হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে টানা বর্ষণ, শিলাবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ৪০০ হেক্টরের বেশি পাকা ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। আগাম বন্যার শঙ্কায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষকরা। ব্যাংক ও মহাজনের কাছে করা ঋণের বোঝা নিয়েই তারা দাঁড়িয়ে আছেন তলিয়ে যাওয়া জমির পাশে।
গুঙ্গিয়াজুড়ি হাওরের ধার ঘেঁষে আবু হাসানের ছোট ঘর। কয়েক দিন আগেও এখানে সোনালি ধানে মাঠ ছিল মুখর। আজ নেই কোনো ফসল। শুধু চোখে জল, মুখে অভিযোগের সুর।
আবু হাসান বলেন, ‘ধান কাটার আগেই সব তলিয়ে গেছে। ব্যাংক থেকে ঋণ করে চাষ করছিলাম। এখন সেই ঋণ শোধ করব কী করে? বাড়ির ছেলেমেয়ের মুখে কী দিয়ে খাওয়াব?’তার দিকে তাকিয়ে স্ত্রী ফাতেমা বেগম বারবার চোখ মুছছেন।
মকার হাওরের কৃষক জাকির মিয়া গত ১৫ বছর ধরে বোরো ধান চাষ করছেন। এবার ৭ একর জমিতে ধান লাগিয়েছিলেন। স্বপ্ন ছিল, ভালো ফলন হলে ছেলেকে ঢাকায় পড়াতে পারবেন, মেয়ের বিয়ের জন্য কিছু জমাতে পারবেন।কিন্তু স্বপ্ন ভেঙে গেছে কয়েক ঘণ্টায়।
ক্ষোভ প্রকাশ করে জাকির মিয়া বলেন, ‘এভাবে ফসল নষ্ট হবে ভাবিনি। মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে গেল। টানা বৃষ্টিতে পানি বাড়তে থাকে আর আমি শুধু দেখছি- আমার সোনার ধান কীভাবে ডুবে যাচ্ছে।’
শ্রমিক সংকট ও হারভেস্টারের অতিরিক্ত ভাড়ায় আগেই কৃষকেরা পড়েছিলেন দুশ্চিন্তায়। তার ওপর আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে গেল স্বপ্নের ফসল।
মনিহারা হাওরের কৃষক আবদুল খালেক বাড়ির পাশের ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছেন তার জমির দিকে। যেখানে এখন শুধু থৈ থৈ পানি। কয়েক দিন আগেও যেখানে দোল খাচ্ছিল পাকা ধান।
হতাশ সুরে খালেক বলেন, ‘এখন কী করব? চাষের জন্য ব্যাংক থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলাম। এই টাকা কী করে শোধ করব? একবার যদি কেউ পাশে দাঁড়ায়।’
তিন বিঘা জমিতে ধান কেটে বাড়িতে তোলা হলেও ৫ বিঘার ধান পানির তলায়। যা কাটা হয়েছে, সেই ধান শুকাতেও পারছেন না বৃষ্টির কারণে। ইতিমধ্যে ধান পচতে শুরু করেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শেখ ফজলুল হক মনি জানান, ‘টানা বৃষ্টির কারণে হাওরের প্রায় ৪০০ হেক্টর পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নবীগঞ্জে ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ ধান কাটা শেষ হলেও বাকি অংশ ক্ষতির মুখে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪০০ হেক্টর পাকা ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, এক বিঘা জমিতে ধান কাটতে খরচ ২ হাজার টাকার বেশি। অথচ প্রতি মণ ধানের দাম ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। এ দামে উৎপাদন খরচই তোলা কঠিন। ফলে কৃষকেরা লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন।
হারভেস্টার ভাড়া নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে কৃষকদের মধ্যে। সরকার নির্ধারণ করলেও প্রতি বিঘা জমিতে হারভেস্টারের ভাড়া ১ হাজার ৯০০ টাকা- বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কথা বলে অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছেন মেশিন মালিকরা।
নবীগঞ্জে বর্ষণ ও শিলাবৃষ্টিতে বিস্তীর্ণ জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আগাম বন্যার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা স্থানীয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের হিসাবে সর্বোচ্চ। উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে হাওরের নদীগুলোতে পানি বাড়ছে, আশঙ্কা আরও ধান নষ্টের।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সৃষ্ট এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে জরুরি ভিত্তিতে প্রণোদনা, কৃষিঋণ পুনঃতফসিল এবং আর্থিক সহায়তা দেওয়া হোক। তা না হলে পুরো এলাকার খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষক পরিবারের জীবনযাত্রা হুমকির মুখে পড়বে।

শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ মে ২০২৬
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে টানা বর্ষণ, শিলাবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ৪০০ হেক্টরের বেশি পাকা ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। আগাম বন্যার শঙ্কায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষকরা। ব্যাংক ও মহাজনের কাছে করা ঋণের বোঝা নিয়েই তারা দাঁড়িয়ে আছেন তলিয়ে যাওয়া জমির পাশে।
গুঙ্গিয়াজুড়ি হাওরের ধার ঘেঁষে আবু হাসানের ছোট ঘর। কয়েক দিন আগেও এখানে সোনালি ধানে মাঠ ছিল মুখর। আজ নেই কোনো ফসল। শুধু চোখে জল, মুখে অভিযোগের সুর।
আবু হাসান বলেন, ‘ধান কাটার আগেই সব তলিয়ে গেছে। ব্যাংক থেকে ঋণ করে চাষ করছিলাম। এখন সেই ঋণ শোধ করব কী করে? বাড়ির ছেলেমেয়ের মুখে কী দিয়ে খাওয়াব?’তার দিকে তাকিয়ে স্ত্রী ফাতেমা বেগম বারবার চোখ মুছছেন।
মকার হাওরের কৃষক জাকির মিয়া গত ১৫ বছর ধরে বোরো ধান চাষ করছেন। এবার ৭ একর জমিতে ধান লাগিয়েছিলেন। স্বপ্ন ছিল, ভালো ফলন হলে ছেলেকে ঢাকায় পড়াতে পারবেন, মেয়ের বিয়ের জন্য কিছু জমাতে পারবেন।কিন্তু স্বপ্ন ভেঙে গেছে কয়েক ঘণ্টায়।
ক্ষোভ প্রকাশ করে জাকির মিয়া বলেন, ‘এভাবে ফসল নষ্ট হবে ভাবিনি। মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে গেল। টানা বৃষ্টিতে পানি বাড়তে থাকে আর আমি শুধু দেখছি- আমার সোনার ধান কীভাবে ডুবে যাচ্ছে।’
শ্রমিক সংকট ও হারভেস্টারের অতিরিক্ত ভাড়ায় আগেই কৃষকেরা পড়েছিলেন দুশ্চিন্তায়। তার ওপর আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে গেল স্বপ্নের ফসল।
মনিহারা হাওরের কৃষক আবদুল খালেক বাড়ির পাশের ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছেন তার জমির দিকে। যেখানে এখন শুধু থৈ থৈ পানি। কয়েক দিন আগেও যেখানে দোল খাচ্ছিল পাকা ধান।
হতাশ সুরে খালেক বলেন, ‘এখন কী করব? চাষের জন্য ব্যাংক থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলাম। এই টাকা কী করে শোধ করব? একবার যদি কেউ পাশে দাঁড়ায়।’
তিন বিঘা জমিতে ধান কেটে বাড়িতে তোলা হলেও ৫ বিঘার ধান পানির তলায়। যা কাটা হয়েছে, সেই ধান শুকাতেও পারছেন না বৃষ্টির কারণে। ইতিমধ্যে ধান পচতে শুরু করেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শেখ ফজলুল হক মনি জানান, ‘টানা বৃষ্টির কারণে হাওরের প্রায় ৪০০ হেক্টর পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নবীগঞ্জে ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ ধান কাটা শেষ হলেও বাকি অংশ ক্ষতির মুখে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪০০ হেক্টর পাকা ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, এক বিঘা জমিতে ধান কাটতে খরচ ২ হাজার টাকার বেশি। অথচ প্রতি মণ ধানের দাম ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। এ দামে উৎপাদন খরচই তোলা কঠিন। ফলে কৃষকেরা লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন।
হারভেস্টার ভাড়া নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে কৃষকদের মধ্যে। সরকার নির্ধারণ করলেও প্রতি বিঘা জমিতে হারভেস্টারের ভাড়া ১ হাজার ৯০০ টাকা- বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কথা বলে অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছেন মেশিন মালিকরা।
নবীগঞ্জে বর্ষণ ও শিলাবৃষ্টিতে বিস্তীর্ণ জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আগাম বন্যার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা স্থানীয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের হিসাবে সর্বোচ্চ। উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে হাওরের নদীগুলোতে পানি বাড়ছে, আশঙ্কা আরও ধান নষ্টের।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সৃষ্ট এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে জরুরি ভিত্তিতে প্রণোদনা, কৃষিঋণ পুনঃতফসিল এবং আর্থিক সহায়তা দেওয়া হোক। তা না হলে পুরো এলাকার খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষক পরিবারের জীবনযাত্রা হুমকির মুখে পড়বে।

আপনার মতামত লিখুন