সংবাদ

তথ্য-জ্ঞান বিস্ফোরণে সংবাদমাধ্যমের দায়


নিয়ন মতিয়ুল
নিয়ন মতিয়ুল
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ০৩:১৯ পিএম

তথ্য-জ্ঞান বিস্ফোরণে সংবাদমাধ্যমের দায়
নিয়ন মতিয়ুল

দুই আড়াই দশক আগের কথা। জেলা শহরের এক পত্রিকা অফিসে গিয়ে অদ্ভুত একটা শব্দ শুনলাম। এক সিনিয়র তার জুনিয়রকে বলছেন, “যেসব নিউজ পাঠক ‘খায়’ না, সেগুলো লেখার দরকার নেই।” চমকে গিয়ে সবিনয়ে বিষয়টা জানতে চাইলাম। সেদিন বুঝেছিলাম, নিউজ ‘খাওয়া’ শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহার হয়। যা বুঝায়, নিউজ একটা পণ্য আর পাঠক হচ্ছেন কনজিউমার বা ভোক্তা। আরও বুঝলাম, যে পত্রিকার ভোক্তা যত বেশি, সেই পত্রিকা তত বেশি জনপ্রিয়। আর জনপ্রিয়তা বাড়লে বিজ্ঞাপন বাড়ে। সঙ্গে পত্রিকার মুনাফাও বেড়ে যায়।

বিগত শতকের সেই ‘খবরপণ্যের’ বিবর্তন ঘটে গেল ইন্টারনেট আবিষ্কারের পর। আগে পাঠকের কাছে খবর পৌঁছে যেত কাগজে করে ছাপার অক্ষরের মাধ্যমে। আর চলতি শতকের গোড়ার দিকে ইন্টারনেট হয়ে উঠলো খবরের মানচিত্রহীন বাহক। যাত্রা শুরু হলো ইন্টারনেটভিত্তিক (ডিজিটাল) পত্রিকা বা নিউজপোর্টালের। প্রায় একই সঙ্গে ইন্টারনেটের পরিসরে ভেসে এলো ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটারের মতো জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো।

ফলে পুরোনো সেই ‘খবর’ বা ‘নিউজের’ চেহারা গেল বদলে। শুধুই অক্ষরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ইন্টারনেট পরিসরে লেখা, ছবি, অডিও বা ভিডিওর আকারে তথ্য হয়ে উঠল খবরের উপকরণ। যে উপকরণের ডিজিটাল ভার্সনের ভিন্ন একটা নাম দেওয়া জরুরি হয়ে পড়লো।

মার্কিন গবেষক, মিডিয়া ও কালচারাল স্টাডিজের অধ্যাপক কেট আইখর্ন ২০২২ সালে ‘কনটেন্ট’ নামে বই প্রকাশ করলেন। যেখানে বললেন, ২০০০ সালের দিকে ইন্টারনেটের গতি বেড়ে যাওয়া, সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থান, গুগল অ্যাডসেন্স চালু হওয়ার প্রেক্ষাপটে ‘খবর’, ‘ভিডিও’, ‘ছবি’ সবকিছুর জন্য নিরপেক্ষ ও গুণগত বিচারহীন শব্দের দরকার পড়েছিল। পুরোনো ‘নিউজ’ বা ‘প্রোগ্রাম’ শব্দগুলো সংকীর্ণ মনে হওয়ায় ‘কন্টেন্ট’ শব্দটি তখন দ্রুত জায়গা করে নেয়।

ফলে আগের ‘নিউজ পড়া’ এসে ঠেকলো ‘কন্টেন্ট কনজিউম’ শব্দে। ‘পাঠক’ পরিণত হলেন ‘অডিয়েন্স’ বা ‘ইউজারে’। গুগল অ্যাডসেন্সের বদৌলতে হাজির হলো ‘হিট’, ‘ভিউ’, ‘ট্রাফিক’ শব্দগুলো। আগের দিনের ‘খবর’ ছিল যাচাই করা সত্যতথ্য। অথচ এ যুগে একটা ছবিও ‘কনটেন্ট’। কেট আইখর্নের ভাষায়, ‘কন্টেন্ট’ মানে ‘শুধু ছড়ানোর জন্যই ছড়ানো উপাদান’। যেমন- একটা ভাইরাল ছবি, যার ভেতরে কোনো জ্ঞান বা তথ্য নেই। অথচ কোটি কোটি মানুষ দেখছে।

প্রখ্যাত মিডিয়া সমালোচক মার্কিন সাংবাদিক জে রোজেন বলেন, “অডিয়েন্স আর প্যাসিভ নেই। সে এখন সক্রিয়। শেয়ার করে, কমেন্ট করে, নিজেও তৈরি করে। সংবাদমাধ্যম এখন শুধু অন্য খবরের সঙ্গে নয়, প্রতিযোগিতা করছে প্রতিটি ডিজিটাল উপাদানের সঙ্গে। ফলে শুধুই ‘ভিউ’ বা ‘ট্রাফিক’ নয়, প্রয়োজন ‘বিশ্বাস’ ও ‘সম্পর্ক’ গড়ে তোলা।”

সাংবাদিক জে রোজেনের এই ‘বিশ্বাস’ আর ‘সম্পর্ক’ গড়ে তোলাই হচ্ছে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিষয়টা বুঝতে গেলে তথ্য আর জ্ঞানের ‘মহাবিস্ফোরণের’ তত্ত্বের দিকে তাকাতে হবে। গত কয়েক দশক ধরে ব্যাপক আলোচিত একটা শব্দ হচ্ছে, ‘তথ্যের মহাসমুদ্র’। বলা হচ্ছে, প্রতিমুহূর্তে পৃথিবীতে কোটি কোটি তথ্য উৎপাদিত হচ্ছে। আর আমরা তথ্যের মহাসমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছি। এতে প্রশ্ন এসে যায়, তথ্য ব্যবহার করে প্রতিদিন যে ‘খবর’ বা ‘কনটেন্ট’ তৈরি হচ্ছে তার পরিমাণ আসলে কত?

ক্লাউড ডেটা প্ল্যাটফর্ম ডোমোর ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন ‘ডাটা নেভার স্লিপস ১০.০’ অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি মিনিটে ১ কোটি ৬০ লাখ টেক্সট বার্তা বা খবর আদান-প্রদান হয়। প্রতি মিনিটে ইউটিউবে আপলোড হয় ৫০০ ঘণ্টা নতুন ভিডিও কনটেন্ট। ব্যবহারকারীরা প্রতি মিনিটে দেখেন ১০ লাখ ঘণ্টা অনলাইন ভিডিও।

কিছু গবেষণা বলছে, প্রতি সেকেন্ডে তিনশর বেশি খবর মূলধারার গণমাধ্যমে তৈরি হয়। প্রতি মিনিটে কেবল ফেসবুকেই পোস্ট হয় প্রায় ২৪ লাখ স্ট্যাটাস। টুইটারে চার লাখের বেশি টুইট যুক্ত হয়। প্রতি ঘণ্টায় কয়েক লাখ ভিডিও আপলোড হচ্ছে শুধু ইউটিউবে। যে হিসাবের মধ্যে আছে টিকটক, এক্স, হোয়াটসঅ্যাপ, লিংকডইনসহ বহু প্ল্যাটফর্ম। এআই আর অনলাইনের কারণে এই সংখ্যা প্রতিমুহূর্তে বাড়ছে। আর এসব তথ্যের মধ্য থেকেই একাংশ আমাদের সামনে আসে 'খবর' হয়ে।

যদিও এসব বিষয়ে তেমন গবেষণা নেই। তবে মার্কিন উদ্ভাবক, ভবিষ্যৎদ্রষ্টা বাকমিনস্টার ফুলারের ‘জ্ঞানবিস্ফোরণ’ তত্ত্ব তথ্যের সুনামির দিক উন্মোচন করে দেয়। তিনি দেখিয়েছেন, ১৯০০ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর অর্জিত মোট জ্ঞান দ্বিগুণ হতে সময় লাগতো ১০০ বছর। ১৯৪৫ সালের দিকে এসে তা নেমে আসে ২৫ বছরে। ফুলারের তত্ত্ব প্রকাশকালে (১৯৮২) সেই সময়ে এসে ঠেকে প্রায় এক বছরে।

তার তত্ত্বের ওপর ভিত্তিতে পরে আইবিএম দেখায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর আধুনিক ডেটা বিস্ফোরণের ফলে ২০২০ সালের পর মানবজাতির তথ্য ও জ্ঞান প্রতি ১২ ঘণ্টায় বা একদিনে দ্বিগুণ হচ্ছে। অনেক গবেষকের মতে, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জিনতত্ত্ব বা এআই গবেষণার মতো কিছু ক্ষেত্রে এই সময় নেমে এসেছে আরও সংক্ষিপ্ত হয়ে। বলা হচ্ছে, এক কাপ চা খেতে খেতে পৃথিবীর সব আবিষ্কৃত জ্ঞান আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে।

ফুলারের তত্ত্ব অনুযায়ী, তথ্য-জ্ঞান বিস্ফোরণ আমাদের মস্তিষ্কের ওপর প্রতিমুহূর্তে সুনামির ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছে। অর্থাৎ আমাদের মস্তিষ্ক হাজার বছর আগের। অথচ আমরা বসে আছি তথ্যের মেশিনগানের সামনে। এক্ষেত্রে তাই প্রশ্ন, প্রাচীন মানবমস্তিষ্ক কতটা সক্ষম তথ্য-জ্ঞানের এমন বিস্ফোরণ সামাল দিতে? 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিবর্তনের ধারায় মানুষের মস্তিষ্ক লাখ লাখ বছর ধরে গড়ে উঠেছে ধীর, স্থির, নির্ভরযোগ্য পরিবেশের জন্য। যে সময়ে তথ্য আসতো ধীরে, মুখে মুখে, গল্পে গল্পে, পুঁথির পাতায় পাতায়। তখন মস্তিষ্কের কাজ ছিল শুধু তথ্য যাচাই, গভীরভাবে প্রক্রিয়াজাত, আবেগের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া আর দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে সংরক্ষণ করা। এআই-জেনারেটেড তথ্যের বিষয় তখন কল্পনারও বাইরে ছিল।

বিখ্যাত নিউরন জার্নালে ২০২৪ সালে প্রকাশিত মার্কিন নিউরোবায়োলজিস্ট মার্কাস মাইস্টার ও গবেষক জিয়েউ ঝেং-এর যুগান্তকারী গবেষণায় দেখানো হলো, “মানুষের চিন্তার গতি সর্বোচ্চ ১০ বিট (কম্পিউটার তথ্যের ছোট একক) প্রতি সেকেন্ড।”অর্থাৎ মানুষের মস্তিষ্ক প্রতি মুহূর্তে যে পরিমাণ তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে, তার একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে- যা ‘কগনিটিভ লোড ক্যাপাসিটি’। এই সীমা পেরোলেই মস্তিষ্ক কাজ করতে শুরু করে আপৎকালীন পদ্ধতিতে। অর্থাৎ যত বেশি তথ্য ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে, তত কম ভাবছে মানুষ। প্রতিক্রিয়া বাড়ছে ঠিকই, তবে চিন্তা কমছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়টাকে আরও জটিল করে তুলছে। একটি এআই মডেল ভুলভাল, পক্ষপাতিত্ব আর কাল্পনিক মিলে এক সেকেন্ডে হাজার হাজার কনটেন্ট তৈরি করতে পারে। মানুষ সেই তথ্য পড়ছে, শেয়ার করছে, তার ওপর ভিত্তি করে রাগ করছে, আনন্দ করছে, ভয় পাচ্ছে। অথচ, আমাদের মস্তিষ্ক বিবর্তনের ধারায় এখনও সেই সক্ষমতা অর্জন করেনি, যেখানে সেকেন্ডের মধ্যে এআই-জেনারেটেড তথ্য আর মানুষের লেখার পার্থক্য বুঝে ফেলবে। 

কারণ, বিবর্তনকে সময় দিতে হয়। অথচ সমস্যা হচ্ছে, বিবর্তনকে দেওয়ার মতো সময় সংবাদমাধ্যমের কাছে নেই। ফলে সাংবাদিক জে রোজেনের সেই ‘বিশ্বাস’ আর ‘সম্পর্ক’ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব এখন সীমাহীন। ফুলারের তথ্য-জ্ঞান বিস্ফোরণের এই যুগে মানুষের মধ্যে ‘লার্নড হেলপলেসনেস’ বা শিখে ফেলা অসহায়ত্ব হচ্ছে। এত তথ্য-জ্ঞান, এত এত সমস্যার পাহাড়, অথচ তার কিছুই করার নেই- এমন অনুভূতি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। ফলে সংবাদমাধ্যম যদি প্রতিমুহূর্তে শুধু সমস্যা নিয়ে চিৎকার দিতে থাকে তাহলে মানুষের মস্তিষ্ক আত্মরক্ষার জন্য তথ্যের সব দরজা-জানালা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে। 

বিবর্তনের শিক্ষা হচ্ছে, বিপদের সময় মানুষের মধ্যে ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ মুড সক্রিয় হয়। অর্থাৎ যুদ্ধ করে অথবা পলায়ন করে। তথ্যের সুনামিতে ‘পলায়ন’ অর্থ খবর না পড়া, সংবাদমাধ্যম থেকে দূরে সরে যাওয়া। আর ‘যুদ্ধ’ এখানে ক্ষোভ আর হতাশা। ফলে সংবাদমাধ্যমের কাজ হচ্ছে, তথ্যের সুনামি নয়, সমাধানের তথ্যও উপস্থাপন করা। সমাধানের পথ বা সফলতার দৃষ্টান্তগুলো মানুষের মস্তিষ্কে ‘প্রত্যাশার নিউরন’ সক্রিয় করে তোলে। যা বিবর্তন ধারায় মানুষের টিকে থাকার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

সংবাদমাধ্যমের তথ্যে ‘বিশ্বাস’ ফিরিয়ে আনতে নিউজরুমের পুরোনো ধারার গেটকিপিং পদ্ধতি আর কাজে আসছে না। সীমাহীন তথ্যসমুদ্রের মধ্যে টেকসই ‘লাইফবোট’ তৈরি করতে হবে। প্রতিটি কনটেন্টে ‘ভেরিফাইড ট্রাস্ট মার্ক’ যুক্ত করে দেওয়া জরুরি। যেখানে তথ্যের উৎস আর যাচাই করার প্রক্রিয়া যুক্ত থাকবে। কনটেন্ট এআই-জেনারেটেড হলে তা জানিয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি তথ্যের ‘ডোজ’ও নির্ধারণ করে দিতে হবে। গেটকিপারদের মনে রাখতে হবে, ঘণ্টায় ঘণ্টায় ‘ব্রেকিং নিউজ’ হজম করার জন্য মানবমস্তিষ্ক এখনও সক্ষম নয়। সমাধানভিত্তিক ও গঠনমূলক খবর থাকতে হবে।

নরওয়ের জাতীয় পাবলিক ব্রডকাস্টার ‘এনআরকে’ ২০০৯ সাল থেকে ‘ন্যাচারালি স্লো নিউজ’ ফরম্যাট চালু করেছে। সে বছর বার্গেন থেকে অসলো পর্যন্ত ৭ ঘণ্টার ট্রেন যাত্রা লাইভ দেখানোর মাধ্যমে সেই প্রবণতা শুরু হয়। যাতে এনআরকের পাঠক-ধারণের হার চল্লিশ শতাংশ বেড়েছে। নিউজরুমের আরেকটি অঙ্গীকার হলো ‘ডিজিটাল ওয়েলনেস’। শুধু খবর পরিবেশন নয়, খবর গ্রহণের সুস্থ পদ্ধতি জানানো, স্ক্রিন টাইম কমানোর টিপস দেওয়া, তথ্য ডিটক্সের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, গভীর পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা আর নিউজ ফাস্টিং-এর মতো বিষয়গুলো অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফিনল্যান্ডে গণমাধ্যমে ‘ফ্যাক্ট ফাস্ট’ হিসেবে সপ্তাহে অনন্ত একদিন কোনো সংবাদ পরিবেশন করা হয় না। মূলত, মস্তিষ্ক ধীরে হজম করতে পারে, গভীরভাবে বোঝার সুযোগ পায়- সেটাই ডিজিটাল খবরের ডিটক্স (বিষমুক্তকরণ)। যার মধ্য দিয়ে গণমাধ্যম স্বাস্থ্য সাক্ষরতা বাড়তে পারে।

অতিরিক্ত তথ্যের কারণে সঠিক তথ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠার বিষয়টি প্রথম ইনফোডেমিক’ শব্দ হিসেবে ২০২০ সালে মিউনিখের বৈশ্বিক সম্মেলনে জোরালোভাবে ব্যবহার করেন বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধানম গেব্রেইয়েসুস। বর্তমানে ‘ইনফোডেমিক’ ছাড়িয়ে ‘জ্ঞান সুনামি’র মুখোমুখি মানবজাতি। এখন কেবল ভুল তথ্যই সমস্যা নয়, সঠিক জ্ঞানের পরিমাণও এত বেশি যে তা হজম করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।কারণ, আমাদের মস্তিষ্ক সেই প্রাচীন অ্যালগরিদমে ডিজাইন করা।

মানুষের জিনে পরিবর্তন আসতে লাগে হাজার হাজার বছর। অথচ সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটে মাত্র কয়েক বছর বা দিনে। লাখ লাখ বছর আগের মস্তিষ্ককে সুরক্ষা দিতে সংবাদমাধ্যমকে ভিন্ন পথ খুঁজতে হবে। তথ্যের সুপারসনিক গতির সঙ্গে পাল্লা না দিয়ে বরং কঠোরভাবে মান যাচাই করতে হবে। তথ্য বা জ্ঞান তখনই সুখের হয়, যখন সেটা হজমযোগ্য, পুষ্টিকর হয়।

সত্যের কষ্টিপাথরে যাচাই করা সময়োপযোগী তথ্য-জ্ঞান পাঠক-অডিয়েন্সের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়াই হবে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের কঠিন এক দায়িত্ব। যে দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে এগিয়ে যেতে চায় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন সংবাদপ্রতিষ্ঠান ৭৬ বছরে পা দেওয়া ‘সংবাদ’ ডিজিটাল। মনে রাখতে হবে, যে মিডিয়া পাঠকের মস্তিষ্কের বিবর্তন বোঝে, তারা টিকে থাকে। বাকিরা হারিয়ে যায় তথ্যের মহাপ্লাবনে।

লেখক: নিউজ এডিটর, সংবাদ

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬


তথ্য-জ্ঞান বিস্ফোরণে সংবাদমাধ্যমের দায়

প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬

featured Image

দুই আড়াই দশক আগের কথা। জেলা শহরের এক পত্রিকা অফিসে গিয়ে অদ্ভুত একটা শব্দ শুনলাম। এক সিনিয়র তার জুনিয়রকে বলছেন, “যেসব নিউজ পাঠক ‘খায়’ না, সেগুলো লেখার দরকার নেই।” চমকে গিয়ে সবিনয়ে বিষয়টা জানতে চাইলাম। সেদিন বুঝেছিলাম, নিউজ ‘খাওয়া’ শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহার হয়। যা বুঝায়, নিউজ একটা পণ্য আর পাঠক হচ্ছেন কনজিউমার বা ভোক্তা। আরও বুঝলাম, যে পত্রিকার ভোক্তা যত বেশি, সেই পত্রিকা তত বেশি জনপ্রিয়। আর জনপ্রিয়তা বাড়লে বিজ্ঞাপন বাড়ে। সঙ্গে পত্রিকার মুনাফাও বেড়ে যায়।

বিগত শতকের সেই ‘খবরপণ্যের’ বিবর্তন ঘটে গেল ইন্টারনেট আবিষ্কারের পর। আগে পাঠকের কাছে খবর পৌঁছে যেত কাগজে করে ছাপার অক্ষরের মাধ্যমে। আর চলতি শতকের গোড়ার দিকে ইন্টারনেট হয়ে উঠলো খবরের মানচিত্রহীন বাহক। যাত্রা শুরু হলো ইন্টারনেটভিত্তিক (ডিজিটাল) পত্রিকা বা নিউজপোর্টালের। প্রায় একই সঙ্গে ইন্টারনেটের পরিসরে ভেসে এলো ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটারের মতো জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো।

ফলে পুরোনো সেই ‘খবর’ বা ‘নিউজের’ চেহারা গেল বদলে। শুধুই অক্ষরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ইন্টারনেট পরিসরে লেখা, ছবি, অডিও বা ভিডিওর আকারে তথ্য হয়ে উঠল খবরের উপকরণ। যে উপকরণের ডিজিটাল ভার্সনের ভিন্ন একটা নাম দেওয়া জরুরি হয়ে পড়লো।

মার্কিন গবেষক, মিডিয়া ও কালচারাল স্টাডিজের অধ্যাপক কেট আইখর্ন ২০২২ সালে ‘কনটেন্ট’ নামে বই প্রকাশ করলেন। যেখানে বললেন, ২০০০ সালের দিকে ইন্টারনেটের গতি বেড়ে যাওয়া, সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থান, গুগল অ্যাডসেন্স চালু হওয়ার প্রেক্ষাপটে ‘খবর’, ‘ভিডিও’, ‘ছবি’ সবকিছুর জন্য নিরপেক্ষ ও গুণগত বিচারহীন শব্দের দরকার পড়েছিল। পুরোনো ‘নিউজ’ বা ‘প্রোগ্রাম’ শব্দগুলো সংকীর্ণ মনে হওয়ায় ‘কন্টেন্ট’ শব্দটি তখন দ্রুত জায়গা করে নেয়।

ফলে আগের ‘নিউজ পড়া’ এসে ঠেকলো ‘কন্টেন্ট কনজিউম’ শব্দে। ‘পাঠক’ পরিণত হলেন ‘অডিয়েন্স’ বা ‘ইউজারে’। গুগল অ্যাডসেন্সের বদৌলতে হাজির হলো ‘হিট’, ‘ভিউ’, ‘ট্রাফিক’ শব্দগুলো। আগের দিনের ‘খবর’ ছিল যাচাই করা সত্যতথ্য। অথচ এ যুগে একটা ছবিও ‘কনটেন্ট’। কেট আইখর্নের ভাষায়, ‘কন্টেন্ট’ মানে ‘শুধু ছড়ানোর জন্যই ছড়ানো উপাদান’। যেমন- একটা ভাইরাল ছবি, যার ভেতরে কোনো জ্ঞান বা তথ্য নেই। অথচ কোটি কোটি মানুষ দেখছে।

প্রখ্যাত মিডিয়া সমালোচক মার্কিন সাংবাদিক জে রোজেন বলেন, “অডিয়েন্স আর প্যাসিভ নেই। সে এখন সক্রিয়। শেয়ার করে, কমেন্ট করে, নিজেও তৈরি করে। সংবাদমাধ্যম এখন শুধু অন্য খবরের সঙ্গে নয়, প্রতিযোগিতা করছে প্রতিটি ডিজিটাল উপাদানের সঙ্গে। ফলে শুধুই ‘ভিউ’ বা ‘ট্রাফিক’ নয়, প্রয়োজন ‘বিশ্বাস’ ও ‘সম্পর্ক’ গড়ে তোলা।”

সাংবাদিক জে রোজেনের এই ‘বিশ্বাস’ আর ‘সম্পর্ক’ গড়ে তোলাই হচ্ছে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিষয়টা বুঝতে গেলে তথ্য আর জ্ঞানের ‘মহাবিস্ফোরণের’ তত্ত্বের দিকে তাকাতে হবে। গত কয়েক দশক ধরে ব্যাপক আলোচিত একটা শব্দ হচ্ছে, ‘তথ্যের মহাসমুদ্র’। বলা হচ্ছে, প্রতিমুহূর্তে পৃথিবীতে কোটি কোটি তথ্য উৎপাদিত হচ্ছে। আর আমরা তথ্যের মহাসমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছি। এতে প্রশ্ন এসে যায়, তথ্য ব্যবহার করে প্রতিদিন যে ‘খবর’ বা ‘কনটেন্ট’ তৈরি হচ্ছে তার পরিমাণ আসলে কত?

ক্লাউড ডেটা প্ল্যাটফর্ম ডোমোর ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন ‘ডাটা নেভার স্লিপস ১০.০’ অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি মিনিটে ১ কোটি ৬০ লাখ টেক্সট বার্তা বা খবর আদান-প্রদান হয়। প্রতি মিনিটে ইউটিউবে আপলোড হয় ৫০০ ঘণ্টা নতুন ভিডিও কনটেন্ট। ব্যবহারকারীরা প্রতি মিনিটে দেখেন ১০ লাখ ঘণ্টা অনলাইন ভিডিও।

কিছু গবেষণা বলছে, প্রতি সেকেন্ডে তিনশর বেশি খবর মূলধারার গণমাধ্যমে তৈরি হয়। প্রতি মিনিটে কেবল ফেসবুকেই পোস্ট হয় প্রায় ২৪ লাখ স্ট্যাটাস। টুইটারে চার লাখের বেশি টুইট যুক্ত হয়। প্রতি ঘণ্টায় কয়েক লাখ ভিডিও আপলোড হচ্ছে শুধু ইউটিউবে। যে হিসাবের মধ্যে আছে টিকটক, এক্স, হোয়াটসঅ্যাপ, লিংকডইনসহ বহু প্ল্যাটফর্ম। এআই আর অনলাইনের কারণে এই সংখ্যা প্রতিমুহূর্তে বাড়ছে। আর এসব তথ্যের মধ্য থেকেই একাংশ আমাদের সামনে আসে 'খবর' হয়ে।

যদিও এসব বিষয়ে তেমন গবেষণা নেই। তবে মার্কিন উদ্ভাবক, ভবিষ্যৎদ্রষ্টা বাকমিনস্টার ফুলারের ‘জ্ঞানবিস্ফোরণ’ তত্ত্ব তথ্যের সুনামির দিক উন্মোচন করে দেয়। তিনি দেখিয়েছেন, ১৯০০ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর অর্জিত মোট জ্ঞান দ্বিগুণ হতে সময় লাগতো ১০০ বছর। ১৯৪৫ সালের দিকে এসে তা নেমে আসে ২৫ বছরে। ফুলারের তত্ত্ব প্রকাশকালে (১৯৮২) সেই সময়ে এসে ঠেকে প্রায় এক বছরে।

তার তত্ত্বের ওপর ভিত্তিতে পরে আইবিএম দেখায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর আধুনিক ডেটা বিস্ফোরণের ফলে ২০২০ সালের পর মানবজাতির তথ্য ও জ্ঞান প্রতি ১২ ঘণ্টায় বা একদিনে দ্বিগুণ হচ্ছে। অনেক গবেষকের মতে, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জিনতত্ত্ব বা এআই গবেষণার মতো কিছু ক্ষেত্রে এই সময় নেমে এসেছে আরও সংক্ষিপ্ত হয়ে। বলা হচ্ছে, এক কাপ চা খেতে খেতে পৃথিবীর সব আবিষ্কৃত জ্ঞান আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে।

ফুলারের তত্ত্ব অনুযায়ী, তথ্য-জ্ঞান বিস্ফোরণ আমাদের মস্তিষ্কের ওপর প্রতিমুহূর্তে সুনামির ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছে। অর্থাৎ আমাদের মস্তিষ্ক হাজার বছর আগের। অথচ আমরা বসে আছি তথ্যের মেশিনগানের সামনে। এক্ষেত্রে তাই প্রশ্ন, প্রাচীন মানবমস্তিষ্ক কতটা সক্ষম তথ্য-জ্ঞানের এমন বিস্ফোরণ সামাল দিতে? 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিবর্তনের ধারায় মানুষের মস্তিষ্ক লাখ লাখ বছর ধরে গড়ে উঠেছে ধীর, স্থির, নির্ভরযোগ্য পরিবেশের জন্য। যে সময়ে তথ্য আসতো ধীরে, মুখে মুখে, গল্পে গল্পে, পুঁথির পাতায় পাতায়। তখন মস্তিষ্কের কাজ ছিল শুধু তথ্য যাচাই, গভীরভাবে প্রক্রিয়াজাত, আবেগের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া আর দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে সংরক্ষণ করা। এআই-জেনারেটেড তথ্যের বিষয় তখন কল্পনারও বাইরে ছিল।

বিখ্যাত নিউরন জার্নালে ২০২৪ সালে প্রকাশিত মার্কিন নিউরোবায়োলজিস্ট মার্কাস মাইস্টার ও গবেষক জিয়েউ ঝেং-এর যুগান্তকারী গবেষণায় দেখানো হলো, “মানুষের চিন্তার গতি সর্বোচ্চ ১০ বিট (কম্পিউটার তথ্যের ছোট একক) প্রতি সেকেন্ড।”অর্থাৎ মানুষের মস্তিষ্ক প্রতি মুহূর্তে যে পরিমাণ তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে, তার একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে- যা ‘কগনিটিভ লোড ক্যাপাসিটি’। এই সীমা পেরোলেই মস্তিষ্ক কাজ করতে শুরু করে আপৎকালীন পদ্ধতিতে। অর্থাৎ যত বেশি তথ্য ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে, তত কম ভাবছে মানুষ। প্রতিক্রিয়া বাড়ছে ঠিকই, তবে চিন্তা কমছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়টাকে আরও জটিল করে তুলছে। একটি এআই মডেল ভুলভাল, পক্ষপাতিত্ব আর কাল্পনিক মিলে এক সেকেন্ডে হাজার হাজার কনটেন্ট তৈরি করতে পারে। মানুষ সেই তথ্য পড়ছে, শেয়ার করছে, তার ওপর ভিত্তি করে রাগ করছে, আনন্দ করছে, ভয় পাচ্ছে। অথচ, আমাদের মস্তিষ্ক বিবর্তনের ধারায় এখনও সেই সক্ষমতা অর্জন করেনি, যেখানে সেকেন্ডের মধ্যে এআই-জেনারেটেড তথ্য আর মানুষের লেখার পার্থক্য বুঝে ফেলবে। 

কারণ, বিবর্তনকে সময় দিতে হয়। অথচ সমস্যা হচ্ছে, বিবর্তনকে দেওয়ার মতো সময় সংবাদমাধ্যমের কাছে নেই। ফলে সাংবাদিক জে রোজেনের সেই ‘বিশ্বাস’ আর ‘সম্পর্ক’ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব এখন সীমাহীন। ফুলারের তথ্য-জ্ঞান বিস্ফোরণের এই যুগে মানুষের মধ্যে ‘লার্নড হেলপলেসনেস’ বা শিখে ফেলা অসহায়ত্ব হচ্ছে। এত তথ্য-জ্ঞান, এত এত সমস্যার পাহাড়, অথচ তার কিছুই করার নেই- এমন অনুভূতি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। ফলে সংবাদমাধ্যম যদি প্রতিমুহূর্তে শুধু সমস্যা নিয়ে চিৎকার দিতে থাকে তাহলে মানুষের মস্তিষ্ক আত্মরক্ষার জন্য তথ্যের সব দরজা-জানালা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে। 

বিবর্তনের শিক্ষা হচ্ছে, বিপদের সময় মানুষের মধ্যে ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ মুড সক্রিয় হয়। অর্থাৎ যুদ্ধ করে অথবা পলায়ন করে। তথ্যের সুনামিতে ‘পলায়ন’ অর্থ খবর না পড়া, সংবাদমাধ্যম থেকে দূরে সরে যাওয়া। আর ‘যুদ্ধ’ এখানে ক্ষোভ আর হতাশা। ফলে সংবাদমাধ্যমের কাজ হচ্ছে, তথ্যের সুনামি নয়, সমাধানের তথ্যও উপস্থাপন করা। সমাধানের পথ বা সফলতার দৃষ্টান্তগুলো মানুষের মস্তিষ্কে ‘প্রত্যাশার নিউরন’ সক্রিয় করে তোলে। যা বিবর্তন ধারায় মানুষের টিকে থাকার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

সংবাদমাধ্যমের তথ্যে ‘বিশ্বাস’ ফিরিয়ে আনতে নিউজরুমের পুরোনো ধারার গেটকিপিং পদ্ধতি আর কাজে আসছে না। সীমাহীন তথ্যসমুদ্রের মধ্যে টেকসই ‘লাইফবোট’ তৈরি করতে হবে। প্রতিটি কনটেন্টে ‘ভেরিফাইড ট্রাস্ট মার্ক’ যুক্ত করে দেওয়া জরুরি। যেখানে তথ্যের উৎস আর যাচাই করার প্রক্রিয়া যুক্ত থাকবে। কনটেন্ট এআই-জেনারেটেড হলে তা জানিয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি তথ্যের ‘ডোজ’ও নির্ধারণ করে দিতে হবে। গেটকিপারদের মনে রাখতে হবে, ঘণ্টায় ঘণ্টায় ‘ব্রেকিং নিউজ’ হজম করার জন্য মানবমস্তিষ্ক এখনও সক্ষম নয়। সমাধানভিত্তিক ও গঠনমূলক খবর থাকতে হবে।

নরওয়ের জাতীয় পাবলিক ব্রডকাস্টার ‘এনআরকে’ ২০০৯ সাল থেকে ‘ন্যাচারালি স্লো নিউজ’ ফরম্যাট চালু করেছে। সে বছর বার্গেন থেকে অসলো পর্যন্ত ৭ ঘণ্টার ট্রেন যাত্রা লাইভ দেখানোর মাধ্যমে সেই প্রবণতা শুরু হয়। যাতে এনআরকের পাঠক-ধারণের হার চল্লিশ শতাংশ বেড়েছে। নিউজরুমের আরেকটি অঙ্গীকার হলো ‘ডিজিটাল ওয়েলনেস’। শুধু খবর পরিবেশন নয়, খবর গ্রহণের সুস্থ পদ্ধতি জানানো, স্ক্রিন টাইম কমানোর টিপস দেওয়া, তথ্য ডিটক্সের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, গভীর পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা আর নিউজ ফাস্টিং-এর মতো বিষয়গুলো অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফিনল্যান্ডে গণমাধ্যমে ‘ফ্যাক্ট ফাস্ট’ হিসেবে সপ্তাহে অনন্ত একদিন কোনো সংবাদ পরিবেশন করা হয় না। মূলত, মস্তিষ্ক ধীরে হজম করতে পারে, গভীরভাবে বোঝার সুযোগ পায়- সেটাই ডিজিটাল খবরের ডিটক্স (বিষমুক্তকরণ)। যার মধ্য দিয়ে গণমাধ্যম স্বাস্থ্য সাক্ষরতা বাড়তে পারে।

অতিরিক্ত তথ্যের কারণে সঠিক তথ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠার বিষয়টি প্রথম ইনফোডেমিক’ শব্দ হিসেবে ২০২০ সালে মিউনিখের বৈশ্বিক সম্মেলনে জোরালোভাবে ব্যবহার করেন বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধানম গেব্রেইয়েসুস। বর্তমানে ‘ইনফোডেমিক’ ছাড়িয়ে ‘জ্ঞান সুনামি’র মুখোমুখি মানবজাতি। এখন কেবল ভুল তথ্যই সমস্যা নয়, সঠিক জ্ঞানের পরিমাণও এত বেশি যে তা হজম করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।কারণ, আমাদের মস্তিষ্ক সেই প্রাচীন অ্যালগরিদমে ডিজাইন করা।

মানুষের জিনে পরিবর্তন আসতে লাগে হাজার হাজার বছর। অথচ সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটে মাত্র কয়েক বছর বা দিনে। লাখ লাখ বছর আগের মস্তিষ্ককে সুরক্ষা দিতে সংবাদমাধ্যমকে ভিন্ন পথ খুঁজতে হবে। তথ্যের সুপারসনিক গতির সঙ্গে পাল্লা না দিয়ে বরং কঠোরভাবে মান যাচাই করতে হবে। তথ্য বা জ্ঞান তখনই সুখের হয়, যখন সেটা হজমযোগ্য, পুষ্টিকর হয়।

সত্যের কষ্টিপাথরে যাচাই করা সময়োপযোগী তথ্য-জ্ঞান পাঠক-অডিয়েন্সের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়াই হবে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের কঠিন এক দায়িত্ব। যে দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে এগিয়ে যেতে চায় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন সংবাদপ্রতিষ্ঠান ৭৬ বছরে পা দেওয়া ‘সংবাদ’ ডিজিটাল। মনে রাখতে হবে, যে মিডিয়া পাঠকের মস্তিষ্কের বিবর্তন বোঝে, তারা টিকে থাকে। বাকিরা হারিয়ে যায় তথ্যের মহাপ্লাবনে।

লেখক: নিউজ এডিটর, সংবাদ


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত