বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে ‘সংবাদ’একটি অনন্য নাম। দীর্ঘ ৭৬ বছরের পথচলায় এই পত্রিকাটি এদেশের প্রগতিশীল রাজনীতি, সংস্কৃতি ও গণমুখী সাংবাদিকতার ধারক হিসেবে কাজ করেছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় বহু নক্ষত্রতুল্য সাংবাদিক সংবাদের পাতাকে সমৃদ্ধ করেছেন। তবে মফস্বল সাংবাদিকতা কিংবা তৃণমূলের মানুষের কথা বলতে গেলে সবার আগে উচ্চারিত হয়- তিনি আর কেউ নন, চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন।
আজ ১৭ মে, সংবাদের ৭৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর এই বিশেষ ক্ষণে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি সেই নির্ভীক কলমযোদ্ধাকে, যিনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের আয়েশ ছেড়ে ধুলোবালি মাখা মেঠোপথকে বেছে নিয়েছিলেন তার কর্মস্থল হিসেবে।
সংগ্রামের দিনগুলি
১৯৪৫ সালের ১৮ জানুয়ারি তৎকালীন ‘মঙ্গাখ্যাত’ উত্তরাঞ্চলের রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলার এক নিভৃত পল্লীতে জন্ম নেন মোনাজাতউদ্দিন। তার বাবা মৌলভী আলীম উদ্দীন আহমেদ এবং মা মতিজান নেছা। মোনাজাতউদ্দিনের শৈশব ও বেড়ে ওঠা ছিল চরম অভাব আর অন্তহীন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তিনি রংপুরের ঐতিহ্যবাহী কৈলাশরঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাসের পর কারমাইকেল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। কিন্তু স্নাতক (বিএ) শ্রেণিতে পড়ার সময় হঠাৎ বাবার মৃত্যু তার জীবনে পাহাড়সম বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পরিবারের সাত ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় হওয়ায় সংসারের পুরো জোয়াল তখন তার তরুণ কাঁধেই চাপে। অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা থমকে গেলেও দমে যাননি তিনি; অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে পরবর্তীতে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। জীবনের এই কঠিন কষাঘাত আর দারিদ্র্যের সঙ্গে নিরন্তর লড়াই-ই তাকে শিখিয়েছিল সাধারণ মানুষের অন্তরের ব্যথা আর চোখের ভাষা পড়তে।
‘সংবাদ’ অধ্যায়
মোনাজাতউদ্দিনের সাংবাদিকতা জীবনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৬ সালে ‘দৈনিক আজাদ’-এর মাধ্যমে। এরপর ১৯৭২ সালে তিনি নিজেই প্রকাশ করেন ‘দৈনিক রংপুর’। তবে তার সাংবাদিক সত্তার পূর্ণ বিকাশ ঘটে ১৯৭৬ সালে যখন তিনি ‘দৈনিক সংবাদ’-এ যোগ দেন। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক তিনি এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থেকে উত্তরবঙ্গের অবহেলিত জনপদ, মঙ্গা পীড়িত মানুষের হাহাকার আর গ্রামীণ রাজনীতির কূটচাল সংবাদের পাতায় নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তাকে যথার্থই বলা হয় ‘চারণ সাংবাদিক’। প্রাচীনকালের চারণ কবিরা যেমন গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে গান গেয়ে বেড়াতেন, মোনাজাতউদ্দিনও তেমনি কাঁধে খদ্দরের ঝোলা ব্যাগ আর হাতে নোটবুক নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে বেড়াতেন খবরের সন্ধানে। তার কাছে খবর মানে কেবল শুষ্ক তথ্য ছিল না, ছিল মানুষের যাপিত জীবনের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
মফস্বল সাংবাদিকতার ব্যাকরণ
মোনাজাতউদ্দিনের সবচেয়ে বড় কীর্তি ছিল সংবাদের পাতায় প্রকাশিত ‘পথ থেকে পথে’ শীর্ষক ধারাবাহিক প্রতিবেদন। এটি কেবল একগুচ্ছ খবর ছিল না, বরং বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতার এক নতুন দিগন্ত। তিনি এমন সব মানুষের কথা লিখতেন যারা কোনোদিন খবরের শিরোনাম হতে পারেনি; ছিন্নমূল মানুষ, চরাঞ্চলের কৃষক, নদীভাঙা পরিবার-এরাই ছিল তার প্রতিবেদনের নায়ক। সংবাদে থাকাকালীন তার ‘মানুষ ও সমাজ’ বিভাগটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়, যার জন্য তিনি মর্যাদাপূর্ণ ‘ফিলিপস পুরস্কার’-এ ভূষিত হন। এর মাধ্যমে তিনি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া দুর্নীতি ও কুসংস্কারকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতেন। তার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কেবল সমস্যার কথা বলত না, বরং নীতিনির্ধারকদের বাধ্য করত সেই সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিতে। তার লেখনী ছিল শাণিত ও ধারালো, কিন্তু তার অন্তঃকরণ ছিল মানুষের প্রতি গভীর সংবেদনশীল।
সৃজনশীলতার ভুবন
মোনাজাতউদ্দিন কেবল একজন ক্ষুরধার প্রতিবেদক ছিলেন না, ছিলেন একাধারে নাট্যকার, ছড়াকার ও শক্তিমান কথাসাহিত্যিক। তার লেখা বইগুলো আজও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের কাছে মফস্বল সাংবাদিকতার পাঠ্যবই হিসেবে সমাদৃত। ‘সংবাদের নেপথ্য’, ‘পথ থেকে পথে’, ‘নিজস্ব রিপোর্ট’, ‘শাহ আলম ও মজিবের কাহিনী’, ‘পায়ের নিচে সর্ষে’ এবং ‘কাগজের মানুষ’ বইগুলো তার জীবনের বহুমুখী অভিজ্ঞতার নির্যাস। প্রতিটি বইয়ে তিনি খবরের পেছনের খবর আর একজন সাংবাদিকের সামাজিক দায়বদ্ধতাকে নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এছাড়া তার লেখা নাটক ও ছড়ায় সমাজ সংস্কার আর শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি
সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদানের জন্য মোনাজাতউদ্দিন অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। ১৯৮৪ সালে ‘সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী স্মৃতি পদক’ লাভ করেন। এছাড়া দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত ‘মানুষ ও সমাজ’ প্রতিবেদনের জন্য ১৯৮৭ সালে মর্যাদাপূর্ণ ‘ফিলিপস পুরস্কার’ পান। একই বছর লাভ করেন ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স’ পুরস্কার। তৃণমূল সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৫ সালে তিনি আন্তর্জাতিক ‘অশোকা ফেলোশিপ’ লাভ করেন। তার অসামান্য কর্মের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৭ সালে তাকে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করা হয়।
অমীমাংসিত প্রস্থান
১৯৯৫ সালে মোনাজাতউদ্দিন ‘সংবাদ’ ছেড়ে ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’ পত্রিকায় যোগদান করেন। এর মাত্র কয়েক মাসের মাথায়, ২৯ ডিসেম্বর যমুনা নদীতে ‘শহীদ বরকত’ ফেরি থেকে পড়ে গিয়ে তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়। তার এই প্রস্থান আজও বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত ও অমীমাংসিত প্রশ্ন হয়ে আছে। তিনি কি সত্যিই যমুনার প্রবল স্রোতে পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলেন, নাকি এর পেছনে ছিল কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের সুগভীর ষড়যন্ত্র? তৎকালীন সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আজও আলোর মুখ দেখেনি, যা এই রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে। দীর্ঘ তিন দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের গণমাধ্যমকর্মীরা আজও সেই সত্যটি জানতে চায়-কী ঘটেছিল সেই শীতের সকালে?
আধুনিক সাংবাদিকতায় মোনাজাতউদ্দিনের প্রাসঙ্গিকতা
আজ যখন সাংবাদিকতা করপোরেট সংস্কৃতির চাপে অনেকটা শহরকেন্দ্রিক এবং চটকদার খবরের দিকে ঝুঁকছে, তখন মোনাজাতউদ্দিন আমাদের শিখিয়ে দিয়ে যান সাংবাদিকতা আসলে কার জন্য। তিনি প্রমাণ করেছেন, এসি রুমে বসে ইন্টারনেট ঘেঁটে যা পাওয়া যায় না, তা পাওয়া যায় মানুষের চোখের জলে আর ঘামের গন্ধে। ‘সংবাদ’-এর ৭৬ বছরের দীর্ঘ ঐতিহ্যের এক বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছেন এই চারণ সাংবাদিক।
মোনাজাতউদ্দিন চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু তার জীবন ও কর্ম আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছে- সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, এটি একটি আজন্ম সাধনা। সংবাদের পাতায় পাতায় তিনি বেঁচে থাকবেন তার অমর লেখনীর মাধ্যমে।
লেখক: এডিটর, ন্যাশনাল ডেস্ক, সংবাদ

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে ‘সংবাদ’একটি অনন্য নাম। দীর্ঘ ৭৬ বছরের পথচলায় এই পত্রিকাটি এদেশের প্রগতিশীল রাজনীতি, সংস্কৃতি ও গণমুখী সাংবাদিকতার ধারক হিসেবে কাজ করেছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় বহু নক্ষত্রতুল্য সাংবাদিক সংবাদের পাতাকে সমৃদ্ধ করেছেন। তবে মফস্বল সাংবাদিকতা কিংবা তৃণমূলের মানুষের কথা বলতে গেলে সবার আগে উচ্চারিত হয়- তিনি আর কেউ নন, চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন।
আজ ১৭ মে, সংবাদের ৭৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর এই বিশেষ ক্ষণে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি সেই নির্ভীক কলমযোদ্ধাকে, যিনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের আয়েশ ছেড়ে ধুলোবালি মাখা মেঠোপথকে বেছে নিয়েছিলেন তার কর্মস্থল হিসেবে।
সংগ্রামের দিনগুলি
১৯৪৫ সালের ১৮ জানুয়ারি তৎকালীন ‘মঙ্গাখ্যাত’ উত্তরাঞ্চলের রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলার এক নিভৃত পল্লীতে জন্ম নেন মোনাজাতউদ্দিন। তার বাবা মৌলভী আলীম উদ্দীন আহমেদ এবং মা মতিজান নেছা। মোনাজাতউদ্দিনের শৈশব ও বেড়ে ওঠা ছিল চরম অভাব আর অন্তহীন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তিনি রংপুরের ঐতিহ্যবাহী কৈলাশরঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাসের পর কারমাইকেল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। কিন্তু স্নাতক (বিএ) শ্রেণিতে পড়ার সময় হঠাৎ বাবার মৃত্যু তার জীবনে পাহাড়সম বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পরিবারের সাত ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় হওয়ায় সংসারের পুরো জোয়াল তখন তার তরুণ কাঁধেই চাপে। অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা থমকে গেলেও দমে যাননি তিনি; অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে পরবর্তীতে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। জীবনের এই কঠিন কষাঘাত আর দারিদ্র্যের সঙ্গে নিরন্তর লড়াই-ই তাকে শিখিয়েছিল সাধারণ মানুষের অন্তরের ব্যথা আর চোখের ভাষা পড়তে।
‘সংবাদ’ অধ্যায়
মোনাজাতউদ্দিনের সাংবাদিকতা জীবনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৬ সালে ‘দৈনিক আজাদ’-এর মাধ্যমে। এরপর ১৯৭২ সালে তিনি নিজেই প্রকাশ করেন ‘দৈনিক রংপুর’। তবে তার সাংবাদিক সত্তার পূর্ণ বিকাশ ঘটে ১৯৭৬ সালে যখন তিনি ‘দৈনিক সংবাদ’-এ যোগ দেন। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক তিনি এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থেকে উত্তরবঙ্গের অবহেলিত জনপদ, মঙ্গা পীড়িত মানুষের হাহাকার আর গ্রামীণ রাজনীতির কূটচাল সংবাদের পাতায় নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তাকে যথার্থই বলা হয় ‘চারণ সাংবাদিক’। প্রাচীনকালের চারণ কবিরা যেমন গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে গান গেয়ে বেড়াতেন, মোনাজাতউদ্দিনও তেমনি কাঁধে খদ্দরের ঝোলা ব্যাগ আর হাতে নোটবুক নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে বেড়াতেন খবরের সন্ধানে। তার কাছে খবর মানে কেবল শুষ্ক তথ্য ছিল না, ছিল মানুষের যাপিত জীবনের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
মফস্বল সাংবাদিকতার ব্যাকরণ
মোনাজাতউদ্দিনের সবচেয়ে বড় কীর্তি ছিল সংবাদের পাতায় প্রকাশিত ‘পথ থেকে পথে’ শীর্ষক ধারাবাহিক প্রতিবেদন। এটি কেবল একগুচ্ছ খবর ছিল না, বরং বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতার এক নতুন দিগন্ত। তিনি এমন সব মানুষের কথা লিখতেন যারা কোনোদিন খবরের শিরোনাম হতে পারেনি; ছিন্নমূল মানুষ, চরাঞ্চলের কৃষক, নদীভাঙা পরিবার-এরাই ছিল তার প্রতিবেদনের নায়ক। সংবাদে থাকাকালীন তার ‘মানুষ ও সমাজ’ বিভাগটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়, যার জন্য তিনি মর্যাদাপূর্ণ ‘ফিলিপস পুরস্কার’-এ ভূষিত হন। এর মাধ্যমে তিনি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া দুর্নীতি ও কুসংস্কারকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতেন। তার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কেবল সমস্যার কথা বলত না, বরং নীতিনির্ধারকদের বাধ্য করত সেই সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিতে। তার লেখনী ছিল শাণিত ও ধারালো, কিন্তু তার অন্তঃকরণ ছিল মানুষের প্রতি গভীর সংবেদনশীল।
সৃজনশীলতার ভুবন
মোনাজাতউদ্দিন কেবল একজন ক্ষুরধার প্রতিবেদক ছিলেন না, ছিলেন একাধারে নাট্যকার, ছড়াকার ও শক্তিমান কথাসাহিত্যিক। তার লেখা বইগুলো আজও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের কাছে মফস্বল সাংবাদিকতার পাঠ্যবই হিসেবে সমাদৃত। ‘সংবাদের নেপথ্য’, ‘পথ থেকে পথে’, ‘নিজস্ব রিপোর্ট’, ‘শাহ আলম ও মজিবের কাহিনী’, ‘পায়ের নিচে সর্ষে’ এবং ‘কাগজের মানুষ’ বইগুলো তার জীবনের বহুমুখী অভিজ্ঞতার নির্যাস। প্রতিটি বইয়ে তিনি খবরের পেছনের খবর আর একজন সাংবাদিকের সামাজিক দায়বদ্ধতাকে নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এছাড়া তার লেখা নাটক ও ছড়ায় সমাজ সংস্কার আর শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি
সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদানের জন্য মোনাজাতউদ্দিন অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। ১৯৮৪ সালে ‘সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী স্মৃতি পদক’ লাভ করেন। এছাড়া দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত ‘মানুষ ও সমাজ’ প্রতিবেদনের জন্য ১৯৮৭ সালে মর্যাদাপূর্ণ ‘ফিলিপস পুরস্কার’ পান। একই বছর লাভ করেন ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স’ পুরস্কার। তৃণমূল সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৫ সালে তিনি আন্তর্জাতিক ‘অশোকা ফেলোশিপ’ লাভ করেন। তার অসামান্য কর্মের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৭ সালে তাকে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করা হয়।
অমীমাংসিত প্রস্থান
১৯৯৫ সালে মোনাজাতউদ্দিন ‘সংবাদ’ ছেড়ে ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’ পত্রিকায় যোগদান করেন। এর মাত্র কয়েক মাসের মাথায়, ২৯ ডিসেম্বর যমুনা নদীতে ‘শহীদ বরকত’ ফেরি থেকে পড়ে গিয়ে তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়। তার এই প্রস্থান আজও বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত ও অমীমাংসিত প্রশ্ন হয়ে আছে। তিনি কি সত্যিই যমুনার প্রবল স্রোতে পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলেন, নাকি এর পেছনে ছিল কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের সুগভীর ষড়যন্ত্র? তৎকালীন সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আজও আলোর মুখ দেখেনি, যা এই রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে। দীর্ঘ তিন দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের গণমাধ্যমকর্মীরা আজও সেই সত্যটি জানতে চায়-কী ঘটেছিল সেই শীতের সকালে?
আধুনিক সাংবাদিকতায় মোনাজাতউদ্দিনের প্রাসঙ্গিকতা
আজ যখন সাংবাদিকতা করপোরেট সংস্কৃতির চাপে অনেকটা শহরকেন্দ্রিক এবং চটকদার খবরের দিকে ঝুঁকছে, তখন মোনাজাতউদ্দিন আমাদের শিখিয়ে দিয়ে যান সাংবাদিকতা আসলে কার জন্য। তিনি প্রমাণ করেছেন, এসি রুমে বসে ইন্টারনেট ঘেঁটে যা পাওয়া যায় না, তা পাওয়া যায় মানুষের চোখের জলে আর ঘামের গন্ধে। ‘সংবাদ’-এর ৭৬ বছরের দীর্ঘ ঐতিহ্যের এক বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছেন এই চারণ সাংবাদিক।
মোনাজাতউদ্দিন চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু তার জীবন ও কর্ম আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছে- সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, এটি একটি আজন্ম সাধনা। সংবাদের পাতায় পাতায় তিনি বেঁচে থাকবেন তার অমর লেখনীর মাধ্যমে।
লেখক: এডিটর, ন্যাশনাল ডেস্ক, সংবাদ

আপনার মতামত লিখুন