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ। কী চাই, কোথায় যেতে চাই, কোন স্বপ্নটি এখনো পূরণ হয়নি এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নিজের জন্য কিছুটা সময় দরকার হয়।
ভালোবাসা শুধু অন্যের জন্য নয়
আমরা সাধারণত ভালোবাসাকে অন্য একজন মানুষকে ঘিরেই ভাবি। অথচ নিজের যত্ন নেওয়া, নিজের ভুলকে ক্ষমা করা, নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিজের প্রয়োজনকে সম্মান করাও ভালোবাসারই অংশ হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ভালোবাসা দিবস কিংবা অন্য কোনো বিশেষ দিনে চারপাশে যখন অসংখ্য যুগল ছবি দেখা যায়, তখন সিঙ্গেল মানুষের মনে নিজের জীবন নিয়ে এক ধরনের অপূর্ণতার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। কিন্তু অন্যের জীবনের দৃশ্য দেখে নিজের জীবনের মূল্য নির্ধারণ করার কোনো প্রয়োজন নেই।
কারও জীবনে দুজন মিলে গল্প লেখা হচ্ছে, কারও গল্পে এখনো একজনই প্রধান চরিত্র। দুই ধরনের জীবনই স্বাভাবিক।
সিঙ্গেল দিবসের পেছনের গল্প
সিঙ্গেল দিবসের প্রচলন নিয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় সিঙ্গেল দিবসের প্রচলনের সঙ্গে কারেন রিডের নাম উল্লেখ করা হয়। প্রথমদিকে জানুয়ারিতে দিনটি পালনের কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে ২৩ সেপ্টেম্বর সিঙ্গেল দিবস হিসেবে পালনের প্রচলন তৈরি হয়।
চীনে আবার সিঙ্গেল দিবস পালিত হয় ১১ নভেম্বর। ‘১১.১১’ তারিখের চারটি এককে একক মানুষের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ধারণা করা হয়, ১৯৯০-এর দশকে চীনের নানজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ আয়োজনের সূচনা হয়। পরবর্তীতে দিনটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং নানা ধরনের ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়।
আজকের দিনটা হোক নিজের জন্য
সিঙ্গেল দিবস মানেই নিঃসঙ্গতার গল্প নয়। বরং নিজের জীবনকে নতুন করে দেখার একটি উপলক্ষ হতে পারে দিনটি।অনেকদিন ধরে যে বইটি কেনার কথা ভাবছেন, সেটি কিনে ফেলতে পারেন। পছন্দের কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে নিজের পছন্দের খাবার খেতে পারেন। ব্যস্ততার কারণে যাওয়া হয়নি এমন কোনো জায়গায় একাই ঘুরে আসতে পারেন। চাইলে প্রিয় গান শুনে, সিনেমা দেখে কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়েও দিনটি উপভোগ করা যায়।
আর যদি কিছুই করতে ইচ্ছে না করে, তাতেও সমস্যা নেই। নিজের ঘরে নিশ্চিন্তে বসে এক কাপ চা হাতে নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোও হতে পারে দিনের সবচেয়ে সুন্দর আয়োজন।
কারণ জীবনের পূর্ণতা সবসময় কোনো সম্পর্কের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। কখনো কখনো নিজের স্বপ্ন, নিজের স্বাধীনতা এবং নিজের সঙ্গে ভালো থাকার মধ্যেও জীবনের গভীর আনন্দ লুকিয়ে থাকে।
তাই আজ যারা সিঙ্গেল, তাদের জন্য বার্তাটা সহজ অন্যের জীবনের গল্প দেখে নিজের গল্পকে ছোট করবেন না। আপনার গল্পের মূল্য আছে। আর সেই গল্পের নায়ক বা নায়িকা যদি আপাতত একজনই হন, তাতেও গল্পটি অসম্পূর্ণ নয়।

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভালোবাসার গল্প মানেই যেন দুজন মানুষের গল্প। একজনের হাত ধরে আরেকজনের পথচলা, একসঙ্গে স্বপ্ন দেখা, বিশেষ দিনগুলোতে পাশাপাশি ছবি তোলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতাজুড়ে এমন দৃশ্যই বেশি চোখে পড়ে। কিন্তু জীবনের গল্প কি সবসময় দুজনকে নিয়েই হতে হবে?উত্তরটা হতে পারে না।
কেউ ভালোবাসার মানুষকে পাশে নিয়ে জীবন সাজাচ্ছেন, কেউ আবার নিজের মতো করেই এগিয়ে চলেছেন। কারও জীবনে সম্পর্ক এসেছে, টেকেনি; কেউ হয়তো এখনো সঙ্গী খুঁজে পাননি। আবার কেউ সচেতনভাবেই বেছে নিয়েছেন একা থাকার জীবন। তাই একা থাকা মানেই যে মন খারাপ করে বসে থাকা, এমন ধারণাও বদলাচ্ছে।
আজ ২৩ সেপ্টেম্বর, সিঙ্গেল দিবস। সম্পর্কের বাইরে থাকা মানুষদের জন্য দিনটি নিজের দিকে ফিরে তাকানোর একটি উপলক্ষ হিসেবেই দেখা যেতে পারে। অন্যের সঙ্গে নিজের জীবনকে মেলানোর বদলে নিজের অর্জন, স্বপ্ন, পছন্দ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার দিন হতে পারে এটি।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শত রূপে, শতবার জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।’ প্রেমের এমন চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কবিতায় পাওয়া যায় একা থাকার অন্যরকম স্বস্তি ‘একা থাকার এই ভালো লাগায় হারিয়ে গিয়েছি, নিঃসঙ্গতা আমাকে আর পাবে না।’ অর্থাৎ মানুষের অনুভূতির জগৎ একরৈখিক নয়। কেউ সঙ্গের মধ্যে পূর্ণতা খুঁজে পান, কেউ নিজের একান্ত জগতেই খুঁজে পান স্বস্তি।
একা মানেই কি একাকী?
একাকীত্ব আর একা থাকা এক বিষয় নয়। একা থাকা হতে পারে নিজের সিদ্ধান্ত, নিজের সময় ও নিজের স্বাধীনতার অংশ। সেখানে অন্য কারও পছন্দ-অপছন্দের সঙ্গে প্রতিনিয়ত নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের ইচ্ছেমতো কোথাও ঘুরতে যাওয়া, পছন্দের খাবার খাওয়া, রাত জেগে সিনেমা দেখা কিংবা নীরবে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করা সবই হতে পারে একা জীবনের ছোট ছোট আনন্দ।
বরং অনেকের কাছে এই সময়টুকু নিজের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ। কী চাই, কোথায় যেতে চাই, কোন স্বপ্নটি এখনো পূরণ হয়নি এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নিজের জন্য কিছুটা সময় দরকার হয়।
ভালোবাসা শুধু অন্যের জন্য নয়
আমরা সাধারণত ভালোবাসাকে অন্য একজন মানুষকে ঘিরেই ভাবি। অথচ নিজের যত্ন নেওয়া, নিজের ভুলকে ক্ষমা করা, নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিজের প্রয়োজনকে সম্মান করাও ভালোবাসারই অংশ হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ভালোবাসা দিবস কিংবা অন্য কোনো বিশেষ দিনে চারপাশে যখন অসংখ্য যুগল ছবি দেখা যায়, তখন সিঙ্গেল মানুষের মনে নিজের জীবন নিয়ে এক ধরনের অপূর্ণতার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। কিন্তু অন্যের জীবনের দৃশ্য দেখে নিজের জীবনের মূল্য নির্ধারণ করার কোনো প্রয়োজন নেই।
কারও জীবনে দুজন মিলে গল্প লেখা হচ্ছে, কারও গল্পে এখনো একজনই প্রধান চরিত্র। দুই ধরনের জীবনই স্বাভাবিক।
সিঙ্গেল দিবসের পেছনের গল্প
সিঙ্গেল দিবসের প্রচলন নিয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় সিঙ্গেল দিবসের প্রচলনের সঙ্গে কারেন রিডের নাম উল্লেখ করা হয়। প্রথমদিকে জানুয়ারিতে দিনটি পালনের কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে ২৩ সেপ্টেম্বর সিঙ্গেল দিবস হিসেবে পালনের প্রচলন তৈরি হয়।
চীনে আবার সিঙ্গেল দিবস পালিত হয় ১১ নভেম্বর। ‘১১.১১’ তারিখের চারটি এককে একক মানুষের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ধারণা করা হয়, ১৯৯০-এর দশকে চীনের নানজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ আয়োজনের সূচনা হয়। পরবর্তীতে দিনটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং নানা ধরনের ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়।
আজকের দিনটা হোক নিজের জন্য
সিঙ্গেল দিবস মানেই নিঃসঙ্গতার গল্প নয়। বরং নিজের জীবনকে নতুন করে দেখার একটি উপলক্ষ হতে পারে দিনটি।অনেকদিন ধরে যে বইটি কেনার কথা ভাবছেন, সেটি কিনে ফেলতে পারেন। পছন্দের কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে নিজের পছন্দের খাবার খেতে পারেন। ব্যস্ততার কারণে যাওয়া হয়নি এমন কোনো জায়গায় একাই ঘুরে আসতে পারেন। চাইলে প্রিয় গান শুনে, সিনেমা দেখে কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়েও দিনটি উপভোগ করা যায়।
আর যদি কিছুই করতে ইচ্ছে না করে, তাতেও সমস্যা নেই। নিজের ঘরে নিশ্চিন্তে বসে এক কাপ চা হাতে নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোও হতে পারে দিনের সবচেয়ে সুন্দর আয়োজন।
কারণ জীবনের পূর্ণতা সবসময় কোনো সম্পর্কের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। কখনো কখনো নিজের স্বপ্ন, নিজের স্বাধীনতা এবং নিজের সঙ্গে ভালো থাকার মধ্যেও জীবনের গভীর আনন্দ লুকিয়ে থাকে।
তাই আজ যারা সিঙ্গেল, তাদের জন্য বার্তাটা সহজ অন্যের জীবনের গল্প দেখে নিজের গল্পকে ছোট করবেন না। আপনার গল্পের মূল্য আছে। আর সেই গল্পের নায়ক বা নায়িকা যদি আপাতত একজনই হন, তাতেও গল্পটি অসম্পূর্ণ নয়।

আপনার মতামত লিখুন