সংবাদ

অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও অতিরিক্ত উন্নয়ন ব্যয় অর্থনীতিকে চাপে ফেলবে: দেবপ্রিয়


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ০৯:৩৪ পিএম

অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও অতিরিক্ত উন্নয়ন ব্যয় অর্থনীতিকে চাপে ফেলবে: দেবপ্রিয়

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাজেট প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, ‘অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও অতিরিক্ত উন্নয়ন ব্যয়ের পরিকল্পনা অর্থনীতিকে আরও চাপের মুখে ফেলতে পারে।’

সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক প্রাক-বাজেট সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এ সংলাপের আয়োজন করে।

দেবপ্রিয় বলেন, ‘দেশ বর্তমানে নানা অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। অথচ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার তিন-চার মাস পার হলেও অর্থনীতিকে কী অবস্থায় পেয়েছে, তার কোনো প্রামাণ্য মূল্যায়ন প্রকাশ করেনি। সরকার ফ্যামিলি কার্ড, ফারমার্স কার্ড বা খাল খননের মতো কর্মসূচি নিয়ে বেশি আলোচনা করলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার কমানো, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা কিংবা কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়গুলো মনোযোগে আসছে না। সরকার চাইলে স্বল্পমেয়াদি একটি অর্থনৈতিক কৌশলপত্র দিতে পারত, যাতে নীতির ধারাবাহিকতা ও সংকট উত্তরণে করণীয় স্পষ্ট হতো। কিন্তু সে ধরনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।’

অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছি বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বাজেট তৈরি করতে। কিন্তু যে বাজেটটা তৈরি করতে যাচ্ছেন সেটা কী তাই হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বাজেট দেখে আমরা যে কথাগুলো বলেছিলাম গতানুগতিক বাজেট হচ্ছে, সেই কথাটাই আবার পুনরাবৃত্তির দিকে যেতে হতে পারে এখন আমাদের এই আশঙ্কায় সৃষ্টি হচ্ছে।’

উন্নয়ন বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এডিপির ৪০-৫০ শতাংশই বাস্তবায়ন করা যায়নি। তাকে আরও ২০ শতাংশ বাড়িয়ে দিচ্ছেন। দিয়ে বাস্তবায়নের কথা বলছেন। সেখানে যে দেড় হাজার প্রকল্প আছে তার থেকে আপনি নোংরা পরিস্কার করলেন না। এটার মাধ্যমে আপনি পুরোনো পরিস্থিতিকেই আবার নতুনভাবে উপস্থাপন করছেন। আয়ের জন্য যে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে রাজস্ব বোর্ডকে তা পরিপালন করার সুযোগই তার নেই। সরকারের উচিত ছিল স্থিতিশীলতা কর্মসূচির মধ্যে থেকে যতটুকু আয় হবে, সেই সীমার মধ্যেই ব্যয় নির্ধারণ করা। কিন্তু এখন ব্যয়কে কেন্দ্র করে কাল্পনিক আয়ের হিসাব দাঁড় করানোর চেষ্টা হচ্ছে। বাজেটের আয়-ব্যয়ের হিসাব বাস্তবসম্মত না হলে পরবর্তীতে ঘাটতি মেটাতে টাকা ছাপানোর প্রবণতা বাড়তে পারে, যা মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দেবে।’

সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাজেটে জনগণ কত দিচ্ছে এবং বিনিময়ে কতটা সেবা পাচ্ছে, তার মূল্যায়ন হওয়া উচিত। একই সঙ্গে দুর্নীতির মাত্রাও পরিমাপের আওতায় আনা প্রয়োজন। আগামী বাজেটে প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হতে পারে। তাই ঋণনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন বাণিজ্য চুক্তিতে শুল্ক ছাড়ের বিষয়গুলোও পূর্ণাঙ্গভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।’

সংলাপে সমাজকল্যাণ ও মহিলা ও শিশু বিষয়কমন্ত্রী আবু জাফর জাহিদ হোসেন বলেন, ‘সরকারের প্রধান লক্ষ্য নি¤œবিত্ত মানুষকে আরও ভালোভাবে সহায়তা করা। আগামী বছরের জুনের মধ্যে ৪০ লাখ পরিবারের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে আগামী অর্থবছরে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। আমরা জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করছি, পাশাপাশি ঘরে ঘরে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।’

এসময় তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা কমানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তার ভাষায়, প্রকল্প নিলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ করতে হবে। বারবার সংশোধনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ‘আগামী অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলে প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে, যা বর্তমান কাঠামোয় অত্যন্ত কঠিন। দেশে ২০১১ সালে সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশের কিছু বেশি রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। এরপর আর কখনো এত প্রবৃদ্ধি হয়নি। কর আদায় বাড়াতে হলে করের আওতা সম্প্রসারণ করতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে করহার কমানোর বিষয়ও বিবেচনা করা প্রয়োজন। অন্যথায় পরিচালন ব্যয় ও সরকারি বেতন কাঠামোর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে।’

সংলাপে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক ও সংসদ সদস্য মাহ্‌মুদা হাবীবা প্রমুখ।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬


অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও অতিরিক্ত উন্নয়ন ব্যয় অর্থনীতিকে চাপে ফেলবে: দেবপ্রিয়

প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬

featured Image

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাজেট প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, ‘অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও অতিরিক্ত উন্নয়ন ব্যয়ের পরিকল্পনা অর্থনীতিকে আরও চাপের মুখে ফেলতে পারে।’

সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক প্রাক-বাজেট সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এ সংলাপের আয়োজন করে।

দেবপ্রিয় বলেন, ‘দেশ বর্তমানে নানা অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। অথচ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার তিন-চার মাস পার হলেও অর্থনীতিকে কী অবস্থায় পেয়েছে, তার কোনো প্রামাণ্য মূল্যায়ন প্রকাশ করেনি। সরকার ফ্যামিলি কার্ড, ফারমার্স কার্ড বা খাল খননের মতো কর্মসূচি নিয়ে বেশি আলোচনা করলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার কমানো, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা কিংবা কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়গুলো মনোযোগে আসছে না। সরকার চাইলে স্বল্পমেয়াদি একটি অর্থনৈতিক কৌশলপত্র দিতে পারত, যাতে নীতির ধারাবাহিকতা ও সংকট উত্তরণে করণীয় স্পষ্ট হতো। কিন্তু সে ধরনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।’

অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছি বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বাজেট তৈরি করতে। কিন্তু যে বাজেটটা তৈরি করতে যাচ্ছেন সেটা কী তাই হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বাজেট দেখে আমরা যে কথাগুলো বলেছিলাম গতানুগতিক বাজেট হচ্ছে, সেই কথাটাই আবার পুনরাবৃত্তির দিকে যেতে হতে পারে এখন আমাদের এই আশঙ্কায় সৃষ্টি হচ্ছে।’

উন্নয়ন বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এডিপির ৪০-৫০ শতাংশই বাস্তবায়ন করা যায়নি। তাকে আরও ২০ শতাংশ বাড়িয়ে দিচ্ছেন। দিয়ে বাস্তবায়নের কথা বলছেন। সেখানে যে দেড় হাজার প্রকল্প আছে তার থেকে আপনি নোংরা পরিস্কার করলেন না। এটার মাধ্যমে আপনি পুরোনো পরিস্থিতিকেই আবার নতুনভাবে উপস্থাপন করছেন। আয়ের জন্য যে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে রাজস্ব বোর্ডকে তা পরিপালন করার সুযোগই তার নেই। সরকারের উচিত ছিল স্থিতিশীলতা কর্মসূচির মধ্যে থেকে যতটুকু আয় হবে, সেই সীমার মধ্যেই ব্যয় নির্ধারণ করা। কিন্তু এখন ব্যয়কে কেন্দ্র করে কাল্পনিক আয়ের হিসাব দাঁড় করানোর চেষ্টা হচ্ছে। বাজেটের আয়-ব্যয়ের হিসাব বাস্তবসম্মত না হলে পরবর্তীতে ঘাটতি মেটাতে টাকা ছাপানোর প্রবণতা বাড়তে পারে, যা মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দেবে।’

সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাজেটে জনগণ কত দিচ্ছে এবং বিনিময়ে কতটা সেবা পাচ্ছে, তার মূল্যায়ন হওয়া উচিত। একই সঙ্গে দুর্নীতির মাত্রাও পরিমাপের আওতায় আনা প্রয়োজন। আগামী বাজেটে প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হতে পারে। তাই ঋণনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন বাণিজ্য চুক্তিতে শুল্ক ছাড়ের বিষয়গুলোও পূর্ণাঙ্গভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।’

সংলাপে সমাজকল্যাণ ও মহিলা ও শিশু বিষয়কমন্ত্রী আবু জাফর জাহিদ হোসেন বলেন, ‘সরকারের প্রধান লক্ষ্য নি¤œবিত্ত মানুষকে আরও ভালোভাবে সহায়তা করা। আগামী বছরের জুনের মধ্যে ৪০ লাখ পরিবারের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে আগামী অর্থবছরে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। আমরা জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করছি, পাশাপাশি ঘরে ঘরে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।’

এসময় তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা কমানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তার ভাষায়, প্রকল্প নিলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ করতে হবে। বারবার সংশোধনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ‘আগামী অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলে প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে, যা বর্তমান কাঠামোয় অত্যন্ত কঠিন। দেশে ২০১১ সালে সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশের কিছু বেশি রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। এরপর আর কখনো এত প্রবৃদ্ধি হয়নি। কর আদায় বাড়াতে হলে করের আওতা সম্প্রসারণ করতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে করহার কমানোর বিষয়ও বিবেচনা করা প্রয়োজন। অন্যথায় পরিচালন ব্যয় ও সরকারি বেতন কাঠামোর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে।’

সংলাপে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক ও সংসদ সদস্য মাহ্‌মুদা হাবীবা প্রমুখ।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত