সংবাদ

সংবাদ-এর সঙ্গে আমার চার দশকের বসবাস


চিত্ত ঘোষ
চিত্ত ঘোষ
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ০২:৪৬ পিএম

সংবাদ-এর সঙ্গে আমার চার দশকের বসবাস
চিত্ত ঘোষ

তারিখটা ৩১ ডিসেম্বর ১৯৮৫ সাল। সকাল ১০টার মধ্যে জন্ডিসে আক্রান্ত ও জ্বর নিয়ে হাজির হলাম বংশাল সংবাদ অফিসে। উদ্দেশ্য দিনাজপুর সংবাদদাতা নিয়োগের ইন্টারভিউ দিতে। আমি ছাড়াও দিনাজপুর হতে আরো দুইজন আবেদন করেছিলেন।একজন আবুল হাসনাত, অপরজন গোলাম নবী দুলাল। প্রথমজন ঢাকায় যাননি এবং দ্বিতীয়জন সংবাদ অফিসে উপস্থিত হয়েও কিছুক্ষণ পর চলে আসেন। শেষ পর্যন্ত  ইন্টারভিউতে উপস্থিত হননি।

একটা গুদামঘরের মতো অফিসে লোকজনশূন্য, আলো কম- দিনেই অন্ধকার। একজন পিয়ন জিজ্ঞেস করলেন কার খোঁজে এসেছি, বললাম দিনাজপুর হতে, ইন্টারভিউ দিতে। ও বুঝছি। একটা বেঞ্চ দেখিয়ে বললেন, বললেন, আপনি বহেন আমি চা খাইয়া আহি। শুরু হলো আমার অপেক্ষার পালা। বেশ কিছক্ষণ পর শ্যামবর্ণের লম্বা ছিপছিপে গড়ন চোখে কালো ফ্রেমের চশমা গায়ে ধূসর রংয়ের চাদর হাতে কয়েকটি বই নিয়ে মধ্য বয়সী এক ভদ্রলোক অফিসে প্রবেশ করলেন। আমি উঠে দাঁড়ালাম, সালাম জানালাম। মাথা নেড়ে সালাম গ্রহণ করলেন। 

হার্ড বোর্ডের ঘেরা দেওয়া একটি কক্ষে গিয়ে তিনি বসলেন। তিনি যে চেয়ারে বসলেন  এবং যেখানে বেঞ্চে বসে ছিলাম একেবারে দু’জন মুখোমুখি হয়ে গেলাম।  কয়েক মুহূর্ত পর তিনি ক্ষীণস্বরে ‘বসির’ ‘বসির’ বলে ডাক দিলেন। যাকে প্রথম সাক্ষাতে পেলাম তিনি দৌড়ে গেলেন তার সামনে। কয়েকগজ দূরত্বে কথোপকথন শোনা যায়। এখানে একটা কাগজ ছিল, তা পাচ্ছি না। ক’জন এসেছে? একজনই তো দেখতাছি। চা দিয়েছো? 

চা এলো, চা পান করার ফাঁকে বসির ভাইয়ের সঙ্গে পরিচিত হলাম। তিনি কে জানতে চাইলে বশির ভাই জানালেন তিনি সন্তোষ গুপ্ত।সংবাদ-এর ভারপ্রাপ্ত বার্তা সম্পাদক। খবরের কাগজে ছাপা ছবির সঙ্গে মিল খুঁজে পেলাম। সত্যিই তিনি সন্তোষ দা। আরো কিছুক্ষণ পর তৃতীয় মানুষটি এলেন এবং আমার সামনে টেবিলের ওপাশের চেয়ারে বসলেন। 

বসির ভাই জানালেন, ইনি জীবন চৌধুরী সংবাদের মফস্বল সম্পাদক। খুবই আগ্রহ নিয়ে তার সঙ্গে পরিচয় হতে নিজের নাম ও জেলার নাম উল্লেখ করলাম। তার টেবিলের বিপরীতে শূন্য চেয়ারগুলোতে বসতে বললেন না। বেঞ্চ দেখিয়ে কর্কশস্বরে বললেন, যেখানে বসে ছিলেন সেখানেই অপেক্ষা করেন, সময় হলে ডাকবো। তার আচরণ দেখে মনে হলো খিটখিটে মেজাজ ও রাগী প্রকৃতির মানুষ সে।

শরীরে জ্বর অস্থির অস্থির লাগছিল। কখনো শরীর দিয়ে ঘাম ঝরছে, কখনো শীতশীত অনুভব হচ্ছিল। ১৯৭৮ সাল তখন আমি কেবল ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছি। তখন হতে সংবাদে হাতে লেখা খবর নিয়মিত ডাকযোগে পাঠাতে শুরু করি। আমার পাঠানো বেশির ভাগ খবর সংবাদের পাতায় স্থান পেত না। মাসে দু-একটা ৫/৬ লাইনের খবর কোনো পাতায় স্থান পেত ভাগ্যক্রমে। তাতেই মস্তবড় আনন্দ হতো। সেই সংবাদ পত্রিকাটি সপ্তাহ কাল ধরে হাতে থাকতো।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এক ভদ্রলোক অফিসে প্রবেশ করলেন। চোখে সোনালি রংয়ের চিকন ফ্রেমের চশমা। ক্ষীণকায় পরিপাটি পোশাক ঠোঁটে মুচকি হাসি- প্রথম দর্শনেই দাঁড়িয়ে তাকে প্রণাম জানালাম। দেখে তাকে চিনতে ভুল করিনি। তিনিই শ্রদ্ধেয় বজলু ভাই (বজলুর রহমান, সংবাদ-এর  ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক)। তিনি তার নির্ধারিত কক্ষে গিয়ে বসলেন। তাকে দেখার পর হতে স্নায়ুচাপ আরো বেড়ে গেল।

মফস্বল সম্পাদক একটা ফাইল নিয়ে ভিতরে গেলেন। এই বুঝি ডাক পড়বে। অবশেষে ডাক এলো ঘড়িতে তখন সোয়া ১টা। সন্তোষদার সঙ্গে দেখা করে হার্ডবোর্ড পার্টিশনের ছোট্ট কক্ষটিতে ঢুকলাম। দেখি বজলু ভাই বসে আছেন। তিনি যে চেয়ারটিতে বসে আছেন তার তিন পাশেই অসংখ্য বই ও পত্রিকা দিয়ে ঠাঁসা। টেবিলের সামনে একটা চেয়ার। সালাম জানালাম। আমাকে বসতে বললেন।

খুবই ধীর স্থিরভাবে চেয়ারের কোণায় বসলাম। কোথায় কি যেন ভুল করে বসি। তিনি টেবিলে রাখা ফাইল দেখছিলেন। কী নাম, বাড়ি কোথায়? দিনাজপুরে কাকে কাকে চেনেন? উত্তরে বললাম, রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গণে যারা নেতৃত্বে আছেন কমবেশি সকলেই আমাকে জানেন। রহিম ভাইকে (সাবেক এমপি এএম আব্দুর রহিম) চেনেন? বললাম জানি এবং তার সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। তিনি টেলিফোনের রিসিভার তুলে বললেন, দিনাজপুরের রহিম সাহেবের সঙ্গে আমাকে সংযোগ করে দিন।

সংবাদে ছাপা হয়েছে আপনার কোনো খবরের কাটিং এনেছেন? আমি সবগুলো খবরের কাটিং তার সামনে দিলাম। একটা খবর তুলে নিয়ে আমাকে দিলেন। বললেন পড়েন। খবরটি ছিল সদ্য আমন মওসুমে আভ্যন্তরীণ ধান সংগ্রহ অভিযান। খাদ্য বিভাগের অধীনে এই সংগ্রহ মওসুম পরিচালনা হলেও সরকারিভাবে সংগ্রহ অভিযানকে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হতো। জেলার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জেলা প্রশাসকসহ সর্বস্তরের কর্মকর্তা মাঠ পর্যায়ে বেশ তৎপর হয়ে উঠতেন। খাদ্যশস্য উৎপাদনে উদ্বৃত্ত জেলা হিসেবে পরিচিত ও শস্যভাণ্ডার খ্যাত দিনাজপুর জেলায় সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত সে সময় জেলা পর্যায়ের জেলা প্রশাসক ‘কর্ডেনিং প্রথা’ চালু করতেন।  আমার খবরের একাংশে উল্লেখ ছিল, ‘সংগ্রহ অভিযান সফল করতে জেলা প্রশাসক জেলায় কর্ডেনিং প্রথা চালু করেছেন (উৎপাদিত ধান যেন জেলার বাইরে যেতে না পারে)।

তিনি (বজলু ভাই) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ডিসি সাহেব কি সঠিক করেছেন? আমি উত্তরে বললাম, না, এটা সঠিক করেননি।  তিনি আবার জানতে চাইলেন কেন? আমি উত্তরে বললাম সংবিধান অনুযায়ী পারেন না।  কেননা সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে দেশে উৎপাদিত যে কোনো পণ্য দেশের অভ্যন্তরে যে কোনো স্থানে পরিবহনযোগ্য।  তিনি মুচকি হাসলেন। এসময় ফোন বেজে উঠলো, তিনি রিসিভার উঠিয়ে বললেন দেন। বললেন, রহিম ভাই কেমন আছেন, আপনার শরীর ভালো তো? রাজনীতির খবরা খবর নিয়ে প্রায় ৮/১০ মিনিট কথা বলার পর তিনি তার (রহিম চাচা) কাছে জানতে চাইলেন, আমার সামনে দিনাজপুরের চিত্ত ঘোষ নামে একজন বসে আছেন, তাকে চেনেন? রহিম চাচা কী বললেন তাৎক্ষণিক আমি জানতে পারিনি। আরো মিনিট পাঁচেক কথা বলে বজলু ভাই রিসিভার রেখে দিলেন।

আরো কয়েকটি নিউজ কাটিং দেখলেন। পরিবেশ বেশ চুপচাপ। কলিং বেল টিপলেন বসির ভাই আসলেন আর ক’জন আছে? বসির ভাই বললেন, আর কেউ নাই স্যার। মাঝে একটা প্রশ্ন করেছিলেন আবুল হাসনাত কেমন রিপোর্টার? উত্তরে বললাম, আমার চেয়ে ভালো। আমার মুখের দিকে তাকালেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, হাসনাত এলেন না কেন? উত্তরে বললাম, আমি জানতাম তিনি আবেদন করেছেন। ইন্টারভিউর কার্ড পেয়েছেন এবং তিনি আসবেন। তিনি বললেন, আপনাকে নিয়োগ দেয়া হলে খবর পাঠাবেন কেমন করে? সাধারণ খবরগুলো ডাকযোগে এবং জরুরি খবর প্রেস টেলিগ্রাম করে। ঠিক আছে ছবি পাঠাতে পারবেন তো? হ্যাঁ পারবো। বললেন ঠিক আছে এখন আসতে পারেন।  দিনাজপুর যাবেন কবে? শিগগিরই ফিরবো।

সংবাদ অফিস হতে ফিরে ঐদিন বিকেলে লঞ্চে উঠে গিয়ে পৌঁছলাম বিক্রমপুরের সিরাজদিঘান থানার সাতগাঁও গ্রামে আমার মেজ পিসির বাড়িতে। সেখানে ছিলেন আমার বড় পিসিমা। তিনি জানতেন জন্ডিসের চিকিৎসা। পরদিন খুব ভোরে ঘুম হতে  উঠিয়ে পুকুরের জলে স্নান করিয়ে ভেজা কাপড়েই কনকনে শীতের মধ্যে দই চিড়ার সঙ্গে ঔষধ মিশিয়ে খাওয়ালেন। প্রচন্ড শীতে তিনদিন ধরে এই ব্যবস্থা চললো। আমি দিনাজপুরে ফিরে এলাম ১৫ জানুয়ারি। দেখলাম হলুদ খামে আমার নামে সংবাদ অফিস হতে পাঠানো চিঠি। খুলে দেখলাম নিয়োগপত্র। সংবাদ কর্তৃপক্ষ আমাকে ১ জানুয়ারি, ১৯৮৬ হতে দিনাজপুর নিজস্ব সংবাদদাতা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। বাবা- মাসহ পরিবারের সকলে খুশি, আমি সাংবাদিক হলাম।  সেই হতে সংবাদ আমার হলো, তবে আমি সংবাদের হতে পারলাম কিনা তা আজো জানলাম না।

আমার সংবাদের সঙ্গে আমি দীর্ঘপথ বেয়ে চলছি। কখনো ক্লান্ত মনে হয়নি। এ পথ চলতে গিয়ে অনেকের সান্নিধ্য পেয়েছি। তারা হচ্ছেন- ভারপ্রাপ্ত বার্তা সম্পাদক  মোজাম্মেল হক (মন্টু ভাই), কার্তিক চ্যাটার্জী (কার্তিক দা) ইয়াকুব ভাই, বার্তা সম্পাদক মনজুরুল আহসান বুলবুল (বুলবুল ভাই), সোহরাব হাসান (সোহরাব ভাই), মজুমদার জুয়েল, খন্দকার মুনিরুজ্জামান (মুনির ভাই), কাশেম হুমায়ুন ভাই, সালাম জুবায়ের ভাই, কাজী রফিক ভাই, বাকী বিল্লাহ ভাই, রাশেদ আহমেদ (রাশেদ ভাই) আবার ডিজিটালে সহকর্মী হলাম।

অনেক অনেক গুণী সাংবাদিকদের সান্নিধ্য পেয়ে নিজেকে শাণিত করার দুর্লভ সুযোগ পেয়েছি। যতটুকু মানুষের ভালোবাসা- স্নেহমমতা পেয়েছি তা সংবা- এর কল্যাণেই। সংবাদ আমাকে ভালো থাকতে শিখিয়েছে। সংবাদ আমাকে সৎ সাংবাদিকতার পথ দেখিয়েছে। দীর্ঘ ৪০ বছর আমার যাত্রাপথে সংবাদ ডিজিটালে রূপান্তর হয়েছে। আজো রয়েছি সংবাদ-এর সঙ্গেই। আমার শেষযাত্রা হউক সংবাদ-এর পরিচয়ই বহন করে। সংবাদ-এর জন্মজয়ন্তিতে এ আমার নিবেদন।

লেখক: স্টাফ রিপোর্টার, দিনাজপুর।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬


সংবাদ-এর সঙ্গে আমার চার দশকের বসবাস

প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬

featured Image

তারিখটা ৩১ ডিসেম্বর ১৯৮৫ সাল। সকাল ১০টার মধ্যে জন্ডিসে আক্রান্ত ও জ্বর নিয়ে হাজির হলাম বংশাল সংবাদ অফিসে। উদ্দেশ্য দিনাজপুর সংবাদদাতা নিয়োগের ইন্টারভিউ দিতে। আমি ছাড়াও দিনাজপুর হতে আরো দুইজন আবেদন করেছিলেন।একজন আবুল হাসনাত, অপরজন গোলাম নবী দুলাল। প্রথমজন ঢাকায় যাননি এবং দ্বিতীয়জন সংবাদ অফিসে উপস্থিত হয়েও কিছুক্ষণ পর চলে আসেন। শেষ পর্যন্ত  ইন্টারভিউতে উপস্থিত হননি।

একটা গুদামঘরের মতো অফিসে লোকজনশূন্য, আলো কম- দিনেই অন্ধকার। একজন পিয়ন জিজ্ঞেস করলেন কার খোঁজে এসেছি, বললাম দিনাজপুর হতে, ইন্টারভিউ দিতে। ও বুঝছি। একটা বেঞ্চ দেখিয়ে বললেন, বললেন, আপনি বহেন আমি চা খাইয়া আহি। শুরু হলো আমার অপেক্ষার পালা। বেশ কিছক্ষণ পর শ্যামবর্ণের লম্বা ছিপছিপে গড়ন চোখে কালো ফ্রেমের চশমা গায়ে ধূসর রংয়ের চাদর হাতে কয়েকটি বই নিয়ে মধ্য বয়সী এক ভদ্রলোক অফিসে প্রবেশ করলেন। আমি উঠে দাঁড়ালাম, সালাম জানালাম। মাথা নেড়ে সালাম গ্রহণ করলেন। 

হার্ড বোর্ডের ঘেরা দেওয়া একটি কক্ষে গিয়ে তিনি বসলেন। তিনি যে চেয়ারে বসলেন  এবং যেখানে বেঞ্চে বসে ছিলাম একেবারে দু’জন মুখোমুখি হয়ে গেলাম।  কয়েক মুহূর্ত পর তিনি ক্ষীণস্বরে ‘বসির’ ‘বসির’ বলে ডাক দিলেন। যাকে প্রথম সাক্ষাতে পেলাম তিনি দৌড়ে গেলেন তার সামনে। কয়েকগজ দূরত্বে কথোপকথন শোনা যায়। এখানে একটা কাগজ ছিল, তা পাচ্ছি না। ক’জন এসেছে? একজনই তো দেখতাছি। চা দিয়েছো? 

চা এলো, চা পান করার ফাঁকে বসির ভাইয়ের সঙ্গে পরিচিত হলাম। তিনি কে জানতে চাইলে বশির ভাই জানালেন তিনি সন্তোষ গুপ্ত।সংবাদ-এর ভারপ্রাপ্ত বার্তা সম্পাদক। খবরের কাগজে ছাপা ছবির সঙ্গে মিল খুঁজে পেলাম। সত্যিই তিনি সন্তোষ দা। আরো কিছুক্ষণ পর তৃতীয় মানুষটি এলেন এবং আমার সামনে টেবিলের ওপাশের চেয়ারে বসলেন। 

বসির ভাই জানালেন, ইনি জীবন চৌধুরী সংবাদের মফস্বল সম্পাদক। খুবই আগ্রহ নিয়ে তার সঙ্গে পরিচয় হতে নিজের নাম ও জেলার নাম উল্লেখ করলাম। তার টেবিলের বিপরীতে শূন্য চেয়ারগুলোতে বসতে বললেন না। বেঞ্চ দেখিয়ে কর্কশস্বরে বললেন, যেখানে বসে ছিলেন সেখানেই অপেক্ষা করেন, সময় হলে ডাকবো। তার আচরণ দেখে মনে হলো খিটখিটে মেজাজ ও রাগী প্রকৃতির মানুষ সে।

শরীরে জ্বর অস্থির অস্থির লাগছিল। কখনো শরীর দিয়ে ঘাম ঝরছে, কখনো শীতশীত অনুভব হচ্ছিল। ১৯৭৮ সাল তখন আমি কেবল ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছি। তখন হতে সংবাদে হাতে লেখা খবর নিয়মিত ডাকযোগে পাঠাতে শুরু করি। আমার পাঠানো বেশির ভাগ খবর সংবাদের পাতায় স্থান পেত না। মাসে দু-একটা ৫/৬ লাইনের খবর কোনো পাতায় স্থান পেত ভাগ্যক্রমে। তাতেই মস্তবড় আনন্দ হতো। সেই সংবাদ পত্রিকাটি সপ্তাহ কাল ধরে হাতে থাকতো।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এক ভদ্রলোক অফিসে প্রবেশ করলেন। চোখে সোনালি রংয়ের চিকন ফ্রেমের চশমা। ক্ষীণকায় পরিপাটি পোশাক ঠোঁটে মুচকি হাসি- প্রথম দর্শনেই দাঁড়িয়ে তাকে প্রণাম জানালাম। দেখে তাকে চিনতে ভুল করিনি। তিনিই শ্রদ্ধেয় বজলু ভাই (বজলুর রহমান, সংবাদ-এর  ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক)। তিনি তার নির্ধারিত কক্ষে গিয়ে বসলেন। তাকে দেখার পর হতে স্নায়ুচাপ আরো বেড়ে গেল।

মফস্বল সম্পাদক একটা ফাইল নিয়ে ভিতরে গেলেন। এই বুঝি ডাক পড়বে। অবশেষে ডাক এলো ঘড়িতে তখন সোয়া ১টা। সন্তোষদার সঙ্গে দেখা করে হার্ডবোর্ড পার্টিশনের ছোট্ট কক্ষটিতে ঢুকলাম। দেখি বজলু ভাই বসে আছেন। তিনি যে চেয়ারটিতে বসে আছেন তার তিন পাশেই অসংখ্য বই ও পত্রিকা দিয়ে ঠাঁসা। টেবিলের সামনে একটা চেয়ার। সালাম জানালাম। আমাকে বসতে বললেন।

খুবই ধীর স্থিরভাবে চেয়ারের কোণায় বসলাম। কোথায় কি যেন ভুল করে বসি। তিনি টেবিলে রাখা ফাইল দেখছিলেন। কী নাম, বাড়ি কোথায়? দিনাজপুরে কাকে কাকে চেনেন? উত্তরে বললাম, রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গণে যারা নেতৃত্বে আছেন কমবেশি সকলেই আমাকে জানেন। রহিম ভাইকে (সাবেক এমপি এএম আব্দুর রহিম) চেনেন? বললাম জানি এবং তার সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। তিনি টেলিফোনের রিসিভার তুলে বললেন, দিনাজপুরের রহিম সাহেবের সঙ্গে আমাকে সংযোগ করে দিন।

সংবাদে ছাপা হয়েছে আপনার কোনো খবরের কাটিং এনেছেন? আমি সবগুলো খবরের কাটিং তার সামনে দিলাম। একটা খবর তুলে নিয়ে আমাকে দিলেন। বললেন পড়েন। খবরটি ছিল সদ্য আমন মওসুমে আভ্যন্তরীণ ধান সংগ্রহ অভিযান। খাদ্য বিভাগের অধীনে এই সংগ্রহ মওসুম পরিচালনা হলেও সরকারিভাবে সংগ্রহ অভিযানকে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হতো। জেলার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জেলা প্রশাসকসহ সর্বস্তরের কর্মকর্তা মাঠ পর্যায়ে বেশ তৎপর হয়ে উঠতেন। খাদ্যশস্য উৎপাদনে উদ্বৃত্ত জেলা হিসেবে পরিচিত ও শস্যভাণ্ডার খ্যাত দিনাজপুর জেলায় সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত সে সময় জেলা পর্যায়ের জেলা প্রশাসক ‘কর্ডেনিং প্রথা’ চালু করতেন।  আমার খবরের একাংশে উল্লেখ ছিল, ‘সংগ্রহ অভিযান সফল করতে জেলা প্রশাসক জেলায় কর্ডেনিং প্রথা চালু করেছেন (উৎপাদিত ধান যেন জেলার বাইরে যেতে না পারে)।

তিনি (বজলু ভাই) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ডিসি সাহেব কি সঠিক করেছেন? আমি উত্তরে বললাম, না, এটা সঠিক করেননি।  তিনি আবার জানতে চাইলেন কেন? আমি উত্তরে বললাম সংবিধান অনুযায়ী পারেন না।  কেননা সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে দেশে উৎপাদিত যে কোনো পণ্য দেশের অভ্যন্তরে যে কোনো স্থানে পরিবহনযোগ্য।  তিনি মুচকি হাসলেন। এসময় ফোন বেজে উঠলো, তিনি রিসিভার উঠিয়ে বললেন দেন। বললেন, রহিম ভাই কেমন আছেন, আপনার শরীর ভালো তো? রাজনীতির খবরা খবর নিয়ে প্রায় ৮/১০ মিনিট কথা বলার পর তিনি তার (রহিম চাচা) কাছে জানতে চাইলেন, আমার সামনে দিনাজপুরের চিত্ত ঘোষ নামে একজন বসে আছেন, তাকে চেনেন? রহিম চাচা কী বললেন তাৎক্ষণিক আমি জানতে পারিনি। আরো মিনিট পাঁচেক কথা বলে বজলু ভাই রিসিভার রেখে দিলেন।

আরো কয়েকটি নিউজ কাটিং দেখলেন। পরিবেশ বেশ চুপচাপ। কলিং বেল টিপলেন বসির ভাই আসলেন আর ক’জন আছে? বসির ভাই বললেন, আর কেউ নাই স্যার। মাঝে একটা প্রশ্ন করেছিলেন আবুল হাসনাত কেমন রিপোর্টার? উত্তরে বললাম, আমার চেয়ে ভালো। আমার মুখের দিকে তাকালেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, হাসনাত এলেন না কেন? উত্তরে বললাম, আমি জানতাম তিনি আবেদন করেছেন। ইন্টারভিউর কার্ড পেয়েছেন এবং তিনি আসবেন। তিনি বললেন, আপনাকে নিয়োগ দেয়া হলে খবর পাঠাবেন কেমন করে? সাধারণ খবরগুলো ডাকযোগে এবং জরুরি খবর প্রেস টেলিগ্রাম করে। ঠিক আছে ছবি পাঠাতে পারবেন তো? হ্যাঁ পারবো। বললেন ঠিক আছে এখন আসতে পারেন।  দিনাজপুর যাবেন কবে? শিগগিরই ফিরবো।

সংবাদ অফিস হতে ফিরে ঐদিন বিকেলে লঞ্চে উঠে গিয়ে পৌঁছলাম বিক্রমপুরের সিরাজদিঘান থানার সাতগাঁও গ্রামে আমার মেজ পিসির বাড়িতে। সেখানে ছিলেন আমার বড় পিসিমা। তিনি জানতেন জন্ডিসের চিকিৎসা। পরদিন খুব ভোরে ঘুম হতে  উঠিয়ে পুকুরের জলে স্নান করিয়ে ভেজা কাপড়েই কনকনে শীতের মধ্যে দই চিড়ার সঙ্গে ঔষধ মিশিয়ে খাওয়ালেন। প্রচন্ড শীতে তিনদিন ধরে এই ব্যবস্থা চললো। আমি দিনাজপুরে ফিরে এলাম ১৫ জানুয়ারি। দেখলাম হলুদ খামে আমার নামে সংবাদ অফিস হতে পাঠানো চিঠি। খুলে দেখলাম নিয়োগপত্র। সংবাদ কর্তৃপক্ষ আমাকে ১ জানুয়ারি, ১৯৮৬ হতে দিনাজপুর নিজস্ব সংবাদদাতা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। বাবা- মাসহ পরিবারের সকলে খুশি, আমি সাংবাদিক হলাম।  সেই হতে সংবাদ আমার হলো, তবে আমি সংবাদের হতে পারলাম কিনা তা আজো জানলাম না।

আমার সংবাদের সঙ্গে আমি দীর্ঘপথ বেয়ে চলছি। কখনো ক্লান্ত মনে হয়নি। এ পথ চলতে গিয়ে অনেকের সান্নিধ্য পেয়েছি। তারা হচ্ছেন- ভারপ্রাপ্ত বার্তা সম্পাদক  মোজাম্মেল হক (মন্টু ভাই), কার্তিক চ্যাটার্জী (কার্তিক দা) ইয়াকুব ভাই, বার্তা সম্পাদক মনজুরুল আহসান বুলবুল (বুলবুল ভাই), সোহরাব হাসান (সোহরাব ভাই), মজুমদার জুয়েল, খন্দকার মুনিরুজ্জামান (মুনির ভাই), কাশেম হুমায়ুন ভাই, সালাম জুবায়ের ভাই, কাজী রফিক ভাই, বাকী বিল্লাহ ভাই, রাশেদ আহমেদ (রাশেদ ভাই) আবার ডিজিটালে সহকর্মী হলাম।

অনেক অনেক গুণী সাংবাদিকদের সান্নিধ্য পেয়ে নিজেকে শাণিত করার দুর্লভ সুযোগ পেয়েছি। যতটুকু মানুষের ভালোবাসা- স্নেহমমতা পেয়েছি তা সংবা- এর কল্যাণেই। সংবাদ আমাকে ভালো থাকতে শিখিয়েছে। সংবাদ আমাকে সৎ সাংবাদিকতার পথ দেখিয়েছে। দীর্ঘ ৪০ বছর আমার যাত্রাপথে সংবাদ ডিজিটালে রূপান্তর হয়েছে। আজো রয়েছি সংবাদ-এর সঙ্গেই। আমার শেষযাত্রা হউক সংবাদ-এর পরিচয়ই বহন করে। সংবাদ-এর জন্মজয়ন্তিতে এ আমার নিবেদন।

লেখক: স্টাফ রিপোর্টার, দিনাজপুর।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত