সংবাদ

রাবি ক্যাম্পাসে ভাসমান দোকানের দৌরাত্ম্য, বাড়ছে ভোগান্তি


জাহিদুল ইসলাম
জাহিদুল ইসলাম
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬, ০২:৩৫ পিএম

রাবি ক্যাম্পাসে ভাসমান দোকানের দৌরাত্ম্য, বাড়ছে ভোগান্তি

দিনের শুরুতেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একসময়কার শান্ত, সবুজ আর নিরিবিলি পথগুলো যেন রূপ নেয় অস্থায়ী এক ব্যস্ত বাজারে। টং দোকানের ঝলমলে আলো, চায়ের ধোঁয়া, ভাজাপোড়ার তীব্র গন্ধ আর দোকানিদের উচ্চস্বরে ক্রেতা ডাকার শব্দে বদলে যায় পুরো পরিবেশ।

কোথাও রাস্তার ধারে, কোথাও ফুটপাত জুড়ে, আবার কোথাও আবাসিক হলের সামনেই গড়ে উঠেছে সারি সারি ভাসমান দোকান। দিন যত গড়ায়, ততই বাড়তে থাকে কোলাহল। এমনকি ক্লাস চলাকালীন সময়েও উচ্চ শব্দ ও বিশৃঙ্খলার কারণে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ। ফলে ক্যাম্পাসের সেই চিরচেনা শিক্ষাঙ্গনের আবহ ধীরে ধীরে হারিয়ে গিয়ে জায়গা করে নিচ্ছে এক অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক চিত্র।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ মোড়, একাডেমিক ভবনের আশপাশ, এমনকি শিক্ষার্থীদের হাঁটার পথও এখন দখল করে বসেছে অসংখ্য ভাসমান ও অস্থায়ী দোকান। চা, ফাস্টফুড, ফল, মোবাইল অ্যাক্সেসরিজ থেকে শুরু করে কাপ— সবই বিক্রি হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে।

কোনো কোনো দোকানে গভীর রাত পর্যন্ত চলে আড্ডা, উচ্চ শব্দে গান বাজানো ও হৈচৈ। এতে যেমন ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি পড়াশোনার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ক্যাম্পাসজুড়ে নানা জায়গায় দোকান ছড়িয়ে রয়েছে। টুকিটাকি চত্বর, ইসমাইল হোসেন সিরাজী ভবনের সামনে, রবীন্দ্র ভবনের পেছনের গেইট, মমতাজ ভবনের সামনে, তৃতীয় বিজ্ঞান ভবনের সামনের এলাকা এবং পরিবহন চত্বরসহ বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী খাবারের দোকান। এর অধিকাংশই ভাজাপোড়া ও ফাস্টফুডনির্ভর খাবারের দোকান। দোকানগুলো থেকে ভেসে আসা তেলের গন্ধ, ক্রেতা ডাকাডাকি ও অতিরিক্ত শব্দ শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও পড়াশোনায় বিঘ্ন সৃষ্টি করছে।

শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এসব দোকানের খাবারের মান নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। অধিকাংশ দোকানেই স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই। খোলা জায়গায় খাবার প্রস্তুত ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে অপরিষ্কার পানি ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কম দামে খাবার মিললেও সেগুলোর মান অত্যন্ত নিম্নমানের এবং অনেক সময় খাবার খেয়ে অসুস্থ হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিভিন্ন সময় খাবারের দোকানগুলোর জন্য নির্ধারিত মূল্যতালিকা করে দিলেও অধিকাংশ দোকান তা মানছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে খাবার বিক্রি, নিম্নমানের খাবার পরিবেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি অমান্যের কারণে সম্প্রতি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে কয়েকটি দোকানকে জরিমানাও করেছে। এরপরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

শিক্ষার্থীদের একাংশ বলছেন, প্রয়োজনের তাগিদে দোকান দরকার হলেও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে দোকান বসানোয় ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা দুটোই নষ্ট হচ্ছে।

এসব দোকানের কারণে ক্যাম্পাসে বাড়ছে শব্দদূষণ ও ময়লা। অনেক জায়গায় ডাস্টবিন না থাকায় খাবারের উচ্ছিষ্ট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকছে। বৃষ্টির সময় নোংরা পানি জমে তৈরি হচ্ছে দুর্গন্ধ। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী শরীফুল ইসলাম তানবীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,“ক্যাম্পাসে দোকান থাকবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এখন যেভাবে যত্রতত্র দোকান বসছে, তাতে পরিবেশটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হাঁটার জায়গাও ঠিকমতো থাকে না।

সবুজ ক্যাম্পাস এখন ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক এলাকায় রূপ নিচ্ছে। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় যে যেখানে পারছে দোকান বসাচ্ছে।”

তবে দোকানিদের দাবি ভিন্ন। তাদের দবি, শিক্ষার্থীদের চাহিদা মেটাতেই এসব দোকান গড়ে উঠেছে। 

এক দোকানি বলেন, “শিক্ষার্থীরা রাত পর্যন্ত এখানে থাকে। তাদের চা-নাস্তার প্রয়োজন হয় বলেই আমরা দোকান দিই। এটা আমাদের জীবিকারও বিষয়। আমরা অল্প দামে শিক্ষার্থীদের খাবারের ব্যবস্থা করি।”

ফুড কর্ণারের দাবি জানিয়ে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মেঘলা আক্তার বলেন, " দোকানগুলো সম্পূর্ণ উচ্ছেদের পরিবর্তে নির্দিষ্ট স্থানে দোকান বসানোর ব্যবস্থা করা হলে একদিকে যেমন সৌন্দর্য রক্ষা পাবে, তেমনি জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নির্ধারিত ফুড কর্নার বা ব্যবসায়িক জোন না থাকায় অপরিকল্পিতভাবে দোকান বাড়ছে। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে ক্যাম্পাসের নান্দনিকতা ও স্বাভাবিক পরিবেশ।"

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, আমরা ঈদের আগে উচ্ছেদ অভিযান চালাবো। শুধু প্রয়োজনীয় দোকান ছাড়া বাকিসব দোকান তুলে দিবো। যে দোকানগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় সেগুলো ছাড়া বাকিসব দোকান আমরা উচ্ছেদ করে দিবো। সম্প্রতি সময়ে ক্যাম্পাসে যত্রতত্র দোকান বসানো হয়েছে,যেটা আসলে ক্যাম্পাসের পুরো পরিবেশটা নষ্ট করে দিচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬


রাবি ক্যাম্পাসে ভাসমান দোকানের দৌরাত্ম্য, বাড়ছে ভোগান্তি

প্রকাশের তারিখ : ১২ মে ২০২৬

featured Image

দিনের শুরুতেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একসময়কার শান্ত, সবুজ আর নিরিবিলি পথগুলো যেন রূপ নেয় অস্থায়ী এক ব্যস্ত বাজারে। টং দোকানের ঝলমলে আলো, চায়ের ধোঁয়া, ভাজাপোড়ার তীব্র গন্ধ আর দোকানিদের উচ্চস্বরে ক্রেতা ডাকার শব্দে বদলে যায় পুরো পরিবেশ।

কোথাও রাস্তার ধারে, কোথাও ফুটপাত জুড়ে, আবার কোথাও আবাসিক হলের সামনেই গড়ে উঠেছে সারি সারি ভাসমান দোকান। দিন যত গড়ায়, ততই বাড়তে থাকে কোলাহল। এমনকি ক্লাস চলাকালীন সময়েও উচ্চ শব্দ ও বিশৃঙ্খলার কারণে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ। ফলে ক্যাম্পাসের সেই চিরচেনা শিক্ষাঙ্গনের আবহ ধীরে ধীরে হারিয়ে গিয়ে জায়গা করে নিচ্ছে এক অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক চিত্র।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ মোড়, একাডেমিক ভবনের আশপাশ, এমনকি শিক্ষার্থীদের হাঁটার পথও এখন দখল করে বসেছে অসংখ্য ভাসমান ও অস্থায়ী দোকান। চা, ফাস্টফুড, ফল, মোবাইল অ্যাক্সেসরিজ থেকে শুরু করে কাপ— সবই বিক্রি হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে।

কোনো কোনো দোকানে গভীর রাত পর্যন্ত চলে আড্ডা, উচ্চ শব্দে গান বাজানো ও হৈচৈ। এতে যেমন ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি পড়াশোনার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ক্যাম্পাসজুড়ে নানা জায়গায় দোকান ছড়িয়ে রয়েছে। টুকিটাকি চত্বর, ইসমাইল হোসেন সিরাজী ভবনের সামনে, রবীন্দ্র ভবনের পেছনের গেইট, মমতাজ ভবনের সামনে, তৃতীয় বিজ্ঞান ভবনের সামনের এলাকা এবং পরিবহন চত্বরসহ বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী খাবারের দোকান। এর অধিকাংশই ভাজাপোড়া ও ফাস্টফুডনির্ভর খাবারের দোকান। দোকানগুলো থেকে ভেসে আসা তেলের গন্ধ, ক্রেতা ডাকাডাকি ও অতিরিক্ত শব্দ শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও পড়াশোনায় বিঘ্ন সৃষ্টি করছে।

শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এসব দোকানের খাবারের মান নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। অধিকাংশ দোকানেই স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই। খোলা জায়গায় খাবার প্রস্তুত ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে অপরিষ্কার পানি ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কম দামে খাবার মিললেও সেগুলোর মান অত্যন্ত নিম্নমানের এবং অনেক সময় খাবার খেয়ে অসুস্থ হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিভিন্ন সময় খাবারের দোকানগুলোর জন্য নির্ধারিত মূল্যতালিকা করে দিলেও অধিকাংশ দোকান তা মানছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে খাবার বিক্রি, নিম্নমানের খাবার পরিবেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি অমান্যের কারণে সম্প্রতি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে কয়েকটি দোকানকে জরিমানাও করেছে। এরপরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

শিক্ষার্থীদের একাংশ বলছেন, প্রয়োজনের তাগিদে দোকান দরকার হলেও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে দোকান বসানোয় ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা দুটোই নষ্ট হচ্ছে।

এসব দোকানের কারণে ক্যাম্পাসে বাড়ছে শব্দদূষণ ও ময়লা। অনেক জায়গায় ডাস্টবিন না থাকায় খাবারের উচ্ছিষ্ট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকছে। বৃষ্টির সময় নোংরা পানি জমে তৈরি হচ্ছে দুর্গন্ধ। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী শরীফুল ইসলাম তানবীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,“ক্যাম্পাসে দোকান থাকবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এখন যেভাবে যত্রতত্র দোকান বসছে, তাতে পরিবেশটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হাঁটার জায়গাও ঠিকমতো থাকে না।

সবুজ ক্যাম্পাস এখন ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক এলাকায় রূপ নিচ্ছে। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় যে যেখানে পারছে দোকান বসাচ্ছে।”

তবে দোকানিদের দাবি ভিন্ন। তাদের দবি, শিক্ষার্থীদের চাহিদা মেটাতেই এসব দোকান গড়ে উঠেছে। 

এক দোকানি বলেন, “শিক্ষার্থীরা রাত পর্যন্ত এখানে থাকে। তাদের চা-নাস্তার প্রয়োজন হয় বলেই আমরা দোকান দিই। এটা আমাদের জীবিকারও বিষয়। আমরা অল্প দামে শিক্ষার্থীদের খাবারের ব্যবস্থা করি।”

ফুড কর্ণারের দাবি জানিয়ে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মেঘলা আক্তার বলেন, " দোকানগুলো সম্পূর্ণ উচ্ছেদের পরিবর্তে নির্দিষ্ট স্থানে দোকান বসানোর ব্যবস্থা করা হলে একদিকে যেমন সৌন্দর্য রক্ষা পাবে, তেমনি জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নির্ধারিত ফুড কর্নার বা ব্যবসায়িক জোন না থাকায় অপরিকল্পিতভাবে দোকান বাড়ছে। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে ক্যাম্পাসের নান্দনিকতা ও স্বাভাবিক পরিবেশ।"

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, আমরা ঈদের আগে উচ্ছেদ অভিযান চালাবো। শুধু প্রয়োজনীয় দোকান ছাড়া বাকিসব দোকান তুলে দিবো। যে দোকানগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় সেগুলো ছাড়া বাকিসব দোকান আমরা উচ্ছেদ করে দিবো। সম্প্রতি সময়ে ক্যাম্পাসে যত্রতত্র দোকান বসানো হয়েছে,যেটা আসলে ক্যাম্পাসের পুরো পরিবেশটা নষ্ট করে দিচ্ছে।



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত