সময়কে আরও নিখুঁতভাবে মাপার প্রযুক্তিতে নতুন অগ্রগতির দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। ভিয়েনা ও বেইজিংয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করা দুটি গবেষক দল তৈরি করেছে বিশ্বের প্রথম দুটি কার্যকর ‘নিউক্লিয়ার ক্লক’ বা নিউক্লিয়াসভিত্তিক ঘড়ি।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ন্যাভিগেশন, যোগাযোগ ও পরিমাপবিদ্যার মতো ক্ষেত্রে কাজে লাগার পাশাপাশি মৌলিক পদার্থবিদ্যার গবেষণাতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
বুধবার বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’-এ প্রকাশিত দুটি পৃথক গবেষণাপত্রে দুই দলের এই সাফল্যের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকদের দাবি, ভবিষ্যতে নিউক্লিয়ার ক্লকের নির্ভুলতা বর্তমানে ব্যবহৃত সবচেয়ে উন্নত পারমাণবিক ঘড়িকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি নতুন প্রযুক্তিটি।
নিউক্লিয়ার ক্লক কীভাবে কাজ করে?
‘নিউক্লিয়ার ক্লক’ নাম শুনে পরমাণুর সংযোজন বা বিভাজনের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে হতে পারে। বাস্তবে তা নয়।
এই ঘড়িতে একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াস এবং উচ্চক্ষমতার লেজার রশ্মির পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে সময় পরিমাপ করা হয়। ভিয়েনা ও বেইজিংয়ের দুটি ঘড়িই ‘থোরিয়াম-২২৯’ আইসোটোপ ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে। এই আইসোটোপকে কঠিন অবস্থার ক্যালসিয়াম ফ্লোরাইড স্ফটিকের মধ্যে আবদ্ধ রাখা হয়েছে।
বেইজিংয়ের গবেষক দলের নেতৃত্ব দেওয়া সিংহুয়া ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ শিকিয়াং ডিং বলেন, দুটি দল একে অপরের থেকে স্বাধীনভাবে ভিন্ন পরীক্ষামূলক পদ্ধতি অনুসরণ করেও প্রায় একই সময়ে কার্যকর থোরিয়াম-২২৯ নিউক্লিয়ার ক্লক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
ভিয়েনার দলের নেতৃত্বে থাকা ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার পদার্থবিদ থরস্টেন শুম জানান, নিউক্লিয়ার ক্লক তৈরি করা প্রায় পাঁচ দশক ধরে পদার্থবিদদের বড় একটি লক্ষ্য ছিল। তার দল ২০০৮ সাল থেকে এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে।
পারমাণবিক ঘড়ি থেকে পার্থক্য কোথায়?
১৯৪৯ সালে নির্ভুল পারমাণবিক ঘড়ি উদ্ভাবনের পর সময় পরিমাপের প্রযুক্তিতে বড় পরিবর্তন আসে। বর্তমান পারমাণবিক ঘড়িতে সিজিয়াম বা স্ট্রনশিয়ামের মতো উপাদান ব্যবহার করা হয়।
লেজার বা মাইক্রোওয়েভের সাহায্যে এসব পরমাণুর বাইরের অংশে থাকা ইলেকট্রনকে এক শক্তিস্তর থেকে অন্য শক্তিস্তরে স্থানান্তরিত করা হয়। সেই পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেই সময়ের হিসাব করা হয়।
নিউক্লিয়ার ক্লকের পদ্ধতি আলাদা। এখানে লেজারের মাধ্যমে পরমাণুর নিউক্লিয়াসে থাকা প্রোটন ও নিউট্রনের শক্তিস্তরের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়।
পরমাণুর বাইরের ইলেকট্রন খোলসের তুলনায় নিউক্লিয়াস অনেক ছোট। ফলে নিউক্লিয়াসের ভেতরের পরিবর্তন আরও নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হলে সময় পরিমাপের নির্ভুলতাও বাড়তে পারে।
কোথায় কাজে লাগতে পারে?
নিউক্লিয়ার ক্লকের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে গবেষকরা কয়েকটি ক্ষেত্রের কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে-
গবেষক শুমের মতে, ভবিষ্যতে নিউক্লিয়ার ক্লক আরও নিখুঁত হওয়ার পাশাপাশি কম ওজনের ও কম ভঙ্গুর ডিভাইস হিসেবেও তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
বর্তমানে সবচেয়ে উন্নত পারমাণবিক ঘড়িগুলো বিলিয়ন বছরে প্রায় এক সেকেন্ড পর্যন্ত ভুল করতে পারে। ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট, ইন্টারনেট, সেলুলার যোগাযোগ ও ফাইবার-অপটিক যোগাযোগের মতো প্রযুক্তিতে এই ধরনের নির্ভুল সময় পরিমাপ গুরুত্বপূর্ণ।
ডার্ক ম্যাটার খোঁজার পরীক্ষাও হয়েছে
নিউক্লিয়ার ক্লকের সম্ভাবনা শুধু সময় মাপার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মৌলিক পদার্থবিদ্যার গবেষণাতেও এটি নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
ভিয়েনার গবেষকরা তাদের তৈরি ঘড়ি ব্যবহার করে একটি নির্ভুল পরীক্ষা চালান। উদ্দেশ্য ছিল ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি শনাক্ত করা। পরীক্ষায় ডার্ক ম্যাটারের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
তবে গবেষক দলটির দাবি, ওই পরীক্ষার সময় নিউক্লিয়ার ক্লকটি বর্তমানে সবচেয়ে উন্নত পারমাণবিক ঘড়িগুলোর সঙ্গে তুলনীয় সক্ষমতা দেখিয়েছে।
আরও উন্নতির অপেক্ষা
নতুন প্রযুক্তি নিয়ে সাফল্য এলেও নিউক্লিয়ার ক্লক এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
থরস্টেন শুমের মতে, ভিয়েনার দলের থোরিয়াম স্ফটিকগুলোর ঘনত্ব ও অপটিক্যাল বৈশিষ্ট্য ভালো। অন্যদিকে বেইজিংয়ের দল ব্যবহার করছে শক্তিশালী লেজার। এই দুই ধরনের সুবিধা একত্র করা গেলে ভবিষ্যতে আরও উন্নত নিউক্লিয়ার ক্লক তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬
সময়কে আরও নিখুঁতভাবে মাপার প্রযুক্তিতে নতুন অগ্রগতির দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। ভিয়েনা ও বেইজিংয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করা দুটি গবেষক দল তৈরি করেছে বিশ্বের প্রথম দুটি কার্যকর ‘নিউক্লিয়ার ক্লক’ বা নিউক্লিয়াসভিত্তিক ঘড়ি।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ন্যাভিগেশন, যোগাযোগ ও পরিমাপবিদ্যার মতো ক্ষেত্রে কাজে লাগার পাশাপাশি মৌলিক পদার্থবিদ্যার গবেষণাতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
বুধবার বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’-এ প্রকাশিত দুটি পৃথক গবেষণাপত্রে দুই দলের এই সাফল্যের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকদের দাবি, ভবিষ্যতে নিউক্লিয়ার ক্লকের নির্ভুলতা বর্তমানে ব্যবহৃত সবচেয়ে উন্নত পারমাণবিক ঘড়িকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি নতুন প্রযুক্তিটি।
নিউক্লিয়ার ক্লক কীভাবে কাজ করে?
‘নিউক্লিয়ার ক্লক’ নাম শুনে পরমাণুর সংযোজন বা বিভাজনের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে হতে পারে। বাস্তবে তা নয়।
এই ঘড়িতে একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াস এবং উচ্চক্ষমতার লেজার রশ্মির পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে সময় পরিমাপ করা হয়। ভিয়েনা ও বেইজিংয়ের দুটি ঘড়িই ‘থোরিয়াম-২২৯’ আইসোটোপ ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে। এই আইসোটোপকে কঠিন অবস্থার ক্যালসিয়াম ফ্লোরাইড স্ফটিকের মধ্যে আবদ্ধ রাখা হয়েছে।
বেইজিংয়ের গবেষক দলের নেতৃত্ব দেওয়া সিংহুয়া ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ শিকিয়াং ডিং বলেন, দুটি দল একে অপরের থেকে স্বাধীনভাবে ভিন্ন পরীক্ষামূলক পদ্ধতি অনুসরণ করেও প্রায় একই সময়ে কার্যকর থোরিয়াম-২২৯ নিউক্লিয়ার ক্লক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
ভিয়েনার দলের নেতৃত্বে থাকা ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার পদার্থবিদ থরস্টেন শুম জানান, নিউক্লিয়ার ক্লক তৈরি করা প্রায় পাঁচ দশক ধরে পদার্থবিদদের বড় একটি লক্ষ্য ছিল। তার দল ২০০৮ সাল থেকে এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে।
পারমাণবিক ঘড়ি থেকে পার্থক্য কোথায়?
১৯৪৯ সালে নির্ভুল পারমাণবিক ঘড়ি উদ্ভাবনের পর সময় পরিমাপের প্রযুক্তিতে বড় পরিবর্তন আসে। বর্তমান পারমাণবিক ঘড়িতে সিজিয়াম বা স্ট্রনশিয়ামের মতো উপাদান ব্যবহার করা হয়।
লেজার বা মাইক্রোওয়েভের সাহায্যে এসব পরমাণুর বাইরের অংশে থাকা ইলেকট্রনকে এক শক্তিস্তর থেকে অন্য শক্তিস্তরে স্থানান্তরিত করা হয়। সেই পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেই সময়ের হিসাব করা হয়।
নিউক্লিয়ার ক্লকের পদ্ধতি আলাদা। এখানে লেজারের মাধ্যমে পরমাণুর নিউক্লিয়াসে থাকা প্রোটন ও নিউট্রনের শক্তিস্তরের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়।
পরমাণুর বাইরের ইলেকট্রন খোলসের তুলনায় নিউক্লিয়াস অনেক ছোট। ফলে নিউক্লিয়াসের ভেতরের পরিবর্তন আরও নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হলে সময় পরিমাপের নির্ভুলতাও বাড়তে পারে।
কোথায় কাজে লাগতে পারে?
নিউক্লিয়ার ক্লকের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে গবেষকরা কয়েকটি ক্ষেত্রের কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে-
গবেষক শুমের মতে, ভবিষ্যতে নিউক্লিয়ার ক্লক আরও নিখুঁত হওয়ার পাশাপাশি কম ওজনের ও কম ভঙ্গুর ডিভাইস হিসেবেও তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
বর্তমানে সবচেয়ে উন্নত পারমাণবিক ঘড়িগুলো বিলিয়ন বছরে প্রায় এক সেকেন্ড পর্যন্ত ভুল করতে পারে। ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট, ইন্টারনেট, সেলুলার যোগাযোগ ও ফাইবার-অপটিক যোগাযোগের মতো প্রযুক্তিতে এই ধরনের নির্ভুল সময় পরিমাপ গুরুত্বপূর্ণ।
ডার্ক ম্যাটার খোঁজার পরীক্ষাও হয়েছে
নিউক্লিয়ার ক্লকের সম্ভাবনা শুধু সময় মাপার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মৌলিক পদার্থবিদ্যার গবেষণাতেও এটি নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
ভিয়েনার গবেষকরা তাদের তৈরি ঘড়ি ব্যবহার করে একটি নির্ভুল পরীক্ষা চালান। উদ্দেশ্য ছিল ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি শনাক্ত করা। পরীক্ষায় ডার্ক ম্যাটারের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
তবে গবেষক দলটির দাবি, ওই পরীক্ষার সময় নিউক্লিয়ার ক্লকটি বর্তমানে সবচেয়ে উন্নত পারমাণবিক ঘড়িগুলোর সঙ্গে তুলনীয় সক্ষমতা দেখিয়েছে।
আরও উন্নতির অপেক্ষা
নতুন প্রযুক্তি নিয়ে সাফল্য এলেও নিউক্লিয়ার ক্লক এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
থরস্টেন শুমের মতে, ভিয়েনার দলের থোরিয়াম স্ফটিকগুলোর ঘনত্ব ও অপটিক্যাল বৈশিষ্ট্য ভালো। অন্যদিকে বেইজিংয়ের দল ব্যবহার করছে শক্তিশালী লেজার। এই দুই ধরনের সুবিধা একত্র করা গেলে ভবিষ্যতে আরও উন্নত নিউক্লিয়ার ক্লক তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন